#অসময়ের_বৃষ্টি
#পর্ব_২
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
সকাল সকাল কলিংবেলের কর্কশ শব্দে সাফোয়ানের আরামের ঘুমের বারোটা বেজে গেল। কোন অভদ্র যে এই সাতসকালে এসে কলিংবেল টিপছে, কে জানে! মনে মনে বিরক্ত হতে হতে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল সাফোয়ান। পেশায় সে একজন ডাক্তার, সদ্যই সরকারি চাকরিতে জয়েন করেছে। বাবা-মা থাকেন কুড়িগ্রামে, আর সাফোয়ান থাকে ঢাকায়। একা একাই এই ফ্ল্যাটে তার দিন কাটে। বাবা-মাকে অনেকবার এখানে এসে থাকার কথা বলেছে সে, কিন্তু নিজেদের চেনা ভিটেমাটি ছেড়ে এই যান্ত্রিক শহরে আসতে কোনোভাবেই রাজি নন তাঁরা। অগত্যা চাকরির সূত্রে সাফোয়ানকে একাই থাকতে হচ্ছে।
“আরে আসছি, আসছি! এমন ষাঁড়ের মতো বেল বাজাচ্ছ কে হে তুমি?”
বিরক্তি নিয়ে দরজাটা খুলল সাফোয়ান। আর দরজা খোলা মাত্রই আফ্রিদি সাফোয়ানকে গায়ের জোরে একপাশে ঠেলে হনহনিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। সাফোয়ান তো যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল! যে ছেলে সচরাচর বেলা দশটার আগে কখনো চোখই খোলে না, সে আজ এত সকাল সকাল তার ফ্ল্যাটে হাজির!
“কী রে মামা? তুই ঠিক আছিস তো? এত সকালে এখানে এলি যে?”
আফ্রিদি কোনো উত্তর দিল না। সোজা সাফোয়ানের শোবার ঘরের দিকে চলে গেল। সাফোয়ানও দ্রুত সদর দরজা আটকে ওর পিছু পিছু এগিয়ে গেল। তার মনে তখন হাজারটা প্রশ্ন, কিন্তু আফ্রিদি যা ত্যাড়া জিনিস নিজে থেকে না বললে ওর মুখ থেকে কিছু বের করার সাধ্য কারও নেই।
রুমে ঢুকে আফ্রিদি সোজা সাফোয়ানের বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আরাম করে চোখ বুজে বলল,
“আয়, ঘুমাই।”
“ছিহ, ব্যাটা! ছেলে হয়ে ছেলেদের বিছানায় এসে বলিস–আয় ঘুমাই?”
সাফোয়ানের রসিকতা আফ্রিদির মোটেও ভালো লাগল না। কপাল কুঁচকে সে চোখ রাঙাল,
“বালটা! আগে ঘুমাই, তারপর সব বলব।”
“আরে কী হয়েছে, একটু বল না!”
সাফোয়ান কৌতুহল সামলাতে না পেরে এবার ওর পাশেই বসে পড়ল। আফ্রিদি চোখ বন্ধ করতে করতে ক্লান্ত গলায় বলল,
“গুষ্টি মারছে! সারা রাত বাসে জার্নি করেছি। এখন একটু ঘুমাতে দে।”
সাফোয়ান আর কথা বাড়াল না, কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তবে তার চিন্তিত চোখজোড়া বন্ধুর ক্লান্ত মুখের দিকেই আটকে রইল।
**
ঘুমঘুম চোখে বিছানায় উঠে বসল স্মৃতি। পরনে তার এখনও রাতের ভারী বিয়ের শাড়ি আর গয়না। চারপাশে তাকিয়ে অচেনা ঘরটা দেখে প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেল সে। পরক্ষণেই মাথায় খেলে গেল তার তো বিয়ে হয়ে গেছে! অবচেতনভাবেই মুচকি হাসল মেয়েটা। বিয়ের আগে মামা বলেছিলেন, একবার বিয়ে হয়ে গেলে স্মৃতিকে আর মামির গালমন্দ শুনতে হবে না। কখনো না খেয়ে থাকতে হবে না, মামির হাতের মারও খেতে হবে না। মামার সেই কথাগুলো মনে পড়তেই স্বস্তি আর আনন্দ কাজ করতে লাগল তার ছোট্ট মনে।
এমন সময় ঘরের দরজায় মৃদু ঠকঠক শব্দ হলো। স্মৃতি বড় বড় চোখ দুটো দরজার দিকে ঘোরাল। শারমিন খন্দকার হাসিমুখে রুমে ঢুকে নরম গলায় বললেন,
“ঘুম ভাঙল তোমার, স্মৃতি?”
স্মৃতি তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে দ্রুত শাশুড়ির পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। শারমিন এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। রাতেই তো একবার সালাম-কালামের পর্ব চুকেছে, আবার কেন!
“আরে কী করছ, স্মৃতি! ওঠো, ওঠো।”
“সালাম করছি, আম্মা। বড়দের দেখলে তো সালাম করা লাগে, মামা শিখিয়েছেন।”
শারমিন হালকা হাসলেন। মেয়েটা বড্ড সহজ-সরল, আর বয়সটাও তো একেবারে কাঁচা, তাই সংসারের কোনো মারপ্যাঁচ বোঝে না। তিনি স্মৃতির চিবুক ছুঁয়ে বললেন,
“আচ্ছা বুঝলাম। তবে এরপর থেকে আর কখনো পায়ে হাত দিয়ে সালাম করবে না, কেমন? বড়দের দেখলেই মুখে সালাম দেবে। মনে থাকবে?”
স্মৃতি দুদিকে মাথা নেড়ে দ্রুত বাচ্চাদের মতো আহ্লাদী গলায় বলে উঠল,
“একশো বার মনে থাকবে, আম্মা! অবশ্যই মনে থাকবে।”
“বেশ। এখন ফ্রেশ হও। আমরা একটু পরেই ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হব।”
স্মৃতি মাথা চুলকাতে চুলকাতে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ফেরেশ কেমনে হয়, আম্মা?”
শারমিন এবার হেসেই ফেললেন,
“ফ্রেশ, ফেরেশ না। এটার মানে হলো–তুমি হাত-মুখ ধুয়ে এসো। চোখে-মুখে পানি দিয়ে, ব্রাশ করে এসো।”
এবার স্মৃতি আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল। আর সাথে সাথে খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল,
“ওহ, এই কথা! ঠিক আছে আম্মা, আমি এখনই ফেরেশ… মানে ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
শারমিন স্মৃতির শিশুতোষ আচরণ দেখে মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
–
এদিকে নিজের ঘরে বিছানায় থমথমে মুখে বসে আছেন ফরিদা ও সুফিয়ান খন্দকার। আফ্রিদির এভাবে রাতের অন্ধকারে চলে যাওয়াটা তাঁদের মনে গভীর অশান্তির সৃষ্টি করেছে। শিউলির ছেলের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আফ্রিদিকে দিয়ে করানোটা কি আসলেই ঠিক হলো? ছেলেটা স্বভাবের দিক থেকে যা ত্যাড়া আর রাগী, তাতে এই নিষ্পাপ স্মৃতির সাথে আদেও বনিবনা হবে কি-না, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
“কী হয়েছে আপনাদের? দুজনে এভাবে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন কেন?”
জয়নাল খন্দকার বাবা-মায়ের এমন চিন্তিত মুখ দেখে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলেন। সুফিয়ান খন্দকার নড়েচড়ে বসলেন। ফরিদা খন্দকার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“মনটা ভালো লাগে না রে জয়নাল। আমাদের নাতি কি স্মৃতির সাথে সংসার করবে শেষ পর্যন্ত? মেয়েটা বড্ড ভালো, রে।”
“এসব নিয়ে আপনারা একদম ভাববেন না। বিয়ে তো একটা না একটা সময় ও করতই। তকদীরে হয়তো এই মেয়েটাই ছিল, তাই এমন পরিস্থিতিতে হয়েছে। আমি আর শারমিন তো আছিই, স্মৃতিকে আমরা নিজেদের মেয়ের মতোই আগলে রাখব। আর আফ্রিদি মুখে যতই রাগ দেখাক, ওর মনটা খারাপ না। ও কখনো স্মৃতির গায়ে হাত তুলবে না বা অন্যায় কিছু করবে না।”
সুফিয়ান খন্দকার এবার একটা লম্বা বুকভাঙা নিশ্বাস ফেললেন,
“তা অবশ্য ঠিক বলেছিস, জয়নাল। আফ্রিদির ওপর ওপর রাগ হলেও ভেতরটা ভালো।”
এমন সময় ঘরে এসে ঢুকল সারা আর জারা। সবাইকে এভাবে থমথমে মুখ করে বসে থাকতে দেখে জারার আর সহ্য হলো না। সারা আর জারা দুই যমজ বোন হলেও স্বভাবের দিক থেকে দুজন উত্তর আর দক্ষিণ মেরু। সারা হলো শান্ত নদীর মতো পরিপাটি, আর জারা? সে হলো বাঁধভাঙা চঞ্চল এক অশান্ত নদী। স্মৃতির চঞ্চলতার সাথে জারার স্বভাবের খুব মিল, তাই দুজনের বন্ডিংটাও বেশ জমবে বোঝা যাচ্ছে।
জারা কোমরে হাত দিয়ে বলল,
“তোমরা কি কেউ ব্রেকফাস্ট করবে না? এভাবে সবাই মুখ কালো করে বসে আছ কেন?”
সারা পাশ থেকে ওর ওড়না টেনে ফিসফিসিয়ে বকা দিল,
“মুখ সামলে কথা বল, জারা। দেখতেই তো পাচ্ছিস সবাই সবাই চিন্তিত।”
জারা ড্যাম-কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
“রাখ তোর চিন্তা! চিন্তা করলে কি পেট ভরবে?”
জয়নাল খন্দকার মেয়েদের দেখে মৃদু হেসে বললেন,
“তোমরা গিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসো। আমি তোমাদের দাদা-দাদিকে নিয়ে আসছি।”
“ওকে, বাবা!”
বলে দুই বোন তড়িঘড়ি করে রুম থেকে চলে গেল।
“চলুন আব্বা, আম্মা, নাস্তাটা সেরে নিই। আমাদের আবার একটু পরেই রওনা দিতে হবে।”
জয়নাল বললেন।
ফরিদা খন্দকার বিছানা থেকে উঠে ছেলের কাছে এগিয়ে এলেন,
“কতদিন পর এলি তোরা, অথচ এভাবে তাড়াহুড়ো করে চলে যেতে হচ্ছে। আফ্রিদিটা যে কোথায় গেল, কে জানে!”
“ঢাকাই গেছে, আর কোথায় যাবে!”
সুফিয়ান খন্দকার খাটিয়া থেকে নামতে নামতে বললেন।
জয়নালও বাবার কথায় তাল মিলিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ আম্মা, কোনো বন্ধুর বাসায় গিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া তার তো আর কোনো জায়গা নেই। যাই হোক, চলুন।”
ফরিদা ও সুফিয়ান খন্দকার ছেলের পিছু পিছু ডাইনিং রুমের দিকে এগোলেন।
খন্দকার বাড়ির সবাই কোনোমতে ব্রেকফাস্টের পর্বটা শেষ করল। কারো তেমন খাওয়াদাওয়ার দিকে মন ছিল না, কেবল জারা আর স্মৃতি বাদে। স্মৃতির অবশ্য অত শত ভাবার সময় নেই, সে নিজের মনেই পেট পুরে খেয়ে নিল।
নাস্তা শেষ হতেই জয়নাল খন্দকার তাঁর পরিবার নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করলেন। বিদায়লগ্নে সুফিয়ান খন্দকার আর ফরিদা খন্দকার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেন। তাঁদের চোখের কোণে জল, আর বুক চিরে বেরিয়ে আসছে দীর্ঘশ্বাস। কত আশা নিয়ে ছেলে-বউ আর নাতি-নাতনিরা গ্রামে এসেছিল, আর যাওয়ার সময় একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় পুরো আনন্দটাই মাটি করে দিয়ে গেল। হাত নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁরা সবাইকে বিদায় জানালেন।
গাড়ি স্টার্ট হতেই স্মৃতি যেন রূপকথার জগৎ দেখতে পেল! জীবনে প্রথমবার প্রাইভেট কারে চড়েছে সে। এত নরম সিট, কাচের ওপাশ দিয়ে গাছপালাগুলো কীভাবে যেন পেছনের দিকে ছুটে পালাচ্ছে– সব মিলিয়ে স্মৃতির তো মহা আনন্দ! কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তার চোখ দুটো বিস্ময়ে চকচক করছে। গাড়ির পেছনের সিটে তিন মেয়ে বসেছে– সারা, জারা আর মাঝে স্মৃতি। স্মৃতি আর নিজের ভেতরের আনন্দ চেপে রাখতে পারল না। সে সারা রাস্তা জারা আর সারার সাথে অনর্গল বকবক করতে করতে চলল। তার কথার যেন কোনো শেষ নেই। গ্রামের গল্প, মামার বাড়ির বিড়ালের গল্প, তার বান্ধবীদের গল্প–সব একনাগাড়ে বলে যাচ্ছে।
সারা স্বভাবগতভাবেই বেশ কম কথা বলে। স্মৃতির এই অতিরিক্ত চঞ্চলতা আর অনবরত কথার তোড়ে সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মৃদু হেসে হু-হাঁ করা ছাড়া স্মৃতির সাথে তার আড্ডাটা ঠিক জমল না।
কিন্তু জারা তো অন্য ধাতুতে গড়া! স্মৃতির মতো এমন একজন পার্টনার পেয়ে জারার ভেতরের চঞ্চল নদীটাও যেন বাঁধ ভেঙে গেল। স্মৃতি জারাকে কনুই দিয়ে হালকা গুঁতো দিয়ে বলল,
“ও আপা! দেহেন, ওই গাছটা ক্যামনে দৌড় মেরেছে! আমরা কি খুব জোরে যাচ্ছি?”
জারা হেসেই খুন,
“আরে পাগলী, গাছ দৌড়ায় না, গাড়ি জোরে চললে ওমন মনে হয়। তুমি কখনো ঢাকায় যাওনি আগে?”
“উঁহু! এই প্রথম। ঢাকা শহর নাকি খুব বড়? মেলা বড় বড় দালান আছে ওখানে?”
স্মৃতির চোখ বড় বড়।
“মেলা না, বলবি অনেক বড়! তুমি চলো আমাদের সাথে, তোমাকে পুরো ঢাকা শহর ঘুরিয়ে দেখাবো।”
জারা একগাল হেসে স্মৃতির হাত চেপে ধরল।
“ আইচ্ছা, আপা।”
স্মৃতির কথায় শুদ্ধ আর আঞ্চলিক ভাষা মিলেমিশে যায়। এদিকে দুই চঞ্চল মেয়ের কিচিরমিচির বকবকানিতে গাড়ির ভেতরের থমথমে ভাবটা উধাও হয়ে গেছে। সামনে বসা জয়নাল আর শারমিন পেছনের আয়না দিয়ে স্মৃতির নিষ্পাপ, আনন্দিত মুখের দিকে তাকিয়ে একে অপরের দিকে চাইলেন। তাঁদের মনে হলো, আফ্রিদি যা-ই করুক না কেন, এই হাসিখুশি মেয়েটাকে তাঁরা কোনোদিন কাঁদতে দেবেন না।
“ স্মৃতি, তোমার খিদে পেলে ওদের বলবে। লম্বা জার্নি তো।”
শারমিন বললেন। স্মৃতি হাসিমুখে জানাল,
“ আইচ্ছা, আম্মা।”
জারা তৎক্ষণাৎ বাঁধা দিল,
“ আচ্ছা বলবে, আইচ্ছা না। “
“ আচ্ছা, আপা।”
বলেই হেসে ফেলল স্মৃতি। এবার ওর হাসি দেখে বাকিরাও হেসে ফেলল।
**
বিকেলের তপ্ত আলো সাফোয়ানের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে এসে পড়েছে। ঘুম থেকে উঠে আফ্রিদি যখন সাফোয়ানের কাছে সব ঘটনা খুলে বলল, তখন সাফোয়ানের চোখ চড়কগাছ! ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে ওরা। সাফোয়ান প্রায় চিৎকার করে উঠল,
“বিয়ে! তুই বিয়ে করেছিস! লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!”
আফ্রিদি রাগে এক হাত দিয়ে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল সাফোয়ানের পিঠে। ঠাস করে শব্দ হলো একটা। আফ্রিদি দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“ঢং মারাবি না তো একদম! আমি আছি নিজের জ্বালায় মরে, আর উনি আসছেন লা হাওলা পড়তে। রাহি শুনলে কী করবে বল তো একবার?”
রাহি হলো আফ্রিদির প্রেমিকা। গত দু-দুটো বছর ধরে প্রেম করছে ওরা। রাহি আফ্রিদিকে সত্যিই ভালোবাসে, তাই ওর অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের পর রাহির প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা ভেবেই আফ্রিদির ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। চিন্তা হচ্ছে।
সাফোয়ান পিঠ হাতলাতে হাতলাতে এবার খুব চিন্তিত হওয়ার ভান করল। গম্ভীর মুখে বলল,
“তা ঠিক বলেছিস, রাহি তো তোকে আস্ত রাখবে না। কিন্তু মামা, পনেরো বছরের একটা মেয়ের বিয়ে কীভাবে দেয় তার পরিবার? এটা তো ক্রাইম!”
আফ্রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসল,
“আরে, গ্রামাঞ্চলে ওসব এখনো হরহামেশাই হয়। কেউ পাত্তা দেয় না।”
“ওওও, আচ্ছা!”
সাফোয়ান মাথা চুলকে একটু শয়তানি বুদ্ধি দেওয়ার মতো করে বলল,
“তাহলে কী আর করবি? বউ ছেড়ে দে। রাহিকে তো আর ছাড়া যাবে না, ও তোর মন-প্রাণ, তোর সত্যিকারের প্রেম!”
সাফোয়ানের মুখে এমন কথা শোনা মাত্রই আফ্রিদির কপাল কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সে ঝট করে হাত বাড়িয়ে সাফোয়ানের কানটা টেনে ধরে মোচড় দিল। খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“লাথি মারব একদম, শালা! বউ ছাড়ব মানে কী? মুখে যা আসে তা-ই বলে দিলেই হলো? আল্লাহর কালাম সাক্ষী রেখে, কবুল বলে বিয়ে করেছি। বিয়ে কি কোনো খেলনা নাকি রে যে মন চাইল আর ছেড়ে দিলাম? হ্যাঁ, মানছি মেয়েটার বয়স কম, ও এখনো বাচ্চা। এটাই যা সমস্যা। তাই বলে আমি বউ ছেড়ে দেব কেন?”
সাফোয়ান কান হাত থেকে ছাড়িয়ে প্রচণ্ড অবাক হয়ে আফ্রিদির দিকে তাকাল। তার এই রাগী, মাস্তান বন্ধুর মুখে এমন নীতিবাক্য শুনে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল!
“ওরে ওরে! তুই তো দেখি গভীর জলের ফিস রে মামা! তা শেষমেশ দুটোই সামলাবি নাকি? এদিকে বউ, ওদিকে প্রেমিকা?”
“হারামি!”
আফ্রিদি সাফোয়ানের দিকে একটা বালিশ ছুড়ে মারল। তারপর খানিকটা নিচু আর বিষণ্ণ গলায় বলল,
“রাহিকে আমি নিজে সব সত্যি কথা খুলে বলব। তাছাড়া আমি এমনিতেই বেকার বলে রাহির ফ্যামিলিতে অনেক সমস্যা ছিল। এটা খুব স্বাভাবিক, ওর পরিবার মেয়ের জন্য ভালো, প্রতিষ্ঠিত ছেলে চায়। তার ওপর এখন যদি এই বিয়ের কথা শোনে…”
কথাটা শেষ না করেই আফ্রিদি চুপ হয়ে গেল। হঠাৎ করে একটা বিষন্ন ভাব ফুটে উঠল ওর চেহারায়।
চলবে….
