#ব্যাকবেঞ্চার (৩)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
ফারিশ পড়ায় আগের চেয়ে বেশ মনোযোগী হয়। স্কুলে যেতে তার ভালো লাগে। তার মতো খারাপ ছাত্রকে কেউ পছন্দ করে না। দুই একজন তার যে বন্ধু রয়েছে, তারা তার মতোই কম মেধাবী। তারা নিজেদের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের হতাশা দূর করে। বাড়িতে ফারিশ এত পরিশ্রম করে সেটা তার বাবা, মায়ের চোখে পড়ে। তবে তার বাবা মানতে চায় না। তার বাবা সবসময় রাত করে বাসায় ফিরতো। ইদানীং বাসায় ফিরে সন্তানদের ঘরে লাইট জ্বালানো দেখে। প্রথম দিন তো ভেবেছিলেন ফারাজ এখনো জেগে আছে। সে পড়াশোনা করছে। এটা ভেবে তিনি দরজার কাছে এসে বলেন,“ফারাজ বাবা ঘুমিয়ে পড়ো। এত রাত জেগে পড়তে হবে না। তুমি সবসময় বেষ্ট।”
কথাটি বলে দরজা ঢেলে ভেতরে প্রবেশ করে অবাক হয়। ফারাজ নয় ফারিশ জেগে আছে। এটা দেখে বাবা খুশি হয় না। বরং কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে,“সারা সন্ধ্যা পড়ে পড়ে ঘুমিয়ে এখন বই পড়ার নাটক চলছে?”
বাবার কথায় হতাশ হয় ফারিশ। তার বাবা তাকে বিশ্বাস করতেই চায় না। সে তার কাছে সবসময়ের মতো ফাঁকিবাজ। অথচ সে সন্ধ্যা থেকেই পড়ছে। ফারিশ বাবাকে কিছু বলে না। কারণ সে জানে তার কথা বাবা বিশ্বাস করবে না। তাই চুপ থাকে। তার বাবার জন্য মনোযোগী হওয়ার অর্থ ফলাফল। যেটায় ফারিশ খুবই খারাপ করে। তার রেজাল্ট অনুযায়ী তার পরিশ্রমের মাপকাঠি করা হয়। অথচ সে পরিশ্রম করে খুব। ফারিশ কোন কথা না বলায় বাবা আর কথা বাড়ায় না। সে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যায়। তবে যাবার আগে ফারাজের গায়ে কাঁথা টেনে দেয়। এটা দেখে ফারিশের হিংসে হয়। তার বাবা তার কথা এভাবে ভাবে না। কখনো আদরও করে না। তাকে শেষ কবে আদর করেছে, তা ফারিশ ভুলেই গেছে।
বাবার এমন কর্মকান্ডে ফারিশ হতাশ হয়। এত পরিশ্রম করে তার কোন লাভ নাই। এটা ভেবে পড়া থেকে মনটা উঠিয়ে নেয়। পরক্ষণে আবার নিজে নিজেকে অনুপ্রেরণা দেয়। না হতাশ হওয়া যাবে না। সে মন দিয়ে পড়লে ঠিক পারবে।
তবে ফারিশ শুধু নিজের নয় বন্ধুদের কথাও ভাবছে। সে যেহেতু এই পরিস্থিতিতে আছে তাই তার মনে হয় তারাও একইরকম অবস্থায় আছে। তাদের সবার দুঃখ এক। সবাই একসঙ্গে চেষ্টা করলে দুঃখটা কমবে। তাই বন্ধুদের সঙ্গে বিকালে গ্রুপ স্ট্যাডি শুরু করে। একে-অপরের সমস্যা দেখে, ধরিয়ে দেয়। যেখানে বেশি সমস্যা হয় সেটা বুঝতে ফারাজের কাছে যায়। ফারাজও ভাইকে ভীষণ ভালোবাসে। তাই বিরক্ত হয় না৷ বরং খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের বোঝায়। ফারাজের এমন আচরণ বরাবরই ফারিশকে অনুপ্রেরণা দেয়। সে ফারাজকে জড়িয়ে ধরে বলে,“তুমি বেষ্ট ভাইয়া। তুমি সবকিছুতে বেষ্ট। ভাই হিসাবেও বেষ্ট।”
“তুইও বেষ্ট। হ্যাঁ মানছি অন্যসব কিছুতে একটু কম বেষ্ট। তবে ভাই হিসাবে অনেক অনেক বেষ্ট।”
এটা বলে ফারাজ তার ভাইয়ের কপালে চুমু দেয়। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“সন্তান হিসাবেও বেষ্ট। এই একটা দিকে তুই আমার থেকে বেষ্ট।”
“কিভাবে?”
ফারিশ বুঝতে পারে না সে সন্তান হিসাবে বেষ্ট কিভাবে হলো। তাই জানতে চায়। ফারাজ মিষ্টি হাসি মুখে নিয়ে বলে,“আমি আমার বাবা, মায়ের খুশির জন্য কখনো কোনকিছু করিনি৷ করার কথা ভাবিনি। কারণ আমি সবটা এমনি পেয়ে গেছি। কিন্তু তুই, শুধুমাত্র বাবা-মাকে খুশি করতে কত পরিশ্রম করিস। এটাই বেষ্ট সন্তান হওয়ার উদাহরণ। বুঝলি তুই?”
“সত্যি?”
ফারিশের প্রশ্নে ফারাজ মাথা নাড়ায়। ফারিশ খুব খুশি হয়। তার মানে এই দিক দিয়ে সে বেষ্ট। তার ভাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এটা ভেবেই তো তার আনন্দ হচ্ছে। খুব আনন্দ হচ্ছে। সে খুশিতে হাত তালি দিয়ে নাচতে থাকে। ফারিশের খুশি দেখে ফারাজও খুশি হয়। সে ভাইয়ের সঙ্গে তাল দিয়ে নাচতে থাকে। ফারিশের হাত ধরে ঘুরতে থাকে। ফারিশ তো খুশিতে বলতে থাকে,“আমি বেষ্ট সন্তান। আমি বেষ্ট সন্তান।”
ফারাজ আপনমনে হাসে। তার ভাইকে খুশি করা কত সহজ? অথচ তার বাবা শুধু দুঃখই দেয়। কেন? ফারাজের মাঝে মাঝে নিজেকে দ্বায়ী মনে হয়। সে এতটা ভালো করে বলেই হয়তো ফারিশের উপর প্রভাব বেশি পড়ে। তবে সে খারাপ করবে? খারাপ করলে সব ঠিক হবে? ফারাজ মনেমনে এসব ভাবতে থাকে। পরক্ষণে আবার মনে হয়, সে খারাপ করলে বাবা তো তাকেও অপছন্দ করবে। তার কোন শখ পূরণ করবে না। যেমনটা ফারিশের সঙ্গে করে। তার কোন ইচ্ছের দাম নাই। যদিও ফারিশের চাহিদাও কম। কিন্তু সেই কম চাহিদাই পূরণ হয় না। এটা ফারাজকে দুঃখ দেয়।
______
বেশ কিছু মাস কেটে যায়। ফারিশদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। তারা এই ছুটিতে বিদেশে ফ্যামিলি ট্যুর দেওয়ার প্লান করে। না এটা ফারিশের প্লান নয়। এটা ফারাজের চাওয়া। তার এই চাওয়াকে প্রধান্য দেয় তার বাবা, মা। ফারিশকে তো তার বাবা নিতে চাচ্ছিলো না। কিন্তু ফারাজ এবং তার মা কষ্ট ভাবে তাই বাধ্য হয়ে নেয়। স্ট্যটাস আর ইগোর খেলায় ফারিশ যে তার বাবার সন্তান সেটা তার বাবাই ভুলে গেছে। তার শত্রুর মতো হয়ে গিয়েছে ফারিশ। এটা ফারিশ বুঝতে পারে না। তাই তো তার বাবার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ রাতের পর রাত তার ঘরের লাইট জ্বালানো দেখেও তার বাবা তার পরিশ্রম মানতে চায় না। কখনো মানতে চায়নি। সবসময় ফারিশের অভিনয় হিসাবে ধরে নিয়েছে। অথচ তার সমস্ত চেষ্টা তার বাবার জন্যই ছিলো। যদিও তার মা খুব প্রশংসা করেছে তার। যাই হোক, ফারিশদের থাইল্যান্ড ট্যুরের দিন চলে আসে। তারা স্বপরিবারে যায়। তাদের সঙ্গে তার বাবার এক বন্ধুর পরিবারও ছিলো। তারা ফারিশকে দেখে প্রথমেই বলে,“তোমার এই ছেলেটা শুনলাম মেধা ভালো না। পড়াশোনায় মন নাই। তা একে নিয়ে প্লান করছো? ভবিষ্যতে কি করবে?”
ব্যাস। হয়ে গেলো। তার এই কথাটা শুনতেই ফারিশের বাবা তার দিকে রাগী চোখে তাকায়। অতঃপর বিরক্তি নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ফারিশের মা বিষয়টা বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু লাভ হয় না। ঘুরেফিরে পুরো প্লেন যাত্রায় মহিলা ফারিশকে নিয়েই চিন্তা প্রকাশ করে। ফারিশের মা কোনভাবে সবটা সামলায়।
অতঃপর পাঁচদিন ছিলো তারা থাইল্যান্ড। সবার সব ভালো হলেও ফারিশের হয়নি। ফারাজ যা পছন্দ করেছে, সবই তার বাবা তাকে কিনে দিয়েছে। কিন্তু ফারিশকে কিছু দেয়নি। তার মা দুইটি দিয়েছিলো। সেটায় অবশ্য সে খুশি হয়। কিন্তু কষ্ট পায় তখন যখন তার একটি খেলনা খুব পছন্দ হয়। ভীষণ পছন্দ। তবে একটু দামি। তার বাবা এটা শুনে এক কথায় না করে দেয়।তার মা যদি দেয় তবে মা এবং ফারিশকে এখানেই রেখে যাবে। তাই ফারিশের মাও দিতে পারে না। বাবার কথা,“ওর মতো অপদার্থের পিছনে যা খরচ করবো সবই লস। এত দামি জিনিস পাওয়ার যোগ্যতাই ওর নাই।”
“ওতটুকু বাচ্চার যোগ্যতা খুঁজছো?”
মা কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে বাবা জানায়,“তবে থাকো নিজের ছেলেকে নিয়ে এখানে। আমি আমার বাচ্চা নিয়ে যাই।”
মা চুপ করে যায়। বাধ্য হয়ে থামে। সে এখানে ঝগড়া বাধাতে চায় না। তাই ফারিশকে ওমন জিনিসের বায়না করতে বারণ করে। ফারিশ এটা নিয়ে একটু বেশিই কষ্ট পায়। তবে কিছু বলে না। একা একা কাঁদে। মা বুঝতে পারে। কিন্তু কিছু করার নাই। তখন তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। সে ফারাজকে ইশারা করে বলে,“ওটার ভিন্ন কালার তুমি তোমার বাবার কাছে চাও। বলো তোমার পছন্দ হয়েছে।”
ফারাজ বুঝতে পেরে তেমনই করে। তার পছন্দ হয়েছে বলে নেয়। তার বাবা সেটা কিনেও দেয়। এটা অবুঝ ফারিশের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। সে তো বোঝেনি মা ভাইয়ের পরিকল্পনা। এটা যে তার জন্যই কেনা হয়েছে। তার তো কষ্ট এটাই, তার বাবা তাকে যেটা দামের জন্য দেয়নি সেটা তার ভাইয়ের একবার চাওয়ায় দিয়ে দিয়েছে। অতঃপর এই কষ্ট নিয়েই তারা দেশে ফিরে। দেশে এসে ফারাজ সেই খেলনাটা ফারিশকে দেয়। ফারিশ অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। তার ভাই খুশিমনে বলে,“এটা আমার বেষ্ট ভাইয়ের জন্য।”
ফারিশ খুশি হয়ে নেয়। তার সব দুঃখ এক নিমিষেই শেষ। এটা পেয়ে সব কষ্ট কমে গেছে। তবে তার খুশি বেশিক্ষণ থাকে না। বাবা বাহিরে গিয়েছে বুঝে ফারাজ খেলনাটা দেয়, অথচ তার বাবা যায় না। সে ঘরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ফেলে যায়। সেটা নিতেই আবার আসে। এসে এই কান্ড দেখে রেগে বলে,“তোমরা মা ছেলে পরিকল্পনা করে ঐ অপদার্থ, মূর্খের জন্য আমার এত টাকা নষ্ট করলে।”
বাবার রাগ দেখে ফারাজ ভয় পায়। ভয় অন্যরাও পায়। বাবার রাগ থামাতে ফারাজ বুদ্ধি করে বলে,“এটা পুরনো হয়ে গিয়েছে বাবা। আমার আর এটা ভালো লাগছে না। তাই ওকে দিয়ে দিলাম।”
এই কথা শুনে বাবা কিছুটা শান্ত হয়। যদিও কথাটা সত্য মনে হয় না। তাও চুপ থাকে। কারণ তার ভালো ছেলে বলেছে যে, তার কথা মানতেই হবে। কিন্তু এসবে ফারিশের খুশি শেষ হয়ে যায়। তার ভাইয়ের এখন এটা পছন্দ নয়, তাই দিয়েছে। এটা তার নয়। অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ায় তাকে দেওয়া হয়েছে। অথচ সে এই পরিবারের সদস্য। আর সবসময় অপ্রয়োজনীয় জিনিস তার হয়। আর একটু ছোট ছিলো যখন তখন ফারাজের এসব কথায় খুশি হতো। তার খেলনা তাকে দেওয়ায় খারাপ লাগতো না। কিন্তু এখন খারাপ লাগে। কারণ সে শিক্ষককে বলতে শুনেছে,“তোমরা তোমাদের পুরনো কাপড় বা খেলনা বা জিনিস ফেলে দাও। একটু পুরনো হতেই ফেলে দাও। অথচ এটার অভাবে কত গরীব কাঁদে জানো? তাই তোমরা সেটা না ফেলে দিয়ে বরং গরীবদের দান করে দিবে। আজ বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাকে বলবে, এগুলো ফেলে না দিয়ে দান করতে।”
কথাটি বলেছে ফারিশের স্কুলের ইংলিশ ম্যাম। এই মানুষটি অতিব চমৎকার। এ সব ছাত্র ছাত্রীকে পছন্দ করে। তার কাছে কোন ভালো খারাপ নাই। সবাই তার স্টুডেন্ট। সবার সমান গুরুত্ব। মানুষটা ফারিশদের অনেক সাহসও দেয়। এই মানুষটা খুব ভালো। তার কথা তো সঠিকই হবে। তাই এখন ফারিশের মনে হয় ঘরের সদস্য হওয়ার পরও সে দানের জিনিস পাচ্ছে। ব্যবহার করছে। ফারিশের মনের অবস্থা তার মা হয়তো বুঝতে পারে। সে নিজের ছেলের এত কষ্ট সহ্য করতে পারছে না। তাই বলে,“তুমি ওর সঙ্গে পর পর আচরণ করো না। তোমার যেহেতু এতই সমস্যা তবে আমার ছেলেকে বোডিং স্কুলে দিয়ে দাও। ও থাকুক ওখানে ওর মতো।”
বাবা মায়ের কথা শুনে কোন কথা না বলে চলে যায়। তার ফ্যাক্টরিতে কাজ রয়েছে। তাই এখন তর্ক করতে চাচ্ছে না। পরে দেখা যাবে। মা হতাশ হয়ে বসে পড়ে। ফারিশ ঘরে গিয়ে কাঁদতে থাকে।
’
’
চলবে,
(ভুলক্রুটি ক্ষমা করবেন৷)
