#বেলীফুলের_ইতিকথা (৬)
#মীরাতুল_নিহা
রাত গভীর হচ্ছে। বস্তির ঘুপচি ঘরগুলোতে একে একে বাতি নিভে যাচ্ছে, কিন্তু বেলীর চোখের পাতা আজ এক মুহূর্তের জন্যও এক হলো না। সে চৌকির এক কোণে ফিওনাকে নিয়ে বসে আছে। ফিওনার ছোট ছোট হাত দুটো বারবার নিজের হাতের মুঠোয় নিচ্ছে বেলী। বাচ্চাটার কবজি দুটো আজ বড্ড বেশি খালি লাগছে। রুপার সেই মোটা চুড়ি দুটো কি সত্যিই হাত থেকে পড়ে গেল? না-কি ফারহান নিয়ে গেল?,
ফারহান এতটা নিচে নামতে পারবে না! নিজের মেয়ের গায়ের গয়না কি কেউ চুরি করে? পরক্ষণেই বেলীর মনে হলো, যে লোকটা একটা বাচ্চাকে ঘরে রেখে আরেকটা বিয়ে করে আনতে পারে, তার কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। বেলীর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ঘৃণা! এক তীব্র, জঘন্য ঘৃণা তার শিরায় শিরায় বইতে শুরু করল। এক সময় ফারহানের জন্য তার যে মায়া ছিল, যে টান ছিল আজ তা কর্পূরের মতো উবে গেছে। ফারহান আর তার নতুন বউ তৃষ্ণা সেই যে দুপুরে সেজেগুজে বেরিয়েছে, এখনো ফেরার নাম নেই। রাত এগারোটা বাজে। আগে হলে বেলী হয়তো দরজায় খিল না দিয়ে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত। কিন্তু আজ সে নিজেই দরজায় শক্ত করে খিল তুলে দিল। সে ফিওনাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। বাচ্চাটা ঘুমের ঘোরে একবার ককিয়ে উঠল। বেলী আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
ওদিকে শহরের এক সস্তা হোটেলের রুমে ফারহান আর তৃষ্ণা তখন নিজেদের মধ্যে বিভোর। তৃষ্ণার হাতে নতুন এক জোড়া সস্তার ইমিটেশন চুড়ি। ফারহান তৃপ্তির হাসি হাসছে। ফিওনার রুপার চুড়ি জোড়া বেঁচে ভালোই আমোদে আছে। ঠিক করেছে বউ নিয়ে এখানেই থাকবে আজকের রাত। তৃষ্ণার আদুরে আবদার মেটাতে আজ তার পকেটে টাকা আছে, মনে আছে ফুর্তি। ফারহান তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখলা তো তিশু? তোমার জন্য আমি কী না করতে পারি!”
তৃষ্ণা আদুরে গলায় বলল,
“তোমার বড় বউ যেই! চুড়ি নিয়া চিল্লাচিল্লি করলে?”
ফারহান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“আরে রাখো তোমার বড় বউ! ওরে আমি ডরাই না-কি? চুড়ি বেঁচছি তো কী হইছে? আমার মেয়ের চুড়ি আমি যা ইচ্ছা করুম!”
“এরকম সাহস যেন বউর সামনে গেলে থাকে। মনে রাইখো কিন্তু!”
ফারহান বিনিময়ে কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে প্রতি উত্তর করল,
“সাহস পরে দেইখো। এখন তো অন্য কিছু দেখার সময়।”
নতুন বউতে মগ্ন হয়ে গেল ফারহান। ভুলে গেল সে কাউকে ভালোবেসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বউ করেছে। ভুলে গেল তার নিষ্পাপ বাচ্চার কথা!
রাত দুটোর দিকে বেলী হঠাৎ দেখল জানালার বাইরে একটা ছায়া। সে চমকে উঠল। না, ছায়াটা সরে গেল। আয়েশাদের ঘর থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা বেলীকে গ্রাস করল। এই একাকীত্ব তাকে দুর্বল করল না, বরং আরও পাথরের মতো শক্ত করে দিল।
ঘরটা যেন এখন একটা জ্যান্ত কবরের মতো খা খাঁ করছে। ফারহান সেই যে তৃষ্ণাকে নিয়ে বেরোল, আজ দুদিন পার হয়ে গেল—একবারও ছায়ার দেখা মিলল না। প্রথম দিন বেলী ভেবেছিল হয়তো রাগ করে কোথাও রাত কাটাচ্ছে, কিন্তু দ্বিতীয় দিন গড়িয়ে যখন রাত নামল, তখন বেলীর বুকের ভেতরটা ভয়ে নয়, বরং আসন্ন সংকটে কুঁকড়ে গেল। ঘরে এক দানা চাল নেই। উপায় না দেখে আজ সকালে বেলী ফিওনাকে পাতলা একটা কাঁথায় জড়িয়ে কোলে তুলে নিল। রোদে পোড়া তপ্ত দুপুরে সে বস্তির সেই দুর্গন্ধময় গলি থেকে বেরিয়ে শহরের পাকা রাস্তায় পা রাখল। এই শহরটা তার কাছে খুব বেশি অচেনা নয়। মাত্র এক দেড় ঘণ্টা দূরত্বেই তার বাপের বাড়ি। এই শহরেরই নামি এক কলেজে সে পড়ত। কত স্বপ্ন ছিল! কত রঙিন দিন ছিল! সেই কলেজের সামনে দিয়েই যাওয়ার সময় বেলীর বুকটা ধক করে উঠল। ঠিক এই গেটটার সামনেই ফারহানের সাথে তার প্রথম দেখা। ফারহানের সেই মায়া লাগানো কথা, ভরসা দেওয়ার ভঙ্গি—সবই ছিল নিছক এক মরীচিকা। সেই মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়েই আজ সে রাস্তার ভিখারি।
বেলী হাঁটতে থাকল। তার চোখ রাস্তার ধারের দেয়ালগুলোতে। যদি কোথাও একটা ‘টিউশনি’ বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে! সে তো শিক্ষিত, অনার্স তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়েছে। কিন্তু দেয়ালের বিজ্ঞাপনগুলো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। কোথাও চটকদার বিজ্ঞাপনের ভিড়ে তার প্রয়োজনীয় কোনো খোঁজ নেই। ক্ষুধার্ত ফিওনা কোলের ভেতর নড়াচড়া করছে। রোদের তাপে বাচ্চাটার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেছে।
ঘণ্টা দুয়েক পাগলের মতো এ গলি ও গলি ঘুরেও যখন কোনো কূল-কিনারা পেল না, তখন শরীর আর সায় দিল না। মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। হার মেনে সে আবার সেই বস্তির পথেই পা বাড়াল। নিজের হারানো দিনের স্মৃতিগুলো তাকে যেন আরও বেশি করে দংশন করছিল।
বস্তির মুখে আসতেই বেলীর চোখে পড়ল সেই কোঁকড়ানো চুল আর বলিষ্ঠ গঠনের অপরিচিত লোকটা। সে আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছে। লোকটার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বেলীর ওপর পড়তেই বেলী অস্বস্তি বোধ করল। দ্রুত পায়ে সে নিজের ঘরের দরজায় এসে পৌঁছাল।
দরজা ঠেলতেই দেখল অবাক কাণ্ড! ঘরের ভেতর ফারহান বসে আছে। বিছানায় আয়েশ করে আধশোয়া হয়ে কিছু একটা চিবোচ্ছে সে। পাশে তৃষ্ণা নেই। বেলীকে দেখেই ফারহান বাঁকা হাসি দিল।
“ বাচ্চা কোলে নিয়ে কোথায় যাওয়া হয়েছিল? খুব তো তেজ দেখিয়েছিলে, এখন বুঝি ক্ষিদে পেয়েছে?”
বেলী কোনো কথা বলল না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন খাটের কোণে রাখা একটা বাজারের ব্যাগের দিকে। ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে সব্জি আর কিছু চাল। ফারহান মুচকি হেসে বলল,
“ দুদিন ভালোই ফুর্তি করলাম তিশুরে নিয়ে। এই যে, তোমাদের জন্য কিছু সওদা নিয়ে আসলাম। এখন যাও, রাঁধো। আমার আবার ক্ষিদা লাগছে খুব!
বেলীর ইচ্ছা হলো ওই চালের ব্যাগটা ফারহানের মুখে ছুঁড়ে মারতে। কটা কটু কথা শোনাতে। কিন্তু ফিওনার মুখের দিকে তাকিয়ে সে পাথর হয়ে গেল। নিজের আত্মসম্মান আর মাতৃত্বের লড়াইয়ে আজ যেন মাতৃত্বই তাকে নতজানু করে দিল। নিঃশব্দে ব্যাগটা হাতে নিয়ে সে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল, পেছন থেকে ফারহানের পৈশাচিক হাসির শব্দ তার কানে তীরের মতো বিঁধতে লাগল।
রান্নাঘরের অন্ধকার কোণে চালের ব্যাগটা নিয়ে বেলী যখন অঝোরে নিশব্দে কাঁদছিল, ঠিক তখুনি বাইরের দরজায় সজোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ফারহান বিরক্তি নিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজা খুলতেই সামনে আদনানকে দেখে ফারহানের ভ্রু কুঁচকে গেল। আদনানের চোখেমুখে এক ধরণের অস্থিরতা। ফারহান রুক্ষ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
“কী রে? অসময়ে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করস কেন?”
আদনান ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত বলল,
“বেলীকে চাই!”
ফারহানের রাগত দৃষ্টি এবার আরও চওড়া হলো। নিজের ঘরের দরজায় অন্য এক যুবক এসে তার বউকে ডাকছে, এটা তার পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে সজোরে ধাক্কা দিল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“তোর সাহস তো কম না! আমার ঘরে আইসা আমার বউরে ডাকস? দরকার থাকলে আমারে ক!”
আদনান একটুও দমল না। সে পকেটে হাত দিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
“দরকারটা ওনার সাথেই। আপনি ডাকবেন না-কি আমি ভেতরে আসব?”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বেলী আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজায় দাঁড়াল। তার লাল হওয়া চোখ দুটো লুকানোর চেষ্টা করে সে ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে আদনান? এত চেঁচামেচি কিসের?”
ফারহান বেলীর দিকে ফিরে গর্জে উঠল,
“এই ছোকরা তোরে ডাকে কেন? কীসের এত দরকার তোদের?”
“তোমাকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না!”
ফারহান এবার আরো রেগে উঠল!
“কারে বলবি তাইলে? কয়টা বেডা মানুষ তোর?”
বেলী ফারহানের কথার উত্তর না দিয়ে আদনানের দিকে তাকাল। আদনান বেলীর মলিন মুখের দিকে তাকালো। সে ফারহানকে অগ্রাহ্য করে বেলীকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনি টিউশনি খুঁজছিলেন না? আমাদের বস্তির পাশেই যে নতুন আবাসনটা হয়েছে, ওখানে একটা ফ্যামিলি টিচার খুঁজছে। ক্লাস সিক্সের মেয়ে। আমি কথা বলে এসেছি, ওরা আপনাকে কাল যেতে বলেছে।”
বেলীর বুকের ভেতর যেন এক পশলা বৃষ্টির ছোঁয়া লাগল। এই অন্ধকারের মাঝে এক টুকরো আলোর রেখা! সে কিছু বলার আগেই ফারহান বাঁকা হেসে উঠল,
“টিউশনি? আমার বউ পরের বাড়ি গিয়া মাস্টারি করবে? লোকে হাসাবে না-কি?”
আদনান এবার ফারহানের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“বউ বাচ্চা থাকা সত্বেও আপনি যখন বিয়া করে দিব্যি আছেন লোকজন কিছু বলে নাই তাইলে ভাবীরেও বলব না! ভাবী যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, তবে বাধা দেওয়ার অধিকার আপনার নেই।”
ফারহান কিছু একটা বলতে গিয়েও আদনানের চাহনি দেখে থেমে গেল। আদনান বেলীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“কাল সকাল দশটায় তৈরি থাইকেন। আমি এসে নিয়ে যাব।”
আদনান চলে যাওয়ার পর ফারহান রাগে গজগজ করতে করতে বিছানায় গিয়ে বসল। বেলী তখনো দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, পচা গন্ধের মাঝেও আজ একটু বেলী ফুলের সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। সে মনে মনে ঠিক করে নিল,কাল সে যাবেই। এই মুক্তি তাকে পেতেই হবে।
#চলবে
#বেলীফুলের_ইতিকথা(৭)
#মীরাতুল_নিহা
বেলী আর অপেক্ষা করলো না। সে ফারহানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“ফারহান, একটা কথা জিগ্যেস করব। সত্যি করে উত্তর দিবে?”
বেলীর কণ্ঠস্বর শান্ত হলেও চোখে রাগ স্পষ্ট। নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কী কথা? কিসের জেরা শুরু করলা?”
“ফিওনার হাতের রুপার চুড়ি জোড়া কোথায়? কাল রাত থেকে দেখছি না। তুমি ওগুলো নিয়েছ?”
ফারহান এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই মুখটা শক্ত করে ফেলল। হাতে থাকা সিগারেটের প্যাকেটটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে সে কর্কশ গলায় বলল,
“কী বললা? আমি চুড়ি নিছি? নিজের মেয়ের গায়ের গয়না আমি চুরি করব? তোমার কি মাথা খারাপ হইছে বেলী?”
“চুরি শব্দটা আমি বলিনি ফারহান। কিন্তু দুদিন ধরে তুমি ঘরে ছিলে না, চুড়িগুলোও নেই। এটা কি কাকতালীয়?”
ফারহান এবার রাগে ফেটে পড়ার ভান করল।
“আরে রাখো তোমার কাকতালীয়! হয়তো কোথাও খুলে রাখছো আর হারায় ফেলছো। ঘরদোর ঠিকমতো গোছাও না, এখন আমারে দোষ দিচ্ছ? আমার নামে এমন অপবাদ দেওয়ার সাহস তুমি পাইলা কই?”
বেলী একদৃষ্টিতে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। মিথ্যে বললে মানুষের চোখ কাঁপে, ফারহানের চোখও কাঁপছে। কিন্তু সে এতই নির্লজ্জ যে গলা উঁচিয়ে প্রতিবাদ করছে। বেলী বুঝতে পারল, ফারহান কোনোভাবেই এটা স্বীকার করবে না। তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই, কেউ দেখেনি ফারহানকে চুড়ি খুলতে। বস্তির এই ঘরে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই যে সে দেখিয়ে দেবে। বেলী এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। সে আর তর্কে গেল না। কারণ সে জানে, এই পাপিষ্ঠের সাথে তর্কের মানে হলো নিজের সম্মান হারানো। ফারহান পেছল হাসি দিয়ে বলল,
“চুপ হয়ে গেলা যে? প্রমান ছাড়া মানুষের নামে দোষ দিতে আসবা না। যাও, খাবার বানাও গে!”
রাত গভীর হয়েছে। বস্তির ঘুপচি ঘরে ভ্যাপসা গরম আর মশার উপদ্রব। বেলী চৌকির এক কোণে ফিওনাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না তার। মনের ভেতর কেবল অপমানের স্মৃতিগুলো কুণ্ডলী পাকাচ্ছে। হঠাৎ করেই এক জোড়া শক্ত হাত পেছন থেকে বেলীকে জড়িয়ে ধরল। পরিচিত সেই স্পর্শ, ফারহানের গায়ের সেই ঘামের মিশ্রিত গন্ধ। এক সময় এই মানুষটার বুকেই বেলী পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেত, কিন্তু আজ এই স্পর্শ তার কাছে বিষের মতো নীল ঠেকছে।
ফারহান বেলীর কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বেলীর ঘাড় থেকে অবিন্যস্ত চুলগুলো সরাতে লাগল। তার স্পর্শে যেন অধিকার আর লালসা মিলেমিশে একাকার। বেলী কুঁকড়ে গেল। যখনই ফারহানের ঠোঁট তার ঘাড়ে স্পর্শ করতে চাইল, ঠিক তখনই বেলী এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
বিছানা থেকে নেমে দূরে দাঁড়িয়ে বেলী তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“গায়ে হাত দিবা না ফারহান! একদম না।”
ফারহান অপ্রস্তুত হয়ে উঠে বসল। চোখে একরাশ বিরক্তি আর কামনার আগুন। সে গলা উঁচিয়ে বলল,
“কী শুরু করলো বেলী? স্বামী আদর সোহাগ করতে আসছে, আর তুমি না করছো? স্বামী হই আমি তোমার, মনে থাকে যেন!”
বেলী হাসল। সেই হাসিতে কোনো সুখ নেই, আছে বুকফাটা হাহাকার।
“কিসের স্বামী? স্বামী? বুঝো তো!”
ফারহান বুক উঁচিয়ে বল,
“ধর্ম অনুসারে তিন কবুল কইয়া তোমায় বিয়া করছি! তোমার স্বামী হইছি!”
বেলী তাচ্ছিল্য করে বলল,
“তিন কবুলের সাথে সাথে নিয়ম মতন বিয়ের সময় যে তিন লাখ টাকা মোহরানা ধার্য হয়েছিল, তার এক পয়সাও কি তুমি পরিশোধ করেছ? ধর্মের নিয়ম অনুসারে তুমি আমার মোহরানা দাওনি, ধর্মের কথা বলে, স্বামী বলে, কিসের স্বামীর বাহানায় আমার শরীর ছুঁতে আসো?”
ফারহান তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল।
“আরে রাখো তোমার মোহরানা! তিন লাখ টাকা কি চাট্টিখানি কথা? মুখের কথা বললেই হয়ে গেল? আর শোনো, বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী একটু আপস করে নিলেই মোহরানা মাফ হয়ে যায়। মাফ করে দিলেই তো হয়! তুমি তো তাই করেছো। আজ আবার নাটক শুরু হয়েছে!”
বেলী এবার গর্জে উঠল।
“তখন হয়তো ভালোবেসে মাফ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন আর করব না। আমার মোহরানা পরিশোধ করো, তারপর অধিকার খাটানোর কথা ভেবো।”
“টাকা পরিশোধ করতে হইলে আর তোরে দিয়ে কি করব? এসব বাদ দিয়া সংসারে মন দে তো।”
“আসলে তোমার মতো অমানুষের সাথে সংসার করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। তুমি শুধরাবার নও, ফারহান। তুমি একটা জানোয়ার! স্বামী হওয়ার যোগ্য না, আর বাচ্চার বাবা হওয়া তো আরো দূরের থাক!”
ফারহান এবার রাগে বিছানায় থাপ্পড় মারল।
“অমানুষ! জানোয়ার! এই জন্যই তো আরেকটা বিয়া করছি। তোর এইসব কথা আর ভালো লাগে না। শান্তি নাই তোর কাছে!”
বেলীর মনে হঠাৎ একটা খটকা লাগল। সে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল,
“তা তোমার সেই নতুন আদরের বউ কই? তোমায় শান্তিতে রাখবে?”
ফারহান মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গজগজ করে বলল,
“তোরে কি কওন লাগব?”
“সে নেই, তার শরীর নেই! সেজন্যই বুঝি আমার শরীরের কথা মনে পড়েছে?”
“সে তার এক বান্ধবীর সাথে ঘুরতে গেছে। আসবনে।”
বেলী এবার মুখ ভেঙিয়ে বাঁকা হেসে উঠল।
“বান্ধবী? না-কি বন্ধু? একটু পরখ করে দেখো ফারহান। যে মেয়ে জেনেও অন্যের স্বামীকে নিয়ে টানাটানি করে, তাদের এক পুরুষে পেট ভরে না। আজ বন্ধুর সাথে গেছে, কাল কার সাথে যাবে তার ঠিক নেই।”
ফারহান কোনো কথা বলতে পারল না। বেলীর প্রতিটি কথা তীরের মতো তার গায়ে বিঁধছে। সে অপমানে আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বালিশে মাথা গুঁজল। বেলী আর সেই ঘরে থাকল না। ফিওনাকে কোলে নিয়ে সে দাওয়ায় গিয়ে বসল। আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, রাতের এই অন্ধকারটা হয়তো কাটবে, কিন্তু ফারহানের সাথে তার সম্পর্কের যে চিরস্থায়ী অন্ধকার শুরু হয়েছে, তা আর কোনোদিনও কাটবে না
সকাল দশটা বাজতে তখনো দশ মিনিট বাকি। বেলী তার পুরোনো পরিষ্কার একটি সুতি শাড়ি পরে তৈরি হয়ে নিল। ফিওনাকে একা রেখে যাওয়ার সাহস বেলীর নেই, আর ফারহানের হাতে মেয়েকে দিয়ে যাওয়া মানেই যমদূতের হাতে কলিজা সঁপে দেওয়া। তাই অগত্যা ফিওনাকে কোলে নিয়েই সে আদনানের সাথে বেরিয়ে পড়ল।বস্তির সেই কাদা-জল মাড়ানো পথ পেরিয়ে তারা যখন শহরের অভিজাত আবাসনটির সামনে এসে দাঁড়াল, বেলীর বুকটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে। বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট, ঝকঝকে রাস্তা—সবই যেন বেলীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে সে এখন এক অন্য জগতের মানুষ। লিফটে উঠে চারতলার একটি ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে আদনান বেল টিপল।
দরজা খুললেন এক পরিপাটি ভদ্রমহিলা। বয়স চল্লিশের কোঠায়, চোখেমুখে আভিজাত্যের কড়া ছাপ। বেলীর কোলে পাঁচ মাসের বাচ্চাকে দেখেই ভদ্রমহিলার কপাল কুঁচকে গেল। তিনি আদনানের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া সুরেই বললেন,
“আদনান, এ কী! তুমি তো বলেছিলে মেয়েটা পড়াতে পারবে। কিন্তু এই দুধের বাচ্চা কোলে নিয়ে সে পড়াবে কীভাবে? আমার মেয়ের পড়ার ব্যাঘাত হবে না?”
বেলীর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
“খালাম্মা, বিশ্বাস করেন ও একদম ডিস্টার্ব করবে না। ও খুব শান্ত। আমি সব সামলে নেব।”
ভদ্রমহিলা যেন আশ্বস্ত হতে পারলেন না। তিনি মাথা নেড়ে বললেন
, “না বাপু, রাইসা এবার ক্লাস সিক্সর। ওর মনোযোগ নষ্ট হলে ক্ষতি আমার। বাচ্চার কান্না আর পড়া—একসাথে চলে না।”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আদনান এবার একটু এগিয়ে এল। গলার স্বর কিছুটা নরম করে সে বলল,
“ বিশ্বাস করেন বেলী অনেক মেধাবী। ওনার কপালটা খারাপ। ওনার স্বামী এখন আরেকটা বিয়া করে উনার জীবনটা জঘন্য করে তুলেছে। এখন এই বাচ্চা নিয়ে ওনার কাজটা খুব দরকার। একটু দয়া করেন।”
আদনানের মুখে বেলীর জীবনের এই করুণ কাহিনী শুনে মহিলার চোখে কিছুটা মায়া খেলে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেলীর দিকে তাকালেন। তারপর একটু ভেবে বললেন,
“দেখো বাপু, করুণা করে তো আর পড়াশোনা হয় না। সামনের মাসেই রাইসার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা। যদি তোমার পড়ানোর পর ওর রেজাল্ট ভালো হয়, তবেই আমি তোমাকে স্থায়ী করব। রেজাল্ট খারাপ হলে কিন্তু আর আসতে পারবে না। পারবে তো?”
বেলীর চোখে তখন আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক। সে শক্ত গলায় বলল,
“পারব । আপনি শুধু একবার সুযোগ দিয়ে দেখেন।”
রাইসা নামের মেয়েটি ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। বেলী ফিওনাকে নিজের কোলের একপাশে রেখে রাইসাকে পড়াতে শুরু করল। ইংরেজী গ্রামার আর অংকের সূত্রগুলো বেলী যখন সহজ করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তখন রাইসার চোখেমুখেও এক ধরণের স্বস্তি দেখা গেল। পড়াতে পড়াতে বেলী একবার আড়চোখে ড্রয়িংরুমের কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকাল। বাইরে শহরের ব্যস্ত রাস্তা দেখা যাচ্ছে। ফিওনা তখন বেলীর কোল থেকে ড্যাবড্যাব করে রাইসার বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সেও বুঝতে পারছে তার মায়ের এই কঠোর সংগ্রামের কথা। পড়াশোনা শেষে বেরোনোর সময় ভদ্রমহিলা বেলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কাল ঠিক সময়ে এসো। দেখি রাইসার উন্নতি কতটুকু হয়।”
ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে লিফটে উঠতেই বেলী এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল। আদনান পাশ থেকে বলল,
“বলছিলাম না, চেষ্টা করলে সব সম্ভব। আপনি শুধু হাল ছাড়বেন না। আমি আছি আপনার পাশে।”
বেলী রিকশায় বসে আদনানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।
#চলবে
