#বেলীফুলের_ইতিকথা (৮)
#মীরাতুল_নিহা
টিউশনিটা পেয়ে বেলীর মনে যে সামান্য আনন্দের আলো ফুটেছিল, বস্তিতে পা রাখতেই তা এক নিমিষেই নিভে গেল। বস্তির চারদিকের পরিবেশ আজ কেমন যেন থমথমে। আয়েশাদের ঘরের সামনে জটলা পাকিয়ে আছে বেশ কিছু মানুষ। বেলী দ্রুতপায়ে এগিয়ে যেতেই দেখল, আয়েশার সৎ মা রাহেলা বেগম কোমরে হাত দিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে চিল চিৎকার করছেন। দাওয়ায় বসে আছে অপরিচিত তিন-চারজন লোক, যাদের চোখমুখের চাউনি মোটেও সুবিধার নয়। বেলী ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতেই শুনতে পেল রাহেলা বেগমের কর্কশ গলা—
“হারামজাদী! ঘরের দরজা খোল কইতাছি! মেহমানরা কতক্ষণ ধরে বইয়া আছে দেখতাছস না? আজ তোর বিয়ে ঠিক হবেই, তোর বাপে অচল হইছে দেইখা কি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবি?”
আয়েশা তার ঘরের দরজা ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ করে মেঝের ওপর কুঁকড়ে বসে আছে। তার দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে, সে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকে রেখেছে। সে জানে, তার সৎ মা যে পাত্র ঠিক করেছে, সেই লোকটা বয়সে যেমন বড়, চরিত্রেও তেমনি জঘন্য। মদ্যপ আর দুশ্চরিত্র বলে এলাকায় লোকটার কুখ্যাতি আছে। রাহেল বেগম টাকার লোভে নিজের পালিত মেয়েকে এই নরকে ঠেলে দিতে চাইছেন। আয়েশা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে—আজ সে ঘর থেকে বের হবে না। আজীবন কপালে যদি কষ্ট থাকে, সই; কিন্তু জেনে শুনে সে এই আগুনে ঝাঁপ দেবে না।বেলী দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ডাকল,
“আয়েশা? আয়েশা দরজা খোল, আমি বেলী।”
ভেতর থেকে আয়েশার কাঁপাকাঁপা আওয়াজ ভেসে এল,
“বেলী উনারে চলে যেতে বল। আমি বিয়া করমু না। আমারে যদি মেরেও দেয়, তাও আমি এই ঘর থেকে বাইর হমু না।”
রাহেলা বেগম এবার বেলীর ওপর চড়াও হলেন।
“এই ছুঁড়ি! তুই কোত্থেকে আসলি নাক গলাতে? নিজের ঘর রক্ষা করতে পারে না আবার আরেকজনের ঘর নষ্ট করতে আইছে! সটান নিজের ঘরে যা কইতাছি!”
অপমানে বেলীর ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেল। কিন্তু সে দমল না। আদনানও ততক্ষণে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। সে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
“আপনারা এখান থেকে যান তো। জোর কইরা বিয়া করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, বুঝেন না?”
লোকগুলোর মধ্যে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বেলীর দিকে এক কুৎসিত দৃষ্টি দিয়ে বলল,
“আইন আমাদের শিখাতে আইসো না খোকা। যার মেয়ে সে দিতাছে, তোমাদের কী?”
বেলী আয়েশার ঘরের জানালার কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আয়েশা, দরজা খুলিস না। আমরা আছি। দেখি কে তোকে জোর করে!”
ওদিকে ফারহান তার ঘরের দাওয়ায় বসে তৃষ্ণার জন্য অপেক্ষা করছিল। আয়েশাদের ঘরের এই নাটক দেখে সে হাসল। বেলীর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলল,
“নিজের ঘর সামলাও বড় বউ। পরের ঘরের চিন্তা করতে গিয়ে আবার নিজের ঘর না হারায় ফেলো!”
বেলী ফারহানের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে বুঝল, এই বস্তির ঘিঞ্জি ঘরগুলো শুধু দারিদ্র্যে ভরা নয়, এখানে মানুষের মনগুলোও পচে নর্দমা হয়ে গেছে। ফারহান যেমন তাকে তিলে তিলে মারছে, রাহেলা বেগমও তেমনি আয়েশাকে শেষ করতে চাচ্ছেন।
হঠাৎ আয়েশার ঘরের ভেতরে একটা বড় কোনো শব্দ হলো। সবাই চমকে উঠল। আয়েশা কি তবে কোনো চরম পথ বেছে নিল? বেলীর বুকটা ধক করে উঠল। সে চিৎকার করে আদনানকে ডাকল দরজা ভাঙার জন্য।
আদনান আর দেরি করল না। আয়েশার ঘরের ভেতরে ওই বিকট শব্দটা হওয়া মাত্রই সে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করল। বেলী চিৎকার করে ডাকছে,
“আয়েশা! আয়েশা কথা বল! কী হয়েছে তোর?
আয়েশার সৎ মা রাহেলা তখনো উঠোনে দাঁড়িয়ে গালিগালাজ করছেন,
“মরুক! মরে গেলেই আপদ চুকাবে। আপদ বিদেয় হইলে আমি অন্তত শান্তিতে ঘুমাতে পারমু!”
মানুষের মনের ভেতরটা যে কতটা অন্ধকার হতে পারে, রাহেলাকে না দেখলে আজ বেলী বুঝতে পারত না। আদনানের তিন-চারটে জোরালো ধাক্কায় পুরোনো কাঠের নড়বড়ে দরজাটা কঁকিয়ে উঠে ভেঙে গেল। বেলী সবার আগে ভেতরে ঢুকল। দেখল, আয়েশা মেঝেতে পড়ে আছে, তার কপাল থেকে রক্ত ঝরছে। সে আসলে জানালার ভাঙা কাঠ দিয়ে নিজের কপালে আঘাত করেছিল—জীবন দেওয়ার জন্য নয়, বরং এই অনাচার ঠেকানোর এক চরম প্রতিবাদ হিসেবে। তার চোখদুটো তখনো খোলা, সেই চোখে আগুনের মতো তেজ। বেলী দ্রুত আয়েশাকে জড়িয়ে ধরল। আয়েশা বেলীর গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল,
“আমি মইরা যামু কইছি দেখ সত্যি সত্যিই! আমি ওই বুড়ো জানোয়ারের কাছে যামু না বেলী, তুই আমারে মেরে ফেল তাও ভালো!”
বেলী আয়েশার কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
“কারো বাপের সাধ্য নাই তোকে নিয়ে যাওয়ার। আমি বেঁচে থাকতে তো অন্তত না।”
বাইরে থেকে সেই পাত্রপক্ষের লোকটা পানের পিক ফেলে ঘরে উঁকি দিল।
“কী গো রাহেলা বেগম? মেয়ে তো দেখি ঢং শুরু করছে। রক্ত দেইখা আমার আবার মাথা ঘোরে। বিয়া কি আজ হইবে না?”
আদনান এবার রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। সে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কলার চেপে ধরল।
“তোর মাথা ঘোরানি আমি আজ জন্মের মতো ঘুচায় দিমু। এখন যদি এই বস্তি থেকে না বের হস, তবে তোরে এই নর্দমায় পুঁতে ফেলব। পুলিশ আসুক, তারপর বুঝবি! এক্ষুনি কল করছি।”
পুলিশের নাম শুনে লোকগুলোর চেহারার রঙ বদলে গেল। তারা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, রাহেলাকে তোয়াক্কা না করেই চম্পট দিল। রাহেলা তখন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আদনানের দিকে তেড়ে এলেন,
“তোর এত বড় সাহস! আমার মেহমানদের তাড়িয়ে দিলি? এই মেয়ের খাওয়া বিয়া শাদীর খরচ কি তোর বাপ দিবে?”
আদনান ভয়ংকর গলায় বলল,
“খাওয়ার খরচ যে দিবে সে দিবে, কিন্তু আপনি যদি আয়েশার গায়ে আর হাত দেন—তবে মনে রাইখেন আপনার নামে আগে মামলা হবে।”
“যে দিব মানে কি? তুই দিবি? ক তুই দিবি?
আমি আজীবন এই মাইয়ার বোঝা নিয়ে ঘুরতে পারমু না। খুব তো পন্ডিতি কইরা পুলিশের ভয় দেহাইয়া বিয়া ভাঙলি, এখন কি তুই আমার আয়েশারে বিয়া করবি? বল, করবি বিয়া?”
“খালাম্মা, মুখ সামলে কথা কন। আয়েশারে ঘরে রাখতে হইব ওই চিন্তা না কইরা, মামলা হইলে আমনেরে জেলে থাকতে হইব, এটা মাথায় রাইখেন।”
রাহেলা বেগম তবুও গজগজ করতে বললেন।
“আমার মাইয়ার বিয়া তুই ভাঙলি! এহন এই মাইয়ার দায়িত্ব তোরই নিতে হইব। আমি কিছু জানি না। তোরে বিয়া করতে হইব মানে তোরেই! সবাই কন কথা ঠিক কি-না?”
রাহেলার কথায় তাল মেলাতে লাগলো পুরো বস্তিবাসী। আদনান আশাহত দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়ে রইলো।
#চলবে
#বেলীফুলের_ইতিকথা (৯)
#মীরাতুল_নিহা
মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা বড় দায়। যারা একটু আগেও আয়েশার ওপর রাহেলার অবিচার দেখে টু শব্দ করেনি, তারাই এখন রাহেলার কথায় তাল মিলিয়ে আদনানের ওপর চড়াও হচ্ছে। আদনান থমকে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারদিকে রাহেলা বেগম এক বিষাক্ত জাল বুনে ফেলেছেন। রাহেলা চিৎকার করে পাড়া মাথায় করছেন,
“এই যে শোনেন সবাই এতই যখন দরদ আয়েশার লাইগা, তবে বিয়া কইরা ঘরে নিয়া যাক। পরপুরুষ হইয়া, আমার মাইয়ার বিয়া ভাঙবা আর আমাগো সমাজে বিচার হইব না, তা তো হয় না!”
ভিড়ের মাঝখান থেকে ফজু মিয়া ফোড়ন কাটল,
“কথা তো মিছা না আদনান! তুই তো এই বস্তির পোলা। ঘরের কথা ঘরে রাখতি, পুলিশ-টুলিশ ডাকার কথা কইয়া বিয়া ভাঙার কী দরকার ছিল? এহন রাহেলার মাইয়ার কুখ্যাতি ছড়াইয়া গেল, ওরে কে বিয়া করব? তুইই কর!”
আদনান একবার বেলীর দিকে তাকালো, তারপর সেই রক্তাক্ত আয়েশার দিকে। আয়েশা তখন বেলীর কোলে মাথা রেখে পাথর হয়ে আছে। অপমানে মেয়েটা যেন ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে। আদনান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“চুপ করেন আপনারা!”
বেলী উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে আগুনের হলকা। সে ভিড় ঠেলে সামনে এসে বলল,
“লজ্জা আপনাদের হওয়া উচিত! আদনান আয়েশার জীবন বাঁচিয়েছে, আর আপনারা সেই সুযোগে ওরে জোর করে দায় চাপাতে চাচ্ছেন?”
ফারহান ঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে বিশ্রী একটা হাসি দিল।
“আরে বউ, তুমি তো এখন অনেক বড় লেকচার দিচ্ছ! ডানা গজাইছে না? আদনানরে তো তুমিই উস্কানি দিছো। এখন আদনানরে বিয়া করতে দাও, তাইলে শান্তি ফিরব!”
আদনানের ধৈর্য এবার বাঁধ ভাঙল। সে চিৎকার করে বলল,
“বন্ধ করেন এই তামাশা! আয়েশা আমার বোনের মতো। আমি তারে বিয়া করতে পারুম না!”
রাহেলা বেগম এবার মাটির ওপর বসে পড়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে শুরু করলেন,
“ওরে বাবা রে! আমার মান-ইজ্জত সব গেল রে! এখন এই মাইয়ারে কে খাওয়াইবো? কে বিয়া করব?”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আদনান টুপ রইলো। সে বুঝতে পারছে, এখানে যুক্তির চেয়ে গলার জোর আর কুসংস্কারের শক্তি বেশি।
রাহেলার কথায় যখন পুরো বস্তিবাসী তাল মেলাচ্ছিল, ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে ঝড়ের বেগে এগিয়ে এলেন আদনানের মা কুলসুম বেগম। নিজের ছেলের নামে এমন অপবাদ আর বিয়ের জবরদস্তি শুনে তিনি আর বসে থাকতে পারেননি। রাহেলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে তপ্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন—
“খবরদার রাহেলা! মুখ সামলে কথা ক। তোর ঢঙি মেয়ের দায় কেন আমার সোনার টুকরা ছেলে নিবে? আমার ছেলে রাজপুত্রের মতন, ভালো ছেলে। তোর ওই কপালপোড়া মেয়ের যোগ্য সে কোনোদিনও না! বিয়া তো দূরের কথা, আমার ছেলের ছায়াও যেন তোর মেয়ে না মাড়ায়।”
রাহেলা বেগমও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। তিনি পাল্টা তেড়ে এলেন,
“ক্যান নিবো না? তোর পোলা পন্ডিতি করতে আসছিল কেন? পুলিশের ভয় দেহাইয়া বিয়া ভাঙছে যখন, তখন এর দায়িত্ব তারেই নিতে হইবো। মেহমানরা তো বিদায় হইছে, এখন এই মাইয়ারে খাওয়াইবো কে? তোর পোলা বিয়া না করলে আমি এই মাইয়ারে আজই ঘাড় ধরে বস্তি থেকে বের করে দিমু! আমি পারতাম না ঝামেলা নিতে!”
দুই মায়ের এই জঘন্য ঝগড়া, আয়েশাকে নিয়ে টানাটানি দেখে বেলীর গা ঘিনঘিন করে উঠল। সে আয়েশার হাত ধরে ভিড়ের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। চোখে মুখে এক কঠিন সংকল্প। চিৎকার করে বলল—
“থামেন আপনারা! আয়েশা কি কোনো বাজারের পণ্য যে আপনারা তাকে নিয়ে এভাবে হাটে বসেছেন? রাহেলা খালাম্মা, আপনি বলছেন ওর দায়িত্ব কে নিবে? আমি বলছি—আয়েশার দায়িত্ব আয়েশা নিজে নিবে! কারো দয়া বা কারো বিয়ের কোনো দরকার নেই ওর।”
কুলসুম বেগম এবার বেলীর কথায় তাল মেলালেন। তিনি মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন,
“ঠিকই তো! বেলী তো ঠিক কথাই বলছে। আমার ছেলে কেন এই আপদ ঘাড়ে নিবে? ও নিজেরে যদি সামলাইতে পারে সামলাক, কিন্তু আমার পোলার সাথে জড়াইলে আমি কিন্তু ভালো হবো না কইলাম!”
রাহেলা বেগম বিদ্রূপের হাসি হাসলেন,
“নিজে তো বাপের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে বস্তিতে পচতাছোস, সতীন লইয়া সংসার করোস! তোর তো নিজেরই ঘরের ঠিক নাই আবার বড় বড় কথা!”
বেলী মাথা উঁচু করে বলল, “আমার দায়িত্ব আমি খুব দ্রুতই নিতে পারবো। আজ থেকে আয়েশাও আমার সাথে তৈরি হবে। ও যদি কাজ করতে পারে, তবে কারো কটু কথা ওকে সইতে হবে না। আদনান যা করেছেন তা উপকারের জন্য করেছেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাকেই দায়িত্ব নিতে হবে।”
আদনান কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে বেলীর দিকে তাকালো। এই মুহূর্তে বেলী পাশে না দাঁড়ালে হয়তো তাকে এক বড় বিপদে পড়তে হতো। রাহেলা বেগম গজগজ করতে করতে বললেন,
“আইচ্ছা দেখুমু কত বড় মাস্টারনি হইছোস তোরা! ঘরে চাউল না থাকলে তখন বুঝবি দায়িত্ব কারে কয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শখ ভাইঙ্গা যাইব তহন!”
বস্তিবাসী ধীরে ধীরে পাতলা হতে লাগল। কুলসুম বেগম আদনানকে এক প্রকার কান ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। বেলী আয়েশাকে আগলে ধরে নিজের ঘরে নিয়ে এল। আয়েশা তখনো থরথর করে কাঁপছে। বেলী তাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“ভয় পাস না আয়েশা। আমরা প্রমাণ করে দেব যে একটা মেয়ে চাইলে একাই লড়তে পারে।”
ঘরে ঢুকে বেলী দেখল ফারহান আর তৃষ্ণা বিছানায় বসে মিটিমিটি হাসছে। তৃষ্ণা নখ কাটতে কাটতে বলল,
“বড় বউর তো তেজ অনেক! তা পোলাপান পড়ায় কয় টাকা কামাই করো যে নিজের সাথে আরেকটা মাইয়ার দায়িত্ব নিলা?”
বেলী কোনো উত্তর দিল না। সে জানে, এই বিষাক্ত সাপেদের সাথে কথা বলা মানে নিজের সময় নষ্ট করা। তার দুচোখে তখন রাজ্যের ঘৃণা। আদনান তখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ফারহানের কথা শুনে একটু বিরক্ত হলেও বেলীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“বেলী ভাবী? আর একটা কথা বলার ছিল। আমার ছোট বোন মাহি তো এবার মাধ্যমিকে। ও অংকে আর ইংরেজিতে খুব কাঁচা। আপনি যদি ওকে একটু পড়াতেন, তবে আমাদের খুব উপকার হতো। অন্য কাউকে না খুঁজে আপনার মতো মানুষকেই আমি ভরসা করতে চাই।”
বেলী অবাক হয়ে আদনানের দিকে তাকালো। এই কঠিন সময়ে আদনান যেভাবে তার পাশে দাঁড়াচ্ছে, তা যেন এক মরুভূমিতে পানির মতো। টিউশনির এই সুযোগ মানেই আরও কিছু আয়, যা দিয়ে সে নিজের ও ফিওনার ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও গুছিয়ে নিতে পারবে।বেলী কৃতজ্ঞতায় মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,
“তুমি আমার জন্য যা করছো আদনান, তার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। তুমি মাহির কথা চিন্তা করো না, আমি ওকে নিজের বোনের মতো করেই পড়াবো।”
আদনান মৃদু হেসে চলে গেল। বেলী আয়েশার হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের বিছানার এক কোণে বসল। ফারহান আর তৃষ্ণা তখনো ঘরে বসে ফিসফিস করছে, কিন্তু বেলী তাদের অস্তিত্বকে আজ পুরোপুরি অগ্রাহ্য করল। তার মনে মনে তখন একটাই শপথ—লড়াইটা সে জিতবেই। মুক্তির পথটা সে নিজেই খোদাই করে নেবে।
**#চলবে.
