#বেলীফুলের_ইতিকথা (৪)
#মীরাতুল_নিহা
বেলী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী প্রতিবেশীদের শান্ত করে দিয়ে যখন বস্তির সরু গলিপথে পা রাখল, রাত তখন তার সমস্ত রহস্য আর নৈঃশব্দ্য নিয়ে নেমে এসেছে। আকাশ জুড়ে কালচে মেঘের ভেলা, যার ফাঁকে দু-একটি তারা টিমটিম করে জ্বলছে। এখানকার রাত তার নিজস্ব এক ছন্দ নিয়ে আসে। চারিদিকে টিনের চাল আর কাঁচা দেয়ালের ঘরগুলো একে অপরের গায়ে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। আবর্জনার স্তূপের পাশ দিয়ে সে হেঁটে চলল। রাতের এই প্রহরে বস্তির জীবন অন্যরকম। কোথাও হ্যারিকেনের হলদেটে আলোয় কোনো খাবারের দোকান সবেমাত্র বন্ধ হচ্ছে, তো কোথাও চলছে চাপা হাসির শব্দ। একটু দূরে, বেলী থমকে দাঁড়াল। সিমেন্টের একটি গোড়ায় হেলান দিয়ে মদ খেয়ে মাতাল হওয়া এক লোক অর্ধ-শুয়ে আছে। তার পরনের মলিন শার্টে সম্ভবত বমির দাগ, মুখ থেকে আসছে তীব্র মদের গন্ধ। লোকটির চোখে কোনো পলক নেই, সে যেন জীবনের সমস্ত ভার নেশার উপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে পড়ে আছে। এই দৃশ্য বস্তির রাতের এক চিরন্তন অংশ। বেলী এসব দেখল, কিন্তু তার মুখে কোনো বিরক্তি নেই। বেলী নিঃশব্দে এগিয়ে চলল আয়েশার ঘরের দিকে। দরজায় মৃদু টোকা দিতেই আয়েশা দরজা খুলল। বেলীকে দেখে সে কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু নীরবে তাকে এবং তার শিশুকন্যাকে ভেতরে টেনে নিল। উষ্ণ, মানবিক আশ্রয়ে সেদিন রাতের বাকিটা সময় বেলী এক গভীর, শীতল শান্তি খুঁজে পেল।
পরের দিন সকাল হতেই আয়েশা তার স্বভাবসুলভ আন্তরিকতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে জোর করে বেলীকে নাস্তা খাওয়াল। বেলী মেয়েকে কোলে নিয়ে, নাস্তা সেরে ঘরের দিকে ফেরার জন্য প্রস্তুত হলো। তার মনে এখন এক নতুন দৃঢ়তা। ঠিক যখন সে আয়েশার ঘর থেকে বেরিয়ে সরু গলি পেরিয়ে একটু খোলা রাস্তায় এসে পৌঁছেছে, তখনই তার চোখ পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরিচিত চেহারার উপর।রাস্তায় আদনানের সাথে তার দেখা হলো। আদনান বেলীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই, প্রথমে তার কোল থেকে ফিওনাকে আলতো করে কোলে তুলে নিল।
ফিওনাকে আদর করতে করতে তার গালে একটি চুমু দিল আদনান। ফিওনাও যেন এই অচেনা পুরুষের স্নেহে শান্ত হয়ে তার কাঁধে মাথা রাখল।
“হয়েছে হয়েছে! এত আদর করতে হবে না! দাও দেখি। ঘরে যাব, দেরী হয়ে যাচ্ছে!”
“ওই ঘর আদৌ আপনার আছে তো!”
আদনানের কথা শুনে বেলীর মুখটা বিষন্নতায় গ্রাস করলেও পরক্ষণেই মনে পড়ল, আদনানের বলা কথাগুলো সত্যি! একদম তিক্ত সত্যি যাকে বলে। মুখে মুঁচকি হাঁসি রেখেই বলল,
“ঘর, বর সবই অনেক আগে গেছে ভাই। এখন থাকার জন্য শুধু একটু জায়গা আছে বলতে পারো!”
প্রসঙ্গ এড়ানো নাকি রাগ কোনোটাই পুরোপুরি প্রকাশ না করে আদনান ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি কোন দিক দিয়ে আপনার ভাই লাগি?”
“কেন? তুমি তো আমার ছোটো বয়সে। আমার ছোটো ভাইয়েরই মতন।”
“উহু! ছোটো ভাইয়ের মতন আর ছোটো ভাই আলাদা বুঝছেন?”
বেলী সন্দিহান দৃষ্টিতে আদনানের পানে তাকিয়ে শুধোয়,
“কি বুঝব?”
বেলীর দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরে আদনান দৃষ্টি নত করে ফেলল তৎক্ষনাৎ! মাথা নুইয়েই প্রতি উত্তর করল,
“আপনার মতন রাগী মেয়ে মানুষের ভাই হবার দরকার নেই বাপু।”
বেলী এবার হেঁসে ফেলল। আদনান ছেলেটার সামনে সে সবসময়ই বলা যায় রাগ টাগ দেখিয়ে রাখে। এটা কেনো, সে নিজেও জানে না। তবে ছেলেটা কথা বলতে শুরু করলে থামে না আর! বাঁচাল যাকে বলে বেলীর কাছে! হয়ত সেজন্যই।
“বেশ বেশ! তা পড়াশোনা কীরকম চলছে?”
“পড়াশোনা চলছে পড়াশোনার মতন। আমি চলছি আমার মতন!”
“কেন, আর পড়বে না?”
আদনান মাথায় হাত দিয়ে চুলকাতে চুলকাতে মৃদুস্বরে বলল,
“বোধহয় না!”
বেলীর তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন,
“কেন?”
“মন বসছে না আর!”
“পড়াশোনা না করলে কি করবে ভবিষ্যতে?”
“বিয়ে!”
আদনানের চটপট উত্তর শুনে বেলী ফের ভ্রু কুঁচকাল! এই বুঝি শুরু হলো, তার বিরক্তির পালা!
“কোনো মেয়েই আসবে না, এভাবে চললে!”
আদনানের মুখটা কিছুটা চুপসে যাওয়ার মতন হয়। বেলী ফের বলে,
“তাহলে কিভাবে চলব?”
“পড়াশোনা করবে মানুষের মতন মানুষ হবে! ভালো চাকরি বাকরি করবে। সুন্দর মতন জীবন যাপন করবে।”
আদনান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“হুম বুঝলাম!”
“বুঝলে যাও বাড়ি যাও!”
ফিওনাকে আদর করার পর আদনান সরাসরি বেলীর দিকে তাকাল। তার পকেট থেকে ভাঁজ করা একটি এক হাজার টাকার নোট ফিওনার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। ফিওনার ছোট্ট হাতজোড় দিয়ে টাকাটা আঁকড়ে ধরল।
বেলী প্রথমে দ্রুত মাথা নেড়ে মানা করল,
“না।”
“রাখেন তো, এখন তর্ক কইরেন না।”
বেলী ইতস্তত করতে লাগল। তার আত্মসম্মান তাকে বাধা দিচ্ছিল, কিন্তু মুহূর্তেই তার বর্তমানের নিদারুণ আর্থিক সঙ্কটের কথা মনে পড়ল। সে তিক্ত হাসি হেসে ভাবল, এক হাজার কেন, এই মুহূর্তে এক টাকাও তার জন্য অনেক! বেলীর চোখে কৃতজ্ঞতা থাকলেও, মুখে ছিল না কোনো শব্দ।
আদনান শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“সাবধানে থাকবেন। কিছু লাগলে আমাকে বলবেন। আমি সবসময়ই আছি।”
এরপর আদনাণ ফিওনাকে আবার বেলীর কোলে ফিরিয়ে দিয়ে, আর কোনো কথা না বলে, দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। বেলা তখন গড়িয়ে চলেছে, নরম রোদ বস্তির টিনের চালে প্রতিফলিত হয়ে চিকচিক করছে। আদনান চলে যাওয়ার পর বেলী ধীর পায়ে ফিরছিল তার ঘরের দিকে।
ঠিক সেই সময়, বস্তির ভেতরের দিকে একটু নিরাপদ আবাসনের মোড়, যেখানে ঘন ঝোপঝাড় একটি ভাঙা টিউবওয়েল দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এসে দাঁড়ালো এক অচেনা পুরুষ। তার গঠন ছিল বলিষ্ঠ—চওড়া কাঁধ, গায়ের রঙ ছিল কালো, মাথাভর্তি কোকড়ানো, ঝাঁকড়া চুল যা তার ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। মুখে এক ধরণের চিন্তার রেখা ফুটে ছিল। দেখলেই বোঝা যায়, সে হয়তো দীর্ঘ পথ হেঁটে এসেছে, আর তার মনে কোনো গভীর অনুসন্ধান চলছে। পুরুষটি আশেপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। সে কয়েকটি দরজায় কড়া নাড়ল, কিছু জানতে চাইল কিন্তু কোনো উত্তর পেল না। বেলীর মতন কেউ কেউ কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারল না। এক ঘর থেকে আরেক ঘর, এক গলি থেকে আরেক গলি—পুরুষটি বেশ কিছুক্ষণ ধরে সেই ঘন জনবসতির মধ্যে তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটির খোঁজ করল। কিন্তু প্রতিটি দরজা থেকেই ফিরে এল নিরাশ হয়ে। তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এল।
একসময়, দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বুঝতে পারল, তার অনুসন্ধান এখানে ব্যর্থ হয়েছে। হয়তো ভুল ঠিকানায় এসেছে। আশাহত হয়ে সেই বলিষ্ঠ, কোঁকড়ানো চুলের পুরুষটি শেষমেশ নিরাপদ আবাসনের সেই মোড় থেকে ধীর পায়ে ফিরে চলল, বস্তির কোলাহল ভেদ করে সে মিশে গেল দূরের পথের ভিড়ে।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ফারহানকে এক নোংরা পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। গত রাতে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের কারণে ঘরে তখনো তীব্র দুর্গন্ধ। নিরুপায় হয়ে ফারহান নিজেই কোমর বেঁধে লেগে পড়ল। সে ঘরের মেঝেতে ছড়ানো সেই অসহনীয় তরল পদার্থ পরিষ্কার করল, ফ্লোর মুছল, এবং যতটা সম্ভব গন্ধ দূর করার চেষ্টা করল। পাশে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণা তখন নিজের শাড়ির আঁচল বা ওড়না দিয়ে নাক টিপে রেখেছিল। তার চোখে ছিল চরম বিতৃষ্ণা এবং ফারহানের প্রতি নীরব অভিযোগ। তাদের দু’জনের মধ্যে তখন কোনো কথা হচ্ছিল না—পরিষ্কার করার এই কাজটি যেন তাদের মধ্যে এক কঠিন নীরবতা তৈরি করেছিল।
ঘরদোর কোনোমতে পরিষ্কার হতেই, বেলী দরজায় এসে দাঁড়াল। সে তার মেয়েকে কোলে নিয়েই ভেতরে পা রাখল। বেলীকে দেখামাত্র ফারহানের জমা হয়ে থাকা সমস্ত রাগ, অপমান আর রাতের বঞ্চনা যেন একযোগে ফেটে পড়ল। তার চোখ লাল হয়ে গেল, শিরা ফুলে উঠল।
“তুই… তুই এত সাহস কিভাবে পেলি! আমাকে আঁটকে রাখা!”
ফারহান বিন্দুমাত্র দেরি না করে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেলী কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ফারহান বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে তার মাথার চুলের মুঠি সজোরে চেপে ধরল। তীব্র, অপ্রত্যাশিত ব্যথায় বেলীর মুখ থেকে এক ঝলক “আহ্!” শব্দ বেরিয়ে এল। তার কোলের শিশুটিও মায়ের এই আকস্মিক যন্ত্রণা আর উত্তেজনায় ভয় পেয়ে কেঁদে উঠল। ফারহান তখন বেলীর চুল ধরে তাকে নির্মমভাবে ঝাঁকাতে শুরু করেছে, বেলী যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে!
পরের মুহূর্তেই, বেলী ফারহানের দেহের নিচের অংশ লক্ষ্য করে, বিশেষ করে তার দু’রানের মাঝখান বরাবর, সজোরে তার পা দিয়ে আঘাত করল।
এই অপ্রত্যাশিত এবং মারাত্মক আঘাতটি ফারহানের সমস্ত শক্তি মুহূর্তে কেড়ে নিল। তার হাত থেকে বেলীর চুল ছাড়িয়ে গেল। ফারহান যন্ত্রণায় একটা বিকট, প্রায় দম আটকানো চিৎকার করে উঠল—যে চিৎকারটি গত রাতের ক্রোধ বা ক্ষোভের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। তার বলিষ্ঠ দেহটি সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়ল, দু’হাতে আঘাতের স্থান চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল।
ফারহানের এই অসহায় পতন দেখে বেলীর মুখের ভাব পরিবর্তন হলো না। সে ধীরে ধীরে তার মেয়ের কান্না থামাতে থামাতে ফারহানের ঠিক পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন কোনো ভয় নেই, আছে কেবল কঠিন সতর্কতা।কণ্ঠে এক তীক্ষ্ণ, শীতল ধার নিয়ে বেলী বলল,
“শোনো। আমার গায়ে ভুলেও যেন আর কখনও হাত না উঠে। আমার গায়ে একটা আঁচড়ও যদি পড়েছে, তাহলে এর পরে পুলিশের স্পর্শ কোথায় কোথায় পড়বে তোমার তুমি বুঝবেও না! এটা তোমার শেষ সতর্কবার্তা। মনে থাকে যেন।”
বেলী তার কোলে থাকা মেয়ের পিঠে আলতো করে চাপড় দিতে দিতে তাকে নিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, ফারহান তখনো যন্ত্রণায় মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে। তৃষ্ণা ফারহানের কাছে গিয়ে শুধাল,
“খুব বেশী লেগেছে?”
ফারহান মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“খুব মানে! উঠে দাঁড়াতে অব্দি পারছি না। মনে হচ্ছে আমার জান প্রাণ, শক্তি, সব গেলোগা রে…!”
ফারহানের কথা শুনে শাহনাজ আৎকে উঠে বলল,
“তাইলে তো আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হইয়া গেল! এবার, আলোকিত হইব কেমনে?”
#চলবে?
#বেলীফুলের_ইতিকথা (৫)
#মীরাতুল_নিহা
সকাল সকাল একটি ঘর থেকে তীব্র আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজটি কুলসুম বেগমের। বস্তির পরিচিত এক রাগী মুখ। চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে এল থালাবাসন ছুঁড়ে মারার ভয়ঙ্কর শব্দ। স্টীলের বাসনের ঝনঝন আওয়াজ এত তীব্র যে, মনে হলো ঘরটাই বুঝি কেঁপে উঠবে। ধাতব বস্তুর সেই তীব্র আঘাত আর পতনের শব্দে কুলসুম বেগমের ক্রোধের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে উঠল। বস্তির সেই সরু, স্যাঁতসেঁতে গলি ধরে সবেমাত্র একটি কালো বিড়াল পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। বাসনের সেই আকস্মিক ঝনঝন আওয়াজ শুনে বিড়ালটি ভয়ে যেন কেঁপে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে তার চলার গতি পরিবর্তন করে, দ্রুত পায়ে পাশের একটি টিনের ঘরের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিল।
কুলসুম বেগমের ঘর থেকে থালাবাসন ছোঁড়ার আওয়াজ যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই আদনান বস্তির সেই গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আদনানের মনে তখনো ফারহানের ঘরে ঘটে যাওয়া ঘটনার রেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। সে সবেমাত্র ঘরের দরজার কাছাকাছি পৌঁছেছে, ঠিক তখনই ঝনঝন শব্দে একটি ষ্টীলের প্লেট এসে পড়ল তার পায়ের ঠিক কাছে। সৌভাগ্যবশত, প্লেটটি তাকে আঘাত করেনি।
বিরক্তি এবং কিছুটা রাগ নিয়েই আদনান উপরে তাকাতেই দেখল, তার মা কুলসুম বেগম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কুলসুম বেগম এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে, আদনানকে দেখে যেন কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,
“আরে! দেখতে পাই নাই রে।”
প্লেটটা যে অসতর্কতাবশত পড়েনি, বরং ইচ্ছে করেই ছুঁড়ে মারা হয়েছে, তা বুঝতে আদনানের বাকি ছিল না। সে কিছুটা রেগেই বলল,
“মা, মনে তো হইতাছে ইচ্ছে করেই করছো! সকাল সকাল এগুলা কি?”
কুলসুম বেগম সঙ্গে সঙ্গে তেলেবেতালে হলেন। তাঁর কণ্ঠে হতাশা আর রাগ মিশে ছিল,
“আজ অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিছে? তোর আদরের ছোটো বোন ফেল করছে! এত কষ্ট কইরা পড়াইতাছি, রাতদিন পরিশ্রম করতাছি, আর সে ফেল করে বইয়া রইছে?”
ভেতরে দরজার এক কোনে ভয়ে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাহি। মায়ের অগ্নিমূর্তি দেখে সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস তার ক্ষুদ্র মনের ভেতর নেই। চুপিচুপি কেবল মনোযোগ সহকারে মা আর ভাইয়ের কথোপকথন শুনতে লাগল।
“আম্মা, ফেল করছে তো কি হইছে?”
“পড়ালেখা করাইতাছি আর তুই কস ফেল করছে তো কি হইছে?”
আদনান একটু এগিয়ে গিয়ে মা’কে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল,
“কিছুই হইব না! ভালো মতন পড়লে বার্ষিক পরীক্ষায় ভালোভাবে উর্ত্তীন হইতে পারবো।”
কুলসুম বেগম ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“কি হইব?”
“উর্ত্তীন! মানে পাশ করতে পারবো বলছি। মাহিকে ভালোভাবে পড়ালেই হইব।”
কথা বলতে বলতে এক পর্যায় মুখ থেকে পানের পিক ফেলে ভদ্রমহিলা ফের বলল,
“মানে প্রাইভেট পড়ানোর কথা কইতাছস?”
“হ, আম্মা। নাইনের পড়া কঠিন আছে কিন্তু।”
“এটারে আর লেখাপড়া করাইয়া লাভ কী? বিয়া-দিয়া দিয়া বিদায় করুম!”
কুলসুম বেগমের যুক্তি দেখে আদনান ভ্যাবাচ্যাকা খেল। সে হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওর এখনো বিয়ের বয়স হয় নাই আম্মা। মাহি ছোটো এখনো।”
“তুই থাম তো! তোর বাপে মাইয়ার পিছে বেশি টেকা খরচ করব? হেয় তো সংসারেই টেকা দেয় না! এসব ছাড়। ভালা পোলা দেখ। বয়স কম আছে, ভালা ভালা পোলারা আইব!”
“আম্মা! আমি পড়াব আমার বোনকে। আমি টাকা দিব। হইছে এবার?”
কুলসুম বেগম তাতেও সন্তুষ্ট হলেন না। ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে শুধালো,
“তুই দিবি? তুই অবশ্য পড়ালেখায় ভালা আছিলি! বিয়ে পাশ করতে পারতি।”
আদনান বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চ বোধক শব্দ উচ্চারণ করে প্রতি উত্তর দিলো,
“এতকিছু তোমার ভাবতে হইব না। তুমি মাহির পড়ালেখার দায়িত্ব আমার উপর ছাইড়া দাও! আর মাথা থেকে ওর বিয়ার ভূত নামাও।”
কুলসুম নিশ্চুপ। আদনান ফের শুধাল,
“এবার বলো, মাহির ফেলের সাথে বাসন ফেলার সম্পর্ক কী? বাসনগুলো কেন ভাঙছো?”
কুলসুম বেগম নাক সিঁটকিয়ে বললেন,
“ঐ হতচ্ছাড়িরে সকালে থালাবাসন মাজতে দিছিলাম। সবগুলিতে বালু লেগে রইছে। ভালোভাবে মাজে নাই! এমন নোংরা বাসন কি মুখে দেওয়া যায়? তাই রাগ করে আছাড় মাইরা ফেলে দিছি!”
আদনান তার মায়ের এমন কাণ্ড দেখে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই বস্তি এবং তার চারপাশের জীবন যেন সবসময়ই এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলা। মাঝেমধ্যে তার ইচ্ছে হয় এখান থেকে সে উড়াল দিবে পাখির মতন। একটা সুস্থ সুন্দর পরিবেশে ভালোভাবে জীবনযাপন করবে।
~~~~~~~~~
ফারহান আর তৃষ্ণার বিয়ের প্রায় পাঁচদিন পেরিয়ে গেছে। অথচ এই অল্প সময়েই তৃষ্ণা হাঁপিয়ে উঠেছে। আজ সকালে ঘর পরিষ্কারের পরেও তার মেজাজ ভালো হয়নি। সে ফারহানের দিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলল,
“পাঁচটা দিন হয় বিয়ে হইলো, অথচ তোমার লগে আমার পাঁচ মিনিটও শান্তি করে কাটানো হইলো না! এমন ঘরবন্দী হয়ে থাকলে চলে? চলো, আজ ঘুরতে যাই?”
তৃষ্ণার আবদার স্বাভাবিক হলেও, ফারহানের মাথার শিরায় যেন বিদ্যুতের মতো চমক খেল। তার পকেটে তখন খাঁ খাঁ শূন্যতা। সব মিলিয়ে সে তখন দিশাহারা। নতুন বউয়ের এই আবদার সে কীভাবে পূরণ করবে? কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে সে ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে রইল। হঠাৎ করেই তার চোখ গেল বিছানার দিকে। সেখানে ফিওনা, বেলীর পাঁচ মাস বয়সী নিষ্পাপ বাচ্চাটি শুয়ে শুয়ে একা একা খেলা করছে। শিশুটি তার ছোট ছোট পা দুটো তুলে তুলে বাতাসে লাথি দিচ্ছে, আর মুখ দিয়ে অনবরত ‘ববব’ জাতীয় শব্দ করে আপন মনে হাসছে। এই দৃশ্য মুহূর্তের জন্য ফারহানের মনকে আর্দ্র করে তুলল।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ফিওনাকে কোলে তুলে নিল। ফারহানের দিকে তাকিয়ে ফিওনা তার ফিরতি একগাল হাসি উপহার দিল, যে হাসি দেখলে পাষাণ হৃদয়েও স্নেহ জাগে। ফারহানও যেন নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। কিন্তু তার সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হুট করেই তার নজর পড়ল ফিওনার দু’হাতে। শিশুটির হাতে শোভা পাচ্ছে রূপার মোটা দুটি চুড়ি। মুহূর্তেই ফারহানের মনে পড়ল এই চুড়িগুলোর পেছনের কাহিনি। বেলীর খুব শখ ছিল মেয়েকে রূপার চুড়ি পরানোর। ফারহানের কাছে চেয়েও না পেয়ে, সে তার নিজের শখের রূপার নুপুরগুলো ভেঙে এই চুড়িগুলো বানিয়েছিল। চুড়িগুলো বেশ মোটাসোটা, চোখ বন্ধ করে অনুমান করা যায়, দু’ভরি তো হবেই! টাকার চিন্তা, তৃষ্ণার আবদার এবং এই অলংকার—সবকিছু মিলেমিশে ফারহানের মস্তিষ্কে এক দ্রুত সিদ্ধান্ত তৈরি হলো। ফিওনার নিষ্পাপ মুখ থেকে চোখ সরিয়ে সে দ্রুত হাতে, প্রায় অনুভূতিহীনভাবে, শিশুটির হাত থেকে চুড়িগুলো খুলে নিল। এরপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে, ফারহান ফিওনাকে আবার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, চুড়িগুলো পকেটে পুরে নিল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণাকে ইশারা করতেই, সেও চলল। ফারহান তার মুখে এক ধরনের বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে তৃষ্ঞাকে নিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসল। পেছনের বিছানায় ফিওনা তখনও পা তুলে তুলে খেলার চেষ্টা করছে। বাইরের উঠোনে বেলী তখন নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল। সে ফিওনার নোংরা কাঁথাগুলো পরিষ্কার করে সাবধানে রোদ লাগার জায়গায় শুকাতে দিচ্ছিল। কাজ সেরে ঘরে ফিরতেই সে দ্রুত ফিওনাকে কোলে তুলে নিল। মায়ের স্পর্শ পেয়ে শিশুটিও যেন শান্তি পেল।
এরপর বেলী তার মূল ঘরটির দিকে এগিয়ে গেল—যে ঘরটিতে ফারহান তৃষ্ণাকে নিয়ে ছিল। দরজা ভেজানো ছিল। বেলী নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করল।
এই ঘরটি ছিল বেলীর স্বপ্নের মতো সাজানো, সামান্য সম্পদ দিয়েই সে একে গুছিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এখন এই ঘরে এক অন্য নারীর দখল। বেলীর যত্নের সব চিহ্ন যেন মুছে গেছে। টেবিলের উপর নতুন বউর রুচি অনুযায়ী নতুন কিছু প্রসাধনীর বোতল, বিছানার চাদর পাল্টে দেওয়া হয়েছে, বাতাসে বেলীর পরিচিত গন্ধের বদলে ভাসছে অন্য কোনো সস্তা আতরের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ। ফারহানের দ্বিতীয় বিয়ে বেলীর জীবনে শুধু একটি নতুন মানুষকেই আনেনি, তার ব্যক্তিগত পরিসর এবং অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। ঘরের প্রতিটি কোণ যেন তাকে বিদ্রূপ করছে—এই যে, তোমার জীবনের উপর আর তোমার নিয়ন্ত্রণ নেই। বেলীর মনটা বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল, কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করল না। সে শুধু দ্রুত চোখ বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এই পরিবর্তন মেনে নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো পথ নেই।
ঘর থেকে বেরিয়ে বেলী আবার উঠোনে এসে দাঁড়াল। তখনি তার চোখে পড়ল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
প্রায় দেড় বছর বয়সী একটি বাচ্চা ছেলে কোনোমতে টলমল পায়ে হেঁটে হেঁটে বেলীর দিকে এগিয়ে আসছে। বাচ্চাটির অবস্থা দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে ভয়ানক অযত্নে আছে। তার সর্দিতে নাক-গাল ময়লা লেগে আছে, শুকিয়ে যাওয়া সর্দি আর ধূলোয় তার মুখটা বিবর্ণ। তার ছোট চেহারায় স্পষ্ট অযত্নের ছাপ। শীতকাল হওয়ায় শিশুটির গাল ফেটে গেছে, লালচে হয়ে আছে ত্বক। বেলীর বুকে তীব্র মায়া হলো। এই দৃশ্য তার নিজের ভেতরের যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দিল। এই বস্তিতে, এই ধরনের কষ্ট আর বঞ্চনা নিত্যদিনের ব্যাপার। এই সময়েই তার মনে এলো, ফারহানের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সেও তো মাঝেমধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা করে। কিন্তু প্রতিবারই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফিওনার মুখ। যদি সে চলে যায়, তবে তার এই নিষ্পাপ মেয়েটির কী হবে? ফিওনার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সে প্রতিবার নিজেকে দমিয়ে রাখে। এদিকে, সেই শিশুটিকে বেলী ভালোভাবেই চেনে—সে পাশের ঘরের রুনার সন্তান। হঠাৎ করেই, একটি মহিলা সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। মহিলাটি কিছু না জিজ্ঞেস করেই অতটুকু বাচ্চার গায়ে ‘ধরাম’ করে এক কিল বসিয়ে দিলেন। যন্ত্রণায় শিশুটি কেঁদে উঠতেই মহিলাটি তার হাত ধরে টানতে টানতে সেখান থেকে নিয়ে গেলেন। বেলীর খুব খারাপ লাগল। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলল না। বস্তিতে এসব হরহামেশা ব্যাপার। এখানে মারধর, চিৎকার, এসবই স্বাভাবিক। বেলী জানে, সে যদি এখন কিছু বলতে যায়, ওই মহিলা তাকেই দু’চারটে কটু কথা শুনিয়ে দেবে, বলবে “নিজের চরকায় তেল দাও।” তাই নীরবে সবকিছু হজম করে বেলী ফিওনাকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। তখনি চোখে পড়ল আদনান এদিকে আসছে! তাকে দেখেই বিরক্তিতে বেলীর চোখমুখ কুঁচকে এলো। ছেলেটাকে দেখলেই যেন, তার ভালো মুডও বিগড়ে যায় এক সেকেন্ডেই।
#চলবে?
