#বেলীফুলের_ইতিকথা(১৮)
#মীরাতুল_নিহা
দোকানের কিছুটা দূরে ছায়ায় এসে দাঁড়াল দুজন। আদনান শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেও বেলীর ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। যে মানুষটাকে সারাক্ষণ এড়িয়ে গেছে, আজ নিজের চরম দুর্দিনে তাকেই ডেকে পাঠাতে হলো। বেলী অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আদনান, তোমাকে হুট করে এভাবে ডাকার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি জানি, তোমার সাথে আমি আগে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। আমার ওপর রাগ করো না ভাই।”
আদনান বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসল।
“ওসব কথা থাক। বিপদে কাছের মানুষ ছাড়া আর কার কাছে যাবেন? আচ্ছা ফারহান ভাইয়ের ডিভোর্সের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবছেন?”
বেলীর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে স্থির গলায় বলল,
“হ্যাঁ আদনান। সে কারণেই তো এসেছি। ফারহান আমাকে এভাবে পথে বসিয়ে নিজে সুখে থাকবে, তা হতে পারে না। আমি তাকে ক্ষমা করব না। সে আমাকে তালাক দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার দেনমোহরের টাকা আর ফিওনার ভরণপোষণ—একটা পয়সাও আমি ছাড়ব না। কিন্তু আদনান, আমার তো কোনো সামর্থ্য নেই। উকিল ধরব সেই টাকা কই? আমি তো কিছুই চিনি না।”
আদনান আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“আপনি নিজেকে একা ভাববেন না। আমি এই কয়েকদিন নিজে থেকে কিছু খোঁজখবর নিয়েছি। আয়েশা বলার পর। আপনি কি জানেন, সরকারিভাবে ‘লিগ্যাল এইড’ নামে একটা ব্যবস্থা আছে? যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তাদের সরকার থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনজীবী নিয়োগ করে দেওয়া হয়। এমনকি মামলার কাজ চালানোর খরচও আপনার এক পয়সা লাগবে না।”
বেলী অবাক হয়ে বলল,
“বলো কী? কিন্তু মামলা তো অনেক জটিল ব্যাপার। আইন-কানুন কি আমার পক্ষে থাকবে?”
আদনান বুঝিয়ে বলতে লাগল,
“দেখেন, আইনের মারপ্যাঁচ বলতে গেলে প্রথম ধাপ হলো পারিবারিক আদালতে মামলা করা। আপনি মূলত দুইটা দাবি করবেন—এক, আপনার পুরো দেনমোহর। আর দুই, ফিওনার ভরণপোষণ। আইন অনুযায়ী, ফারহান ভাই নোটিশ দেওয়ার পর তিন মাস আপনার থাকা-খাওয়ার খরচ দিতে বাধ্য। আর দেনমোহরের টাকা তো উনার ওপর ঋণের মতো, ওটা উনি শোধ না করলে আদালত উনার সম্পত্তি ক্রোক করতে পারে। এমনকি উনি যদি টালবাহানা করেন, তবে উনার জেল পর্যন্ত হতে পারে।”
বেলী গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সে জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু আমার কাছে তো কাবিননামার অরিজিনাল কপি নেই, ওটা ফারহানের কাছে।”
আদনান বুদ্ধিদীপ্ত হেসে বলল,
“অরিজিনাল কপি লাগবে না আপা। যে কাজীর অফিসে বিয়ে হয়েছে, সেখান থেকে আপনি একটা সার্টিফাইড কপি তুলে নিতে পারবেন। ওটাই কোর্টে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট। আমি কালই খোঁজ নিয়ে কাজী অফিস থেকে ওটা বের করার ব্যবস্থা করব। আপনি শুধু ফিওনার জন্মের প্রমাণপত্র আর আপনার আইডি কার্ডটা জোগাড় রাখেন।”
আদনান আরও যোগ করল,
“আরেকটা কথা, তালাক কার্যকর হতে ৯০ দিন সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে ফারহান ভাই চাইলে তালাক প্রত্যাহার করতে পারে, কিন্তু আপনি যদি না চান তবে আইনত কেউ আপনাকে বাধ্য করতে পারবে না। আপনি কেবল আপনার পাওনা আদায়ের জন্য লড়বেন।”
আদনানের কথাগুলো শুনে বেলীর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে খানিকটা উত্তেজিত হয়েই বলল,
“কী বলছ আদনান? ফিরিয়ে নেওয়া মানে? ফারহান তো সাক্ষী রেখে আমাকে তিন তালাক দিয়েছে। আল্লাহ্র আরশে সেই খবর পৌঁছে গেছে। ইসলামি বিধানে তো তিন তালাক দিলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেস হয়ে যায়। সেখানে আবার ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ কোথায়? আমি কি অতই সস্তা যে সে যখন খুশি আমাকে ছুড়ে ফেলবে, আর যখন খুশি ফিরিয়ে নেবে?”
আদনান বেলীর মনের অস্থিরতা বুঝতে পারল। সে শান্ত গলায় বলল,
“ আপনি ধর্মীয় দিক থেকে একদম ঠিক বলছেন। তিন তালাকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আমি বলছিলাম রাষ্ট্রীয় আইনের কথা। বাংলাদেশের আইন বলে, রাগের মাথায় বা সাক্ষী রেখে কেউ মুখে তালাক দিলেই সেটা চূড়ান্ত হয় না। আইনের উদ্দেশ্য হলো একটা সংসারকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার শেষ চেষ্টা করা। তাই ৯০ দিন সময় দেওয়া হয়।”
বেলী তপ্ত স্বরে বলে উঠল, “আইন যা-ই বলুক আদনান, আমার কাছে আল্লাহ্র আইনই বড়। যে স্বামী সবার সামনে আমাকে ‘তিন তালাক’ দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে পারে, সে ফিরিয়ে নিলেও আমি আর ওই ঘরে যাব না। ওই সম্পর্ক আমার জন্য হারাম হয়ে গেছে। আমি কেবল আমার দেনমোহরের টাকা আর ফিওনার অধিকার বুঝে পেতে চাই। সে যদি ফিরিয়ে নিতেও আসে, আমি সরাসরি না করে দেব।”
আদনান মাথা নিচু করল। সে বুঝতে পারছে বেলীর আত্মসম্মানে কতটা আঘাত লেগেছে। সে বলল,
“আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি যখন মনস্থির করেছেন আর ফিরবেন না, তখন ওই ৯০ দিন সময়টা আপনার কেবল টাকা আদায়ের আইনি অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে। ফারহান ভাই যদি ফিরিয়ে নেওয়ার নাটকও করেন, আপনি কোর্টে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন যে আপনি আর সংসার করতে ইচ্ছুক নন। এতে আপনার দেনমোহর পাওয়া আরও সহজ হবে।”
বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, সমাজ আর আইনের এই মারপ্যাঁচে মেয়েদের জীবনটাই যেন একটা দাবার ঘুঁটি। কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে বের করে দেয়, কেউ আইনের দোহাই দিয়ে আটকে রাখতে চায়।
সে দৃঢ়স্বরে বলল,
“ফারহান আমাকে ফিরিয়ে নেবে কি না, সেই আশায় আমি বসে নেই। আমি শুধু চাই সে যেন তার কৃতকর্মের শাস্তি পায়। আমার দেনমোহরের এক একটা টাকা আদায় করে নেব।”
আদনান আর কথা বাড়াল না। আলোচনা শেষে বেলীর মনের ভার অনেকটাই হালকা হয়ে গেল।
“অনেক ধন্যবাদ ভাই। এত বুঝো তখন পড়াশোনাটা আর করলে না কেন?”
আদনান বিনিময়ে মুঁচকি হাসলো। সে বেলীর থেকে গুনে গুনে প্রায় তিন বছরের ছোটো! বর্তমান বয়স ২২।
“গরীবের আর পড়াশোনা! উচ্চ মাধ্যমিক দেওয়ার পর অর্নাসে ভর্তি হলেও টাকার অভাবে আর চালিয়ে যেতে পারিনি।”
বেলী বড় করে একটা শ্বাস নিলো। এই টাকা যে কত মূল্যবান সে এখন ভালো করেই বুঝে।
“চাইলে আবার শুরু করতে পারো। বয়স তো তেমন হয়নি।”
আদনান ফিরতি কিছু বলল না। এই তেমন না বয়সেই তার মনের ভেতর কত উথাল পাথাল শুরু হয়েছে! সেটা দমাবে কি করে তা নিজেরও জানা নেই। সে আদনানকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধীরপায়ে বস্তির ভেতর নিজের ঘরটার দিকে যায়। দেখতে দেখতে দেড়টা মাস পার হয়ে গেল। সময়ের এই চাকা যেন বেলীর জীবনে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। সেই ভ্যাপসা গরম, ছোট ঘরটা এখন আর শুধু অভাবের সাক্ষী নয়, বরং এক কর্মচঞ্চল কারখানায় রূপ নিয়েছে। বেলীর কোলের ছোট্ট ফিওনা এখন আর আগের মতো শুধু শুয়ে থাকে না। সে এখন ঘর জুড়ে হামাগুড়ি দেয়। তার সেই আধো আধো বুলিতে ‘মা মা’ ডাক যখন ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়, তখন বেলীর সব ক্লান্তি যেন জাদুমন্ত্রে উবে যায়। আট মাস পেরোনো ফিওনা এখন টলমল পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তার প্রতিটি খিলখিল হাসি বেলীর লড়াইয়ের জ্বালানি।
ব্যবসায়িক দিক থেকেও বেলী এখন আলোর মুখ দেখছে। চুড়ির পাশাপাশি সে হাতে বানানো গয়নাও তৈরি শুরু করেছে। এআই ব্যবহার করে চমৎকারভাবে ছবি তোলার সেই বুদ্ধিটা দারুণ কাজে লেগেছে। প্রথম মাসেই তার মোট লাভ হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকা! প্রথম অর্ডারের পর যেন আর পেছনে তাকাতে হয়নি। যদিও এই সাফল্যের পেছনে আছে বেলীর দিনরাত এক করা অজস্র পরিশ্রম—এক হাতে মেয়েকে সামলানো আর অন্য হাতে নিপুণ নকশা করা। চোখ দুটো লাল হয়ে যেত, কোমর ব্যথা করত, তবুও সে থামেনি।
টিউশনি থেকেও এবার চার হাজার টাকা হাতে এসেছে। রাইসা আর রিয়াদকে পড়ানোর সেই টাকাটা সে খুব যত্ন করে আলাদা করে রেখেছে সংসারের খরচের জন্য। আয়েশা এবার পদোন্নতি পেয়ে বেতন দশ হাজার টাকা পেয়েছে। আয়েশা বরাবরই দরিয়া দিল মানুষ, সে বলে,
“বেলী, তুই আর টাকা দিবি কী? আমরা তো একসাথেই আছি।” কিন্তু বেলী তা মানেনি। সে জানে আয়েশারও একটা ভবিষ্যৎ আছে, তাকেও টাকা জমাতে হবে। তাই সংসারের খরচে বেলী এখন নিজের ভাগের টাকাটা জোর করেই দেয়। সবচেয়ে বড় স্বস্তি মিলেছে আজ সকালে। মতিন মহাজনের সেই বিষাক্ত সুদের টাকা আর আসলের পুরোটা বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে বেলী। সেই কর্কশ লোকটা যখন পানের পিক ফেলে টাকাগুলো গুনছিল, বেলীর মনে হচ্ছিল তার ঘাড় থেকে যেন হিমালয় পাহাড়ের সমান একটা বোঝা নেমে গেল। সুদে টাকা নেওয়ার পর প্রতিটি রাত সে আশঙ্কায় কাটিয়েছিল, যদি শোধ করতে না পারে? আজ সে দায়মুক্ত।
মহাজনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বেলী আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিল। নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে দেনা শোধ করার তৃপ্তিই আলাদা। সে মনে মনে ভাবল,
“এই মাসটা কেবল দেনা মেটাতেই গেল, পরের মাস থেকে ইনশাআল্লাহ লাভের মুখ দেখবে।”
বেলী দ্রুত পায়ে বস্তির দিকে হাঁটা ধরল। আজ বিকেলে তার নতুন কিছু অর্ডারের মাল ডেলিভারি দিতে হবে।
অর্ডার তো আসছে, কিন্তু এই মালগুলো মানুষের হাতে পৌঁছাবে কীভাবে? প্রথম কয়েকবার আদনান সাহায্য করেছিল, কিন্তু বারবার তো আর তাকে বলা যায় না। বেলী নিজেই খোঁজ নিয়ে জানল বস্তির অদূরেই একটা কুরিয়ার সার্ভিসের ছোট অফিস আছে। এখন নিয়ম করে দুদিন পরপর বেলী ফিওনাকে আয়েশার কাছে রেখে কিংবা সাথে নিয়ে সেখানে যায়। ছোট ছোট কার্ডবোর্ডের বাক্সে সযত্নে চুড়ি আর গয়নাগুলো প্যাক করে বেলী। ভেতরে একটা ছোট চিরকুটে লিখে দেয়—’আমাদের ওপর ভরসা রাখার জন্য ধন্যবাদ’। কুরিয়ার অফিসে গিয়ে যখন সে তার হাতের কাজগুলো জমা দেয়, তখন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয় তার। এই গয়নাগুলো শহরের বড় বড় দালানের কোনো এক সুখী নারীর হাতে উঠবে, আর সেই আয়ে তার ফিওনার সুন্দর ভবিষ্যত তৈরী হবে একটু একটু করে।
কুরিয়ারের চার্জ নিয়ে প্রথম দিকে একটু হিসাব মেলাতে কষ্ট হচ্ছিল। ক্রেতারা কি ডেলিভারি চার্জ দিতে চাইবে? কিন্তু বেলী দেখল, কাজের মান ভালো হলে মানুষ ওই বাড়তি টাকা দিতে দ্বিধা করে না। কুরিয়ারের রসিদগুলো সে একটা ফাইলে জমিয়ে রাখছে। ওগুলো যেন তার সফলতার একেকটা দলিল। আজও তিনটে পার্সেল বুক করে যখন সে ফিরছিল, কুরিয়ারের লোকটা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
“আপা, আপনার তো মাশাআল্লাহ ভালোই অর্ডার আসে। প্রতিদিন দেখি আসেন।”
বেলী শুধু মৃদু হাসল। এই হাসির আড়ালে যে কত বিনিদ্র রাত আর কত চোখের জল লুকিয়ে আছে, তা কেবল সে’ই জানে।
ছোট্ট ঘরটা এখন আর শুধু তার থাকার জায়গা নয়, এটা এখন তার স্বপ্ন গড়ার কারখানা। ঘরে ফিরে ফোনটা হাতে নিতেই বেলীর চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। এ তো সেই রাইসার আম্মুর বড় বোন, যিনি গত মাসে প্রথমবার এক জোড়া চুড়ি নিয়েছিলেন! মেসেজটা খুলেই বেলীর মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। আপা লিখেছেন, “বেলী, তোমার পাঠানো গয়নাগুলো পরে আমি একটা দাওয়াতে গিয়েছিলাম। সবাই এত প্রশংসা করেছে যে কী বলব! বিশেষ করে ফিনিশিংটা দারুণ। আমি আমার আরও দুই বান্ধবীর জন্য একই রকম চার সেট চুড়ি আর একটা নেকলেস নিতে চাই। অর্ডারটা কনফার্ম করো প্লিজ।”
বেলীর খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছিল। শুধু নতুন কাস্টমার নয়, তার কাজের মান ভালো বলে ‘ফিরতি কাস্টমার’ বা রেগুলার ক্লায়েন্টও তৈরি হতে শুরু করেছে। একজন উদ্যোক্তার জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে?
বেলী মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, এখন আর তাকে শুধু বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করলেই হবে না; এখন তাকে নিজের ব্যবসাটা আরো বড় করার কথা ভাবতে হবে। অর্ডারের বহর বাড়ছে দেখে বেলী আজ আরও কিছু নতুন নকশার পুঁতি আর সুতা কেনার তালিকা তৈরি করল। ফিওনা তখন হামাগুড়ি দিয়ে এসে বেলীর আঁচল টেনে ধরল, যেন সেও মায়ের এই সাফল্যে ভাগ বসাতে চায়।
#চলবে
#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৯)
#মীরাতুল_নিহা
হাসপাতালের সাদা দেয়াল, ওষুধের উৎকট গন্ধ থেকে মুক্তি পেলেও ফারহানের মুক্তি মেলেনি যন্ত্রণার হাত থেকে। আজ তিনদিন হলো সে বাড়িতে ফিরেছে, কিন্তু বিছানাই এখন তার একমাত্র জগত। ভয়াবহ এক্সিডেন্টে ফারহানের বাঁ পা-টা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডাক্তার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী কয়েক মাস তাকে সম্পূর্ণ ‘বেড রেস্টে’ থাকতে হবে। সামান্য চলাফেরা করতে হলেও তাকে এখন বগলের নিচে গুঁজে নেওয়া সেই অ্যালুমিনিয়ামের ক্রাচ (Crutch) বা লাঠির ওপর ভর দিতে হয়। যাকে গ্রাম্য ভাষায় অনেকে ‘স্কেচ’ বলে থাকে। সেই ক্রাচে ভর দিয়ে সে খুড়িয়ে খুড়িয়ে বাথরুম পর্যন্ত যায়।
হাসপাতালের বিল বাবদ প্রায় পনেরো হাজার টাকা খরচ হয়েছে, আর ফেরার সময় আরও পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। এই পুরো টাকাটাই দিয়েছে সেই গাড়ির মালিক, যার সাথে ফারহানের ধাক্কা লেগেছিল। ফারহানের পকেটে তখন এক আনা পয়সাও ছিল না। অন্যের দয়ায় জীবন বাঁচিয়ে বাড়িতে আসার পর ফারহান ভেবেছিল একটু শান্তিতে বিশ্রাম নেবে, কিন্তু দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাড়িতে আসার পর ফারহান যেন আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শরীরের যন্ত্রণার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মনের যন্ত্রণা, যার মূলে রয়েছে তৃষ্ণা। তৃষ্ণার মধ্যে এখন এক আমূল পরিবর্তন। ফারহান বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছে, অথচ তৃষ্ণার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
বিকেলের মরা রোদ জানলা দিয়ে ফারহানের উপর এসে আছড়ে পড়েছে। শরীরের ব্যথার চেয়েও পেটের ভেতরকার মোচড়টা এখন বেশি কষ্ট দিচ্ছে তাকে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণা খুব যত্ন করে চোখে গাঢ় কাজল দিচ্ছে। ফারহান অনেকক্ষণ ধরে তার দিকে তাকিয়ে থেকে ধরা গলায় বলল,
“তৃষ্ণা, বড্ড খিদে লাগছে গো। পেটের ভেতরটা কেমন জানি করছে।”
তৃষ্ণা কাজল দেওয়া থামিয়ে আড়চোখে একবার ফারহানের দিকে তাকাল। কপালে বিরক্তির ভাঁজ তুলে বলল,
“দুপুরে তো এক থালা ভাত খাইলা, এর মধ্যেই আবার খিদা কিসের? সারাক্ষণ খালি তোমার ক্ষিদাই লাগে? মানুষের পেটে বাচ্চা থাকলেও তো এত ঘন ঘন খায় না!”
ফারহান বিনীত স্বরে বলল,
“ডাক্তার হাই ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক দিছে তো, ওষুধগুলোর গরমে শরীর শুকিয়ে আসে আর খিদে পায়। একটু কিছু খাইতে দিলে ভালো হইতো।”
তৃষ্ণা এবার ঘুরে দাঁড়াল। কড়া গলায় বলল,
“এখন খেলে রাতে কী খাইবা শুনি? ঘরে তো আর চাল-ডালের পাহাড় নাই। আর এখন যদি খাইয়ে দিই, তবে রাতে আবার কে রাঁধবে? আমার তো আর ওসবের সময় নেই।”
ফারহান একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সময় নেই কেন? কোথাও যাইবা নাকি?”
তৃষ্ণা উত্তর না দিয়ে আবার আয়নায় মন দিল। আজ সে শাড়ি পরেনি, তার বদলে পরেছে একটা আঁটোসাটো আধুনিক থ্রিপিস। চুলগুলো পিঠের ওপর ছাড়া, কপালে একটা বড় লাল টিপ। ওড়নাটা দায়সারাভাবে গলার একপাশে ঝোলানো। তাকে দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে সে বিবাহিত একজন নারী ফারহান তীক্ষ্ণ চোখে তার সাজগোজ দেখে বলল,
”এত সাজগোজ করে কোথায় যাচ্ছ তুমি? শরীরটা আমার ভালা না, এই অবস্থায় আমারে একা রাইখা কোথায় যাবে?”
“ঘুরতে যাচ্ছি। কেন, যাওয়া নিষেধ নাকি?”
তৃষ্ণা লিপস্টিকটা ঠোঁটে বুলিয়ে নিল। ফারহানের ভেতরে এবার সন্দেহের বিষবাষ্প দানা বাঁধল। সে ক্রাচে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে করতে বলল,
”কিসের ঘুরাঘুরি? আর কার সাথেই বা যাও? এই সন্ধ্যায় সাজুগুজু করে বাইরে যাওয়ার কী দরকার?”
তৃষ্ণা এবার অগ্নিশর্মা হয়ে ফিরে তাকাল। তার গলার স্বর সপ্তমে চড়ল,
“খবরদার ফারহান! আমাকে একদম জেরা করতে আসবা না। তোমার মতো এক পঙ্গু লোকের সাথে যে আমি এখনো ঘরে আছি, এটাই তো তোমার ভাগ্য! এই পচা ঘরে সারাদিন বসে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তুমি তো এখন অচল, তোমার সাথে বসে থাকলে কি আমার পেট ভরবে না মন ভরবে?”
তৃষ্ণার প্রতিটি শব্দ যেন ফারহানের বুকে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। সে স্তব্ধ হয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তৃষ্ণা থামল না। সে হাতব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে কড়া স্বরে বলল,
“বেশি প্রশ্ন করবে না। মেজাজ খারাপ করলে কিন্তু একবারে চলে যাব, তখন এক গ্লাস পানি দেওয়ার মানুষও খুঁজে পাবে না। ঘরে বসে ওষুধ খাও আর ঘুমাও।”
তৃষ্ণা গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় দড়াম করে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে গেল, যার শব্দে ফারহান কেঁপে উঠল। ফারহান ফ্যালফ্যাল করে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। এই তৃষ্ণার জন্যই সে এতকিছু করেছে? বিছানার পাশে পড়ে থাকা সেই অ্যালুমিনিয়ামের ক্রাচ দুটো যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। ফারহান বুঝতে পারল, সে এক চরম ভুলের মাশুল দিচ্ছে, কিন্তু সেই মাশুল যে এত ভয়ানক হবে তা সে কল্পনাও করেনি। আজ সে পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, অথচ এক গ্লাস পানি দেওয়ার মতো কেউ নেই।
পায়ের প্লাস্টারে মোড়ানো অংশটা এখন টনটন করছে। ফারহান দাঁতে দাঁত চিপে সহ্য করার চেষ্টা করল। তার মনে হলো, বেলীর অভিশাপ বোধহয় তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। বিছানার পাশে রাখা সেই ক্রাচ দুটোর দিকে তাকিয়ে ফারহানের চোখে জল এল। শরীরের অক্ষমতা আর তৃষ্ণার এই চরম অবহেলা—ফারহানের সহ্যের সীমা আজ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, সে শুধু পঙ্গু হয়নি, সে আসলে এক বিশাল ভুল গর্তে পা দিয়েছে যেখান থেকে ফেরার পথ এখন অনেক ঝাপসা।
তৃষ্ণা চলে যাওয়ার আধঘণ্টা পরেই দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ফারহান ভাবল তৃষ্ণা কি কিছু ফেলে গেল? কিন্তু না, দরজা খুলতেই দেখল এক ডাকপিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি হলদে খাম এবং সাথে একটি লাল রঙের কার্ড।
পিয়ন কর্কশ গলায় বলল,
“ফারহান সাহেব কে? আপনার একটা রেজিস্ট্রি করা চিঠি আছে। এই লাল কার্ডটায় একটা সই করে দেন।”
ফারহান অবাক হয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে সই করে দিল। পিয়ন চলে যাওয়ার পর সে খামটা নিয়ে বিছানায় ফিরে এল। খামটা খুলতেই তার চোখের সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা— ‘লিগ্যাল নোটিশ’ মানে ‘আইনি নোটিশ নিচে একজন আইনজীবীর সিল ও স্বাক্ষর। ফারহানের বুকটা ধক করে উঠল। নোটিশের ভাষাগুল পড়তে লাগলো,
“আমার মক্কেল মোসাম্মৎ বেলী রহমানের পক্ষ হইতে আপনাকে জানানো যাইতেছে যে, আপনি তাহাকে বিনা কারণে এবং দেনমোহর পরিশোধ ব্যতিরেকেই লোকসমক্ষে তালাক প্রদান করিয়াছেন। অত্র নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে দেনমোহরের ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা এবংআপনার কন্যা ফিওনার মাসিক ভরণপোষণ বাবদ নির্দিষ্ট অংকের টাকা পরিশোধ করিতে হইবে। অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করা হইবে, যাহার যাবতীয় খরচ ও দায়ভার আপনার ওপর বর্তাইবে।”
ফারহান ধপাস করে সোফায় বসে পড়ল। তার মাথার ভেতরটা যেন ঝিমঝিম করছে। এই নোটিশের অর্থ হলো—বেলীর পেছনে এখন রাষ্ট্র এবং আইন দাঁড়িয়ে আছে। নোটিশের নিচে ছোট করে লেখা কিছু ধারা ফারহানকে আরও আতঙ্কিত করে তুলল। সেখানে বলা হয়েছে, দেনমোহর হলো স্ত্রীর একটি আইনি ঋণ। এই ঋণ শোধ না করলে আদালত কেবল তার স্থাবর সম্পত্তি (যেমন এই ঘর বা আসবাবপত্র) ক্রোকই করবে না, বরং পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাকে কারাদণ্ডও ভোগ করতে হতে পারে।
ফারহান বিড়বিড় করে বলল,
”দুই লাখ টাকা! আমার পকেটে এখন ওষুধের পাঁচটক টাকাও নাই, আমি দুই লাখ টাকা কই পাব? আর জেল? আমি এই পঙ্গু শরীর নিয়ে জেল খাটব ও আল্লাহ্!”
তৃষ্ণা যখন ফিরে আসবে, তখন এই নোটিশ দেখলে কী লঙ্কাকাণ্ডটাই না বাঁধবে! ফারহান বুঝতে পারল, সে এখন আক্ষরিক অর্থেই এক চোরাবালিতে আটকে গেছে। একদিকে পঙ্গু শরীর, অন্যদিকে তৃষ্ণার অবহেলা, আর এখন এই আইনি খাঁড়া। বেলী তাকে ক্ষমা করেনি, সে তার অধিকার আদায়ের লড়াই শুরু করে দিয়েছে।
ফারহানের মনে হলো, কাগজের টুকরোটি আসলে তার কৃতকর্মের এক মরণকামড়। সে ফ্যালফ্যাল করে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ রাতটা তার জন্য বড় দীর্ঘ হতে চলেছে।
#চলবে
