#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৬)
#মীরাতুল_নিহা
তৃষ্ণা আজকাল বড্ড বদলে যাচ্ছে। সেই শুরুর দিকের মোহমাখা নমনীয়তা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। এখন তার কথায় কথায় মেজাজ, আকাশচুম্বী সব আবদার। ফারহান খাটের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল কীভাবে সামলাবে সে এই সংসার?
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল তৃষ্ণা। ফারহান পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা সেজেছে চমৎকার করে। কপালে একটা বড় লাল টিপ, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, আর রেশমি চুলগুলো কাঁধের ওপর সুন্দর করে আঁচড়ানো। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় তৃষ্ণার ফর্সা মুখটা যেন জ্বলজ্বল করছে। ফারহানের সব রাগ, সব ক্লান্তি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। এই একটা রূপই তাকে বারবার গলে যেতে বাধ্য করে। সব কষ্ট ভুলে ফারহান বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইল।
তৃষ্ণা এসে খাটের এক কোণে বসল। ফারহান উঠে গিয়ে ওর ঠিক পাশে ঘেঁষে বসল। তার মনটা তখন এক অদ্ভুত মমতায় ভরে আছে। সে চাইল তৃষ্ণাকে একটু নিবিড়ভাবে ছুঁতে, একটু আদর করতে। ফারহান যেই হাত বাড়িয়ে তৃষ্ণার কাঁধে আলতো করে স্পর্শ করল, অমনি তৃষ্ণা ঝটকা দিয়ে সরে বসল।
তৃষ্ণা মুখ ঝামটা দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“রাখো তো! এখন কি ওসবের সময় নাকি? যত্তসব! রাতের কাজ রাতেই ভালো হয়। এখন আমার মেজাজ ঠিক নাই।”
ফারহান কপাল কুঁচকে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তৃষ্ণা কী বোঝাতে চেয়েছে তা সে পরিষ্কার বুঝেছে। কিন্তু ফারহানের খারাপ লাগল অন্য জায়গায়। সে তো কেবল শরীরি কামনায় তাকে ছুঁতে চায়নি তার ভেতরের হাহাকার আর মানসিক অস্থিরতা একটু মমতাময় স্পর্শে প্রশমিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তৃষ্ণা সেখানে কেবল যৌনতাই খুঁজে পেল। মনের মিলের চেয়ে তৃষ্ণার কাছে শারীরিক চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটাই যেন মুখ্য।
ফারহান কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তৃষ্ণার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তৃষ্ণার চোখেমুখে এক লহমার জন্য ভয়ের আভা খেলে গেল, পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। সে ফারহানের দিকে একবার সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত খাট থেকে উঠে পড়ল।
“আইতাছি।”
তৃষ্ণা প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল কথা বলতে।
ফারহান একা ঘরে বসে রইল। তার মনের ভেতর খচখচ করতে লাগল কার ফোন এল যে তাকে আড়াল করে কথা বলতে হবে?
প্রায় আধা ঘণ্টা পর তৃষ্ণা ঘরে ফিরল। তার চোখেমুখে একটা চাপা উত্তেজনা, যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলোচনা সেরে এসেছে। ঘরে ঢুকেই সে কোনো কথা না বলে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ফারহান এতক্ষণ গুম মেরে বসে ছিল। তৃষ্ণার উপস্থিতি টের পেয়ে সে এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আলতো করে তৃষ্ণার ঘাড়ে আর মুখে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলে? কে কল দিছিল?”
তৃষ্ণা নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
“আমার এক বন্ধু। কূান?”
ফারহানের বুকে খচ করে বিঁধল কথাটা। সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“বন্ধুর কল ধরতে আমার সামনে থেকে উঠে বাইরে যেতে হয় নাকি? আমার সামনে কথা কইলে কী হতো?”
তৃষ্ণা এবার বিরক্তির সাথে পাশ ফিরল।
“আরে বাবা, মানুষের তো একটা ব্যক্তিগত বিষয় থাকে। সবারই তো প্রাইভেসি আছে, তাই না?”
ফারহান আকাশ থেকে পড়ল। সে অবাক হয়ে বলল,
“স্বামী-স্ত্রীর ভেতর আবার কিসের প্রাইভেসি তৃষ্ণা? আমরা তো এখন একজন আরেকজনের অংশ। আমাদের মধ্যে তো লুকোচুরির কিছু থাকার কথা না।”
তৃষ্ণা তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এখন রাগের ঝলকানি। কর্কশ গলায় বলল,
“থাকে! সবকিছুরই একটা সীমা থাকে। আমাকে এই দমবন্ধ করা শাসনের মধ্যে রাখতে চাইও না।”
ফারহান বড় অসহায় বোধ করতে লাগল। সে কাতর গলায় বলল,
“তৃষ্ণা, তুমি দিন দিন বড্ড বদলে যাইতাছো। তুমি কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না?”
তৃষ্ণা এবার হাত নেড়ে রাগ দেখিয়ে বলল,
“ভালোবাসি না মানে? ভালোবাসি দেখেই তো তোমার মতো বিবাহিত আর এক বাচ্চার বাপকে আমার মতো সুন্দরী একটা মেয়ে এমনি এমনি এসে বিয়ে করছে?”
তৃষ্ণার এই কথাগুলো ফারহানের বুকে তীরের মতো বিঁধল। তাকে উদ্ধার করার বা তাকে গ্রহণ করার যে ‘অহংকার’ তৃষ্ণা দেখাল, তা ফারহানকে এক বিন্দু আনন্দ দিল না বরং নিজের আত্মসম্মানবোধে চরম আঘাত লাগল। সে
ফারহান যখন কড়া কোনো জবাব দিতে যাবে, ঠিক তখনই আবারও তৃষ্ণার ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। ঘরের নিস্তব্ধতায় রিংটোনের শব্দটা যেন ফারহানের সন্দেহের আগুনে ঘি ঢেলে দিল। তৃষ্ণা আবারও অস্থির হয়ে ফোনের দিকে হাত বাড়াল।
আয়েশা তার হাড়ভাঙা খাটুনির জমানো টাকা থেকে আজ অনেকগুলো জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। বসার জন্য প্লাস্টিকের ছোট দুটো পিঁড়ি হতে সিলভরের কয়েকটা গামলা আর রান্নার কিছু মশলাপাতি। এসেই সে দেরি করেনি, নতুন কেনা মাটির চুলাটায় আগুন ধরিয়ে ঝটপট ভাত চড়িয়ে দিয়েছে।
বেলী তখন ঘরের এক কোণে বসে পরম মমতায় ফিওনাকে দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত। তৃষ্ণার্ত শিশুটি পেট ভরে দুধ খেয়ে মায়ের কোলেই শান্তিতে চোখ বুজেছে। বেলী আলতো করে মেয়েকে চাদরে শুইয়ে দিয়ে আয়েশার পাশে এসে বসল। আয়েশা ভাতের হাঁড়ি থেকে এক থালা ধোঁয়া ওঠা ভাত আর দুটো বড় সাইজের আলু সেদ্ধ বেলীর সামনে এগিয়ে দিল।
মাছের ঝোল বা মাংসের বিলাসিতা তাদের জন্য এখন স্বপ্ন। বেলী এক চিমটি লবণ দিয়ে গরম আলু দুটোকে ভালো করে চটকে নিল। এখনো ভালো কোনো তরকারির ব্যবস্থা হয়ে ওঠেনি, তবুও এই পেট ভরে খাওয়াটাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
খেতে খেতেই বেলীর নজর গেল জানালার বাইরের রোদের দিকে। রোদের তেজ কমে এসেছ। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল বেলা তিনটে বেজে গেছে। বেলী ভাবল, এখন আর আলসেমি করে শুয়ে থাকলে চলবে না। মাহিকে পড়াতে যেতে হবে, আবার সন্ধ্যায় ফিরে চুড়ির কাজে হাত দিতে হবে।
সে আঁচলে হাত মুছে ফিওনার কপালে একটা চুমু খেয়ে আয়েশাকে বলল,
“আয়েশা, মেয়েটার দিকে খেয়াল রাখিস। আমি বেরোচ্ছি।”
আয়েশা খাবার চিবোতে চিবোতে বলল,
“সাবধানে যাস বেলী। ফিওনার চিন্তা করিস না, ও ঘুমাইতাছে।”
বেলী তার সাধারণ সুতির ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
বেলী যখন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল, দেখল উঠোনে বসে কুলসুম বেগম লাল টুকটুকে ঠোঁটে পান চিবুচ্ছেন। তার চারপাশ ঘিরে পাড়ার আরও কয়েকজন নারী বসে গল্পের আসর জমিয়েছেন। বেলীকে দেখেই কুলসুম বেগমের ভ্রু কুঁচকে গেল, পানের পিচ ফেলে তিনি তেরছা নজরে তাকালেন।
বেলী বিনীতভাবে সালাম দিয়ে বলল,
“খালা, মাহিকে পড়াতে এলাম। আদনান বলেছিল ওকে পড়াতে হবে।”
কুলসুম বেগম পানের বাটাটা সজোরে বন্ধ করে কর্কশ গলায় বললেন,
“মাহিকে আর পড়ানো লাগত না। উটকো মাইয়্যালোক দিয়া পড়াইয়া আমার মাইয়ারে নষ্ট করার দরকার নাই।”
পাশ থেকে এক প্রতিবেশী নারী মুখ টিপে হেসে মশকরা করে উঠলেন,
“ঠিকই তো কইছেন বুবু। স্বামী-খেদানো মাইয়া ঘরে আইলে কুলক্ষণ লাগে। ওর নিজের কপালই পোড়া, ও আবার কারে জ্ঞান দিব?”
বেলী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা অপমানে ছিঁড়ে যাচ্ছে, চোখ ফেটে জল আসতে চাইছে। সে আর কথা না বাড়িয়ে ভারাক্রান্ত মনে চলে যাওয়ার জন্য যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে এল আদনান। দুপুরে খাওয়ার পর সে সবে একটু ঘুমিয়েছিল, বাইরের চিৎকার তর্কাতর্কিতে তার ঘুমটা ভেঙে গেছে।
পরিস্থিতি বুঝতে আদনানের এক মুহূর্তও দেরি হলো না। সে কড়া গলায় ডাক দিল,
“বেলী ভাবী! দাঁড়ান, কোথায় যাচ্ছেন?”
মায়ের দিকে তাকিয়ে আদনান বেশ রুক্ষ স্বরেই বলল,
“মা, তুমি কি শুরু করলা? মাহিকে কে পড়াবে না পড়াবে সেইটা আমি ঠিক করব। পড়াশোনার খরচ আমি দেই, সিদ্ধান্তও আমার। মাহিকে উনিই পড়াবে।”
কুলসুম বেগম ফেটে পড়লেন, “আদনান! তুই আমার মুখের ওপর কথা কস? এই বেলীর লাইগা?”
আদনান আর কোনো কথা বাড়াল না। সে কঠিন স্বরে বলল,
“টাকা আমি দেব, মা। কথা এখানেই শেষ।”
ছেলের মুখের ওপর আর কথা বলার সাহস পেলেন না কুলসুম বেগম। আদনান দমে যাওয়ার পাত্র নয় তা তিনি জানেন।
আদনান বেলীর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আপনি ভেতরে গিয়ে বসেন। মাহি! এই মাহি, বই খাতা নিয়ে আয়।”
বেলী মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকল। পেছনে তখনো প্রতিবেশীদের ফিসফাস আর ঠেস মারা কথা কানে আসছিল। একজন তো বলেই ফেলল,
“আয়েশাটা দো আদনানের গলায় ঝুলতে পারে নাই, এই বেলী দেখি ঝুলে যাইব যাইব ভাব!”
কথাগুলো বেলীর কানে তীরের মতো বিঁধলেও সে কোনো শব্দ করল না। জীবনের চরমতম অপমানগুলো সে এখন হজম করতে শিখে গেছে। তার এখন লক্ষ্য একটাই—যেকোনো মূল্যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। সে মাহির পড়ার টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। মাহি বই খুললেও সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
#চলবে…
#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৭)
#মীরাতুল_নিহা
আদনানদের বাসা থেকে ফেরার পর বেলী নিজেকে আরও বেশি কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। আয়েশার ফোনের ভাঙা স্ক্রিনে অনেকক্ষণ সময় ব্যয় করে সে শেষমেশ ‘বেলী’স ক্রিয়েশন’ নামে একটা ফেসবুক পেজ খুলল। ল্যাভেন্ডার আর নীল রঙের সেই ভেলভেট চুড়িগুলো, যা সে পরম যত্নে বানিয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটা ছবি জানালার আলোয় তুলে পোস্ট করল। সাথে লিখল মনের মাধুরী মেশানো কিছু কথা। কিন্তু সময় যেন কাটতেই চায় না। এক দিন গেল, দুই দিন গেল—পেজে লাইক বা কমেন্ট তো দূরের কথা, একটা মেসেজও এল না। বেলী বারবার ফোনটা হাতে নেয়, রিফ্রেশ করে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। তার সাজানো স্বপ্নগুলো যেন ওই নিস্প্রাণ স্ক্রিনের ভেতর আটকে গেছে। বেলী ভীষণ হতাশ হয়ে পড়ল।
আয়েশা বেলীর মুখটা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বেলী, আমি আগেই কইছিলাম না? এইগুলা আমাগো মতন মানুষের কাজ না। অনলাইনে মানুষ বড় বড় পেজ দেইখা জিনিস কেনে। আমাদের এই সব কেউ দেখব না। থাক বাদ দে, কাল থেইকা আমার লগে অন্য কোনো কাজে চল। অন্তত দুবেলা ভাত জুটব।”
বেলী কোনো উত্তর দিল না। সে ভাঙা ফোনটা হাতে নিয়ে ঝিম মেরে বসে রইল। হুট করেই স্ক্রল করতে করতে তার চোখে পড়ল একটা ভিডিও যেখানে দেখানো হচ্ছে কীভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI (এআই) ব্যবহার করে সাধারণ মানের জিনিসকেও অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। বেলীর ধধারে পড়া মস্তিস্কে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।
সে দেখল, কিছু এআই টুল ব্যবহার করে ঝাপসা বা ঘোলাটে ছবিকেও ঝকঝকে করা সম্ভব এবং ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে চমৎকার স্টুডিও লাইটিং বা শৌখিন পরিবেশ যোগ করা যায়। বেলীর হাতে থাকা ছবিগুলো ছিল ঘোলা, অন্ধকার ঘরের পটভূমিতে তোলা, যা দেখে কেউ আকৃষ্ট হওয়ার কথা নয়।
বেলী সোজা হয়ে বসল। সে ভাবল,
“আমার হাতের কাজ তো খারাপ না বল? শুধু উপস্থাপনাই তো মানুষকে টানছে না! তবে কেন আমি শেষ চেষ্টা করব না?”
সে তৎক্ষণাৎ গুগলে সার্চ করতে শুরু করল। তার ওই সাধারণ ঘোলাটে ছবিটা একটা এআই এডিটর অ্যাপে আপলোড দিল। কয়েক মুহূর্ত প্রসেসিং হওয়ার পর স্ক্রিনে যা ফুটে উঠল, তা দেখে বেলীর চোখ ছানাবড়া! সেই মলিন প্লাস্টিকের ওপর সুতা মোড়ানো চুড়িগুলো এখন একটা মার্বেল পাথরের ওপর রাখা, চারপাশ দিয়ে বেলী ফুলের পাঁপড়ি ছড়ানো আর ওপর থেকে পড়ছে স্নিগ্ধ সোনালী আলো। এ যেন কোনো নামী ব্রান্ডের বিজ্ঞাপন! বেলী উত্তেজনায় আয়েশাকে ডেকে বলল, “আয়েশা, দেখ! এইটা কি সেই ছবি যেটা আমি তুলছিলাম?”
আয়েশা চোখ কচলে তাকিয়ে বলল,
“এইটা তো কি সুন্দর হইছে রে! যেন জাদু করেছে কেউ”
বেলী হাসল। তার হারানো আত্মবিশ্বাস এক নিমিষেই ফিরে এল। সে নতুন করে সেই এআই দিয়ে এডিট করা ছবিগুলো পেজে পোস্ট করল। মনে মনে বলল,
“বাঁচার জন্য মানুষ কত কিছু করে, আমিও না হয় আধুনিক যুগের এই জাদুটাই শিখলাম!”
এআই দিয়ে ছবিগুলো ঠিকঠাক করে পেজে আপলোড দেওয়ার পর বেলীর মনে এক চিলতে স্বস্তি ফিরল। তবে এখন আর বসে থাকার সময় নেই, রাইসাকে পড়ানোর সময় হয়ে গেছে। রাইসার বাসাটা একটু দূরে হলেও বেলী হেঁটেই যায়। কলিং বেল বাজাতেই রাইসা এসে দরজা খুলে দিল। আজ রাইসাকে পড়ানোর এক মাস পূর্ণ হলো। রাইসা মেয়েটা বড্ড শান্ত আর মনোযোগী। বেলী যা বোঝায়, ও খুব সহজেই সেটা ধরে নিতে পারে। রাইসাকে পড়াতে বেলীর একটুও কষ্ট হয় না, বরং মনের ভেতর একটা ভালো লাগা কাজ করে। পড়া শেষ করে বেলী যখন ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন রাইসার মা হাসিমুখে ড্রয়িংরুমে এগিয়ে এলেন।
তিনি বললেন,
“বেলী, আজ তো মাস শেষ হলো। এই নাও তোমার বেতন।ও
বেলী নিচু হয়ে টাকাটা নিল। তাদের বেতন ঠিক হয়েছিল দেড় হাজার টাকা। কিন্তু টাকাটা হাতে নিয়ে গুনে দেখল সেখানে দুই হাজার টাকা আছে। বেলী কিছুটা অবাক হয়ে রাইসার মায়ের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বলল,
“খালা, আমাদের তো দেড় হাজার কথা ছিল। এখানে দুই হাজার টাকা, ভুল করে হয়তো পাঁচশ টাকা বেশি চলে এসেছে।”
রাইসার মা মুচকি হাসলেন। তিনি পরম স্নেহে বেলীর মাথায় হাত রেখে বললেন,
“না বেলী, ভুল হয়নি। আমি আসলে দেখতে চেয়েছিলাম তুমি কিছু বলো কি না। তুমি না বললেও আমি নিজেই জানাতাম। ওই পাঁচশ টাকা তোমার বোনাস। রাইসা এবার পড়াশোনা ভালো করে করছে। আর ওর হাতের লেখাও অনেক সুন্দর হয়েছে। সব তোমার চেষ্টার ফল। এইটুকু উপহার তোমার প্রাপ্য।”
বেলীর বুকটা কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। এই অভাবের দিনে বাড়তি পাঁচশ টাকা তার কাছে অনেক বড় পাওনা। সে যখন সালাম দিয়ে বিদায় নিতে যাবে, তখন রাইসার মা আবার বললেন,
“শোনো বেলী, আরেকটা কথা। আমার ছোট ছেলে রিয়াদ, ও এবার টুতে পড়ে। ওকেও কি তুমি পড়াতে পারবে? রিয়াদ একটু চঞ্চল, কিন্তু আমি চাই তুমিই ওকে সামলাও। দু ভাই বোন এক সাথেই থাকুক।”
খুশিতে বেলীর চোখ চিকচিক করে উঠলো। রিয়াদকেও পড়ানো মানে আয়ের নতুন একটা উৎস তৈরি হওয়া। সে একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। রাইসার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন বেলী রাস্তায় বেরোল, তখন তার আকাশের মেঘগুলো যেন কাটতে শুরু করেছে। একদিকে এআই দিয়ে সাজানো তার অনলাইন ব্যবসার নতুন আশা, আর অন্যদিকে টিউশনির এই বাড়তি সুযোগ বেলী বুঝতে পারছে, মেধা আর পরিশ্রম বৃথা যায় না। সে দ্রুত পায়ে বস্তির দিকে হাঁটা ধরল, এখন তার মনে শুধু ফিওনার হাসিমুখটা ভাসছে। বেলীর জীবনটা এখন ফিওনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। আয়েশা কাজে থাকলে ফিওনাকে কোলেই নিয়ে সে পড়াতে যায়। কখনো এক হাতে বই ধরে অন্য হাতে মেয়েকে সামলায়, আবার কখনো রাইসা বা মাহির পড়ার টেবিলের পাশে ফিওনাকে বসিয়ে রেখে পড়া বুঝিয়ে দেয়। আজ পড়ানো শেষ করে ফিওনাকে নিয়েই সে ঘরে ফিরল।
ঘরে ফিরে ফিওনাকে পেট ভরে দুধ খাইয়ে মেঝেতে একটা পুরনো চাদর বিছিয়ে কিছু খেলনা দিয়ে বসিয়ে দিল বেলী। ফিওনার বয়স এখন সাত মাসে পড়বে। শরীরটা বেশ ভারী হয়েছে, এখন সে উপুড় হয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার জোর চেষ্টা করছে। একটা রঙিন প্লাস্টিকের বল ধরতে গিয়ে ফিওনা টাল সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। বেলী ভয় পেয়ে এগিয়ে যেতেই দেখল, ব্যথা পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বাচ্চার খিলখিল হাসিতে ঘর ভরে উঠল।
বেলী অপলক চোখে সেই দৃশ্য দেখল। তার বুকটা এক পরম শান্তিতে জুড়িয়ে গেল। এই হাসির জন্যই তো সে আজ আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটছে। ফিওনা তখন তার কচি দু হাত বাড়িয়ে মায়ের দিকে তাকাল, যেন বলছে—‘আমাকে বুকে নাও’। বেলী আর দেরি করল না, পরম আদরে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে তার কপালে দীর্ঘ এক চুমু খেল। ফিওনার শরীরের সেই মিষ্টি গন্ধে বেলীর সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। রান্নাবান্নার টুকটাক কাজ আর ঘর গোছানো শেষ করে বেলী আয়েশার ফোনটা হাতে নিল। আজ আয়েশা ভুল করে ফোনটা ঘরেই রেখে গেছে। বেলীর বুকটা ঢিপ ঢিপ করছিল সেই এআই দিয়ে বানানো ছবিগুলোর কী অবস্থা তা দেখার জন্য। কাঁপাকাঁপা আঙুলে ফেসবুক পেজটা খুলতেই বেলীর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!
ফোনের স্ক্রিন জুড়ে অজস্র নোটিফিকেশন। তার সেই ছবিগুলোতে অনেক রিয়েক্ট আর সুন্দর সুন্দর কমেন্ট এসেছে। কেউ লিখেছে ‘অসাধারণ কাজ’, কেউ বা জানতে চেয়েছে দাম। স্ক্রল করতে করতে বেলী দেখল ইনবক্সে একটা মেসেজ একজন আপু দুই জোড়া ল্যাভেন্ডার রঙের ভেলভেট চুড়ি অর্ডার করেছেন!
খুশিতে বেলী প্রায় চিৎকার করে উঠতে চাইল। তার প্রথম অর্ডার! তার নিজের হাতে তৈরি জিনিসের কদর কেউ বুঝেছে! আজ যেন সত্যিই আনন্দের দিন বেলীর। সব মিলিয়ে দিনটা যেন মেঘ কেটে যাওয়া রোদেলা দুপুরের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
বেলী ফিওনাকে জড়িয়ে ধরলো পরপর কটা চুমু খেল।
বস্তির মুখেই কয়েকটা ছোট ছোট টং দোকান। বেলী সেখানে গিয়ে কিছুটা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে সন্ধানী দৃষ্টি, সে আদনানকে খুঁজছে। মনের ভেতর এক অপরাধবোধ কাজ করছে। কতবার এই ছেলেটা নিজ থেকে কথা বলতে চেয়েছে আর বেলী? সে প্রতিবারই অবহেলা করেছে, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এমনকি রুক্ষ ব্যবহার করতেও ছাড়েনি। অথচ এই দুঃসময়ে আদনানই তার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দোকানের এক কোণে আদনানকে বন্ধুদের সাথে কথা বলতে দেখে বেলী একটু দূরে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। আদনান তাকে দেখামাত্রই বন্ধুদের থেকে সরে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে বরাবরের মতোই সেই উৎকণ্ঠা। যেন বেলী তার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু।
#চলবে?
