#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৪)
#মীরাতুল_নিহা
হোটেল থেকে দু’দিন কিনে খাবার পর আজ ফারহানের পকেট গড়ের মাঠ। পকেটে হাত দিয়ে দেখল গুটিকয়েক খুচরো পয়সা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে একটা ফোনের দোকানে টুকটাক কাজ করে, মাস শেষে যা বেতন পায় তার সিংহভাগই সে তৃষ্ণার শখ মেটাতে আর প্রসাধন কিনতে ব্যয় করেছে। আজ উপায় না পেয়ে নিরুপায় হয়ে ফারহানকে ঘরে চাল-ডাল আর রুই মাছ নিয়ে বসতে হয়েছে। রান্না করা ছাড়া উপায় নেই। রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে, কিন্তু রাঁধুনি হিসেবে তৃষ্ণা যেন কোনো রাজ্যের মহারানী। সে নিজে খুন্তি নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু ফারহানকে আষ্টেপৃষ্ঠে খাটিয়ে মারছে।
“ওগো, পেঁয়াজটা কুচি করে দাও তো! মাছের মশলাটা কই রাখছো? হলুদ দাও, মরিচ দাও!”
তৃষ্ণার প্রতিটি কথা যেন একেকটি হুকুম। রুই মাছের ঝোল রান্না করতে গিয়ে সে ফারহানকে এটা-ওটা এগিয়ে দিতে বলে এমনভাবে অর্ডার করছে, যেন ফারহান তার কেনা গোলাম। ফারহান কোনো প্রতিবাদ করছে না, মুখ বুজে সব করে দিচ্ছে। কারণ সে জানে, হোটেলে গিয়ে খাওয়ার মতো এক আনা পয়সাও এখন তার কাছে নেই। আর হোটেলের সেই পানসে স্বাদের চেয়ে ঘরের দুমুঠো গরম ভাত এখন তার কাছে অনেক দামী। মাছটা কড়াইতে দিয়ে তৃষ্ণা হঠাৎ কপাল কুঁচকে আলসেমি মাখা গলায় বলল,
“ভাতটা চড়িয়ে দিয়েছি, বলক আসলে একটু দেখে নামিয়ে নিও তো। আমি যাই, চুলটা বড্ড এলোমেলো হয়ে আছে, গরম লাগছে গোসলও করতে হবে। একটু আঁচড়ে আসি।”
তৃষ্ণা আয়নার সামনে গিয়ে বসল আয়েশ করে। ফারহান আগুনের আঁচের পাশে বসে রইল। তার মনটা আজ কু ডাকছে। ইদানীং সে লক্ষ্য করছে, একটা অচেনা লোক তাদের ঘরের অলিগলির দিকে মাঝেমধ্যেই উঁকিঝুঁকি মারে। লোকটার চাউনি আর ঘোরাঘুরি খুব একটা সুবিধের মনে হচ্ছে না ফারহানের কাছে। সন্দেহ দানা বাঁধলেও সে কিছু বলছে না, কারণ ঘরের ভেতরের অশান্তি সামলাতেই সে এখন হিমশিম খাচ্ছে। চুলায় ভাতের হাঁড়ি থেকে ধোঁয়া উঠছে। ফারহানের মনে হচ্ছে তার জীবনটাও যেন ওই ধোঁয়ার মতোই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
ফারহান থালায় ভাত বেড়ে প্রথম লোকমা মুখে দিতেই মুখটা কুঁচকে গেল তার। রুই মাছের ঝোলটা দেখতে যতটা লোভনীয় হয়েছিল, খেতে ততটাই বিস্বাদ। লবণের আধিক্যে মুখে দেওয়া দায়। ফারহান ভাতের থালা থেকে মুখ তুলে তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“তৃষ্ণা, মাছের ঝোলটায় অনেক লবণ হইছে। মুখে দেওয়া যাচ্ছে না তো।”
কথাটা শোনামাত্রই তৃষ্ণা যেন বারুদে আগুন লেগে ফেটে পড়ল। সে তেড়েফুঁড়ে এল রান্নাঘরের দিকে। কোমরে হাত দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“লবণ বেশি হইছে তো কী হইছে? ভাতে লবন না নিয়ে খাইলেই তো হয়।” আমি কি কোনোদিন রান্না করছি? বাবার বাড়িতে তো এক গ্লাস পানি ঢেলে খাইনাই। তোমার জন্য যে এই আগুনের পাশে বসে মাছ ভাজলাম, এই তো বেশি! খাইলে খাও, না খাইলে উইঠা যাও।”
ফারহান স্তব্ধ হয়ে তৃষ্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতে যে মেয়েটা সোহাগী গলায় তাকে পাগল করে দিচ্ছিল, আজ তার এই রুদ্রমূর্তি ফারহানের চেনা জগতের বাইরে। সে আর কোনো প্রতিবাদ করল না। চুপচাপ ভাতের সাথে লবণাক্ত ঝোল মেখেই মুখে তুলতে লাগল। খেতে খেতে ফারহানের অবচেতন মনটা হঠাৎ অতীতে ডুব দিল। আজ বড্ড বেশি বেলীর কথা মনে পড়ছে তার। বেলীও তো তার বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে ছিল। ভালো রেজাল্ট করা, মার্জিত স্বাভাবের মেয়েটা বিয়ের পর এই জরাজীর্ণ বস্তিতে এসেছিল। অথচ কোনোদিন একটা টু শব্দ করেনি সে। ফারহানের সামান্য আয়ের সংসারে নিজেকে এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছিল যেন এই অভাবই তার আজন্ম সঙ্গী। ফারহান যা এনে দিত, বেলী তা দিয়েই হাসিমুখে অমৃত রান্না করত। বেলীর হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ ডাল-ভাতও ফারহানের কাছে পরম তৃপ্তির মনে হতো। ফারহানের গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে এল।
ফারহান নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করল। লবণের তেতো স্বাদ ছাপিয়ে বুকের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাসের নোনতা স্বাদ তাকে দহন করতে লাগল। সে বুঝতে পারছে, মোহ আর বাস্তবের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তৃষ্ণার এই চাকচিক্যমাখা রূপের আড়ালে যে এক ভয়ংকর কঠোরতা লুকিয়ে ছিল, তা সে আগে বুঝতে পারেনি। খাওয়া শেষ করে ফারহান হাত ধুতে ধুতে আবার সেই জানালার দিকে তাকাল। সেই রহস্যময় লোকটা কি এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে?
বাপের বাড়ির গলিটার মুখে আসতেই চেনা রাস্তা, চেনা দোকানদার—সবই এক আছে, শুধু বেলীর জগৎটা বদলে গেছে। গেটের কাছে পৌঁছাতেই বেলীর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। লোহার গেটটা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। শুধু গেট নয়, ভেতরের কাঠের দরজাটাতেও বিশাল এক তালা ঝুলছে। জানালার পাল্লাগুলো বন্ধ, যেন এক তপ্ত দুপুরে বাড়িটা প্রাণহীন হয়ে পড়ে আছে। বেলী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শৈশব-কৈশোরের এই বাড়িটা এমন নিস্তব্ধ কেন? ঠিক তখনই পাশের বাড়ির সালেহা খালা কলতলার কাজ সেরে ঘরে ফিরছিলেন। বেলীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি ওড়নার আড়ালে মুখ টিপে হাসলেন। তারপর এগিয়ে এসে গলার স্বর নিচু করে বললেন,
“আরে বেলী যে! তা বাপের বাড়ি আইলা বুঝি? কিন্তু আইসা তো লাভ হইলো না।”
বেলী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“খালা, আমার বাবা-মা কোথায়? ঘর তালা মারা কেন?”
সালেহা খালা এবার বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে শুরু করলেন,
“পাড়ায় তো কানাকানি আছিলই। সেই শোকে আর লজ্জায় তোমার বাবা তো কারো সামনে মুখ দেখাইতে পারতাছিল না। এই অপমানে কার্তিক মাসে রাতারাতি উনারা বাসা বদলাইয়া চইলা গেছে। কই গেছে তা কাউরে বইলা যায় নাই।”
বেলী যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার বাবা-মা তাকে কোনো আশ্রয় দেওয়া তো দূরে থাক, উল্টো ‘সমাজ আর লজ্জা’র ভয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন?
বেলীর চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। বাপের বাড়ির যে শেষ আশ্রয়টুকু সে ভেবেছিল, তা আজ এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
বেলী গেটের সামনে থেকে ধীর পায়ে সরে এল। তার ভেতরে এক তীব্র হাহাকার জেগে উঠল। না আছে স্বামীর ঘর, না আছে বাবার ঘর। এই বিশাল শহরে আজ তার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।
বাপের বাড়ির সেই বন্ধ গেট আর তালাবদ্ধ দরজার স্মৃতি নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে বেলী বাসায় ফিরল। তার প্রতিটি কদম যেন পাথরের চেয়েও ভারী।
রুমে ঢুকতেই বেলী দেখল, আয়েশা মেঝেতে বসে রঙিন কিছু জিনিসপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। ফিওনা তার পাশে বসে ছোট ছোট হাতে সেই জিনিসগুলো নিয়ে আপনমনে খেলছে। বেলী ব্যাগটা একপাশে রেখে ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এগুলো কী আয়েশা? কোত্থেকে আনলি?”
আয়েশা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে এক অন্যরকম বিস্ময়। সে বলল,
“ ফিওনা কান্নাকাটি করতাছিল তো, তাই ওরে নিয়া একটু মোড়ের দিকে গেছিলাম। ওখানে কলির সাথে দেখা। মেয়েটা মোবাইল টিপতেছিল। কথা বলতে বলতে দেখলাম ও অনলাইন থেকে নাকি হাতে বানানো কিছু কসমেটিক অর্ডার করব।”
বেলী কৌতূহল নিয়ে শুনতে লাগলো,
আয়েশা আবার বলতে শুরু করল,
“জানিস বেলী, এই এক জোড়া চুড়ির দাম নাকি চারশো টাকা! আমি তো শুনে অবাক। এই সামান্য চুড়ি এত দাম দিয়ে মানুষ কেনে? কলি বলল অনলাইনে নাকি এগুলোর খুব কদর। মেয়েরা নাকি শখ করে এইগুলা পরে।”
আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“জিনিসগুলা দেখতে বড্ড সুন্দর, আমারও পছন্দ হইছে। কিন্তু আমাগো মতো মানুষের এই চারশো টাকা দিয়া এক জোড়া চুড়ি কেনা তো অসম্ভব। এই টাকায় কয়বেলার চাল হয়, সেই চিন্তা আগে করতে হয়।”
আয়েশা উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে বেলীকে বলতে লাগল,
“জানিস বেলী, আমার খুব শখ হইতাছিল ওই চুড়িগুলা পরতে। কলিরে জিগাইলাম, এইগুলা কি খুব দামি জিনিসের? কলি হাসল। ও কইল নাহ্ আপা, জিনিসপাতির দাম খুব বেশি না, অল্পই দাম কিন্তু এইগুলা নিখুঁত কইরা বানাইতে অনেক পরিশ্রম আর অনেক সময় লাগে। সেই কারিগরিরই দাম এত।”
আয়েশার চোখ দুটো তখন জ্বলজ্বল করছিল। সে বেলীর হাত ধরে বলতে থাতলো,
“আমি ওরে জিগাইলাম, আমি যদি জিনিসপাতি কিনি তবে কি নিজে বানাইতে পারুম? কলি আমারে সাহস দিল। আজই ও আমারে কিছু জিনিস কিন্না দিছে। পাঁচশো টাকার সুতা, পুঁতি আর আঠা নিয়া আইছি। এমবিও কিনছি কদ্দুর! আপাতত মোবাইলের ভিডিও দেইখা দেইখা বানানোর চেষ্টা করতাছি।”
বেলী অবাক হয়ে আয়েশার দিকে তাকালো। তার মাথায় এমন বুদ্ধি এল কোত্থেকে? আয়েশা তখন হিসেব মিলাতে ব্যস্ত। সে আঙুল গুনে বলল,
“হিসেব কইরা দেখ বেলী, এক জোড়া চুড়ির দাম যদি চারশো টাকা হয়, তবে এই পাঁচশো টাকার জিনিস দিয়া কত জোড়া চুড়ি আরামসে বানানো যাবে। পাঁচ জোড়া চুড়িও যদি বানাইতে পারি কত লাভ! একবার ভাব তো, কত ভালো ব্যবসা এইটা! যারা করতাছে ভালোই করতাছে ক?”
বেলী খুব মনোযোগ দিয়ে আয়েশার কথাগুলো শুনছিল। তার শিক্ষিত মস্তিষ্ক দ্রুত লাভ-ক্ষতির অংকটা কষে নিল। সত্যিই তো! যে সার্টিফিকেটের জন্য সে হন্যে হয়ে ঘুরছে, সেই সার্টিফিকেট ছাড়াও তো বাঁচার পথ তৈরি করা সম্ভব। আয়েশা পাশে বসে ভিডিও দেখে একটা চুড়িতে রঙিন সুতা প্যাঁচানোর চেষ্টা করছে। ফিওনা ওর কোলের কাছে বসে অবাক হয়ে সেই রঙিন কাণ্ডকারখানা দেখছে।
সে আয়েশার হাত থেকে একটা রঙিন সুতার বান্ডিল আর একটা চুড়ি তুলে নিল। আয়েশা মোবাইলের ভিডিওটা আবার চালু করে বেলীকে দেখাল কীভাবে পুঁতিগুলো বসাতে হয়।
#চলবে?
#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৫)
#মীরাতুল_নিহা
আয়েশা আর বেলী গোল হয়ে বসেছে। বেলী অত্যন্ত নিপুণ হাতে একটা প্লাস্টিকের চুড়ির গায়ে সামান্য আঠা লাগিয়ে নিল। তারপর সিল্কের চকচকে সুতার এক প্রান্ত সেখানে চেপে ধরে খুব সাবধানে পেঁচাতে শুরু করল। প্রতিটি প্যাঁচ হতে হচ্ছে একদম গা ঘেঁষে, যেন ভেতরে প্লাস্টিকের কোনো অংশ দেখা না যায়। সুতাটা বেশি টাইট হলে ছিঁড়ে যাবে, আবার আলগা হলে ফিনিশিং নষ্ট হবে। বেলী তার মস্তিস্ক আর ধৈর্যকে এক করে পরম মমতায় কাজটা করছিল।
পুরো চুড়িটা সুতায় মোড়ানো শেষ হলে বেলী সেখান সোনালী রঙের সরু জরি আর ছোট ছোট পাথর দিয়ে নকশা করতে শুরু করল। আয়েশা একপাশে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিল। বেলী যখন শেষ পাথরটা বসিয়ে চুড়িটা আলোর সামনে ধরল, আয়েশা বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল,
“আরে! আমি কলির হাতে যে চুড়ি দেখছিলাম, তোর বানানো এইটা তো তার চাইতেও হাজার গুণ সুন্দর হইছে!”
বেলী ম্লান হাসল। উত্তর না দিয়ে সে ফোনের ভিডিওটা আবার চালু করল। ইউটিউবে একটা নকশা দেখে তার চোখ আটকে গেছে। সে এবার আরেকটা চুড়িতে ভিন্ন রঙের সুতা আর কুন্দনের কাজ শুরু করল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে বসে থেকে কাজ করতে করতে বেলীর ঘাড় আর শিরদাঁড়ায় একটা তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে লাগল। চোখ দুটোও ঝাপসা হয়ে আসছে।সে এক পর্যায়ে হাতের কাজটা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল। ঘাড়টা দুই দিকে ঘুরিয়ে মটমট শব্দ করতেই সে বলে উঠল,
“উফ! সত্যিই অনেক পরিশ্রমের কাজ রে আয়েশা। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় শুধু সুতা পেঁচানো, কিন্তু এই মনোযোগ আর ধৈর্য ধরে বসে থাকাটা যে কতটা কষ্টের, তা নিজে না করলে বোঝা যায় না।”
আয়েশা বেলীর কাঁধে হাত রেখে আলতো করে টিপে দিতে দিতে বলল,
“কষ্ট তো হইবই। এত সুন্দর জিনিস কি আর অমনি হয়? আমি তো ভাইবা পাইতাছি না, তুই ফোনে ভিডিও দেইখা একবারেই এত সুন্দর কেমনে বানালি!”
বেলী মুচকি হাসল। এই অপমানের দিনে আয়েশার এই সামান্য প্রশংসা তার কাছে অনেক বড় পাওনা। আয়েশা চুড়িগুলো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
“কালই এইগুলা নিয়া কলির কাছে যামু। ওরে দেখামু । এইগুলা যদি বাজারে একবার নিতে পারি, দেখবি মানুষ কাড়াকাড়ি কইরা কিনব।”
বেলী মাথা নেড়ে ধীরস্থিরভাবে বলল,
“না আয়েশা, এগুলো ফুটপাতে বা সাধারণ বাজারে বিক্রি করে লাভ হবে না। ওখানে মানুষ জিনিসের কদর বুঝবে না, উল্টো দামাদামি করে পানির দরে কিনতে চাইবে। এত পরিশ্রমের দাম সেখানে পাওয়া যাবে না।”
আয়েশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কী করবি? ঘরে সাজায়া রাখবি নাকি?”
বেলী আয়েশার পুরনো ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনটা ফাটা, চার্জও থাকে না বেশিক্ষণ। সে অনেক কষ্টে ইন্টারনেট ঘেঁটে ফেসবুকের বিভিন্ন গয়নার গ্রুপ আর পেজগুলো আয়েশাকে দেখাতে লাগল। বেলী বলল,
“দেখ আয়েশা, অনলাইনে এই হাতে বানানো গয়নার কত চাহিদা! হাজার হাজার মানুষ ঘরে বসে এগুলো কিনছে। আমাদেরও অনলাইনেই সেল করতে হবে। তবেই পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পাব।”
আয়েশা ফোনটার দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে ফেলল। সে করুণ স্বরে বলল,
“কিন্তু বেলী, আমার এই ভাঙাচোরা ফোনের ক্যামেরা তো ঘোলা। এইটা দিয়ে ছবি তুললে কি আর সুন্দর হবে? মানুষ কি ঝাপসা ছবি দেখে এসব কিনবে?”
বেলী ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার আলোর কাছে গিয়ে কয়েকবার ছবি তোলার চেষ্টা করল। আসলেও ছবিগুলো খুব একটা পরিষ্কার আসছে না। চুড়ির আসল রূপ আর উজ্জ্বলতা যেন ওই লেন্সের ভেতর মরে যাচ্ছে। বেলী এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা হতাশ হলো। একটা ভালো ফোন বা ক্যামেরার অভাবে কি তবে তার এই চেষ্টাও বিফলে যাবে?
তবে পরক্ষণেই সে নিজেকে শক্ত করল। আয়েশার দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলল,
“ছবি ঘোলা আসছে ঠিকই, তাও আমি চেষ্টা করে দেখব। দেখি একটু আলোতে নিয়ে বা অন্য কোনোভাবে তোলা যায় কি না। হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না আয়েশা। বাঁচার জন্য মানুষকে কত কিছুই না করতে হয়! আজ ছবি ভালো আসছে না, কাল হয়তো আসবে। কিন্তু আমাদের চেষ্টা থামানো যাবে না।”
বেলী আবার একটা চুড়ি হাতে তুলে নিল। অন্ধকার এই ঘরে যেখানে একটা ভালো আয়না পর্যন্ত নেই, সেখানে সে তার স্বপ্নের রঙিন ছবি তোলার জন্য এক চিলতে আলোর খোঁজ করতে লাগল।
বস্তির এক কোণে নোনা ধরা দেয়াল আর স্যাঁতস্যাঁতে গলিটার শেষ মাথায় লোকটার ঘর। ঘরের সামনে আসতেই বেলীর বুকটা অজানা এক আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। আয়েশা ফিসফিস করে বলল,
“বেলী, একবার ভাইবা দেখ। মহাজন মতিন লোকটা কিন্তু সুবিধার না। সময়মতো টাকা না পাইলে মানুষরে বেইজ্জত করতে ওরে বাপেও আটকাইতে পারে না।”
বেলী শক্ত গলায় জবাব দিল,
“উপায় নাই রে আয়েশা। সুদে টাকা নেওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে আমার সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।”
তারা ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দেখল মতিন মহাজন একটা জরাজীর্ণ তক্তপোশের ওপর আয়েশ করে বসে আছে। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, গায়ের রঙ তামাটে আর চোখ দুটো সারাক্ষণ লাল হয়ে থাকে। কুচকুচে কালো দাঁত বের করে সে অনবরত পান চিবোচ্ছে, আর পানের পিক ফেলার জন্য পাশে রাখা পিতলের পিকদানিটা বারবার ব্যবহার করছে। লোকটা পানের সাথে প্রচুর জর্দা খায় বলে তার মেজাজ সবসময় চড়া থাকে। পুরো বস্তির মানুষ তাকে যমের মতো ভয় পায়। কারণ বিপদে পড়লে সে টাকা দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার ওপর যে হাড়কাঁপানো সুদ আদায় করে, তাতে অনেক মানুষের ঘরবাড়ি পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে।
মতিন মহাজন আড়চোখে বেলী আর আয়েশার দিকে তাকাল। তার হাতে একটা পুরনো খাতা, সেখানে কার কাছে কত পাওনা সব লেখা আছে। সে পানের পিক ফেলে গম্ভীর গলায় বলল,
“কী ব্যাপার? আয়েশা যে হুট কইরা লগে এই মাইয়া নিয়া আমার দরবারে আসলি?”
আয়েশা কাঁপা গলায় বলল,
“মহাজন ভাই, ওর কিছু টাকা লাগত।”
মতিন মহাজন এক দলা পান চিবোতে চিবোতে বেলীর আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখল। রাগী গলায় বলল,
“শোনো মাইয়া, আমার টাকার সুদ কিন্তু প্রতিদিন বাড়ে। সময়মতো সুদ না দিলে কিন্তু আমার রূপ অন্যরকম হইয়া যায়। তুমি শোধ কেমনে করবা? না আয়েশায় করব?”
বেলী এবার সামনে এগিয়ে এল। মতিন মহাজনের সামনে পাতা একটা নড়বড়ে টুলে বসে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আয়েশাকে দিয়ে আমার বিচার করবেন না মহাজন সাহেব। আমি টাকা নিচ্ছি আমার নিজের দায়িত্বে। সময়মতো আপনার টাকা আর সুদ—দুইই আপনি ফেরত পাবেন। আমি শুধু কাজের জন্য শুরুতে কিছু টাকা চাই।”
মতিন মহাজন বেলীর এই তেজ দেখে কিছুটা থমকে গেল। সে আবারও পানের ডিব্বাটা হাতে নিয়ে জর্দা মাখাতে মাখাতে এক কুৎসিত হাসি দিল।
মতিন মহাজনের সেই জবরদস্ত ঘরের গুমোট পরিবেশে বেলীর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। মহাজন একবার কুটিল চোখে তাকিয়ে বলেছিল,
“নিবা যখন একবারে দশ পনেরো হাজারই নাও, কাজে লাগবো।”
বেলীর মনেও একবার দ্বিধা জেগেছিল, পুঁজি বেশি হলে হয়তো কাজ দ্রুত বাড়বে। টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে পারবে কিন্তু পরক্ষণেই তার বিবেক বাধা দিল। আয়েশা পাশে দাঁড়িয়ে ইশারায় বলছিল যেন বেশি না নেয়। বেলী মনে মনে ভাবল, যদি ব্যবসা কোনোভাবে কাজ না করে, তবে এই পাহাড়সম সুদের বোঝা সে বইবে কী করে? আয়েশার নয় হাজার টাকা বেতন থেকে টেনেটুনে হয়তো পাঁচ হাজার টাকা শোধ করার সামর্থ্য থাকবে, কিন্তু পনেরো হাজার হলে তারা দুজনেই পথে বসবে।
সব ভেবে বেলী নরম গলায় বলল,
“না মহাজন সাহেব, আপাতত পাঁচ হাজারই দেন। এইটুকু দিয়েই শুরু করতে চাই।”
টাকাটা আঁচলে গিঁট দিয়ে বেলী আর আয়েশা প্রায় ছুটতে শুরু করল। ঘরে ফিওনাকে একা ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছে তারা। বস্তির এই পরিবেশে ছোট একটা বাচ্চাকে বেশিক্ষণ একা রাখা নিরাপদ নয়। গলির মোড় ঘুরতেই হন্তদন্ত হয়ে আসা আদনানের সাথে তাদের প্রায় ধাক্কা লাগার অবস্থা। আদনান তাদের এমন ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখেমুখে কৌতূহল। সে পথ আগলে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার আয়েশা? আপনারা এমন হন্তদন্ত হয়ে কই থেকে আসলেন? বস্তিতে আবার নতুন কোনো ঝামেলা হইছে নাকি?”
বেলী চুপ করে থাকলেও আয়েশা আর চেপে রাখতে পারল না। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আরে আদনান ভাই পেটের দায়ে বাঘের খাঁচায় ঢুকছিলাম। মতিন মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়া ফিরতাছি। বেলীর ব্যবসার পুঁজি লাগবে যে!”
আদনানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। মতিন মহাজনের নাম শুনেই তার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। সে বেলীর দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল,
“আপনারা মতিন মহাজনের কাছে গেলেন কেন? আমায় কেন একবার বললেন না?”
বেলী শান্ত দৃষ্টিতে আদনানের দিকে তাকাল। সে শুধু বলল,
“সবসময় তোমাদের ওপর বোঝা হয়ে থাকা যায় না আদনান। নিজের লড়াইটা এবার নিজেকেই শুরু করতে হবে, তা সে পথ যতই কঠিন হোক।”
আদনান কিছু বলতে চাইল, কিন্তু বেলীর সেই দৃঢ় চাহনির সামনে তার কথাগুলো আটকে গেল।
আদনান কপালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মতিন মহাজনের সুদের হার সে জানে। সে অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“পাঁচ হাজার টাকায় মাসে চারশো টাকা সুদ দিতে হইব? আপনারা কি বুঝেশুনে এই কাজ করছেন?”
আদনান ব্যাকুল হয়ে বলল,
“আমার কাছে কিছু জমানো টাকা আছে। আপনারা ওই মহাজনের টাকা এখনই ফেরত দিয়ে আসেন। আমার কাছ থেকে নেন, কোনো সুদ দিতে হবে না। যখন সুবিধা হয় তখন দিয়েন।”
বেলী এক মুহূর্তের জন্য থামল। আদনানের সরলতা আর তার প্রতি এই নিঃস্বার্থ টান তাকে স্পর্শ করল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। বেলী আদনানের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল,
“আদনান, তুমি আমাদের জন্য যা করেছো, তার কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু মানুষেরও তো আত্মসম্মান বলে কিছু থাকে। বারবার তোমার সাহায্য নিলে আমি নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব। আমার লড়াইটা আমাকেই লড়তে দাও।”
আদনান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে আবারও জেদ ধরল,
“আচ্ছা, যদি সাহায্য হিসেবে নিতে না চান, তবে ধার হিসেবে নেন। অন্তত ওই জঘন্য লোকটার হাত থেকে তো বাঁচবেন।”
বেলী এবার একটা শুকনো হাসি দিল। সে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“ধারই যখন নিব, তখন নিয়েছিই তো! এখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ কী? একবার যখন পা বাড়িয়েছি তখন পেছনের দিকে তাকালে আর সামনে আগানো যাবে না। মহাজনের টাকা শোধ করার জেদটাই হয়তো আমাকে দিয়ে বেশি কাজ করাবে।”
আদনান আর কিছু বলল না। সে একদৃষ্টে বেলীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার আর ভালো লাগা কাজ করছে। মেয়েটার এই আত্মসম্মানবোধই তাকে বারবার বেলীর প্রতি দুর্বল করে তোলে। সে মনে মনে ঠিক করল, বেলী যেমনই করুক, সে ছায়ার মতো আড়ালে থেকে সবসময় তাকে আগলে রাখবে। বেলী আর আয়েশা যখন ঘরের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন তারা শুনতে পেল ভেতর থেকে ফিওনার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। দুজনে প্রায় দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল।
#চলবে…
