#বেলীফুলের_ইতিকথা (১২)
#মীরাতুল_নিহা
ফারহানের মুখ থেকে সজোরে উচ্চারিত ‘তিন তালাক’ শব্দটা যেন তপ্ত সীসার মতো প্রতিটি মানুষের কানে গিয়ে বিঁধল। বস্তির ধুলোবালি ওড়া সেই জরাজীর্ণ উঠোনে মুহূর্তেই এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। ইসলামি শরীয়তের অমোঘ আর রূঢ় বিধানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে কয়েক বছরের একটা সাজানো সংসার ধুলোয় মিশে গেল।
শরীরের কম্পন থেমে গিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত কাঠিন্য ভর করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকল আদনান। আজ সন্ধ্যাবেলা মাহিকে পড়ার জন্য বেলীর কাছে নিয়ে আসার কথা ছিল তার। কিন্তু বিকেলের এই হট্টগোল শুনে সে একটু আগেই খোঁজ নিতে চলে এসেছে। ভিড় ঠেলে সামনে আসতেই সে শুনতে পেল ফারহানের সেই শেষ কথাগুলো। আদনান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ফারহানের দিকে, তারপর দেখল বেলীর সেই ফ্যাকাশে, ধীরস্থির মুখচ্ছবি।
“ফারহান ভাই! এইটা আপনি কী করলেন? রাগের মাথায় এত বড় সর্বনাশ…”
ফারহান দ্রুত আসার জন্য তখনো রাগে হাঁপাচ্ছে। ফারহান চিৎকার করে বলল,
“সর্বনাশ আমি করি নাই আদনান, ও করছে! ওরে আমি আজাদী দিয়া দিলাম। এখন ও কই যায় কি করে, সেইটা দেখার বিষয় আমার না!”
তৃষ্ণা মেঝেতে বসে মনে মনে এক পৈশাচিক বিজয়োল্লাস করছিল। সে জানত ফারহানকে উসকে দিলে সে হিতাহিত জ্ঞান হারাবে, কিন্তু এত দ্রুত কাজ হাসিল হবে তা সে কল্পনাও করেনি। সে তার রক্তাক্ত পায়ের ক্ষতটা আবার আঁচল দিয়ে ঢেকে ন্যাকামি করে বলল,
“ওগো, রাগ থামাও। এখন তো যা হওয়ার হইয়াই গেছে। কপালে যা ছিল তাই হইলো।”
আখতার রহমান হাতের তসবিহটা মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরলেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“ফারহান, রাগের মাথায় এক বসায় তিন তালাক দিয়া তুমি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলে। শিক্ষিত সুন্দর, বুঝদার বউ! এই দুধের বাচ্চা সবই শেষ কইরা দিলে। এর ফল কিন্তু ভালো হইবো না।”
বেলী তখন ফিওনাকে বুকের সাথে এমনভাবে চেপে ধরেছে, যেন এই পৃথিবীতে তার একমাত্র অবলম্বন ওই একরত্তি প্রাণ। সে আদনানের দিকে একবার তাকালো। আদনানের চোখে তখন গভীর সমবেদনা।
বেলী এবার ফারহানের দিকে ফিরল। তার কণ্ঠে কোনো করুণা নেই, বরং এক ধারালো শীতলতা। সে সবার সামনে স্পষ্ট গলায় বলল,
“তালাক তো দিলে ফারহান। এবার নিজের পুরুষত্বের প্রমাণ দাও। মনে আছে বিয়ের সময় দুই লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য হয়েছিল? এক টাকাও তো উসুল দাওনি। এই যে আজ আমাকে আর আমার বাচ্চাকে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছ, তার আগে আমার সেই পাওনা দুই লাখ টাকা বুঝিয়ে দাও।”
দুই লাখ টাকার নাম শুনে ফারহানের চেহারা মুহূর্তেই নীল হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল,
“কীসের টাকা? এই কয় বছর খাওয়াইছি-পরাইছি ওইগুলা কি টাকা না?”
আখতার রহমান ধমক দিয়ে বললেন,
“থামো ফারহান! দেনমোহর হলো স্ত্রীর হক। তুমি তালাক দিছো যখন, তখন কড়ায়-গণ্ডায় ওই টাকা তোমারে শোধ করতে হইবো। আর ইদ্দত চলাকালীন তিন মাসের খরচও দিবা। এইটা আল্লাহর আইন, এইখানে কোনো মাফ নাই।”
আখতার রহমান যখন দেনমোহরের টাকার কথা তুললেন, ফারহান তখন দিশেহারা। বস্তির উৎসুক মানুষগুলোর সামনে তার পৌরুষ তখন ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। কিন্তু বেলী দমল না। সে ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচল কণ্ঠে বলল,
“তুমি ভেবেছো তালাক দিয়ে দিলেই সব চুকে গেল? ইসলামি আইন আর এদেশের আইন—দুটোতেই আমার দেনমোহরের দুই লাখ টাকা তোমার কাছে ঋণ। এই টাকা শোধ না করা পর্যন্ত তোমার নিস্তার নেই।”
ফারহান রাগে তোতলামি করে বলল,
“তোর এত তেজ কিসের? আমার ঘরে থাকবি আর আমারেই আইনের ভয় দেখাবি?”
বেলী ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলল,
“আমি তোমার দ্বিতীয় বউর মতন আত্মসম্মানহীন নই যে, তোমার ঘরে গিয়ে আবার থাকব! আমি চলে যাবো। তবে ভেবেছো তালাক দিলেই সব চুকে গেল? মুক্তি পেয়ে গেলে? আমি খুব শীঘ্রই উকিল নিয়ে আসব। আইনসম্মতভাবে ডিভোর্স পেপার তৈরি হবে এবং সেখানে আমার দেনমোহর আর ইদ্দতকালীন খোরপোষের প্রতিটি পয়সা তোমাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। আর মনে রেখো, আমার মেয়ের যাবতীয় খরচও তোমাকে আজীবন টানতে হবে। টাকা রেডি করে রেখো ফারহান।”
তৃষ্ণা এবার ফারহানের হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “ওগো, ওরে যেতে দাও। ও গেলে আমরা শান্তিতে থাকব।”
বেলী তৃষ্ণার দিকে ফিরেও তাকাল না। সে ঘরের এক কোণ থেকে নিজের আর ফিওনার যৎসামান্য কাপড়চোপড় একটি ব্যাগে ভরে নিল।
আদনান স্তম্ভিত হয়ে দেখল, বেলী এক হাতে তার সন্তান আর অন্য হাতে ব্যাগ নিয়ে সেই পরিচিত ঘর থেকে বের হয়ে আসছে। ভিড় চিরে যখন সে রাজপথের দিকে পা বাড়াল, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে আঁধার নেমেছে।
অন্ধকার গলিটা দিয়ে বেলী যখন দ্রুতপায়ে বেরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এল। আয়েশা কাজ থেকে ফিরে সবটা শুনেছে। দৌড়ে এসে বেলীর হাত জাপটে ধরল সে। আয়েশার চোখের জল বাঁধ মানছে না। তার নিজেরও মাথায় আজ ছাঁদ নেই, বেলীর অবস্থাও আজ হুবহু তার মতোই। দুই ভাগ্যহতা নারী নিস্তব্ধ রাতের রাস্তায় দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। আদনান পেছন পেছন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। বেলীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে অপরাধীর গলায় বলল,
“এই রাইতে বাচ্চা নিয়া কই যাইবেন? অন্তত আজকের রাতটা আমার বাড়িতে চলেন। আপনার কোনো অসুবিধা হইবো না।”
বেলী ব্যাগটা শক্ত করে ধরে মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত কাঠিন্য,
“না আদনান। আজ থেকে আমার আর কোনো বাড়ি নেই। কারোর দয়া বা আশ্রয়ে থাকার শক্তি আমার আর অবশিষ্ট নেই। তুমি অনেক করেছো। এখন আমায় যেতে দাও।”
আয়েশা তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আদনান ভাই, আমাগো লাইগা এই খোলা আকাশই যথেষ্ট। অভাবী মানুষের রাত কাডানোর লাইগা রাস্তার ধারই অনেক।”
আদনান এবার একটু ধমকের সুরে বলল,
“আরে কী পাগলামি করতাছেন আপনারা? নিজের কথা ভাবেন ঠিক আছে, কিন্তু এই ছোট বাচ্চাটার কথা তো ভাবেন! ওর অসুখ হলে কী করবেন? ফিওনার দিকে তাকান অন্তত!”
বাচ্চার কথা শুনে বেলী একটু থমকে দাঁড়াল। ফিওনা তখন খিদে আর গরমে ছটফট করে কাঁদছে। আদনান সুযোগ বুঝে আবার বলল,
“আমি আপনাদের দয়া করছি না। আমার এক পরিচিত মানুষের বস্তির শুরুর মাথায় ছোট ছোট কিছু এক রুমের ভাড়া ঘর আছে। আমি ওখানেই নিয়ে য্চ্ছি।”
বেলী আর আয়েশা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। বেলী নিচু স্বরে বলল,
“কিন্তু আদনান, আমাদের কাছে তো এখন ঘর ভাড়া নেওয়ার মতো কোনো টাকা নেই। আয়েশার জমানো সামান্য কিছু ছাড়া আমার হাত একদম খালি।”
আদনান আশ্বস্ত করে বলল,
“টাকা তো এখনই দিতে হবে না। মাস শেষ হইতে তো অনেক দেরি। আপাতত একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই তো হোক! চলেন আমার সাথে।”
বেলী আর আয়েশা এবার আর না করতে পারল না। কোলের বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে তারা আদনানের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। বস্তির সেই চাকচিক্যহীন সরু গলিগুলো পেরিয়ে একদম শুরুর পথে ছোট ছোট টিনের চালের ঘরগুলোর দিকে তাদের কাফেলা চলল। ফারহানের সেই বিষাক্ত ঘর থেকে মুক্তি পেলেও, সামনে যে এক অনিশ্চিত জীবন অপেক্ষা করছে তা তারা দুজনেই টের পাচ্ছিল। আদনান যখন ঘরটার তালা খুলল, তখন এক ভ্যাপসা গুমোট গন্ধ নাকে এল। টিনসেডের এই একচিলতে ঘর। ভেতরে টিমটিমে একটা হলুদ বাল্ব জ্বলছে। দেয়ালগুলো নোনা ধরা, আর নিচে কাল কুচকুচে সিমেন্টের ফ্লোর। ঘরটা এতটাই ছোট যে একটা খাট রাখলে আর তেমন জায়গা থাকে না। আসবাবপত্রের নামগন্ধ নেই, কেবল শূন্যতার এক হাহাকার দেয়ালের কোণে কোণে জমে আছে।
আদনান অপরাধীর গলায় বলল,
“আপাতত এইটাই জোগাড় করতে পারছি। কাল সকালে আমি টুকটাক কিছু এনে দেব। আজ রাতটা কষ্ট করে একটু মানিয়ে নেন।”
বেলী কথা বলল না। সে কেবল অপলক দৃষ্টিতে ওই কাল ফ্লোরটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সাজানো ঘর,সবই তো আজ এক মুহূর্তে অতীত হয়ে গেল। আয়েশা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দ্রুত তার কাপড়ের পুটলিটা খুলল। সেখান থেকে একটা পুরনো ধোয়া চাদর বের করে ফ্লোরের এক কোণে বিছিয়ে দিল।
বেলী যন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে এল। নিজের ব্যাগ থেকে কয়েকটা কাঁথা বের করে চাদরের ওপর বিছিয়ে সে ফিওনাকে আলতো করে শুইয়ে দিল। ফিওনা সম্ভবত ক্লান্তিতেই অবশ হয়ে গিয়েছিল, শোয়ানোর সাথে সাথেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
কতক্ষণ ওভাবে কেটে গেল কেউ জানে না। বেলী পাথরের মূর্তির মতো ফিওনার মুখের দিকে তাকিয়ে একধ্যানে বসে আছে। তার চোখ দুটো শুকনো, কিন্তু ভেতরে যেন প্রলয় বয়ে যাচ্ছে। আয়েশা এক কোণে বসে বেলীর দিকে তাকাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না এই মুহূর্তে বেলীকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ এই কথাটা এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা মনে হচ্ছে আয়েশার কাছে।
আদনান দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরের এই নিস্তব্ধতা তাকেও কষ্ট দিচ্ছে। সে নিচু স্বরে ডাকল, “আয়েশা, একটু বাইরে আসো তো!”
আয়েশা বাইরে গেলে আদনান তার হাতে এক প্যাকেট পাউরুটি ও কলা গুঁজে দিয়ে বলল,
“এইটা রাখো। আমি এখন যাই, বেশি রাত করলে আম্মা চিন্তা করবে। কাল ভোরেই আসব।”
আদনান চলে যাওয়ার পর আয়েশা ঘরে ঢুকে দেখল বেলী ঠিক আগের মতোই বসে আছে। আয়েশা ধীরে ধীরে বেলীর কাঁধে হাত রাখল।
“বেলী… কিছু খাবি? আদনান ভাই এইগুলা দিয়া গেল।”
বেলী এবার মুখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কোনো প্রাণ নেই। সে ফিসফিস করে বলল,
“আয়েশা, মানুষের জীবন কি এক দিনের মধ্যে এতখানি পাল্টে যেতে পারে?”
আয়েশা উত্তর দিতে পারল না। শুধু আশাহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
#চলবে?
#বেলীফুলের_ইতিকথা (১৩)
#মীরাতুল_নিহা
ভোরের আলো তখনো বস্তির টিনের চালে ঠিকঠাক আছড়ে পড়েনি। আদনান নিজের ঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। কাল রাতভর বেলী আর আয়েশার জন্য ঘর জোগাড় করা, দৌড়ঝাঁপ আর মানসিক উত্তেজনায় শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ছিল। তার সেই গভীর ঘুম বেশিক্ষণ টিকল না। ঘরের চিৎকারে ধড়ফড় করে জেগে উঠল সে। কণ্ঠস্বরটা অতি পরিচিত তার মা কুলসুম বেগম! কুলসুম বেগম ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলছেন। আদনান চোখ ডলতে ডলতে বাইরে আসতেই তিনি ছেলের ওপর বাঘিনীর মতো তেড়ে এলেন।
“আদনান! তোর কি আক্কেল-জ্ঞান সব লোপ পাইছে? সারা বস্তিতে ছি ছি পইড়া গেছে যে তুই ওই স্বামী-খেদানো বেলীর লাইগা ঘর ভাড়া নিয়া দিছস!
নিজের খাইয়া বনের মোষ তাড়ানো কি তোর কাম?”
আদনান বিরক্ত হয়ে বলল,
“আরে মা, সকাল সকাল কী শুরু করলা? মানুষটা বিপদে পড়ছে, বাচ্চা নিয়া রাস্তায় দাঁড়াইছে। সাহায্য করছি বইলা কি খুব অপরাধ হইয়া গেছে?”
কুলসুম বেগম ফোঁস করে উঠলেন,
“অপরাধ না তো কী? পরের ঘরের ঝগড়াঝাঁটি নিয়া মাতবরি করতে গিয়া নিজের নাম খারাপ করতাছস। একটু আগে পারুলের মা কত কথা কইলো ইনিয়ে বিনিয়ে! শোন আদনান, সাফ কথা কইয়া দিলাম, ওই বেলীর ছায়াও যেন তুই না মাড়াস।”
আদনান মা’কে আপ্রাণ বোঝানোর প্রচেষ্টায় বলতে লাগল,
“মা! বাচ্চাটার জন্য মায়া লাগে। তাছাড়া মানুষই তো মানুষের উপকারে লাগে।”
“উপকারীরে বাঘে খায়, এইটা ভুইলা যাস না। ওই মেয়ের লগে মেলামেশা করলে তোর বিয়া-শাদি নিয়াও কথা উঠব।”
আদনান এবার রেগে গেল।
“মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো কি এখন নজর দেওয়া হইয়া গেল? মা, একটু সম্মান রাইখা কথা কও।”
“সম্মান আমার কপাল! তুই আজ থেইকা ওগো কোনো খবর নিবি না। এডাই শেষ কথা!”
কুলসুম বেগমের চরম আল্টিমেটাম। মা আর ছেলের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ তেতো বাকবিতণ্ডা চলল। কুলসুম বেগমের অনড় জেদ আর কুৎসিত সব সন্দেহের কথা শুনে আদনানের কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক পর্যায়ে রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
রাস্তায় পা রাখতেই গলি দিয়ে হনহনিয়ে হাঁটার সময় তার চোখেমুখে বিরক্তি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আদনানের গতি কমে এল। সামনেই ফারহানের সেই ঘরটা। ফারহানের ঘরের দরজার কাছে আসতেই আদনান দেখল দরজাটা আধখোলা হয়ে আছে।
আদনান মনে মনে নিজেকে শাসন করল। তার উঁকি দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু অবুঝ কৌতূহল তাকে বাধ্য করল একবার ভেতরের দিকে তাকাতে। না চাইতেও তার চোখজোড়া চলে গেল ঘরের ভেতরের দিকে।
ঘরের ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে একলা শুয়ে আছে ফারহান। ভোরের আলোয় তার মুখটা কালচে আর বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। ঘরের ভেতরটা একদম এলোমেলো। আদনান চারদিকে ভালো করে খুঁজল, কিন্তু কোথাও ফারহানের নতুন বউ তৃষ্ণাকে দেখতে পেল না।
আদনানের মনে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
তৃষ্ণাকে না দেখে আদনান আর সময় নষ্ট করল না। ফারহানের এই বিধ্বস্ত দশা দেখার কোনো আগ্রহ তার নেই। তার সমস্ত চিন্তা এখন ওই টিনসেডের এক রুমের ঘরটার দিকে। কেন যেন আজ সকালে বেলীকে না দেখে সে থাকতে পারছে না। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা আর অস্থিরতা তাকে তাড়া করে ফিরছে।
টিনের চালার ছিদ্র দিয়ে আসা ভোরের এক চিলতে আলো যখন বেলীর মুখে পড়তেই বেলীর ঘুম ভেঙে গোল। সারারাত শক্ত মেঝের ওপর শুয়ে তার মেরুদণ্ড থেকে শুরু করে সারা শরীর যেন জমে পাথর হয়ে আছে। পাশের বিছানায় আয়েশা এখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর রাতের এই মানসিক ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো ওরও ফুরিয়ে এসেছে। বেলী ধীরে ধীরে উঠে বসল। পা বাড়াতেই হাড়ের ভেতর এক তীক্ষ্ণ ব্যথার ঢেউ খেলে গেল। ফিওনা তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন, তার নিষ্পাপ মুখটা দেখে বেলীর বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আয়েশা ধড়ফড় করে জেগে উঠল। চোখ কচলাতে কচলাতে সে হাই তুলে বলল,
“উফ! শরীরটা জুইত ঠেকতাছে না রে বেলী। মনে হইতাছে কেউ ডলা দিছে। আজ মনে হয় কাজে যাইতে পারুম না।”
বেলী ম্লান হেসে বলল,
“যাবি কি করে? সারারাত এই শক্ত মেঝেতে শুয়ে থাকলে কি আর শরীর ভালো থাকে? বরং বিশ্রাম নে।”
আয়েশা কোনোমতে উঠে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল,
“তুই কি আজ পড়াইতে যাবি না? শরীর তো তোরও ভালো না।”
বেলী দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে দৃঢ় স্বরে বলল,
“যাব। আজ যদি না যাই, তবে কাল হয়তো আমার ফিওনাকে না খেয়ে থাকতে হবে। আমার বিশ্রাম নেওয়ার বিলাসিতা সাজে না রে আয়েশা।”
কথাগুলো বলতে বলতেই জরাজীর্ণ কাঠের দরজায় টোকা পড়ল। বেলী অবাক হয়ে আয়েশার দিকে তাকাল। এই সাতসকালে কে আসতে পারে? আয়েশা দরজা খুলতেই দেখল আদনান দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখেমুখে তখনো সকালের অশান্তির ছাপ স্পষ্ট।
বেলী বলল,
“আদনান? এই সকালে? ভেতরে আসো।”
আদনান ভেতরে পা বাড়াল না। দরজার চৌকাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে সে অপরাধীর চোখে ঘরের ভেতরটা দেখল। গতরাতের দেওয়া সেই পাউরুটি আর কলার প্যাকেটটা তখনো এক কোণে অবহেলিতভাবে পড়ে আছে। কেউ ছোঁয়ওনি ওটা। আদনানের বুকটা হু হু করে উঠল। সে নিচু গলায় বলল,
“ভেতরে আসব না। কাল রাতের খাবারগুলা দেখি সব পড়ো আছে। আপনারা কি কিছুই খান নাই? এইগুলা দিয়ে অন্তত নাস্তাটা করে নেন। শরীর টিকবে না তো এমন করলে।”
বেলী কোনো উত্তর দিল না। সে ঘরের ভেতর গিয়ে ফিওনাকে ভালো করে কাঁথা দিয়ে ঢেকে দিল। আয়েশাকে ইশারায় ফিওনার খেয়াল রাখতে বলে সে মাথার ওড়নাটা টেনে নিল। আদনানের কথা যেন তার কানে পৌঁছালই না। তার এখন একটাই লক্ষ্য—কাজে যেতে হবে। টাকা ইনকাম করতে হবে। বাঁচতো হবে ভালোভাবে। আদনানকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বেলী শুধু বলল,
“আমি রাইসাকে পড়াতে যাচ্ছি। আয়েশা ফিওনাকে একটু দেখিস।”
আদনান একদৃষ্টে বেলীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। রিক্ত হাতে, শূন্য পেটে এবং শরীরভর্তি ব্যথা নিয়ে একটা মেয়ে কীভাবে এত তেজ নিয়ে পথ চলতে পারে, তা তার ধারণার বাইরে।
পিচঢালা তপ্ত রোডের ওপর দিয়ে বেলী যখন হাঁটছিল, তখন মাথার ওপরের সূর্যটা যেন তার ভাগ্য নিয়ে উপহাস করছিল। ফিওনাকেআয়েশার কাছে রেখে তো এসেছে, কিন্তু মন টিকছে না। গন্তব্যহীনভাবে কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে মোড়ের মাথায় এসে থমকে দাঁড়াল। আজ তার মন বারবার বাপের বাড়ির দিকে টানছে। কয়েকটা গাড়ি পেরোলেই পরিচিত পুরনো বাড়িটা, যেখানে তার শৈশব কেটেছিল। কিন্তু আজ সেই বাড়ির দিকে পা বাড়াতে তার কলিজা কাঁপছে। বেলী জানে, সে এখন আর সেই আদরের মেয়েটি নেই। সে এখন এক ‘তালাকপ্রাপ্তা’ নারী, যার কোলে আবার একটি সন্তান। এই সমাজে মেয়েদের বাপের বাড়ি তখনো স্বর্গ থাকে যতক্ষণ তারা স্বামীর ঘরে সুখে থাকে। যেই মুহূর্তে সম্পর্কটা চুকে যায়, সেই স্বর্গটা মুহূর্তেই বিষাক্ত হয়ে ওঠে। বেলী মনে মনে ভাবল,
“মা-বাবা কি আমাকে ঘরে তুলবেন? নাকি ভাববেন আমি তাদের গলায় নতুন করে পাথরের মতো জগদ্দল পাথর হয়ে চেপে বসতে আসছি?”
প্রতিবেশীদের কটু কথা, আত্মীয়দের কানাঘুষা আর নিজের ভাই-বোনদের অবজ্ঞার কথা ভেবে বেলীর বুকটা ধক করে উঠল। পা দুটো যেন আঠা দিয়ে রোডের সাথে লেগে আছে। সামনে আগানোর শক্তি সে পাচ্ছিল না। কিন্তু পরক্ষণেই এক চিলতে জেদ তার ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। এভাবে আর কতদিন অন্যের দয়ায় চলবে সে? আদনানের সাহায্য নিয়ে আর আয়েশার সাথে এক রুমের এই কাল ফ্লোরে কি সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে? লোকেই বা তাকে কতকাল দেখবে?
না, তা হয় না। বেলীর আলমারিতে এখনো তার সযত্নে রাখা সার্টিফিকেট গুলো আছে। পড়ালেখায় সে কোনোদিন ফাঁকি দেয়নি। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল আজ বাপের বাড়িতে যাবে শুধু নিজের সার্টিফিকেটগুলো উদ্ধার করতে। যেটুকুই আছে ওতে বেলীর রেজাল্ট নজরকাঁড়া! অত ভালো না হলেও চলার মতন একটা চাকরি সে খুঁজে তো নিতে পারবে! নিজের যোগ্যতায় নিজের আর ফিওনার ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে হবে তাকে। বেলী আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। ভয়ের মেঘটা সরিয়ে সে নিজের ভেতরের তেজটাকে আবারও জাগিয়ে তুলল।
বেলী ধীর পায়ে বাপের বাড়ির গলির দিকে পা বাড়াল।
#চলবে?
