#বেলীফুলের_ইতিকথা (২০)
#মীরাতুল_নিহা
আইনি নোটিশটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই ফারহানের মনে হচ্ছিল অদৃশ্য কিছু তাকে পিষে ফেলছে। বুকের ভেতরটা এমনভাবে চেপে ধরছিল যে দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। খোলা হাওয়ায় একটু বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য সে ক্রাচে ভর দিয়ে অতি কষ্টে ঘরের বাইরে বের হলো। কিন্তু বাইরে বের হয়ে সে যা দেখল, তাতে তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। বস্তির সেই চিপা গলির মোড়ে একটা ছায়ামতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে দুজন। একটি মেয়ে একটি ছেলেকে বেশ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে আছে। ছেলেটির মুখ দেখা না গেলেও মেয়েটিকে চিনতে ফারহানের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। এ যে তার বর্তমান স্ত্রী তৃষ্ণা! দিনে-দুপুরে সবার চোখের আড়ালে এ কী লীলা শুরু করেছে সে?
ফারহানের রক্ত মাথায় চড়ে গেল। যে তৃষ্ণার জন্য সে তার দুধের শিশু আর সতী সাধ্বী স্ত্রীকে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল, সেই তৃষ্ণা আজ অন্য পুরুষের বুকে! রাগে-ঘৃণায় কাঁপতে কাঁপতে ফারহান সেখানে গিয়ে হাজির হলো। ফারহানকে হঠাৎ সামনে দেখে তৃষ্ণা ভড়কে গিয়ে ছিটকে সরে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক। আমতা আমতা করে সে বলল,
“তু… তুমি? তুমি তো বাথরুমেও একা যাইতে পারো না, বাইরে কেমনে আসলা?”
ফারহান দাঁতে দাঁত চিপে বলল,
“এসেছি বলেই তো নিজের চোখে তোমার এই নোংরামি দেখতে পারলাম! কে এই লোক? জবাব দাও!”
তৃষ্ণা নিজেকে সামলে নিয়ে ফারহানকে ধমক দিয়ে বলল,
“তুমি ঘরে যাও তো! এখানে সিনক্রিয়েট করবা না।”
তখনি ওই অচেনা লোকটা তৃষ্ণার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
“তৃষ্ণা, এই ল্যাংড়া লোকটা আবার কে?”
তৃষ্ণা এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে নির্লজ্জের মতো লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে না না, এইটা আমার এক দূর সম্পর্কের ভাই। গ্রাম থেকে আসছে চিকিৎসা করাইতে। তুমি এখন যাও তো, পরে কথা কমুনে।”
ফারহান স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের কানে যা শুনল তা যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার বৈধ স্বামীকে সে আজ এক নিমেষে পরকীয়া প্রেমিকের কাছে ‘ভাই’ বানিয়ে দিল? ছিঃ! মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে!
তৃষ্ণা দ্রুত ছেলেটিকে বিদায় করে দিয়ে দিলো
আশপাশে লোকজন উঁকিঝুঁকি মারছে দেখে সে আর সেখানে দাঁড়াল না। ফুঁসতে ফুঁসতে ভেতরে ঢুকলো।
ফারহানও টলতে টলতে ঘরের ভেতরে ঢুকল। তার সারা শরীর ঘামছে। ঘরে ঢুকতেই ফারহান চিৎকার করে উঠল,
”তৃষ্ণা! তুমি আমাকে তোমার প্রেমিকের কাছে ভাই পরিচয় দিলা? বিছানায় যার সাথে শোও তাকে বলো ভাই? তোমার কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু নাই?”
তৃষ্ণা তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের ওড়না ঠিক করছিল। গালে তখন ফারহানের দেওয়া চড়ের লাল দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে! টেবিলের ওপর পড়ে থাকা হলদে খামটা ছোঁ মেরে তুলে নিল। ভেতরে থাকা আইনি নোটিশটা দ্রুত পড়ে তার মুখটা বাঁকা হয়ে গেল।
তৃষ্ণা বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল,
“নোটিশ আইছে তোমার নামে? তোমার সেই ‘সতী’ বউ তো দেখি চাল চালছে।”
ফারহান অবসন্ন গলায় বলল,
“হ্যাঁ, বেলী পাঠাইছে। দুই লাখ টাকা দেনমোহর দাবি করছে ফিওনার ভরনপোষণ সহ। সময় দিছে পনেরো দিন। টাকা না দিলে জেল-জরিমানা সব হইব, কাগজে তো তাই লেখা।”
তৃষ্ণা শব্দ করে হেসে উঠল,
“দুই লাখ টাকা! পকেটে দুই পয়সা নাই আর দেনমোহর দিবা দুই লাখ? জেলে যাওয়াই তোমার কপালে আছে ফারহান।”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান হাসল।
“ভাগ্যে যা আছে তা-ই হইব। এর চেয়ে বেশি আর কী হইতে পারে?”
তৃষ্ণা তার সাজগোজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিতে নিতে কর্কশ গলায় বলল,
“তোমার ভাগ্যে যা আছে হউক, আমার ভাগ্য আমি তোমার লগে নষ্ট করুম না।”
ফারহান এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“ভাগ্য আর নষ্ট করবা কী? দিব্যি স্বামী থাকতে পরকীয়া চালাইয়া যাইতেছ, মানুষের কাছে স্বামী পরিচয় দিতে লজ্জা পাও—ভাগ্য তো তুমি অনেক আগেই নষ্ট করছ।”
তৃষ্ণা এবার বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল।
“মুখ সামলাইয়া কথা কও ফারহান! পরকীয়া করি তো তোমার কী? তুমি যখন দুধের বাচ্চা আর বউ থাকতে আমার লগে প্রেম করছো, বিয়া করছো—তখন তোমার চরিত্র কই আছিল? নিজেরে অনেক বড় সতী মনে হইতাছে নাকি? আমারে ছিঃ দাও কোন মুখে?”
ফারহানের মুখে আর কোনো কথা সরল না। তবে ফারহান সে জায়গায় দাঁড়িয়েই সজোরে তৃষ্ণার গালে চড় বসালো! তৃষ্ণা গালে হাত দিয়ে অগ্নিশর্মা হয়ে আছে।
“শালার ল্যংড়া! তুই আমার গায়ে তুললি? দেখ এর ফল কি হয়! তোর সাথে যে আছি এডাই তো তোর সাত কপালের ভাগ্য! কদর না কইরা উল্টা মারলি তো? লাথি মারি তোর মতন ল্যাংড়ারে!”
তৃষ্ণা গটগট করে আলমারি খুলে নিজের কাপড়চোপড় বের করতে লাগল। ফারহান বলল,
“কাপড় কেন বের করতাছো? কোথায় যাও তুমি?”
তৃষ্ণা ব্যাগে কাপড় ঠাসতে ঠাসতে বলল,
“যাইতাছি মানে চইলাই যাইতাছি। তোমার এই পচা ঘরে পইড়া থাকার শখ আমার নাই।”
ফারহান স্তব্ধ হয়ে বলল,
“সুখের সময় পাশে থাকতে পারলা, আর আজ আমার এই দুঃখের দিনে পাশে থাকবা না? তোমার কথা শুইনাই তো আমি বেলীরে তালাক দিছি। আমার সব শেষ করছি তোমার জন্য।”
তৃষ্ণা এবার আঙুল উঁচিয়ে নির্লজ্জের মতো বলল,
“তালাক দিছো তো আমার কী? তুমি আমারে সুখের আশা দিছিলা। এখন না পারো বিছানায় সুখ দিতে, না পারো টাকা-পয়সার সুখ দিতে। শরীরটাও গেছে, পকেটও খালি—উপরে আবার পুলিশের ভয়। জেলেও যাইবা। তোমার লগে থাকলে আমিও না ফেঁসে যাই! আবার আজকে আমার গায়ে হাতও তোলা হিছেঁ কোন দুঃখে তোমার লগে থাকুম? আমি চললাম আমার পথে।”
ফারহানের দুচোখ বেয়ে তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। তৃষ্ণা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার আগে থমকে দাঁড়াল। তাচ্ছিল্য ভরে বলল,
“ভাগ্যিস কবুল পইড়া বিয়া করছিলাম শুধু, কোনো কাবিন করি নাই। শোন, তুই এখনই আমারে ‘তালাক’ দিয়া মুক্ত কর। আমি আমার প্রেমিকের কাছে চইলা যাইতাছি।”
ফারহান যেন জীবন্ত লাশে পরিণত হলো। তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এল। এই তৃষ্ণার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল ফোনের মাধ্যমে। দিনগুলোতে যখন ফিওনা রাতে কাঁদত, বেলী বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকত ফারহানের তখন ঘুম ভেঙে মেজাজ খারাপ হতো। সেই বিরক্তির মাঝেই সে মোবাইল হাতে নিত। এক রাতে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তৃষ্ণার সাথে কথা শুরু। ধীরে ধীরে সেই মায়াবী কণ্ঠ আর ফোনের স্ক্রিনে দেখা তৃষ্ণার সৌন্দর্যে সে এমনভাবে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে নিজের সাজানো সংসারটাকে তুচ্ছ মনে হয়েছিল। তৃষ্ণা বলেছিল তার মা ছাড়া দুনিয়ায় কেউ নেই, সে খুব অসহায়। ফারহান ভেবেছিল তাকে বিয়ে করে সে উদ্ধার করছে, তাকে খুব ভালোবাসে। অথচ আজ সব স্পষ্ট। তৃষ্ণা তাকে ভালোবেসেনি, ভালোবেসেছিল তার সক্ষমতা আর টাকাকে। আজ ফারহান যখন সব হারিয়ে নিঃস্ব, তখন সেই ‘অসহায়’ তৃষ্ণা তাকে পঙ্গু অবস্থায় মাঝপথে ফেলে চলে যাচ্ছে।
বলা বাহুল্য, বেলীর সাথে সংসার চলাকালীনই ফারহান তৃষ্ণার সাথে ফোনে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। গভীর রাতে যখন শ্রান্ত বেলী ফিওনাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত, ফারহান তখন ফোনের ওপাশে তৃষ্ণার মায়াবী জালে বন্দি হতো। সেই ফোন থেকে শুরু হওয়া সম্পর্ক গড়ায় সামনাসামনি দেখায়, আর তারপর শরীরি লেনাদেনায়। তৃষ্ণা মূলত সেই বিছানার সুখেই ধরা দিয়েছিল। ফারহানের সক্ষমতা আর পকেটের টাকা তখন তাকে অন্ধ করে রেখেছিল।
কিন্তু আজ ভাগ্য বিড়ম্বনায় ফারহান পঙ্গু। শরীরে সেই তেজ নেই, পকেটে সেই জোর নেই। না শারীরিক, না মানসিক—কোনোভাবেই তৃষ্ণাকে সুখী করার ক্ষমতা এখন আর তার নেই। ডাক্তার বলেছে এই পা স্বাভাবিক হতে বহু সময় লাগবে, আদৌ হবে কি না তাও নিশ্চিত নয়। তৃষ্ণা যে আগাগোড়াই স্বার্থপর ছিল, আজ বিপদের মুখে তা নগ্নভাবে প্রকাশ পেল।
তৃষ্ণা খাটে বসে শেষবারের মতো নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে নিচ্ছিল। ফারহান ক্রাচ সরিয়ে কোনোমতে হেঁচড়ে হেঁচড়ে তৃষ্ণার পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে তৃষ্ণার পা জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদ করে বলল,
“তৃষ্ণা, যেও না! এই অবস্থায় আমাকে ফেলে যেও না। রাগে একটা চড় না হয় দিছি। আমার বউ বাইরে পরকীয়া করছে আমার অসুস্থতার সুযোগে এটা আমি কেমনে মানব বলো? একটু বুঝার চেষ্টা করো। সব বাদ দিয়ে সংসারে মনোযোগ দাও। আমি তো তোমাকে খুব ভালোবাসি তাই না বলো?”
“আর আমি যে তোর বউরে মাইনা নিছি? সতীন নিয়ে সংসার করছি ওইডা কই যাইব? সব বাদ। তোর সাথে থাইকা আমি আমার ভবিষ্যৎ জীবন যৌবন নষ্ট করতে পারমু না। আমি বুঝে গেছি তুই আমারে টাকা না শারীরিক সুখ কোনোটাই দিতে পারবি না আর। সুখ না পাইলে কেন থাকমু ক? আমার দাম আছে। আমি তোর মতন ল্যাংড়া বা অক্ষম না!”
ফারহান এবার আকুতিভরা কন্ঠে বলল,
“তুমি তো জানো, এই দুনিয়ায় এখন আমার আর কেউ নেই। আমি কার কাছে থাকব?”
তৃষ্ণা এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত হলো না। সে পা ঝামটা মেরে ফারহানের হাত সরিয়ে দিল, যেন কোনো নোংরা আবর্জনা তাকে স্পর্শ করেছে। ব্যাগটা শক্ত করে হাতে তুলে নিয়ে সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“শোন ফারহান, পরিষ্কার কথা—বিছানায়ও সুখ নেই, টাকা-পয়সার সুখও দিতে পারছো না। তোমার কাছে থাকা মানে জীবন্ত মরে থাকা। এমনিতেই টাকার জন্য জেলে যাইবা, তখন তো আমি এমনিতেও একা হয়ে যামু। যামুই যখন, তবে আগেভাগেই যাই। না হয় সুদীপ্ত হাতছাড়া হয়ে যাবে। ও আমার জন্য মোড়ে অপেক্ষা করছে। ভাবছিলাম তোর লগে থাকমু একসময় তো অনেক সুখ দিছো। সুস্থ হইলে তো হইছেই। মাঝখানে দুই চারটা প্রেম করলেও করতাম! কিন্তু এখন যা দেখলাম তুই তো যাবি পুলিশে! সব অন্ধকার! ভালোই হইছে এতদিন লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছিলাম। এখন সবটা জানলি তো? গেলাম আমি। আমার আশা আর করবি না। যা সর ল্যাঙড়া কোনখানের!”
ফারহানের মুখে আর কোনো শব্দ সরল না। ফারহানের বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। যে তৃষ্ণার জন্য সে তার ফুটফুটে মেয়েটার ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেই তৃষ্ণা আজ তাকে ভয় দেখিয়ে অন্য পুরুষের হাত ধরতে দ্বিধা করল না।
তৃষ্ণা আর পেছন ফিরে তাকাল না। দামি পারফিউমের কড়া গন্ধ ছড়িয়ে সে ফারহানের সামনে দিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফারহান মেঝের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। সে ঝাপসা চোখে দেখল তার সাজানো স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ। তার চোখের সামনে নিজের পরিণতি আজ স্পষ্ট। যে মিথ্যে আনন্দের মোহে সে নিজের ঘর ভেঙেছিল, সেই মোহ আজ তাকে পথের ভিখারি বানিয়ে দিয়ে গেল। একেই কি তবে বলে প্রকৃতির বিচার?
#চলবে
#বেলীফুলের_ইতিকথা (২১)
#মীরাতুল_নিহা
সকাল সকাল তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে বেলী টিউশনি শেষ করে ফিরল। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত, কিন্তু বসার জো নেই। তাড়াহুড়ো করে দুমুঠো খেয়ে ফিওনাকে দেখেই সে ছুটল কুরিয়ার অফিসের দিকে। আজ বেশ কয়েকটা পার্সেল রিটার্ন এসেছে। অনলাইনে কাজ করা দেখতে সহজ মনে হলেও ঝামেলা কম নয় কেউ ঠিকানা ভুল লেখে, কেউ আবার পার্সেল রিসিভ করে না। ডেলিভারি ম্যানের ফোন তুলে না! এই রোদের মধ্যে বারবার কুরিয়ার অফিসে দৌড়ানো বেলীর জন্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।এদিকে আয়েশার আজ ছুটি। সে ঘরে ফিওনাকে নিয়ে মেতে আছে। একটা ছোট প্লাস্টিকের বল নিয়ে দুজনে খেলছিল। হঠাৎ বলটা ফিওনার গায়ে একটু জোরে লাগতেই মেয়েটা ‘উউ’ করে শব্দ করে উঠল। ফিওনার মাড়িতে নতুন একটা ছোট দাঁত গজিয়েছে। সেই ছোট্ট সাদা দাঁতটুকু দেখিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে সে এমনভাবে কান্না শুরু করল যে আয়েশার দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আয়েশা খুব আবেগী হয়ে সেই দৃশ্যটা কিছুক্ষণ দেখল। ফিওনা কাঁদলে ওকে একদম বেলীর মতো লাগে। কি আদুরে মিষ্টি বাচ্চা! বেলী কড়া করে বলে দিয়েছে, ফিওনার সামনে যেন আয়েশা আঞ্চলিক বা অশুদ্ধ ভাষায় কথা না বলে। সে চায় তার মেয়ে বড় হয়ে সুন্দর এবং শুদ্ধ ভাষায় কথা বলুক। আয়েশা তাই খুব যত্ন করে শুদ্ধ ভাষায় ফিওনাকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগল,
“ও আমার সোনা মা, একদম কাঁদে না। এই দেখো বলটা পচা, বলটাকে আমি বকে দিয়েছি। আর কাঁদবে না কিন্তু!”
আয়েশার সোহাগে ফিওনা চোখের জল মুছে আবার খিলখিল করে হেসে উঠল। একই সময়ে বস্তির মোড়ে ভাঙা পায়ে ক্রাচে ভর দিয়ে অতি কষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে ফারহান। শরীরের ভারসাম্য রাখা তার জন্য দায় হয়ে পড়েছে, তবুও সে আজ বেরিয়েছে একটা বিশেষ খোঁজে। আদনানদের ঘরের কাছে আসতেই দেখল একদল মহিলার জটলা। আদনানের মা কুলসুম বেগম পানের পিক ফেলে তীক্ষ্ণ নজরে ফারহানকে দেখলেন। কুলসুম বেগম কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কী গো ফারহান? এই ভাঙা পা নিয়া রোদের মধ্যে কই যাইতে লাফালাফি করতাছো?”
ফারহান কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“চাচি, আদনান কি ঘরে আছে? ওর সাথে খুব দরকার আছিল।”
কুলসুম বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
“না, আদনান ঘরে নাই। কামে গেছে। তা তোমার বউ আমার পোলারে খাটায় মারে। কিছু হইলেই পোলা আমার বেলীর কাছে ছুট লাগায়। এটা দেয় ওটা দেয় বাপরে! আবার তোমার কি দরকার শুনি?”
ফারহান ইতস্তত করে বলল,
“চাচি, আদনান তো জানবে বেলী কোথায় বাসা নিয়েছে। ওর সাথে আমার একটু কথা আছিল। আমি তো কিছুই জানি না ও কই থাকে।”
কুলসুম বেগম একটা বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বললেন,
“হায়রে কপাল! নিজের বউ-বাচ্চা কই থাকে সেই খবর রাখারও মুরোদ নাই? বস্তি থেইকা মাত্র দশ মিনিটের পথ দূরে বেলী থাকে, অথচ তুমি এই পা নিয়া সারা দুনিয়া খুঁজতাছো। কেন গো, এখন মাথা কি ঠিক নাই?”
ফারহান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এতটা কাছেই থাকে বেলী? এই রোদে ক্রাচে ভর দিয়ে পরগাছার মতো অন্যদের দ্বারে দ্বারে বেলীর ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছে। অথচ সে জানতও না, তার খুব কাছেই বেলী তার নতুন এক পৃথিবী গড়ে তুলেছে।
কুলসুম বেগম পানের বাটাটা গুছিয়ে ফারহানের দিকে বাঁকা চোখে তাকালেন। বিদ্রূপের স্বরে বললেন,
“ক্যান গো ফারহান? বেলীরে তো তালাক দিয়া বিদায় করছিলা, এখন আবার তারে খুঁইজা কী হইব?”
ফারহান মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল,
“চাচি, আমি ভুল বুঝতে পারছি। মানুষের তো ভুল হয়, আমারও হইছে। আমি বড় অন্যায় করছি বেলীর সাথে।”
ফারহানের মুখে অনুশোচনা দেখে কুলসুম বেগমের সুর হঠাৎ বদলে গেল। তিনি বেশ উৎফুল্ল হয়ে বললেন,
“এই তো বুদ্ধিমানের মতো কথা কইলা! যাও, বউ-বাচ্চারে ফিরাইয়া আনো। বেলী হইলো একটা লক্ষ্মী সংসারী মাইয়া। তার মতো মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ঘরের লক্ষ্মী তাড়াইছো বইলাই তো আজ তোমার এই দশা, পঙ্গু হইয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাছো। যাও ঘরের লক্ষী ঘরে ফিরায় আনো।”
অথচ এই কুলসুম বেগমই আড়ালে আদনানকে বকাবকি করেন যেন সে বেলীর ছায়া মাড়াতে না যায়। তখন বেলী তার চোখে ‘অপয়া অলক্ষ্মী’, কিন্তু ফারহানের সামনে এখন তিনি বড় নীতিবান হয়ে উঠলেন। তিনি আরও যোগ করলেন,
“আইন-কানুন দিয়া তো আর ডিভোর্স হয় নাই। রাগের মাথায় ত্যাজ্য করছো তো কী হইছে? এখন ফিরাইয়া আনলেই সব ঠিক হইয়া যাইব।”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, মুখে যত সহজেই বলা যাক, বেলী তাকে ক্ষমা করবে না। এটুকু অন্তত চিনে। সেদিন সবাইকে সাক্ষী রেখে সে যেভাবে চিৎকার করে তালাক বলেছিল, সবাই জানে এখন বেলী আর তার বউ নেই। ঠিকানা জোগাড় করে ফারহান অতি কষ্টে ক্রাচে ভর দিয়ে সেই ছোট বাসাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিতরে তখন আয়েশা ব্যস্ত। সে চুলায় ফিওনার জন্য সুজি বসিয়ে নাড়ছে। আর ছোট্ট ফিওনা খেলতে খেলতে হামাগুড়ি দিয়ে একেবারে দরজার সামনে চলে এসেছে। ফারহানের আর বাসা খুঁজতে হয়নি, গলির কাছে এসেই মেয়েকে দেখেই সে চিনে ফেলেছে। একটা ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়েটা দরজার চৌকাঠে হাত রেখে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে বাইরের লোকটার দিকে। ফিওনা তার বড় বড় চোখ জোড়া উঁচিয়ে দেখতে লাগল সামনে দাঁড়ানো আগন্তুককে। এই লোকটা যে তার নিজের বাবা, তা বোঝার মতো বয়স বা স্মৃতি কোনোটাই তার নেই। বাবার আদর সে কবেই বা পেয়েছে? অথচ কী আশ্চর্য! অচেনা লোকটাকে দেখেও ভয় পাওয়া তো দূরে থাক, ফিওনা হুট করেই খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করল। তার সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে ফারহান থমকে গেল। মেয়েটা হাসলে ঠিক বেলীর মতো লাগে। ফারহান অবাক হয়ে দেখল, বেলীর আদল যেন মেয়েটার সারা মুখে লেপটে আছে। তার মনে পড়ে গেল, ফিওনা জন্মের সময় বেলী কত আহ্লাদ করে
বলত— “দেখো তো ফারহান, মেয়ের চোখটা ঠিক তোমার মতো আর মুখটা আমার মতো হয়েছে না?”
ফারহান তখন শুনেও শোনেনি, বেলীর সেই খুশিতে সায় দেওয়ার মতো সময়ও তার ছিল না।
আজ সেই দৃশ্যগুলো লহমায় ফারহানের চোখের সামনে ভেসে উঠল। নিজের রক্তের সন্তান সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে, অথচ ফারহান আজ এতটাই অসহায় যে ক্রাচে ভর দিয়ে থাকা এই শরীরে মেয়েটাকে কোলে তুলে নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও তার নেই। একটু আদর করার সাধ্য তার নেই! অপরাধবোধ আর হাহাকার মিলে ফারহানের ভেতরটা যেন দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগল। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তার নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে রইল, সে তার জন্মদাতা পিতা হলেও যার কাছে সে আজ এক জনম অচেনা মানুষ।
সুজির বাটি হাতে নিয়ে আয়েশা দরজার কাছে আসতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। দেখল ফারহান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফিওনার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। আয়েশা এক মুহূর্ত দেরি না করে ছোঁ মেরে ফিওনাকে কোল তুলে নিল, যেন কোনো শিকারি চিলের হাত থেকে নিজের ছানাকে রক্ষা করল।
আয়েশা ফারহানের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। এ কোন ফারহান? সেই ফিটফাট, অহংকারী মানুষটার আজ কী হাল! মাথার চুল আর দাড়ি উশকোখুশকো হয়ে মুখটা ঢেকে ফেলেছে, চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে পাংশু বর্ণ ধারণ করেছে। আর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা হলো তার পা—ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই পঙ্গু মানুষটাকে দেখে চেনা দায়।
আয়েশা ঘৃণা মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী চাই এখানে? ক্যান আইছেন?”
ফারহান ম্লান চোখে কোল থেকে নামতে চাওয়া ফিওনার দিকে তাকিয়ে থেকে ধরা গলায় বলল,
“আমি বেলীকে চাই। বেলী কোথায়?”
আয়েশার মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে চিৎকার করে বলল,
“ক্যান? নোটিশ পাইয়া এখন বেলীর কথা মনে পড়ছে? যখন ওই তৃষ্ণার কথায় বেলীরে আর দুগ্ধপোষ্য বাচ্চাডারে এক কাপড়ে লাথি মাইরা ঘর থেকে বের কইরা দিছিলেন, তখন মন কই আছিল আপনার?”
ফারহান লজ্জায় আর অপমানে মাথা নিচু করে রইল। তার হাত কাঁপছে, ক্রাচটা বারবার পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,
“আমি বেলীর জন্য অপেক্ষা করব। ও কই গেছে?”
আয়েশা গর্জে উঠল,
“তা জানার কোনো অধিকার আপনের নাই। মুখ কালা কইরা এখন বিদায় হন, নাইলে চিল্লাইয়া লোক জড়ো করমু।”
ফারহান এবার শেষ চেষ্টা হিসেবে দম্ভের ভাঙা দেয়াল আঁকড়ে ধরে বলল,
“আইনি মতে কিন্তু বেলী এখনো আমার বউ। ভুইলা যাইস না। তালাক এখনো কার্যকর হয় নাই। আমি আমার বউকে নিয়ে যেতে পারি।”
“আপনার বউ তৃষ্ণাকে এইমাত্র মোড়ের মাথায় অন্য এক লোকের সাথে রিকশায় চড়তে দেখে এসেছি। সেখানে যান। ভুল রাস্তায় এসেছেন কেন?”
পেছন থেকে আসা বেলীর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরে ফারহান আর আয়েশা দুজনেই চমকে উঠল। বেলী কুরিয়ার অফিস থেকে ফিরে এসেছে। তার হাতে কয়েকটা খাম। চোখেমুখে বিরক্তির রেখা।
ফারহান কাঁপাকাঁপা হাত দুটো ক্রাচ থেকে কোনোমতে আলগা করে জোর করে এক করার চেষ্টা করল। সে আর্তনাদ করে বলল,
“বেলী, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি ভুল করেছি। আমি এখন পঙ্গু, আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বেলী। আমি তোমাদের নিতে এসেছি। তুমি আমার মেয়ে তোমরাই এখন আমার শেষ ভরসা।”
#চলবে?
