#নীল_ধ্রুবতারা [অন্তিম পর্ব]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
আমাকে যখন হাসপাতালে আনা হলো, তখন আমার অনাগত সন্তানের জীবনের সলতেটা মিটমিট করে জ্বলছে। গর্ভস্থ বাচ্চার কোনো নড়াচড়া টের পাচ্ছি না। বুকটা হাহাকার করে উঠছে ভয়ে। ডাক্তাররা এমন পরিস্থিতিতে সিজারের কথা ভাবছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার ভয়ানক ডায়রিয়া হয়েছে। মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। স্যালাইন চলছে। ডাক্তার ম্যাডাম আমার মা আর ওই ভদ্রলোক স্বামীকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায়ে বেশ ভালোই ধমকালেন।
হাসপাতালে যতগুলো দিন ছিলাম, ওই তরুণী ডাক্তারটির মতো অমায়িক মানুষ খুব একটা দেখিনি। অসম্ভব রূপবতী, আবার কণ্ঠস্বরও চমৎকার। আমার ডায়রিয়াটা একদিনের মধ্যেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এল, বাচ্চাটাও টিকে গেল। কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। প্রথম আল্ট্রাসনোগ্রাফির হিসাব অনুযায়ী, আমার প্রসবের তারিখ পেরিয়ে গেছে এক সপ্তাহ আগেই। ডাক্তাররা বেশ চিন্তিত। সি-সেকশন করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আমার স্বামী মাহতাব অনেক ছোটাছুটি করে রক্ত জোগাড় করল। অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হতেই আমি হঠাৎ বাধা দিলাম। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে বললাম,
“সিজার করব না। ভুলেও না। আমার প্রচণ্ড ভয় করে।”
তরুণী ডাক্তার আমাকে ধমকে উঠলেন,
“নয় মাস এত কষ্ট করার পর কি মরা বাচ্চা প্রসব করতে চাও?”
কথাটা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠল, কিন্তু জেদ কমল না। মাহতাব আমার হাত ধরে করুণ গলায় বলল,
“কী চাও নবনী? আমাদের বাচ্চাটা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শেষ হয়ে যাক?”
আমি কোনোমতে বললাম,
“মানুষের কি নরমালে বাচ্চা হয় না?”
“তোমার ডেলিভারি ডেট এক সপ্তাহ আগেই পেরিয়ে গেছে!”
“গেলে গেছে। সময় হলে আল্লাহর হুকুমে সে আসবেই। জোর করে টেনেহিঁচড়ে পৃথিবীতে আনার কী দরকার?”
মাহতাব আমাকে অনেক বোঝাল, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলও করল—কিছুই আমার জেদ গলাতে পারল না। আমি পাথরের মতো অনড় হয়ে বললাম,
“যে আল্লাহ আমার বাচ্চাকে এত ঝড়-ঝাপটার পরেও বাঁচিয়ে রেখেছেন, তিনিই তাকে রক্ষা করবেন। ভুল ওষুধ খাওয়ার পরেও তার কিছু হয়নি, এক্সিডেন্টের পরেও সুস্থ ছিল, ডায়রিয়ার পরেও সে ঠিক আছে। শুধুমাত্র সময় হয়নি বলেই সে আসছে না। এর জন্য তাকে নিয়ে টানাটানি করব? না, কক্ষনো না।”
মাহতাব অসহায়ের মতো হাসল, বলল,
“বোকার মতো কথা বলো না। টানাটানি আবার কী?”
আমি শান্ত গলায় বললাম,
“টানাটানি নয় তো কী? সময় হলে সে নিজেই আসবে।”
ডাক্তারদের সামনে অবশ্য এসব যুক্তি ধোপে টিকল না। উনি শুনলেনই না আমার কথা। যুক্তির বাহারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। বরং আমাকে ধমকে চুপ করিয়ে দিলেন। অত সুন্দর একটা মেয়ের গলায় যে এতটা কঠিন ধমক লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। ওনারা সিজারের সিদ্ধান্তে অটল। আমার খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হলো। কিন্তু সব ঠিকঠাক হওয়ার আগমুহূর্তে বিপত্তি ঘটল আমার রক্তচাপ নিয়ে। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় প্রেশার বেড়ে গেছে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে তো আর সিজার করা যায় না। ডাক্তাররা আমার ওপর মহা বিরক্ত হলেন। মাকে ডেকে কঠিন গলায় বললেন,
“আপনার মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে যান। রিক্সে নিতে পারব না। রক্ত-পানি ভেঙে যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে আবার হাসপাতালে যেন না আনা লাগে। জীবনে এমন রোগী দেখিনি!”
মা আমাকে অনেক বোঝালেন, কিন্তু প্রেশার তো মায়ের কথা শোনে না! বরং আমিই উল্টো মাকে বোঝাতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার বিরক্ত হয়ে আমাকে ছাড়পত্র দিয়ে দিলেন। কিন্তু বের হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তরুণী ডাক্তারটি বললেন,
“দাঁড়ান, একবার পেলভিসের মুখটা পরীক্ষা করে দেখি। সময় তো অনেক পার হয়েছে। একবার দেখে দিই।”
তিনি পরীক্ষা করলেন। সামান্য হলেও পেলভিসের মুখ খুলেছে। তিনি কোনো কথা না বলে ছাড়পত্রটা ছিঁড়ে ফেলে শান্ত গলায় বললেন,
“থাকুন। আজ-কালের মধ্যেই ডেলিভারি হবে।”
শুনে আমি স্বস্তি পেলাম। অযথা কাটাকুটির ঝামেলা নেই ভেবেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আচ্ছা, বাচ্চা প্রসবে দেরি হলে মানুষ কেন এত ভয় পায়? কেন এত নিয়ম? প্রকৃতির নিজস্ব একটা ছন্দ আছে। সেই ছন্দেই তো গাছ বড় হয়, বৃষ্টি পড়ে, চাঁদ ওঠে। আমার সন্তানও সেই ছন্দে পৃথিবীতে আসবে। সিজারের ছুরি দিয়ে পেট কেটে তাকে পৃথিবীতে আনার কী দরকার?
পরদিন সকালে আরেকবার পরীক্ষা করা হলো। দেখা গেল আরও খুলেছে পেলভিসের মুখ। খুলেছে, তবে সামান্য। বিকেলের মাঝে না খুললে শেষ অবধি ব্যবস্থা সি-সেকশন। অবশ্য তার প্রয়োজন পড়ল না। দুপুর বারোটার দিকেই আমার চিনচিন করে কোমর ব্যথা করতে লাগল। তীক্ষ্ণ তীব্র ব্যথায় নীল হয়ে যেতে থাকলাম আমি। তলপেটে অনুভব করতে লাগলাম তীব্র টান। সময় যত গড়াল, যন্ত্রণা তত বাড়ল। মনে হলো, আমার শরীরের সমস্ত হাড়গুলো একেকটা খড়ের আঁটির মতো মড়মড় করে ভেঙে যাচ্ছে। যন্ত্রণার সংজ্ঞা যদি হয় তীব্রতা, তবে এই ব্যথা সেই সংজ্ঞা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে আছি। মনে হলো, চোয়ালের হাড়গুলোও বুঝি ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। ব্যথাটা একটু কমে এলেই আমার ঘুম পেতে লাগল ভীষণ করে। মনে হলো সহস্র বছর ধরে আমি ঘুমাই না। ঘুম নামক বস্তুটি চোখের পাতায় ধরা দেয় না বহু বহু কাল। আমি বেডে শুতে গেলাম। বিড়বিড় করতে লাগলাম,
“আমি ঘুমাব, একটুখানি ঘুমাব।”
মায়ের দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বললাম,
“মা, আমি ঘুমাই। বাচ্চা হওয়ার সময় আমাকে ডাক দিলেই হবে। আমি ঘুম থেকে উঠে যাব।”
আমার অতি দুঃখের মুহূর্তেও মা হেসে ফেললেন। কোমল গলায় বললেন,
“তোমাকে ডাকতে হবে না, মা। বাচ্চা হওয়ার কালে তুমি নিজেই উঠে যাবা। এখন তুমি ঘুমাও দেখি।”
কিন্তু ঘুম! সে কি আর আসে? ঘুম আসার আগেই তীব্র যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠতে হয়। আবার যখন ব্যথাটা চলে যায়, খুব করে ঘুম পায়। সে যে কী অসহ্য যন্ত্রণা!
সময়ের সাথে সাথে টের পেলাম, প্রচণ্ড ব্যথায়, চাপে কে যেন আমার পুরো অস্তিত্বকে পিষে ফেলছে। তলপেট থেকে উঠে আসা ব্যথাটা শিরদাঁড়া বেয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোতে এক ধরনের বৈদ্যুতিক শকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল। প্রতিটি হাড় যেন তার জায়গা ছেড়ে সরে গেল তীব্র বেগে। আমি তলিয়ে যেতে লাগলাম এক অতল গহ্বরে, যেখানে অক্সিজেনের বড্ড অভাব। যেখানে কেবল যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা।
যন্ত্রণা সইতে না পেরে মাহতাবের হাতটা পিষে ফেলতে লাগলাম। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালিও দিলাম বোধহয়।
যন্ত্রণার দাপটে আমার কপালে বিন্দু বিন্দু মরণঘাম জমতে শুরু করেছে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। প্রসবের ব্যথা বুঝি একেই বলে! খুবই অসহ্য! ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক!
হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো এই কষ্ট সহ্য করার মতো ক্ষমতা মায়েদের শরীরে কোত্থেকে আসে, কে জানে! প্রসবের প্রতিটি সেকেন্ডকে একটা যুগের সমান মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই যন্ত্রণা বুঝি অনন্তকাল ধরে চলবে। আচ্ছা, আমি কি মারা যাচ্ছি? নাকি এই ভাঙনের পরেই কোনো এক নতুন জন্মের শুরু হবে?
মাহতাব আমার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়েছিল। মাগরিবের আজানের ধ্বনি শুনলাম তখন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম,
“যাও নামাজে যাও। আমার জন্য দোয়া করো। আমাদের সন্তানের জন্য দোয়া করো। যাও।”
মাহতাব চলে যাওয়ার পরপরই ব্যথার যে প্রচণ্ড ঝড়টা আমার শরীরের হাড়-মাংস সব চুরমার করে দিচ্ছিল, হঠাৎ করেই তা থেমে গেল। আমার কণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেল বাতাসে। তারপরই শোনা গেল নবজাতকের প্রথম কান্নার স্বর। কী আছে এক কান্নার শব্দে? তা শুনেই ঘরের গুমোট আবহাওয়াটা সতেজ হয়ে উঠল কেন? আমার মনে হলো বাচ্চাটার কান্নার শব্দের প্রতিটি স্পন্দনে আমার শরীরের সব ভাঙা হাড় যেন জোড়া লেগে যাচ্ছে। মুহূর্তেই সমস্ত যন্ত্রণার ক্লান্তি ধুয়ে মুছে চলে যাচ্ছে দূর থেকে বহুদূরে।
নার্স আমার বুকের ওপর আলতো করে তুলে দিল বাচ্চাটাকে। তাকে জড়িয়ে ধরার মতো শক্তি আমার নেই। আমি নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে তাকে অনুভব করতে লাগলাম। এই তো আমার সেই কোহিনূর হীরে। পৃথিবীর কোনো রাজকোষের ধনদৌলত দিয়ে যার মূল্য মাপা যায় না। কত কত রাজা-বাদশা কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছে ওই এক টুকরো হীরের জন্য, অথচ বিধাতা আজ আমাকে তার চেয়েও দামি এক রত্ন দিয়েছেন। এই রত্ন আমার সন্তান। এই বাচ্চা আমার একান্ত। আমার নিজের। ওর ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমি পৃথিবীর সেরা ধনী, সেরা সুখী মানুষ। এই হীরের কোনো কাট নেই, কোনো পালিশ নেই, কিন্তু এর দ্যুতি আমার চোখের সামনে জগতটাকে উজ্জ্বল করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, সাগরের অতল গহ্বরে লুকানো কোনো দুষ্প্রাপ্য মুক্তো আজ আমার হাতের মুঠোয়। যার জন্য জগতের সকল মানুষ হাহাকার করে, পাহাড়ের চূড়ায় খুঁজে ফেরে মণি-মানিক্য, কিংবা মহাকাশের দূরতম নক্ষত্র থেকে টেনে আনে আলো—সেসবই যেন আজ ম্লান হয়ে গেছে ওর অস্তিত্বের কাছে।
মাহতাব নামাজ থেকে ফিরল দেরি করে। মোনাজাতে বোধহয় খুব কাঁদল সে, কারণ যখন এল দেখলাম বিন্দু বিন্দু জলকণা হয়ে জমে আছে তার চোখের পাতায়। কপালে গভীর একটা স্পর্শ করে আমার গায়ের উষ্ণতা পরখ করল মাহতাব। অবসন্ন শরীর নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। সে অস্ফুটে বলল,
“কেমন আছো বৌ? জানো— আমাদের একটা চাঁদের মতো ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।”
আমি চোখ বুজে নিলাম। শরীরের অবসাদ ছাপিয়ে মরে যাওয়ার মতো সুখ-সুখ অনুভূতি হচ্ছে আমার। মাহতাব বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চুমু খেল, আজান দেওয়ার পর আমার আকাশ উজ্জ্বল করা ধ্রুবতারার কানের কাছে মুখ নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন আর মধুর মন্ত্রের মতো ফিসফিস করে বলল,
“আম্মু… আমার আম্মু!”
আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটির দিকে। আমার ধ্রুবতারাটি মাহতাবের হাতের আলিঙ্গনে কেমন শান্ত হয়ে আছে, দীপ্তি ছড়াচ্ছে। অনিন্দ্য সুন্দর সেই দৃশ্যটি দেখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল আমার ঠোঁটের কোণে। আমি জগতের সকল যন্ত্রণা উপেক্ষা করে হাসলাম। একটুখানি হাসলাম।
—সমাপ্ত—
,
