Thursday, June 18, 2026







নীল ধ্রুবতারা পর্ব-০৯

#নীল_ধ্রুবতারা [৯]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

“খোকা ঘুমাল
পাড়া জুড়াল,
বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে?”

আমি বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বিড়বিড় করে কবিতা আওড়াচ্ছি। ঘুমন্ত বাচ্চাটার মাথা আমার কাঁধের উপর। সে পরম নিশ্চিন্তে আমার কোলে ঘুমাচ্ছে। আমার বুক ভরে উঠছে খুশিতে। আজকাল আমার দিন কাটছে বড় আনন্দে। ওই যে সেদিন স্বপ্নে দেখলাম, একটা বাচ্চার মা আমি। সেদিন থেকেই সময়ে-অসময়ে ঘুমানোর অভ্যাস হয়েছে আমার। ঘুমালেই দেখতে পাই আদুরে বাচ্চাটাকে। কী যে দারুণ বাচ্চাটা! আমার কোলে সে খুব করে হাসে। আজকাল অবশ্য বাচ্চাটাকে দেখার জন্য ঘুমাতেও হয় না। যখন খুব একা থাকি, তখনই আবিষ্কার করি বাচ্চাটা আমার আশেপাশেই আছে। বাচ্চাটাকে সাথে নিয়ে দারুণ দিন কাটে আমার। সারাদিন ঘরে দোর দিয়ে বসে থাকি। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেই। গোসল করিয়ে দেই। দেখতে পাই, লাল টকটকে বাথটাবের পানিতে হাত-পা ছুঁড়ে খেলা করছে বাচ্চাটা। কতবার যে বললাম তাকে, বাচ্চার এটা লাগবে, ওটা লাগবে—মানুষটা ভুলে যায় খালি। মাঝে মাঝে বলে,
“তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নবনী। দিনদিন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যাচ্ছো তুমি!”

আমি তখন হাসি। চিরকাল এই এক কথাই বলে গেল মানুষটা। আমি নাকি পাগল! এতোদিন ঠাট্টা করে বললেও, আজকাল সে কেমন করে যেন আমার দিকে তাকায়—যেন সত্যি সত্যি আমাকে পাগল ভাবছে সে। বিশেষ করে যখন বাচ্চার কথা বলি। আশ্চর্য! মাহতাব এমন করে কেন? আমি বুঝতে পারছি, মাহতাব দায়িত্বশীল স্বামী হলেও চমৎকার বাবা হতে পারেনি। আমার বাচ্চাটার প্রতি সে বড্ড উদাসীন। আমার পুচকে সোনা তার বাবাকে একদম সহ্য করতে পারে না। তাই তো মাহতাব ঘরে এলে সে লুকিয়ে যায়। ঘরময় খুঁজেও কোথাও পাই না আমি তাকে। এজন্যই মাহতাবকে দেখলেই আমার খুব রাগ লাগে। আমি খুব ঝগড়া বাঁধাই তার সাথে। সে যতক্ষণ ঘরে থাকে, অহেতুক চিল্লাতে থাকি। আমি আজকাল কারো সাথেই কথা বলি না। আমার ভালো লাগে না কিছু। শুধু আমার সোনা বাচ্চার সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। আমার এখনো পিরিয়ড হয়নি। নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছি, অথচ সুস্থতার বদলে শরীর আরও খারাপ হয়েছে। মাথার সব চুল পড়ে যাচ্ছে। খাবারের রুচি উঠে গেছে। মাহতাব আমাকে নিয়ে বড়ই চিন্তিত। আমি তার চিন্তাকে কোনো পাত্তা দেই না, আপনমনে থাকি। সে যখন ঘরে থাকে, আমি বারান্দায় গিয়ে বসে বসে আকাশ দেখি। যখন সামান্য টু শব্দটিও করতে আসে, আমি খুব করে ঝগড়া করি তার সাথে। তার চোখ দেখে বোঝা যায়, সে হৃদয়ে চাষ করছে অসহ্য যন্ত্রণা আর বেদনা।

অনেক ঝগড়াঝাটির পর যখন তার বিষাদগম্ভীর মুখটা দেখি, আমার বুকটা তখন হু হু করে ওঠে। পরক্ষণেই কেঁদে-কেটে হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাই। মানুষটা আমাকে ক্ষমা করে দেয় কিনা জানি না। তবে মুখে বলে, “আচ্ছা, আচ্ছা, করলাম ক্ষমা। তবুও প্লিজ কেঁদো না।”

আমিও তবুও কাঁদি। ফিরে আসি বাস্তবতায়। বুঝে নেই আমার ঘরে কোনো বাচ্চা নেই। কোনো পুচকে সোনার হাসির শব্দে মুখরিত হয় না আমার ঘর। সত্যটা উপলব্ধি করতেই যেন আরও বাড়ে আমার পাগলামি। সারাক্ষণ উল্টাপাল্টা চিন্তা করি, কান্নাকাটি করি। মোবাইলে তখন রিলস, ইউটিউব সবখানে শুধু এই জাতীয় নাটকগুলোই আসতো যে—বাচ্চা না হওয়ায় বউয়ের সাথে ছাড়াছাড়ি, কিংবা পরকীয়া, লুকিয়ে বিয়ে ইত্যাদি। স্বপ্নেও তাই দেখতাম। আর উন্মাদের মতো কাঁদতাম। আমার তখন হিতাহিতজ্ঞানশূন্য অবস্থা।
রান্না করলে একদিন লবণ হয় না তো আরেকদিন লবণে তিক্ত। তেল, ঝাল, মসলার অপ্রতুলতার পরিমাণ এতোটাই বাড়ে যে সেই খাবার মুখে তোলা যায় না। ভদ্রলোক অফিস থেকে ফিরে সেই অখাদ্য সোনামুখ করে খেয়ে নেয়। কারণ ভালো-মন্দ কোনো মন্তব্য করলেই যে আমি ফনা ধরা ফণা ধরানো ফণিনীর মতো ফোঁস করে উঠব, সেই তথ্য ততদিনে বুঝে গিয়েছেন তিনি। আমাদের সংসারের অবস্থা তখন—কখনো আমরা চিরশত্রু বা কখনো চির অচেনা। কিন্তু এভাবে কত দিন? একই ছাদের নিচে এমন অপরিচিতের মতো বাস করা যায় না। আবার দুজন চিরশত্রুও একই বিছানায় ঘুমাতে পারে না। অবশ্য সবসময় অশান্তির সূচনা আমিই করতাম। সমাপ্তি ঘটতো তার, “আচ্ছা, আমার-ই ভুল। প্লিজ ক্ষমা করে দাও” বাক্যে।

একদিন পাশের ফ্ল্যাটের এক আন্টি আমার কাছে এলেন। ভদ্রমহিলা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। দারুণ মার্জিত কথাবার্তা, নমনীয় ব্যবহার, বাচনভঙ্গি চমৎকার। উনার সাথে কথা বললে খুব শান্তি শান্তি লাগে। শান্তিপ্রিয় মানুষটি আমার ঘরে এসে মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন,
“কেমন আছো নবনী? কী হয়েছে তোমার? এমন শুকিয়ে গিয়েছো কেন?”

আমি সত্যিই জানি না আমার কী হয়েছে? কেন বাস্তব আর অবাস্তবের মাঝে বসবাস করছি আমি? কেন ভুলে যাই নিজের অস্তিত্বের কথা? কেন অবাস্তব এক পৃথিবীতে খুঁজে বেড়াই সন্তান সুখ? অপার্থিব ওই জগৎ যে আমার নয়! বুঝেও কেন অবুঝের মতো কাজ করছি? কেন আমার সুখের সংসারে স্বেচ্ছায় বপন করছি অশান্তির বীজ?

আন্টির প্রশ্নের জবাবে ছোট করে বললাম, “ভালো।”
“তোমাদের মাঝে কী হয়েছে বলো তো! যদিও কারো দাম্পত্য জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আমার নেই, তবুও রোজ রোজ তোমার চিৎকার কানে লাগছে। তুমি রাগ কোরো না নবনী, তোমার স্বামীর কন্ঠ তো কখনোই আসে না। একা একা তুমিই চিল্লাতে থাকো। কারণ কী নবনী?”

কারণ যে আমি নিজেও জানি না। তবে এটা জানি, ভদ্রমহিলা আমার স্বামীকে অতিমাত্রায় পছন্দ করেন। আমার স্বামীর ভদ্রতা, নমনীয়তা, যত্নশীল স্বভাবের কারণে উনি প্রায়ই গুণগান করেন। তার উপর সে রূপবান পুরুষ। এমন সৌন্দর্য আর মধুর ব্যবহার কোনো মানুষের মাঝে একসাথে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই কারণেই সকলে তাকে পছন্দ করেন ভীষণ। করেন কারণ, আশেপাশের অন্য ভাড়াটে পুরুষরা যখন অবসর সময়ে বাসায় থেকে এখানে ওখানে উঁকিঝুঁকি মারেন, প্রকাশ্যে সিগারেট ফোঁকেন, মেয়েদের আড্ডায় কেমন হ্যাংলামি করে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন আমার স্বামী ঘরে বসে আমার সাথে খোশমেজাজে গল্প করেন। রান্নায় সাহায্য করেন। ঘরদোর পরিষ্কার করেন। আজ অবধি সে ভিন্ন কোনো মেয়ের দিকে চোখে চোখ রেখে কথা বলেনি, মাহতাব। নত মস্তকে সে চলাফেরা করে সবসময়। ওর এই ভদ্রতার কারণে সকলের কাছেই উনি প্রশংসিত। এই আন্টি যে আমার স্বামীকে নিপাট ভদ্রলোক ভেবে প্রগাঢ় এক স্নেহ অনুভব করেন তা আমি জানি। তাই উনার কথার কোনো সদুত্তর দিতে পারলাম না।

আন্টি আবারও বললেন,
“সংসারে রোজ রোজ অশান্তি করা উচিত নয় নবনী। তোমার হাজবেন্ড খুবই ভালো ছেলে। ওর সাথে কেন ঝগড়াঝাটি করো? ও পুরুষ মানুষ, সারাদিন বাইরে খেটেখুটে আসে। বাসায় এসেও যদি একটু শান্তি না পায় তবে ওর কী ভালো লাগে? এমন চলতে থাকলে একটা সময় পর ওর ঘর থেকে মন উঠে যাবে। একটি সুন্দর সংসার কিন্তু এমনি এমনি গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সহনশীলতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে। তোমাকে এটা বুঝতে হবে।”

ভদ্রমহিলা একটু থামলেন। আমি মন দিয়ে উনার কথা শুনছি। উনার কথা শুনতে আমার ভালো লাগে। দারুণভাবে উনি সামান্য বিষয়কেও অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেন। উনি আবার বললেন,
“দেখো নবনী, আমি জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে এইটুকু বুঝেছি—সংসার আসলে একটা ফুলের বাগানের মতো। প্রতিদিন একটু করে যত্ন না নিলে সেখানে আগাছা জন্মাতে দেরি হয় না। স্বামী হচ্ছে মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে অবহেলা বা ঝগড়া দিয়ে নষ্ট কোরো না। দিনশেষে কিন্তু ক্ষতি তোমারই হবে। শোনো, ভালোবাসা দিয়ে যা আদায় করা যায়, তা ঝগড়া করে কোনোদিন হয় না। ও পুরুষ মানুষ, ওর উঁচু গলা আজ অবধি শুনলাম না আমি, অথচ তুমি মেয়ে মানুষ, তোমার গলার স্বর আশেপাশের সবাই চেনে। অদ্ভুত না! ও কি চাইলেই তোমার সাথে চিৎকার করতে পারে না?”

ভদ্রমহিলা আরও অনেক অনেক জ্ঞানের কথা বিতরণ করলেন। আমি শুনলাম মন দিয়ে। কোনো কথা বললাম না। যাবার আগে উনি বললেন,
“তুমি কিন্তু আর ঝগড়া করবে না মাহতাবের সাথে। আজ বাসায় ফিরলে হাসিমুখে কথা বলবে। বুঝেছো?”

আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম। বুঝালাম হাসিমুখেই কথা বলব। অশান্তি করব না আর। কিন্তু দেখা গেল আমি অশান্তি না করে থাকতে পারলাম না। চাপাস্বরে অশান্তি করলাম সেদিন। কারণ সে আসার কিছুসময় আগেই বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়াচ্ছিলাম আমি। হঠাৎ সে এসে যাওয়ায় আমার ঘুমন্ত বাচ্চাটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। প্রাণভরে দেখতেও পেলাম না। আর তখন থেকে মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে লাগলাম আমি। তীক্ষ্ণ এক ধরণের ব্যথায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল আমার পৃথিবী। মাহতাবকে খুব করে গালি দিলাম সেদিন। একপর্যায়ে তুই-তুকারি করে পরিস্থিতি করে তুললাম আরও জটিল। আশ্চর্য, আমার সব অন্যায় মেনে নিলেও মাহতাব তুই সম্বোধন মেনে নিতে পারল না। চাপা আক্রোশে আমার বাহু চেপে ধরে বলল,
“এই যে এতো ঝগড়াঝাটি করি দুজনে। বিবাহিত জীবনের এতো বছরে খুব রাগ করেও কখনো তোমাকে তুই বলে ডেকেছি আমি?”

তার কন্ঠস্বর খুব অচেনা ঠেকল। আমি বুঝতে পারি মানুষটা ভয়ংকর রেগে গিয়েছে। এতোবছরের বিবাহিত জীবনে এতোটা রাগ করতে তাকে কখনোই দেখিনি। আমি ভয় পেলাম। মাহতাবের এই রূপ বড্ড অচেনা লাগল আমার। আমি এই মাহতাবকে চিনি না। আমি যাকে চিনি, সে আমার উপর চিৎকার করতে পারে না। সে আমার হাত এতো জোরে চেপে ধরার এখতিয়ার রাখে না। তার লাল টকটকে চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কেঁদে ফেললাম। মাহতাব আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি তখন কাঁদলাম। ভীষণ করে কাঁদলাম। আমার কান্নায় ভিজে গেল বালিশ।

মানুষটা ঘরে ফিরল অনেক রাত করে। দরজা ভিড়িয়ে ঘর অন্ধকার করে আমি জানালা দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে ছিলাম তখন। সে এসে গলা খাঁকারি দিল। অন্ধকারেও কীভাবে যেন টের পেল আমি বসে আছি জানালার ধারে। ভারিক্কি কন্ঠে বলল,
“ঘুমাওনি কেন?”

আমি জবাব দিলাম না। তার সন্ধ্যার ব্যবহার আমি ভুলতে পারি নি। আমার মনটা তীব্র অভিমানে দ্রবীভূত হয়ে আছে। তীব্র অভিমান প্রকাশের ভাষা থাকে না। তাই তো নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে আমি বসে রইলাম নির্বিকার। মাহতাব এগিয়ে এসে বিছানায় পা তুলে আমার সামনে বসল। তার গা থেকে ভদভদ করে সিগারেটের গন্ধ আসছে। এই মানুষটা সিগারেট খেয়েছে? রাগে, ঘৃণায় আমার শরীর কাঁপতে লাগল। সিগারেটের গন্ধ আমার একদম সহ্য হয় না এটা সে জানে। তবুও? সে কাছে এগিয়ে আসায় আমি নাকে ওড়না চাপা দিলাম। তীব্র বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে থাকলাম অন্যদিকে। মাহতাব জোরপূর্বক আমার হাত টেনে নিয়ে কোমল গলায় বলল,
“তখনকার ব্যবহারের জন্য সরি নবনী। আসলে আমার মাথা ঠিক ছিল না। তুই ডাকটা আমি সহ্য করতে পারি না। তুমি তো আমার বৌ, ভালোবাসি তোমায় আমি। তুমি আমাকে তুই করে ডেকেছো দেখে আমার মাথাটা হুট করে গরম হয়ে গিয়েছিল।”

আমি ছোট করে শ্বাস ফেলে বললাম,
“ওহ আচ্ছা।”
“দেখো নবনী, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হবে সম্মানের। সেখানে তুই ডাকটা মানায় না। যতই ঝগড়া হোক, ঝামেলা হোক তবুও তুমি প্লিজ কখনো তুই করে ডাকবে না আমায়।”
এই প্রসঙ্গে কথা বাড়ালাম না। বরং বললাম,
“তুমি সিগারেট খেয়েছো?”

সে লজ্জায় মাথা নত করে নিল। অন্ধকারের মাঝেও স্পষ্ট দেখলাম তার অপরাধীর মতো নামিয়ে নেওয়া মুখ। ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে তার দিকে ধরতেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। টকটকে লাল হয়ে আছে চোখ। বোঝা যাচ্ছে খুব কেঁদেছে। কিংবা সিগারেটের ধূম্রজালের কারণে জ্বলছে চোখ-মুখ। সিগারেটের গন্ধে আমার বমি বমি লাগছে। আমি করুণ গলায় বললাম,
“তুমি প্লিজ গোসল করে আসো। সিগারেটের গন্ধে আমার মাথা ঘুরছে।”

মাহতাব গোসল করে এল। এবং শুয়ে শুয়ে সারারাত এপাশ-ওপাশ করল সে। সকালে উঠে হঠাৎ বলল,
“ভাবছি তোমাকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাব। এমন করে তো চলতে পারে না!”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কেন? পাগলের ডাক্তারের কাছে গিয়ে আমার কী কাজ? আমি কি পাগল?”
সে কিছু বলল না। তবে চোখ-মুখ দেখে ধারণা করলাম সে আমাকে সত্যিকার অর্থেই পাগল ভাবছে। আচ্ছা, আমি কি সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি? ভাবতে গিয়েই মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম। আমার সমস্ত বোধ অসাড় হয়ে গেল। লোপ পেতে থাকে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা। আমার জগৎ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় একটা বাচ্চা। গোলগাল চেহারার সুন্দর একটা বাচ্চা।

পরবর্তী কয়েকদিন মাহতাব খুব চেষ্টা করল আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার। কিন্তু আমি তো পাগল নই। কেন যাব পাগলের ডাক্তারের কাছে? বরং মাহতাব আমাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চায় ভেবেই আমার কান্না পায়। শেষ অবধি আমাকে পাগল প্রমাণের জন্য এমন উঠেপড়ে লাগল মাহতাব? অবশ্য লাগবেই তো! আমাকে পাগল প্রমাণ করে কোনোভাবে দায়মুক্ত হতে পারলেই তো আবার বিয়ে করতে পারবে সে। তীব্র আর প্রচন্ড একটা দম বন্ধ করা অনুভূতি বয়ে চলে আমার বুক জুড়ে। কী করব, কোথায় যাব? আমার ভবিষ্যৎ কী ভেবেই অস্থির হই। আর সংসারে বাধাই অশান্তি।

পনেরো দিন কেটে যাবার পরেও যখন পিরিয়ড হলো না, তখন মাহতাব চিন্তায় পড়ে গেল। আমাকে আবার নিয়ে যেতে চাইল ডাক্তারের কাছে। কিন্তু আমার ভয় হলো, ভুলিয়ে মিথ্যে বলে সে যদি আমাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়? আমি ডাক্তারের কাছে যাবার প্রসঙ্গে নিমরাজি হলাম। শত চেষ্টা করেও মাহতাব আমার সংকল্পে কিঞ্চিৎ ফাটল ধরাতে পারল না। বুঝাতে পারল না, আমাকে নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নয়, গাইনি চিকিৎসকের কাছে যাবে সে।

তবে মাহতাব নিজেও তো রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। তারও তো ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। একদিন প্রচন্ড ঝগড়ার পর আমার অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা দেখে আমাকে মায়ের কাছে রেখে গেল সে। এছাড়াও আরেকটা কারণ বোধহয় ছিল। কোনো এক বজ্জাত পাগলের ডাক্তার সব শুনে তাকে বলেছে,
“আপনার স্ত্রীর থেকে কয়েকদিন দূরত্ব বজায় রাখুন আপনি। দেখুন তার মানসিক অবস্থা কী হয়। হতে পারে একা একা থাকার কারণে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছেন। উনাকে সবসময় লোকসমাগমের মাঝে রাখা দরকার।”

মাহতাব আমাকে রেখে চলে গেল। এখানে আমার খুব সমস্যা হয়েছে। বাড়ি ভর্তি লোকজন। আমার তিন চাচার পাশাপাশি বাড়ি। সুতরাং জায়গা সংকুলান থাকলেও মানুষের সংকট নেই। সারাদিন বাচ্চাকাচ্চা-র ক্যাঁচক্যাচ। আমার এসব বাচ্চাকে ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে নিজের ওই সোনা বাচ্চাকে। অথচ তাকে দেখতে পাই না আমি। ওই যে বললাম, খুব যখন একা থাকি তখন সে আসে। এখানে একা থাকার পরিবেশ কোথায়? তাছাড়া আরেক যন্ত্রণা হয়েছে আমার। আমি কিছুই খেতে পারি না। শুধু লেবু আর মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাই। চেহারা শুকিয়ে শেষ। নিয়মিত ডাক্তারের ওষুধ খাবার পরেও আমার পিরিয়ড হচ্ছে না দেখে মা আবার ভালো বড় ডাক্তার দেখাবেন বলে ভাবলেন। এদিকে কোরবানির ঈদ আসন্ন। জেলা শহরের বড় গাইনি ডাক্তারের সিরিয়াল পাওয়া গেল ঈদের পর। আমি সন্দেহের সুরে মাকে ডেকে বললাম,
“আচ্ছা মা, তুমিও আমাকে মিথ্যে বলে পাগলের ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবে না তো!”
মা কঠিন মুখে জবাব দিল, “পাগলের ডাক্তার কেন দেখাব, তুই কি পাগল? আশ্চর্য! আর শোন, আজকে জামাই আসবে। ওর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঈদ করবি।”

আমি বাধ্য মেয়ের মতো মেনে নিলাম। এবং ওর অফিস ঈদের ছুটি হবার দিনেই চলে গেলাম শ্বশুরের ভিটেতে ঈদ করতে। কিন্তু আনন্দের ঈদ তো সকলের জন্য আনন্দ বয়ে আনে না, কারো কারো জন্য বয়ে আনে বিষাদ!

—চলমান—

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ