#নীল_ধ্রুবতারা [৮]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
“তোমায় দেখতে দেখতে আমি,
যেন অন্ধ হয়ে যাই।
দুনিয়াতে তুমি ছাড়া,
কিছু দেখার তো আর নাই।”
গোসল সেরে বের হয়ে ওয়াশরুমের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াল মাহতাব। গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল প্রিয় গানটি। আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখে আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। ওর মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। বুকে হাত দিয়ে মাহতাব বলে উঠল,
“এমন করে হেসো না, নবনী। তোমার হাসি যে আমার মরণাস্ত্র।”
এই লোকটা বরাবর অতিরিক্ত প্রশংসা করে। কখনো যদি সামান্য মাথায় ঘোমটা দিয়েও তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, সে বলবে,
“কী আশ্চর্য, আজ তোমাকে এতো সুন্দর লাগছে কেন, নবনী?”
আমি কৃত্রিম অভিমান করে বলি,
“শুধু আজ লাগছে? অন্য সময় লাগে না?”
“সবসময় লাগে।”— দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেয় সে।
কোনো খাবার রান্না করলে প্রশংসায় ভাসায় আমাকে। এমন একটা ভাব করে যেন এতো সুস্বাদু খাবার সে জীবনেও খায়নি। কে জানে— এটা হয়তো আমাকে খুশি করার একটা টেকনিক। তার এই অতিরিক্ত প্রশংসা শুনে আমি ফুলে-ফেঁপে বেলুন হয়ে যাই। আজও হলাম। এগিয়ে গিয়ে তার সদ্য মেদ জমতে থাকা পেটে একটু গুতো দিয়ে কপাল কুঁচকে শুধালাম,
“সারাক্ষণ ফ্লার্টিং! আমাকে পটানোর জন্য এতো পাম দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তোমার বিয়ে করা বউ।”
“আমি তোমাকে পাম দেই? এটাই মনে হয় তোমার?”
মাহতাব ভারী বিস্মিত হয়। যেন এমন মিথ্যে দোষারোপ শুনে সে খুবই মর্মাহত হয়েছে। আমি হতাশ হয়ে তার কাঁধের তোয়ালে কেড়ে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলাম। দড়িতে ভেজা তোয়ালে মেলে দিয়ে ফিরে আসার সময় টের পেলাম মাহতাব আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার উন্মুক্ত বুকে ধাক্কা খেলাম আমি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
“ভূতের মতো চুপিচুপি পেছনে এসে দাঁড়িয়ে আছো কেন? চলো, খাবে চলো।”
মাহতাব আমাকে কায়দা করে ঘুরিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। নাক ডুবাল আমার ঘাড়ে। তার উষ্ণ নিশ্বাস তোলপাড় তুলল আমার বুকে। ফিসফিস করে বললাম,
“কী করছ, কেউ দেখে ফেলবে।”
“কেউ দেখবে না। আর দেখলেই বা কী? আমি আমার বউকে জড়িয়ে ধরেছি। তাতে কার কী?”
চারদিকে গাঢ় অন্ধকার নেমেছে বহু আগে। দেখাদেখির কোনো বিষয় নেই। তবুও আমি করুণ গলায় বললাম,
“ছাড়ো।”
“কেন ছাড়ব? ছাড়ার জন্য ধরেছি নাকি?”
“তোমার না খিদে পেয়েছে। এসো, ভাত দিই।”
“যার বউ রাত দুপুরে পরী সেজে বসে থাকে, তার খিদে ভাতে মিটে না।”
আমি জোর দিয়ে ওর হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে নাক টেনে দিয়ে বললাম,
“কিসে মিটে তবে?”
“বোঝো না?”
“না।”
“ঘরে চলো, বুঝাচ্ছি।”
মানুষটা আমাকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক আক্রমণে আমি আঁতকে উঠে বললাম,
“আরে, পড়ে যাব তো!”
মানুষটা আমাকে পড়ে যাওয়ার সুযোগ দিল না। সেই রাতে খুব করে ভালোবাসল সে আমায়। রাতের খাওয়ার চিন্তা বেমালুম ভুলে গিয়ে মত্ত হলো আমাতে। মধুর মিলন শেষে তার বুকে মাথা রেখে আহ্লাদী গলায় বললাম,
“আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে?”
“আমি কি তোমাকে কখনো মিথ্যে কথা বলি?”
“না, বলো না। কিন্তু আজ খুব সত্যি করে একটা কথা বলো তো…”
মাহতাব কান খাড়া করে রইল। আমি আলতো হাতে আঁচড় কাটতে লাগলাম তার বুকে। কথাটা কীভাবে গুছিয়ে বলা যায়, সেটাই ভাবতে লাগলাম। মাহতাব আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলল,
“চুপ করে আছো কেন? বলো, কী জানতে চাইছ?”
আমি শুকনো ঢোক গিললাম। অন্ধকারে আমার চোখ ছলছল করে উঠল। বিড়বিড় করে বললাম,
“আচ্ছা, আমার যদি বাচ্চা না হয়, তবে কি তুমি আরেকটা বিয়ে করবে?”
মাহতাব তার বুক থেকে আমাকে সরিয়ে দিল। তার দিকে তাকিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে রইলাম আমি। সে দুই হাতে আমার গাল চেপে ধরে আক্রোশ নিয়ে বলল,
“পাগলের মতো কথা বলছ কেন, নবনী? বাচ্চা না হলে আমি আবার বিয়ে করব কেন? একটা সংসারে বাচ্চাই কি সব? আল্লাহ যদি আমাদের বাচ্চা না দিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন, তবে তাই সই। আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনার ওপর অখুশি হবার তুমি-আমি কে? এসব আজাইরা কথা ভেবো না। এই যে আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি, তুমি আমায় ভালোবাসো—এসব কি কিছুই নয়?”
আমি চুপ করে রইলাম। মাহতাব গাল ছেড়ে কপালের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিল। করুণ গলায় জানতে চাইল,
“নবনী, আমাদের এতো ভালোবাসার পরেও কি একটা সংসার পূর্ণতা পায় না? এই ভালোবাসা নিয়ে আমরা কাটিয়ে দিতে পারি না গোটা জীবন?”
আমি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলাম। এই মানুষটার সাথে গোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মতো সৌভাগ্যের আর কী-ই বা আছে? সে আমাকে যতটা ভালোবাসে, এতো ভালো আর কেউ কখনোই বাসে নি। তবুও আমার ভয় লাগে। সেই ভয় থেকেই চোখের কোণ বেয়ে নামে অসহায়ত্বের অশ্রু।
আমার কান্না দেখে হতাশ হলো মাহতাব। বলল, “বোকার মতো কাঁদছ কেন? এই কান্না যদি বাচ্চার জন্য হয়, তাহলে বলব—বিয়ের এতোদিন পরেও তুমি এখনো আমাকে চিনতে পারোনি, নবনী।”
আমার কান্না বাড়ল। তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলাম। মাহতাব আমাকে আগলে নিয়ে সান্ত্বনা দিল,
“শোনো, বাচ্চা হচ্ছে আল্লাহর দেওয়া আমানত। এখন আমার মালিক যদি আমাকে সেই আমানত না দিয়ে খুশি থাকেন, তবে আমাদের কি উচিত নয় ভাগ্যকে মেনে নেওয়া? তুমি জানো, আমার দূরসম্পর্কের এক আপুর বিয়ের বিশ বছর পর বাচ্চা হয়েছে। উনি একটা মেয়েকে দত্তক নিয়েছিলেন। সেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর, যখন মেয়ের বাচ্চা হবে, তখন দেখা গেল এতো বছর পর উনিও প্রেগন্যান্ট। তাহলে বোঝো, আল্লাহর বিচার কত চমৎকার!”
মাহতাব আরও অনেক হাদিস, কুরআনের কথা বলল। নিজের জানা এমন অনেক ঘটনার বিস্তারিত জানাল আমাকে। শেষে আমাকে এটা বলেও আশ্বস্ত করল যে—সিস্ট থাকলেও বাচ্চা হয়। শুধু নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা প্রয়োজন। তার এসব ছেলেভুলানো কথায় অবশ্য আমার হৃদয় তৃপ্ত হলো না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। এবং ঘুমের ঘোরে অদ্ভুত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখলাম।
একটা ফুটফুটে বাচ্চা আমার কোলে বসে আছে। বাচ্চাটা ছেলে না মেয়ে বোঝা যাচ্ছে না। সে খুব হাসছে। কী যে সুন্দর হাসি! মায়াবী মুখ। গোল গোল চোখ। সেই চোখ চকচক করছে খুশিতে। আমার এতো ভালো লাগল বাচ্চাটাকে। আমি তাকে খুব করে আদর করলাম। স্বপ্নে মনে হলো এটা আমারই বাচ্চা। আমি নিজের বাচ্চার গালে অসংখ্য চুমু খেলাম। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলাম তার ছোট্ট মুখ। অনেকক্ষণ খেলার পরে বাচ্চাটা কাঁদতে লাগল। আমি তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরময় হাঁটতে লাগলাম। একসময় তার কান্না থামল। আমি নিঃশব্দে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম।
“বউ!”
আমার ঘুম ভাঙল মাহতাবের ডাকে। ঘুম ভাঙলেও ঘোর কাটল না আমার। মাহতাবের ‘বউ’ ডাকে মেজাজ হারালাম হঠাৎ। কঠিন চোখে তাকিয়ে মুখ চেপে ধরে চাপা স্বরে বললাম,
“হুশ! দেখছ না, বাবু ঘুমাচ্ছে। একদম শব্দ করবে না।”
সে অবাক হয়ে গেল আমার ব্যবহারে। অবশ্য পরপরই নিজেকে সামলে নিলাম আমি। খেয়াল করলাম—মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসছে নামাজের আহ্বান। তার মানে ভোর হয়ে এসেছে। শুনেছি ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। যদিও আমার এই স্বপ্নটা সত্যি হওয়ার নয়। ইশ! আফসোসের অনলে দ্রবীভূত হলো আমার মন।
মাহতাব বলল,
“স্বপ্ন দেখছিলে নাকি?”
“হুঁ।”
আমি মাথা ঝাঁকালাম। আমার জীবনে এই স্বপ্নটা ভয়ংকর সুন্দর। ইশ! এমন সুন্দর স্বপ্ন যদি রোজ দেখতে পেতাম। গোসল করে মাহতাব নামাজে চলে গেল। আমিও গোসল সেরে এসে চা বানালাম। রান্না করলাম। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে দিনের কাজকর্ম গুছিয়ে নিলাম আমি। মাহতাব অফিসে চলে গেলে অখণ্ড অবসর নিয়ে ভাবতে বসলাম। ভাবতে লাগলাম আমাদের প্রেম থেকে বিয়ের ঘটনাগুলো। মাহতাব আমাকে প্রথম সাক্ষাতের দিন কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। অথচ আমি ভেবেছিলাম সে বোধহয় হাঁটু মুড়ে বসে আমাকে গোলাপফুল বাড়িয়ে দিয়ে বলবে,
“নবনী, আই লাভ ইউ। ডু ইউ লাভ মি?”
কিন্তু সে দাঁড়িয়ে থেকে ফুল বাড়িয়ে দিয়ে ফটাফট বলে দিল, “আই লাভ ইউ।”
তার গলা কাঁপল। দৃষ্টি এলোমেলো হলো। আশ্চর্য! কথাটা বলার সময় সে একটা বার আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল না। তার চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছিল দূরের সুপারি গাছ, উড়ন্ত পাখি, দূরের পাঁচতলা বিল্ডিং ইত্যাদি ইত্যাদিতে। তখন আমার মনে হলো, ইশ! কী গাধা ছেলের প্রেমেই না পড়েছি। গাধা ছেলের আমাকে প্রেম নিবেদনের মাঝেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বৃষ্টি। ঝকঝকে সূর্যের আলো সরে গিয়ে হঠাৎ আকাশ ঢেকে গেল কালো মেঘে। আমাদের ভালোবাসা-বাসির দৃশ্য বদলে গেল তখন। দুজনে প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম আমরা। দিঘির মাঝে যে সুন্দর ছাতাটা আছে, তার নিচেই দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাহতাব অপূর্ব ব্যবস্থা দেখে বিড়বিড় করে বলল,
“বাহ, এটা খুব দারুণ তো!”
বলতে বলতে সে অপার মুগ্ধতা নিয়ে চারপাশে দেখতে লাগল। আমি এক দৃষ্টিতে অন্যমনস্ক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আকাশ থেকে রুপোলি সুতোর মতো টিপটিপ করে বৃষ্টি নামছে। বিরামহীন বৃষ্টি। আমরা দুজনে একসাথে দাঁড়িয়ে অনেকটা সময় বৃষ্টি দেখলাম। কোনো কথা বললাম না। আমি বোধহয় বৃষ্টি নয়, এক নজরে পলক না ফেলে তাকেই দেখছিলাম। আর অনুভব করছিলাম অসম্ভব সুপুরুষ একজন মানুষের সাথে আমার প্রেম হয়েছে।
সুদর্শন পুরুষটি একসময় আমাকে বলল,
“তোমার হাতটা দেবে, নবনী?”
তার এই আবদার শুনে আমার শরীর ঝিমঝিম করে উঠল। সে আমার হাত ধরতে চাইছে? কী আশ্চর্য কথা! জীবনে কখনো পুরুষের সংস্পর্শে না যাওয়া আমি ভীষণ দ্বিধায় পড়ে গেলাম। নিজের হাত দুটো পেছনে লুকিয়ে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালাম। সে অনুরোধের স্বরে বলল,
“প্লিজ দাও।”
আমি আরও গুটিয়ে নিলাম নিজেকে। পিছিয়ে গেলাম দু কদম। মানুষটা আমার দিকে দু কদম এগিয়ে এল। তীব্র অধিকারবোধ থেকে আমার হাত টেনে নিয়ে পকেট থেকে আঙটি বের করে পরিয়ে দিল অনামিকায়। আমি এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিতে পারলাম না। আমার সমস্ত বোধ, শক্তি অসাড় হয়ে গিয়েছে। আমি টের পাচ্ছি, যতটা সাহস নিয়ে উনি আমার হাত ধরেছিলেন, সেই সাহস কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে আকাশে। তিরতির করে তার হাত কাঁপছে। আমার তখন খুব হাসি পেল। ফিক করে হেসে দিয়ে বললাম,
“ওরে আমার সাহসী রে! এমন ইঁদুরের কলিজা নিয়ে প্রেম করলেন কীভাবে আপনি?”
মানুষটার সাথে সেই আমার বাস্তবে বলা প্রথম কথা। মেসেজে সারাক্ষণ ‘তুমি’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা আমি, ‘আপনি’ বলেই সম্ভোধন করেছিলাম তাকে। আমার কথা শুনে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়েছিল সে। আমতা আমতা করে বলছিল,
“আসলে নার্ভাস লাগছে খুব।”
“আমারও।”
সে আমার কথা শুনে মুচকি হাসল। আমি তার হাসি দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। মানুষটা কি জানে হাসলে তাকে কতটা সুন্দর লাগে? সে কি জানে—তার হাসি দেখে একটা রমণীর হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছে? এবং সে একজন ভয়ানক সুপুরুষ! জানে মানুষটা? কী ভীষণ রূপবান সে!
আমি তার দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে রইলাম। আমার এই উনিশ বছরের জীবনে এমন সুদর্শন পুরুষ কখনোই দেখিনি আমি। একসময় সে বলল,
“তারপর বলো, কেমন আছো?”
“ভালো। আপনি?”
“আগে শুধু ভালো ছিলাম। এখন খুব বেশি ভালো আছি।”
“কেন? বেশি ভালো কেন?”
“কারণ নবনী নামের এক সুন্দরী মেয়ের সাথে আজ আমার দেখা হয়েছে। তাকে দেখার পর থেকে আমি ভীষণ ভীষণ ভালো আছি।”
আমার ভীষণ লজ্জা লাগল। আমি সুন্দরী নই। তবুও মানুষটা কেমন গর্বের সহিত ‘সুন্দরী’ দাবি করছে আমাকে! যেন আমি বিশ্বসুন্দরী। আচ্ছা, এই মানুষটা এতো ভালো কেন? কেন এতো ভালো সে? আমার খুব কাঁদতে মন চাইল। সুখের কান্না। নিজের হাতের চিকন সোনার আঙটির দিকে আমি একমনে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেটা খুলতে খুলতে তাকে বললাম,
“এটা আমি নিতে পারব না, মাহতাব। আপনি এটা নিজের কাছে রাখুন।”
মাহতাব আঙটিটা নিল না। মর্মাহত হয়ে জানতে চাইল, “কেন?”
“কারণ, মা আমার হাতে আঙটি দেখলে সন্দেহ করবে। এটা আবার স্বর্ণের আঙটি। আমাকে জিন্দা দেখতে চাইলে এইটা আপনি সাথে নিয়ে যান।”
মাহতাব জোর দিয়ে বলল,
“আমি এটা তোমার জন্য এনেছি। তিন মাসের স্যালারি থেকে অল্প অল্প টাকা জমিয়ে কিনেছি আঙটিটা। প্লিজ ফিরিয়ে দিও না।”
অনেক জোরজবরদস্তি করেও আমি তাকে হারাতে পারলাম না। শেষ অবধি এই আঙটির সৎগতি করলাম বান্ধবীর কাছে গচ্ছিত রেখে। সে লুকিয়ে রাখল তার বাড়িতে নিয়ে। তার আরও অনেক দিন পরে সেটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বললাম,
“মা, একটা আঙটি পেয়েছি। দেখো তো এটা স্বর্ণের কিনা!”
মা হাতে নিয়ে দেখেছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় পেয়েছি। আরও অনেক জেরার পরেও যখন সন্দেহের অবকাশ রইল না, তখন স্বর্ণের আঙটি বলেই ঘোষণা দিলেন। এবং যেহেতু এটা কুড়িয়ে পেয়েছি আমি, সেহেতু এই বস্তুর আসল উত্তরাধিকারীও আমি। আঙটিটা সেভাবেই হস্তগত হয়েছিল আমার।
যা ভাবছিলাম—সেদিন বৃষ্টিভেজা দুপুরে হুড়তোলা রিকশায় সারা শহর ঘুরেছিলাম আমরা। বসেছিলাম নামী-দামী রেস্টুরেন্টে। অবশ্য কাবাবের মাঝে হাড্ডি হয়েছিল আমার প্রিয় বান্ধবী। একা একা একটা ছেলের সাথে ঘুরে বেড়ানোর সাহস আমার কোনো কালেই ছিল না। সেদিন আমাদের আরও অনেক মধুর আলাপ হয়েছিল। হাস্যরসের সাথে সুন্দর সময় কাটিয়েছিলাম তিনজন। এরপর সন্ধ্যার ঠিক আগে বিষণ্ণ মনে সে বিদায় নিয়েছিল আমার থেকে। আমার শহর থেকে। দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে ধরণীতে যখন আয়োজন করে সন্ধ্যা নামছে, তখন মাহতাবকে বিদায় দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। সে এখন চলে যাবে! সারাদিনের এতো মধুর ঘটনাগুলো কেবলই স্মৃতি হয়ে রবে আমার মনে। এই পৃথিবী কী ভীষণ নিষ্ঠুর! যে পৃথিবীতে মাহতাব নেই, সেই পৃথিবী কী ভীষণ জঘন্য!
মানুষটার দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা হু হু করে উঠল। মনে মনে হাজারবার তাকে প্রশ্ন করলাম, কেন এলে মাহতাব? কেনই বা চলে যাচ্ছো? আমাকে এতো কষ্ট দেওয়ার কী-ই বা প্রয়োজন ছিল? সে শুনল না আমার প্রশ্ন। বরং অতলান্ত বিষাদের ছায়া মুখে মেখে এগিয়ে এল আমার দিকে। চোখের চপল চাহনি মিলিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। সেথায় বাসা বেঁধেছে এক পৃথিবী বিষাদ। তার ওই আর্দ্র চোখের দিকে তাকিয়ে আমার বড় মায়া হলো। চোখের জলকে বাঁধন দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম আমি। মাহতাব ভেজা কণ্ঠে, নিচু স্বরে শুধাল,
“আবার কবে দেখা হবে, নবনী?”
তার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া নিবিড় আকুলতা আমার বুকের ভেতরে তীক্ষ্ণ তীরের মতো বিঁধল। মনে হলো মরণবাণ কেউ ছুঁড়ে দিয়েছে আমার হৃদয়ে। চোখের কোণায় এসে জমা হয়েছে এক পৃথিবী কান্না। কিন্তু এখন আমি কাঁদলে মাহতাবও যে কেঁদে ফেলবে। ভরা বাজারে পুরুষের কান্নার মতো লজ্জার দৃশ্যের অবতারণা করতে পারি না আমি। নিজের ভেতরের সবটুকু হাহাকার এক ম্লান, করুণ হাসির আড়ালে চেপে রেখে নির্লিপ্ত গলায় বললাম,
“তুমি যখন চাইবে…”
কথাটা বলেই চোখ নামিয়ে নিলাম। এর বেশি কিছু বলার অধিকার বা শক্তি—কোনোটাই তখন আমার ছিল না। আমি তাকে চাইলেও বলতে পারতাম না, ‘আরেকটু থেকে যাও!’ কিংবা, ‘যেও না, মাহতাব।’ সেই অধিকারটুকু পেতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কিছু মাস।
সেই বিদায়ের লগ্নে মাহতাব আর একটি কথাও বলেনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের বিষণ্ণ অবয়বটা টেনে নিয়ে সে বাসের দিকে পা বাড়িয়েছিল। আমিও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম এক মহাসমুদ্র শূন্যতা বুকে নিয়ে। দূরপাল্লার বাসটা আমার প্রিয় পুরুষকে বুকে টেনে নিয়ে ছেড়ে গেল আমার শহর। আচ্ছা, আমি কেন বাস হলাম না? কেন হলাম না, প্রিয় মানুষ বুকে নিয়ে বেড়ানো যান?
—চলমান—
