#নীল_ধ্রুবতারা [১০]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
শশুরবাড়ি যাবার সময় বাসে বসে আমি ডুব দিলাম আবার স্মৃতিমন্থনে। ভদ্রলোকের সাথে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়েছিল আয়োজন ছাড়াই। আমি যে প্রেম করছি, সেই খবরটা ছোট বোনের কল্যাণে মা-বাবার কানে উঠে গিয়েছিল। আমার বোনকে সিআইডি অফিসার এসিপি প্রদ্যুমানের থেকে কম কিছু মনে হয় না। সে করল কী, ঘুমন্ত আমার আঙুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে চুরি করে ফোন খুলে ফেলল, আর প্রেমের সব প্রমাণ উজার করে দিল মায়ের সামনে। আমাদের রক্ষণশীল পরিবারে প্রেম বস্তুটিকে খুবই অপরাধের নজরে দেখা হয়। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে আমি হয়ে উঠলাম আমার পরিবারের ভয়ংকর আসামী। খুনের আসামীকে থানায় ধরে নিয়ে পুলিশ যেমন করে পেটায়, বাবা আমাকে চ্যালাকাঠ দিয়ে তেমন করে পিটালেন। আমার ফোন কেড়ে নেওয়া হলো। রাতভর কান্নাকাটি করে খুব ভোরে ফোন আর কিছু ক্যাশ টাকা চুরি করে বাড়ি থেকে পালালাম আমি। আমার সারা গায়ে তখন রাজ্যের ব্যথা। জ্বরের তোপে চোখ খুলে রাখা দায়। আমি প্রথমে সরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার আমাকে জ্বরের ওষুধ দিলেন। সেই ওষুধ খেয়ে ঝিম ধরে অনেকক্ষণ বসে রইলাম হাসপাতালের বেঞ্চিতে। ঘণ্টাখানেক পরে একটু চাঙ্গা হয়ে কল লাগালাম মাহতাবের নাম্বারে। রিসিভ হতেই বললাম,
“আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাবে মাহতাব?”
সে খুব অবাক হলো। বেশ অনেকক্ষণ কিছু বলল না। নিজেকে কোনো রকমে ধাতস্থ করে নিয়ে এক সময় জানতে চাইল,
“কী হয়েছে? তুমি আমার কাছে আসবে মানে কী?”
“মানে বোঝো না! আমি তোমার কাছে চলে যাব। আমাকে বিয়ে করবে?”
“বিয়ে!”
মাহতাবের বিস্ময় দেখে আমিও বিস্মিত হলাম। বিয়ের কথা শুনে এমন আঁতকে ওঠার কী আছে? ড্যাংড্যাং করে প্রেম করেছে আর বিয়ে করবে না? রাগে শরীর জ্বলে গেল। বললাম,
“কেন? প্রেম করেছো কি সারাজীবন ঘাস কাটার জন্য? বিয়ের জন্য নয়?”
“আরে না। মানে এখন বিয়ে? হঠাৎ!”
“এমনি। তুমি স্পষ্ট করে বলো তো, বিয়ে করবে আমায়?”
মাহতাব আমতা-আমতা করতে লাগল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“বাড়ি থেকে রাগ করে চলে এসেছি। কোথায় যাব জানি না। যদি তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি থাকো, আমি তোমার কাছে চলে যাব। এখন ভেবে বলো। দশ মিনিট সময় দিচ্ছি।”
বলেই খট করে কল কেটে দিলাম আমি। মাহতাব বোধহয় বলতে চাচ্ছিল—বিয়ের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দশ মিনিটে নেওয়া যায় না। আমি তার কোনো কথা শুনলাম না। রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেললাম। এই পৃথিবী এতো নিষ্ঠুর কেন? কেনই বা আমার বাবা-মা এতো পাষাণ? ভাবতে ভাবতে চার মিনিটের মাথায় মাহতাব কল দিল। রিসিভ করে বললাম,
“এর মাঝেই ভাবনা শেষ? তা বলো, কী ভেবেছো?”
সে অসহায় গলায় ডাকল,
“নবনী…”
“হুঁ।”
“তুমি প্লিজ বাড়ি যাও। তোমার বাবা-মা চিন্তা করছেন।”
“করুক চিন্তা। উনারা আমাকে জানোয়ারের মতো পিটিয়েছেন। আমি ভুলেও আর বাসায় যাব না। এসব বাদ দিয়ে বলো, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে? বিয়ের খরচ আমার কাছে আছে। বিশ হাজার টাকা নিয়ে বের হয়েছি।”
মাহতাব করুণ গলায় বলল,
“টাকা চুরি করেছো?”
“হ্যাঁ। আমাকে মেরেছে না! তার ক্ষতিপূরণ।”
“প্লিজ বাড়ি যাও। তোমার বাবা-মা চিন্তায় অস্থির হয়ে গিয়েছেন। এখানে-সেখানে খোঁজ করছেন।”
তার কথা শুনে আমার কপাল কুঞ্চিত হলো। আমার বাবা-মা কী করছে সেই খবর সে কীভাবে জানল? জিজ্ঞেস করলাম সে কথা—
“তুমি কীভাবে জানলে?”
“তোমার বান্ধবী ফোন করেছিল। উনারা ভাবছেন তুমি আমার সাথে পালিয়ে এসেছো। তোমাকে সাহায্য করেছে ওই মেয়ে।”
“বাহ, ভালো তো!”
“ভালো নয়। এলাকায় তাদের মানসম্মান নষ্ট হবে।”
“তাতে আমার কী?”
“উনারা কষ্ট পাবেন।”
“আমাকে মারার সময় তাদের মনে ছিল না, আমিও কষ্ট পাচ্ছি? তুমি ওদের হয়ে সাফাই গেয়ো না প্লিজ!”
মাহতাব শুনল না আমার কথা। সে আরও অনেকক্ষণ ধরে আমার বাবা-মায়ের সম্মান রক্ষার চেষ্টা চালাল। অনুরোধ-উপরোধের পর আমি মেনে নিলাম। সে আমাকে আশ্বস্ত করল, আগামীকাল সে আসবে আমার সাথে দেখা করতে। আজকে যেন আমি কোনো আত্মীয়ের বাড়ি চলে যাই। আমি তাই গেলাম। আমার দাদুর বাড়িতে আশ্রয় নিলাম সেদিন। বাবা-মা খবর শুনে নিশ্চিন্ত হলেন। ঘটনা যতটা সহজভাবে উল্লেখ করেছি, ততটা অবশ্য সহজ ছিল না। মাহতাবের আচরণে আমি খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল—এই লোক সত্যিই আমাকে বিয়ে করবে তো?
মাহতাব সত্যি সত্যি পরদিন আমার সাথে দেখা করতে এল। প্রথম সাক্ষাতের ঠিক এক মাস এগারো দিন পর। কলেজের কথা বলে দাদুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি দেখা করলাম তার সাথে। আমার শরীরে বাবার করা আঘাতের অনেক চিহ্ন লক্ষ্য করল সে। সারাদিন একসাথে কাটিয়ে যাবার আগে সে বলল,
“এরপর তোমাকে আমার বউ হিসাবে দেখব।”
আমি বিশ্বাস করিনি। তবে সত্যিই আমাদের তৃতীয়বার দেখা হয়েছিল বিয়ের দিন। অবশ্য সম্পর্কটাকে বিয়ে অবধি নিয়ে যেতে খুব কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল আমাদের। মাহতাবের সাথে দেখা করে সেদিন বাড়িতেই এসেছিলাম আমি। এবং সাহস করে মাকে নিজের মুখেই মাহতাবের কথা বলেছিলাম। আমার নাছোড়বান্দা আবদারে, নির্লজ্জতার বাড়াবাড়ি দেখে মা কথাও বলেছিল মাহতাবের সাথে। শেষে যখন জানল ছেলেটার বাড়ি বহুদূর, তখনই বেঁকে বসল। আমাকে অন্য স্থানে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। আমি কিন্তু হার মানলাম না। তাদের গালাগাল, তিরস্কার, অবহেলা, তির্যক দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিয়মিত উৎপীড়ন করতে লাগলাম সবাইকে। পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে হ্যাবলার মতো বসে থাকি, প্রশ্নের উল্টাপাল্টা জবাব দেই। মেরেও আমাকে সোজা পথে আনা যায় না। শেষে গিয়ে হতাশ হয়ে মেনে নিল তারা। ওদিকে মাহতাব নিজের বাড়িতে বলেছে তখন। আমার শ্বশুর-শাশুড়ির এখনই ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার কোনো প্রবৃত্তিই ছিল না।
সুতরাং পুত্রের অন্যায় আবদার মেনে নিলেন না তারা। মাহতাবও নাছোড়বান্দা। শেষে তারাও হার মানল। পারিবারিকভাবে বিয়ের কথা এগোতে থাকল আমাদের। আমার বাবা-মা তাদের বাড়ি গিয়ে ছেলে দেখে এল। মোটামুটি পছন্দই হলো সব। তারাও এল আমায় দেখতে। সব দেখেশুনে আনন্দিত মনেই ফিরে গেল। যেহেতু এখানে আমাদের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিয়ে আটনোর প্রশ্নই নেই। কিন্তু বিপত্তি বাঁধালেন উনারা। আমাকে উনাদের এক ফোঁটাও পছন্দ হয়নি। মাহতাবের বাড়ির সকলের গায়ের রঙ মারাত্মক ফর্সা। সেখানে আমি শ্যামবর্ণা এক কুশ্রী তরুণী। তাদের সুন্দর ছেলের পাশে আমাকে আদৌ মানায়?
উনারা বলে দিলেন, এই বিয়ে হবে না। মাহতাবের উপর কঠিন নির্দেশ জারি হলো যাতে আমার সাথে আর কোনোরূপ যোগাযোগ না রাখে। জেদী মাহতাব সেটা শুনল না। সে আমার সাথে আগের মতোই যোগাযোগ করল। আমিও বিচ্ছিন্ন হতে পারলাম না তার থেকে। সে আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিল। ছেলে এখনো আমার সাথে যোগাযোগ রাখে জেনেই মাহতাবকে ওয়ার্ক পারমিটে দুবাই পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করল তারা। কিন্তু মাহতাব সেই পরিকল্পনায় জল ঢেলে একদিন ঘোর বর্ষার দিনে এসে আবার উপস্থিত হলো আমার শহরে, আমার বাড়িতে। সে এল একা একা। মা-বাবা তাকে দেখে মুখ কালো করে ফেলল। তার বাবা-মায়ের অপমান হজম করতে পারেনি বলেই হয়তো কঠিন স্বরে জানতে চাইল,
“তুমি! তুমি আবার কী চাও?”
মাহতাব সেদিন কী বলেছিল জানি না। তবে বাবা-মা তাকে নিয়ে ঘরের দোর দিয়ে মিটিং করেছিল ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে। এরপর বেরিয়ে এসে আমাকে আদেশ করল,
“রেডি হয়ে কাজী অফিসে চল।”
এই আদেশের পেছনে, এতো সহজে মেনে নেওয়ার পেছনে একটাই ভয় ছিল তাদের—যদি আমরা পালিয়ে যাই! সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবেই সেদিন সম্মতি দিয়েছিল তারা। এবং রাত নয়টার সময় পাঁচ লক্ষ এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়ে গেল আমার আর মাহতাবের। আড়ম্বরহীন বিয়ে। বিয়ের প্রথম রাত্রিটা ছিল বড্ড সাদামাটা। সারারাত পাশাপাশি গল্প করে ভোররাতের দিকে আলাদা আলাদা ঘরে ঘুমিয়েছিলাম আমরা, কারণ গ্রামে প্রচলিত নিয়ম—বিয়ের প্রথম রাত্রেই নবদম্পতিকে একসাথে ঘুমাতে নেই। এতে নাকি অকল্যাণ হয়। তবে দ্বিতীয় রাতে জগতের সমস্ত কল্যাণ নিয়ে মাহতাবের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলাম আমি। ‘ঘুমিয়েছিলাম’ শব্দে অবশ্য ভুল আছে। মাহতাব সেদিন উন্মাদ প্রেমিক হয়েছিল। এক মুহূর্ত ঘুমাতে দেয়নি আমাকে। আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিল। কী মারাত্মক সুখের ছিল সে রাত্রি! এমন সুখের রজনী দ্বিতীয়বার আসেনি আমার জীবনে। অবশ্য মাহতাব আমাকে আদর করেছে আরও বহুবার, তবে সেই দিনের অনুভূতি ছিল ভিন্ন।
বিয়ের সপ্তাহ ঘুরতেই আমাদের এলাকায় একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলল মাহতাব। বউ নিয়ে শ্বশুরের পয়সায় বসে বসে খাওয়া যায় না। বিয়ের দুদিন পরেই অবশ্য মাহতাবের আগের অফিসের কলিগের কাছ থেকে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ঘটনাটি জেনে যান এবং ফোন করে মাহতাবকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। কান্নাকাটির অন্ত থাকে না তাদের। নির্বিকার মাহতাব আমাকে বুকে জড়িয়ে রাখেন সম্পূর্ণ ভরসা দিয়ে। শ্বশুর-শাশুড়ির ত্যাজ্যপুত্র করার ঘটনাটি অবশ্য স্মরণ থাকে না। এক মাসের মাথায় মাহতাব আর আমাকে ঘটা করে তুলে নিয়ে যান তারা। বেশ ঝড়ঝাপটা আসে আমার উপর। মাহতাব বরাবর সাংসারিক এসব পলিটিক্স থেকে গা বাঁচিয়ে চলেছে। তবে আড়ালে আমার যত্নও করেছে খুব। সেই যত্ন-আত্তির এক আনাও কারো চোখে পড়ে গেলে তীব্র তিরস্কার সইতে হয়েছে তাকে। শুনতে হয়েছে—
“এই কালী বউয়ের এতো খাতির? তাবিজ করে পোলাডারে শেষ করে দিল। বউ যেখানে যায়, এই পোলাও সেখানেই যায়। বউয়ের আঁচলের নিচে নিচে থাকে।”
তার নাম হয়ে গেল বউ পাগল। এর মাঝেই কতজনে কত কী বলল! আমার স্বামীকে আবার বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রী দেখার কাজটা করল একজন আত্মীয়। আমি দেখলাম। কাঁদলাম। আর মাহতাব খুব যতনে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে সান্ত্বনা দিল। শ্বশুরবাড়িতে আমরা মাস তিনেক থাকার পরে আবার আমাদের এলাকায় ফিরে আসি। কারণ চাকরির ঠিক সুবিধা পাচ্ছিল না মাহতাব। কারণ এটা দেখালেও আমি জানি, সে চাইছিল এসব যন্ত্রণা থেকে যেন আমি মুক্তি পাই। পেলাম মুক্তি। পূর্বের অফিসেই আবার যোগ দিল মাহতাব। আমরা কাছেই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করি। এরপর এই সংসার! সুখী সুখী সংসার।
প্রতি ঈদের সময় ঈদ করতে চলে যাই আমরা। ঈদের ছুটি কাটিয়ে আবার হৃষ্টচিত্তে ফিরে আসি। এবারও যাচ্ছি। কিন্তু এবারের যাত্রায় কোনো আনন্দ নেই। আমার মনটা বড় বিষণ্ণ। শরীর ভীষণ খারাপ। দুর্বলতায় ঠিক করে দাঁড়াতে পারি না। সারাক্ষণ মাথা ঘোরে।
শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আমার অসুস্থতা আরও বাড়ল। জ্বর-ঠান্ডায় কাহিল হয়ে গেলাম। যন্ত্রণা দিতে থাকলাম মাহতাবকে। ঈদের আগের রাতে মাহতাব একটা মেহেদী নিয়ে এসে আমাকে বলল,
“নবনী এসো, তোমাকে মেহেদী লাগিয়ে দেই।”
সে মেহেদী দিতে পারে না ঠিক করে। তবে আমার হাতে খুব শখ করে কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং এঁকে দেয়। তার ওই চিত্রকর্ম দেখে আমিও ভীষণ খুশি হই। যতটা না হই, প্রকাশ করি তার চেয়েও বেশি। কিন্তু আচমকা আমার কী যেন হলো। জানালা দিয়ে ঢিল দিয়ে আমি মেহেদী ছুঁড়ে ফেললাম দূরের কাদামাটিতে। মাহতাব হতাশ হয়ে সেটা গিয়ে তুলে আনল। নিয়ে এসে আমার পাশে বসে মায়ের নাম্বারে ফোন দিয়ে নালিশ করল আমার নামে। আম্মা বলল,
“তুমি এক থাপ্পড় দিয়ে ওর দাঁত ফেলে দাও। এই মেয়ে চিরকালের বেয়াদপ। ফাজিলটাকে নিয়ে যাওয়াই ভুল হয়েছে তোমার। দাও, আমি কথা বলছি।”
মা আমাকে খুব করে বকে দিল। আমি পাত্তাই দিলাম না সেই সব। তারা তো আর জানে না আমার অস্থিরতা কোথায়! আজ কতদিন বাচ্চাটাকে দেখি না আমি! আমাকে এতো মানুষজনের ভিড়ে এনে আমার শান্তি নষ্ট করে দিয়েছে তারা।
ঈদের দিন থেকেই আমার প্রচুর বমি শুরু হলো। বমির কারণে কিছুই খেতে পারি না। রাতে ঘুম হয় না। ভোরের দিকের খারাপ লাগাটা বাড়ল খুব। কান্নাকাটি আর অস্থিরতায় বাড়ির সবাইকে তটস্থ করে রাখলাম আমি। ঈদের পরদিনই আমাকে নিয়ে গাজীপুর ব্যাক করল মাহতাব। ফিরে এসে বড় ডাক্তার দেখালাম আমি। উনি আমার পূর্বের রিপোর্টগুলো দেখে আমাকে ধমকালেন অনেকক্ষণ। সরকারি ডাক্তার না দেখিয়ে কেন ওখানে গিয়েছি, দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কেন কাজ করি, উল্টাপাল্টা ওষুধ কেন খাচ্ছি ইত্যাদি। আমি বুঝলাম না নিজের ভুলটা। ডাক্তার আমাকে মধুর ভাষায় বললেন,
“মা, তুমি আরেকটা আল্ট্রা করে এসো।”
আমার আল্ট্রা করা হলো। রুমের সামনে অনেকটা সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাহতাব। পায়চারি করতে লাগল এখান থেকে ওখানে। রিপোর্ট আসার পর আমি ডাক্তারকে দেখালাম এবং নিজের সমস্যাগুলো বললাম বিস্তারিত। খুব বমি হয় আজকাল সেটাও জানাতে ভুললাম না। ভদ্রমহিলা মুচকি হেসে বললেন,
“বমি ছাড়া কে কবে মা হয়েছে, শুনি?”
আমি উনার কথাটা প্রথমে বুঝতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম। মানে কী এই কথার? কেন বললেন বমি ছাড়া কেউ মা হয় না? এবং যখন কারণ বুঝতে পারলাম, তখন আনন্দে আমার চোখ ছলছল করছে। রিপোর্টে দেখা গেল আমার ওভারিতে সিস্ট এবং বাচ্চা—দুটোই আছে। আমার সাথেই কেবিনে ঢুকেছিল মাহতাব। খবরটা শোনার পর আমি দেখলাম সে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছে। এটা শুধু কথা নয়, সত্যিকার অর্থেই সে লাফিয়ে উঠল। পুরোটা সময় কেমন যেন উজ্জ্বল, প্রফুল্ল দেখাল তাকে। ডাক্তার আমার ওষুধ বদলে দিলেন। শুকরিয়া আদায় করলেন ভুল ওষুধে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি এটা জানিয়ে। নেক্সট টাইম যাতে ওই হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে না যাই, সেই নির্দেশও দিলেন।
বেরোনোর আগে আমি বললাম,
“ম্যাডাম, সিস্ট থাকলে নাকি বাচ্চা হয় না?”
“কে বলেছে হয় না? কার কাছে শুনেছো এসব ভুল কথা? যদি সিস্ট থাকলে বাচ্চাই না হবে, তবে তোমার গর্ভে যে ভ্রুণটি বেড়ে উঠছে সেটা কি?”
আমি আমতা-আমতা করতে লাগলাম। উনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন,
“ওভারিতে সিস্ট থাকলে বাচ্চা হয়না এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। বর্তমান সময়ে সিস্ট থাকা খুব সাধারণ একটি বিষয়। অধিকাংশ মেয়েদের সিস্টের সমস্যা থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো হরমোনের ছোটখাটো অসামঞ্জস্য ছাড়া আর কিছুই নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কোনো নিয়ম নেই যে সিস্ট থাকলে কনসিভ করা যাবে না।
আমরা শুধু দেখি সিস্টের ধরনটা কী এবং সেটি পেসেন্টের ওভুলেশনে (ডিম্বস্ফোটন) কতটা বাধা দিচ্ছে। প্রয়োজন হলে ছোট কিছু ওষুধ বা সামান্য লাইফস্টাইল পরিবর্তনে ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক করা যায়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সিস্ট থাকা বহু মা এখন সুস্থ সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। তাই অযথা দুশ্চিন্তা করে নিজের মানসিক চাপ বাড়াবে না, এতে হরমোনের ভারসাম্য আরও নষ্ট হবে। শান্ত থাকো, হাসিখুশি থাকো। নিজের যত্ন নাও। বেস্ট অফ লাক!”
আমি মুগ্ধ হয়ে গেলার উনার বিশ্লেষণ শুনে। অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের হাতে পড়া যে কোনো রোগীর জন্যই কত বড় আতঙ্ক সেটা হারে হারে টের পেলাম আমি। কেবিন থেকে বেরিয়ে মাহতাব শক্ত করে চেপে ধরে রইল আমার হাত। মা আনন্দিত হয়ে অনেকের কাছে ফোন করে নিজের নানি হওয়ার খবর জানালেন। আমি এবার আনন্দে কেঁদে ফেললাম। মনে হতে লাগল—পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বোধহয় আমি। ইশ! এই পৃথিবী এতো ভালো কেন? বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাহতাব আমাকে জ্ঞান দিল খুব। যার সারমর্ম এই—দেখেছো, শুধু শুধু চিন্তা করে এতো অশান্তিতে ভুগলে তুমি। এই জন্যই বলি, এতো অধৈর্য হয়ো না। আল্লাহর বিচার সবচেয়ে উত্তম।
আমি সন্তানসম্ভবা জানার পর থেকে আরও ভীষণ করে ডুবে গেলাম বাচ্চার সাথে সময় কাটানোতে। অবশ্য অবাস্তব পৃথিবীর সেই গোলগোল চোখের বাচ্চাটার সাথে নয়। আজকাল তাকে আর দেখতে পাই না। সে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে বহু দূরে। এখন আমি কথা বলি আমার গর্ভের বাচ্চাটার সাথে। তাকে ফিসফিস করে ডাকি,
“সোনা, তুমি কি ভালো আছো? শুনতে পাচ্ছো মায়ের কথা?”
আরও অনেক কথা থাকে তার সাথে আমার। তবুও ওই গোলগোল আঁখিদুটির জন্য আমার মন কেমন করে। সে এখন কেন আসে না? কেন দেখতে পাই না তাকে? তার কি খুব অভিমান হয়েছে? মনের কথাগুলোই মাহতাবকে বলে বলে অতিষ্ঠ করে তুলি। একদিন খুব বুঝিয়ে সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল আমায়। তিনি অনেক অনেক প্রশ্ন করলেন। আমি জবাব দিলাম। শেষে তিনি আমাকে বললেন—
“শুনুন, ওই বাচ্চাটা স্রেফ আপনার মনের কল্পনা। আপনার কোনো বাচ্চা ছিলই না। অনেক মেয়েদের মাতৃত্বের প্রতি দুর্বলতা থাকে। বিয়ের পরপরই তারা মা হতে চায়। হয়তো আপনার মাঝেও ছিল। এরপর যখন আপনি শুনলেন মা হতে পারবেন না, আপনার মন সেটা মানতে পারেনি। আপনমনে একা একা এক অবাস্তব কল্পনায় আপনি খুঁজে নিলেন সন্তান সুখ।”
“কিন্তু আমি তো তাকে সত্যি সত্যিই দেখতাম। তার খিলখিল হাসির শব্দ আজও আমার কানে বাজে।”
আমার কথায় উনি একটুখানি হাসলেন মনে হলো। আমি বিব্রত বোধ করতে লাগলাম। মাহতাব নেই আশেপাশে কোথাও। আমার অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। ভদ্রলোক সামান্য ঝুঁকে এসে বললেন,
“এগুলোও সব আপনার কল্পনা। ডিপ্রেশন থেকেই এইসব অলীক ভাবনার সৃষ্টি। শুনুন, কখনো একা থাকবেন না। যখন একা থাকবেন, নিজের গর্ভের বাচ্চার সাথে অনেক কথা বলবেন। ভালো লাগবে।”
কতটুকু কী বুঝেছিলাম তা জানি না। সামান্য কিছু মেডিসিন দিয়েছিলেন তিনি আমায়। সাথে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমার দায়িত্বশীল স্বামীর দায়িত্বের ভার। সেদিনের পর থেকে মাহতাব আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়েনি। আমাকে দেখাশোনা করার জন্য মাকে নিয়ে এল। যখন মা থাকে না, তখন মাহতাবের কল্যাণে ছোট বোন হলো আমার সঙ্গী। আরও কয়েকবার ডাক্তার দেখানোর পর ধীরে ধীরে আমার স্মৃতি থেকে মিলিয়ে যেতে লাগল পরাবাস্তব ওই বাচ্চাটা। যার চোখ বড় মায়াবী। বড় মায়াবী যার চোখ!
অনেকের গর্ভাবস্থার সময়টা চোখের পলকে কেটে যায়। আমার কিন্তু কাটল না। দিন দিন নানা সমস্যায় নানান রোগে আক্রান্ত হলাম আমি। বমির সমস্যা মিটে গিয়ে বুক জ্বালাপোড়া শুরু হলো। ঘুমের সমস্যা বাড়ল। সর্বোপরি বাড়ল আচমকা মেজাজের গতিবিধির পরিবর্তন। এই কাঁদি, এই হাসি। মাহতাব আমাকে সামলে নেয়। ক্ষমা চায়। তবে রাগ করে না একবারও। গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসের মাথায় আমার অনার্স-এর প্রথম পরীক্ষা শুরু হলো। সেন্টার বেশ দূরে। তৃতীয় পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে গুরুতর এক্সিডেন্ট করলাম আমি। আমাদের অটোরিকশা উলটে পড়ে গেল ধানখেতের মাঝে। অচেতন হয়ে পড়ে রইলাম কিছুক্ষণ। যখন হুঁশ ফিরল, খেয়াল করলাম কপাল বেয়ে নামতে শুরু করেছে রক্তের ধারা। আমার তখন সে রক্ত দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কথা। আমি হলাম না। আমি নিজের পেটে হাত রেখে গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগলাম। বলতে লাগলাম,
“আমার বাচ্চা! আল্লাহ গো, আমার বাচ্চা!”
আমার চিৎকারে সচকিত হয়ে উঠেছিল আশেপাশের সকল মানুষ। আমাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। বাড়িতে খবর দেওয়া হলো। মা-বাবা এসে আমার অবস্থা দেখে আঁতকে উঠল। মা ভেজা গলায় বলল, “কীভাবে কী হইল মা?”
আমি বললাম,
“মা, আমার বাচ্চাটা বাঁচব তো!”
“আল্লাকে ডাকো মা। আল্লাহকে ডাকো।”
আমার আল্লাহর আমার প্রতি দয়ার শেষ নেই। এতো ঝড়ঝাপটার পরেও আমার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হলো না। সৃষ্টিকর্তার এই মেহেরবানির কথা স্মরণ করে আজও শুকরিয়া আদায় করি আমি। কী দয়াময় তিনি!
এমনি করেই আমার জীবনের পাতা থেকে ঝরে গেল নয়টি মাস। ধরণীতে তখন শীত নেমেছে। জেঁকে বসেছে হিম। ঘরে ঘরে উঠেছে নতুন ধান। সোনালী ধান থেকে গৃহিণীরা খেটেখুটে বের করে নিচ্ছে চাল। আমার হঠাৎ নতুন চালের পিঠা খেতে ভীষণ ইচ্ছে হলো। ভাড়া বাসা ছেড়ে নিয়ে ততদিনে আমাদের বাড়িতে চলে এসেছি আমরা।
সেই এক্সিডেন্টের পর থেকেই নিজেদের বাড়িতে থাকি। মাহতাব বাবার হাতে খাওয়া বাবদ কিছু টাকা-পয়সা দেয়। মাঝে মাঝে বাজার করে। পিঠার প্রতি এতো আগ্রহ দেখে মা বাজার থেকে উপকরণ কিনে আনালেন। বানিয়ে দিলেন আমার আরাধ্য খাদ্যদ্রব্যটি। খেজুরের গুড়ের তৈরি তেলে ভাজা পিঠা খেলাম পেট ভরে। সন্ধ্যায় পেট ভরে পিঠা খাওয়ার শখ মিটল মাঝরাতে। পিঠার দল আমার পেটের মধ্যে নৃত্য করতে লাগল। এবং একই সাথে শুরু হলো বমি। লক্ষণ বুঝে মা বললেন,
“নবনীর তো মারাত্মক ডায়রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। ওকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।”
আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো সকালে। ততক্ষণে আমার অবস্থা শোচনীয়। সিরিয়াস অবস্থা দেখে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমাকে রাখল না। তারা ট্রান্সফার করে দিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। নিজের উঁচুপেটটা নিয়ে আমি চড়ে বসলাম সিএনজিতে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ময়মনসিংহ।
—চলমান—
