#হৈমন্তী
#লেখা: আফরা আরনাজ
#পর্ব: ০১
“কোথায় ছিলে? ফিরতে এতো রাত হলো যে?”
রাত বাজে দেড়টা। হৈমন্তী সবে বাড়ি ফিরলো। ও ড্রেসিং টেবিলের কাছে গিয়ে দাড়াতেই প্রিয়ম প্রশ্নটি করলো।হৈমন্তী পেছন ফিরে প্রিয়মের পানে চাইলো। ও চোখ মুখ শক্ত করে পা ঝুলিয়ে খাটের এক কোনে বসে আছে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষণ রেগে আছে।হৈমন্তী তা দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।ও নিজের ব্যাগটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখলো।কপালের টিপটা খুলে আয়নায় আটকে দিলো। তখনই নিরবতা কাটিয়ে প্রিয়ম আবার বলে ওঠলো,
”কি হলো বলছো না যে, আমার কথা কী শুনতে পাও নি?”
হৈমন্তি আবার ওর দিকে তাকালো বললো,
”তা তোমায় বলার প্রয়োজন মনে করছি না।”
প্রিয়ম এ কথা শুনে কপাল কুঁচকালো। এই একই কথা ও নিজেও বলেছিলো হৈমন্তীকে কিছুদিন আগে।হৈমন্তী কী তবে বদলা নিলো!
প্রিয়ম চোয়াল শক্ত করে খাট থেকে নেমে হৈমন্তীর কুনুই চেপে ধরলো।
”আমার কথা আমাকেই ফেরত দিচ্ছো,ভুলে যেও না তুমি আর আমি এক না।”
হৈমন্তির স্বাভাবিক মুখশ্রী। ও একটা গা জ্বালানি হাসি দিয়ে বললো,
”কেনো!এক না কেনো?তুমিও মানুষ আমিও মানুষ। শুধু লিঙ্গটারই ভেদাভেদ। আর তো কিছু ভিন্ন নেই।”
”ভিন্ন আছে।একটা মেয়ে মানুষের এতো রাত অবধি বাহিরে থাকা নিরাপদ না।”
হৈমন্তী হাসলো, “ভয় পাচ্ছ? যে রাস্তা ঘাটে তোমার বউ এর দিকে যদি তোমার মতই কোনো নরপশু নজর দিয়ে দেয়।”
প্রিয়ম থমকালো।ওর হাত ও ঢিলে হয়ে এলো।হৈমন্তী তাই হাত ছাড়িয়ে নিলো। প্রিয়ম বললো, “কি উল্টো পাল্টা বকছো”।
” উল্টো পাল্টা না প্রিয়ম। তুমি একটা পশু। ”
প্রিয়ম চিৎকার করে ওঠলো,”হৈমন্তী,,,,,, অনেক হয়েছে।নিজের দোষ ঢাকতেএখন আমার ওপর উল্টো পাল্টা কথা বলছো।”
হৈমন্তী ঘৃণার চোখে চাইলো প্রিয়মের পানে।
”কী করে পারলে প্রিয়ম! কী করে?
তারপর একটু দম নিয়ে বললো, “একটা বাচ্চা মেয়ে ছিলো ও। কী করে তুমি ওকে বাজে ভাবে ছুঁয়ে দিলে? ”
প্রিয়ম হকচকিয়ে গেল। নিজেকে সামলে বললো,”দেখো হৈমন্তী এসব বাজে বকা বন্ধ করো।তুমি কি বলছো আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”
হৈমন্তির চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠলো রাগে ঘেন্নায়। ওর গায়ে লাল পাড়ের সাদা শাড়ী,সিঁথির লাল সিদুর, হাতের শাখা-পলা। সব মিলিয়ে ওকে ভয়ংকর লাগছে। যেনো সব ধ্বংস করে দিবে ও এক নিমিষে।
হৈমন্তী রাগান্বিত স্বরে চিবিয়ে বললো,
”কার কথা বলছি বুঝতে পারছো নাহ?আমাদের কাজের মেয়ে জগত্রী ওর মেয়ে বীণা। তুমি ওকে অফিস থেকে ফেরার পথে বাজেভাবে ছুঁয়ে দাওনি?ওকে নিজের সাথে অন্য কোথাও যেতে জোর করো নি?”
প্রিয়ম ঘাবড়ালো এবার।তুতলিয়ে বললো,”ক,,কে বলেছে এসব তোমায়?”
হৈমন্তি আবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।ওর চোখে জল এলো।ও প্রিয়মের কাছে গিয়ে ওর বুকে দুুহাত রেখে চোখের দিকে চাইলো। হৈমন্তীর চোখ বেয়ে অনবরত জল গরিয়ে পড়ছে। কান্নার তোপে ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। একটা ঢোক গিলে ও বললো,
”এসব নাহয় বাদই। আমার শরীরে কী এমন কমতি ছিলো প্রিয়ম! যে তোমাকে নষ্টগলিতে যেতে হয়?”
প্রিয়মের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।ও হৈমন্তীর বাহু চেপে ধরলো,”এসব কী বলছো তুমি?”
হৈমন্তি কাঁদছে ই।ও পারছে না চিৎকার করে কাঁদতে।
”আমি নিজের চোখে তোমায় ওখানে যেতে দেখেছি প্রিয়ম।আর নাটক করো না। ”
প্রিয়ম ঢোক গিললো।ও বুঝে গেলো হৈমন্তী ওর পিছু নিয়েছিলো কিন্তু ও টের পাই নি। অবিন্যস্ত পরিবেশ কে সামাল দিতে প্রিয়ম ক্রন্দনরত হৈমন্তীর গাল স্পর্শ করলো।কোনো ছোটো বাচ্চাকে বুঝ দেয়ার মতো করে বললো,”তুমি যেমন ভাবছো তেমন কিছু নয় সোনা।আমি ওখানে কাজে গিয়েছিলাম।”
হৈমন্তী ওর হাত ঝামটা মেরে সরিয়ে দিলো।একটা ঘৃণাভরা হাসি দিয়ে বললো,”কী এমন কাজ যা আমাকে বলা যায় না। লুকিয়ে করতে হয়। তারপর একটু থেমে নাক টেনে প্রিয়মের চোখে কড়াভাবে তাকিয়ে বললো,”কী কাজ যার জন্য প্রতি সপ্তাহে তোমার ওই নষ্টগলিতে যেতে হয়?”
প্রিয়ম এবার বুঝে গেলো হৈমন্তী অনেক আগে থেকেই ওর ওপর নজর রেখেছিল। তখনই হৈমন্তী আবার প্রিয়মের কাছে আসলো।একদম কাছে।ওর গালে পরম আবেশে হাত বুলিয়ে বললো,
”প্রিয়ম! আমার প্রিয়ম!তুমি কী করে এতো বদলে গেলে?তুমি তো শুধু আমার ছিলে কী করে পারলে আমার হয়েও অন্য নারীর কাছে যেতে?
হৈমন্তীর চোখ বেয়ে আবার জল গরিয়ে পরলো।
”আমাদের না প্রেমের বিয়ে ছিলো!তুমি না আমায় বড্ড ভালোবাসতে! কী করে এতো বদলে গেলে প্রিয়ম?
প্রিয়ম হৈমন্তী কে ধাক্কা দিয়ে সরালো।ওর মুখ শক্ত।হৈমন্তীর বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো প্রিয়ম,
”তুমি আমার ওপর নজর রাখছিলে?এতো বড় সাহস তোমার! ”
হৈমন্তি একটা রহস্যময় হাসি দিলো। তারপর মুখ শক্ত করে করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো,
”হাত ছাড়ো আমার। তোমার ওই নোংরা হাত দিয়ে আমার ছোঁবে না। আর সাহস,,, সে তো তুমি দেখোই নি।আমি ডিভোর্স দেবো তোমায়।”
প্রিয়মের মাথায় রক্ত ওঠলো।ও বুঝে পেলো না কি করবে। হৈমন্তী ওকে ছেড়ে গেলে ওকে গুছিয়ে রাখবে কে!হৈমন্তী কে ওর লাগবেই।প্রিয়ম হৈমন্তীর বাহু আরো শক্ত করে চেপে ধরলো।
”এতো সহজ আমাকে ছেড়ে দেওয়া?আমি তোমায় এতো সহজে ছাড়ছি না, কোথাও যেতে দেবো না তোমায়। ”
হৈমন্তী ওর চোখের দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”তোমার মতো নরপশু কে আমি তোয়াক্কা করি না। তুমি আমায় না ছাড়লে ও আমি তোমায় ছেড়ে দেবো।আমার সিঁথির সিদুর আমি একাই মুছতে পারবো।”একথা শুনে প্রিয়ম হিতাহিতজ্ঞান শূন্য হয়ে পড়লো।ও হৈমন্তীর হাত চেপে মেঝেতে ছুড়ে দিলো।হৈমন্তী ছিটকে ড্রেসিং টেবিলের কোনায় গিয়ে পরলো। টেবিলের পায়ার তারকাঁটার সাথে লেগে ওর ডান হাতের অনেকখানি অংশ কেটেও গেলো।
প্রিয়ম ওকে উদ্দেশ্য করে বললো,
”ছেড়ে দিবি, আমায় ছেড়ে দিবি। এতো সহজ!আমিও দেখবো তুই এ ঘর ছেড়ে কী করে বের হোস। “এই বলেই প্রিয়ম তালা চাবি নিয়ে ঘরের দরজা আটকে চলে গেলো।
(চলবে)
