#নীল_ধ্রুবতারা [৬]
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা
আমাদের যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিন খুব বৃষ্টি নেমেছিল শহর জুড়ে। অদেখা প্রেমের সাত মাসের মাথায় আমাদের মন একে অপরকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় আমরা কল্পনা করি— দুজনার দেখা হবার দিনটা ঠিক কেমন হবে? কেমন হবে সামনাসামনি ভালোবাসি শোনার মুহূর্ত? মানুষটাকে সামনে থেকে দেখে বুকে কি উথাল-পাতাল ঝড় বয়ে যাবে?
এইসব সুখ কল্পনার মাঝেও একটা ভয় ভীষণ ভাবে আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। এই ভয় নিজের রূপহীন, লাবণ্যহীন চেহারাটা নিয়ে। দেখা করার পর যদি মানুষটা আমাকে পছন্দ না করে? কি হবে তখন? এতো মাসের পরিচয়ের পরেও যেই মানুষটা শুধুমাত্র আমাকে সামনে থেকে দেখার আশায় ছবি দেখার দাবি তুলেনি, এখন আমি যদি তার পছন্দমতো না হই? সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ আমি সুন্দরী নই।
ছেলেবেলা থেকে আমার ডায়েরি লেখার ভীষণ শখ। ভদ্রলোক আমার কাছে একটা পুরনো ডায়েরি দাবি করেছেন। বিনিময়ে উনি আমার জন্য নতুন ডায়েরি নিয়ে আসবেন। আমি বুঝতে পারলাম না, পুরাতন ডায়েরি চাওয়ার কারণ কি? কে জানে, হয়তো আমাকে পুরোপুরি জানার ভীষণ শখ তার। আমারও খুব শখ নিজেকে উত্তমরূপে তার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু ময়ূরের পালক লাগালেই তো কাক ময়ূর হয়ে যায় না। এটা অবশ্য আমার ভাষ্য নয়। শিশুকালের চৌকাঠ মাড়িয়ে আমি যখন বয়ঃসন্ধিতে পা দিয়েছিলাম, তখন সামান্য লাবণ্যময়ী দেখাত আমাকে। ওই কালো রঙের মাঝেও অদ্ভুত এক রহস্য ছিল বোধহয়। মায়ের তখন ইচ্ছে হলো আমার বাড়ন্ত শরীরের বাড়তি যত্ন নেবার। আমি তখনো অগোছালো রমণী। মাথার খোলা চুল উড়িয়ে চড়ে বেড়াই গোটা গ্রাম। এ বাড়ির আমগাছের মগডালে চড়ি তো ও বাড়ির বরই গাছে ঢিল ছুঁড়ি। আমড়া গাছের কচি পাতা চিবিয়ে খাই ছাগলের মতো। সে কি অন্যরকম স্বাদ! কি আনন্দ! বাদ দিতে পারি না লিচু পাতাও। লিচু পাতা চিবিয়ে রঙ ফেলে দেই। ঠোঁট জোড়া তখন টকটকে লাল হয়। সমবয়সী বাচ্চাদের কাছে গল্প করি,
“এই দেখ, আমি লিপস্টিক দিয়েছি।”
তখন অবশ্য লিপস্টিককে বড্ড আরামে লিবিস্টিক বলেই চালিয়ে দিতাম। মূল কথা উড়নচণ্ডী, দামাল মেয়ে ছিলাম আমি। লক্ষ্মী বাচ্চাটি হবার চেষ্টাও কোনো কালে ছিল না আমার মাঝে। আমার দুরন্তপনায় মা অস্থির ছিল। সেই আমার শরীরে যখন বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনগুলো ঘটতে শুরু করল, তখন মা নিয়মিত মুখে লাগানোর জন্য কাঁচা হলুদ বেটে দিতেন। চুলগুলোকেও নিয়মিত তেল মেখে শাসনের বেড়াজালে বন্দি করে ফেলেছেন। মায়ের অলঙ্ঘনীয় আদেশ ছিল— নিয়মিত শ্যাম্পু করা এবং গোসলের আগে রোজ হলুদের প্রলেপ মেখে বসে থাকা। এমনি করে একদিন মুখে হলুদ মেখে সমবয়সীদের প্ররোচনায় নেমে গেলাম দস্যিপনায়। এ বাড়ি, ও বাড়ি ঘুরতে গিয়ে একজনের মা আমাকে বলে বসল,
“কিরে নবনী, মুখে কি মেখেছিস?”
আমার মন পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার সাথে ইতোমধ্যে পরিচিত হয়েছে। তবুও সরল আমার কাছে ঘরের খবর পরের কাছে বিলানো ছিল খুবই আনন্দের কাজ। উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠলাম,
“কাঁচা হলুদ বাটা মেখেছি, কাকী। আম্মা মাখিয়ে দিয়েছে। রোজ মাখি।”
“ওহ!”
উনার বলার ভঙ্গিতে ব্যাঙ্গাত্মক ভাবটা স্পষ্ট হলো। এতো চমৎকার করে ব্যাঙ্গের হাসি হাসতে এ জীবনে কাউকে দেখেনি আমি। আমার ধারণা— কুটিল হাসির প্রতিযোগিতায় এই মহিলা প্রথম হবেন। শুধু হাসিতেই ক্ষান্ত হলেন না তিনি। ঠোঁট বাঁকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বললেন,
“ময়ূরের পেখম লাগালেই তো আর কাক ময়ূর হয়ে যায় না!”
না, কোনো লুকোছাপা নয়। নয় কণ্ঠের আওয়াজের তীব্রতা কম। আমার সামনে আমার চেহারা নিয়ে কটূক্তি করেছিলেন তিনি। ছোট্ট আমি অনেকদিন বুঝিনি উনার ব্যাঞ্জনধর্মী উত্তর। যখন বুঝেছি তখন আমি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে পারি নির্দ্বিধায়। কেউ আমাকে কালো বললেও মন খারাপ করি না হুট করে। তবুও গভীর রাতে কিংবা অসহ্য একাকিত্বের সময় নিজের গায়ের রঙ নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগি আমি। শুধু গায়ের রঙ নয়, গোটা আমাকে নিয়েই মনস্তাপের শেষ নেই আমার। যেই চেহারা নিয়ে আমি হীনমন্যতায় ভুগি সেই চেহারাটা অন্য কেউ কেন পছন্দ করবে? কেউ কেউ প্রশ্ন করবেন, কালো মেয়েদের কি বিয়ে হয় না? হয়। তবে নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝামেলা কিছু আছে বৈকি। সেই ঝামেলা মেটানোর উত্তম অস্ত্র যৌতুক। মুখে অবশ্য যৌতুক শব্দটা উচ্চারিত হয় না। পাত্রপক্ষ মধুর গলায় বলে,
“ছেলের ভীষণ শখ, শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা মোটরসাইকেল উপহার দিবে।”
যৌতুক শব্দের নতুন প্রতিশব্দ হচ্ছে উপহার। এমন বাহারি উপঢৌকনের সাথে সাথে কালো রঙের মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে যায় পণ্যের মতো। তবুও যায়। আমিও যাব। তবে এই যে অদেখা ভদ্রলোকের সাথে আমার প্রেম, তাকে কি পাব জীবনসঙ্গী হিসাবে? যাকে হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছি আমি তার বউ হবার সৌভাগ্য কি আমার আছে?
জীবনের উপর আমার ভীষণ অভিযোগ। জীবনের প্রথম যেই মানুষটাকে নিজের সম্পূর্ণ আবেগ অনুভূতি নিয়ে ভালোবাসলাম সেই মানুষটার সাথে দেখা হবার পর কি হবে সেই শঙ্কায় আমার ঘুম হয় না। এক জীবনে এতো যন্ত্রণা আমি রাখব কোথায়? সৃষ্টিকর্তা কি পৃথিবীর সব যন্ত্রণা আমার ভাগ্যেই লিখেছেন?
আতঙ্ক, ভয়, শঙ্কা নিয়েই আমার দ্বারে সেই দিন এল যেদিন আগন্তুকের সাথে আমি দেখা করব। তার আগের রাত্রিটি নির্ঘুম কাটলো আমার। কালো চোখজোড়ার নিচে পড়ল ডার্ক সার্কেল। এলোমেলো আমি নিজেকে যথাসম্ভব পরিপাটি করে খুব ভোরে একটা চিঠি লিখতে বসলাম। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি আজন্ম টান আমার। প্রেমের কথা বহুত জানা আছে। সেই কথামালা গুছিয়ে ক্লাস এইট থেকেই প্রেমের কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। নিজের সাহিত্যিক প্রতিভার সবটাই ঢেলে দিয়েছিলাম সেই চিঠিটিতে। চিঠির মূল ভাষা এই—
প্রিয় প্রেমিক,
এখন তোমার হাতে আমার লেখা সর্বপ্রথম কিংবা শেষ চিঠিটি। কারণ, আজকের পর আমাদের দুজনের প্রণয় কোন দিকে মোড় নিবে তা জানি না। হয়তো আমাকে তোমার মনের মতো দেখতে না হলে এখানেই আমাদের সম্পর্কের ইতি ঘটবে। কারণ আমি জানি, অপছন্দের কিছু নিয়ে দীর্ঘদিন সুখী জীবন কাটানো যায় না। তবুও এই নির্মম সত্যটা ভাবতে গেলেই আমার দুচোখ জলে ভরে উঠে। তোমাকে ভিন্ন নিজের আশেপাশে অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারি না আমি। না পারি তোমার পাশে অন্য কোনো রমণীর ছায়াও সহ্য করতে। প্রেম বিয়োগের কথা ভাবতে গেলে একটা শাণিত তলোয়ারের আঘাতে আমার হৃদয় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বুঝবে কি তুমি, বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া সেই রমণীর ব্যথা?
আমি অপরূপা নই। নই মহাকালের পাতা থেকে উঠে আসা অপ্সরা। যার আঁখিযুগল প্রেমিকের হৃদয়ে মায়াবাণ নিক্ষেপ করতে পারে। যার অঙ্গের লীলায়িত গতিছন্দ প্রেমিকের হৃদয়মন হরণ করে প্রাণে প্রেমের মূর্ছনা জাগাতে সক্ষম। আমি সূর্যের আলোর মতো প্রখর, গ্রীষ্মের মতো শুষ্ক, বন্যার মতোই ভয়াবহ, সাইক্লোনের মতো ধ্বংসাত্মক। কি ভাবছো, নারীর সহজাত বৈশিষ্ট্য, নমনীয়তা বুঝি আমার মাঝে নেই? হয়তো সামান্য একটুখানি ভুল ভাবছো তুমি। কেন বলছি?
বলছি কারণ, আমি খুব বাজে ভাবে প্রেমে পড়েছি। গুছিয়ে ভালোবেসেছি একজন পুরুষকে। আজকাল রাতে দামাল মেয়ে নবনীর ঘুম হয় না। না সে উত্তাল সমুদ্রের মতো ছুটে চলে এলাকার এ মাথা থেকে ও মাথা। এই নবনী গভীর রাতে, যখন খুব জোছনা হয় তখন অপার্থিব আলো অঙ্গে মেখে স্নান করে। প্রেমের কবিতা আওড়ায় চাঁদের দিকে চেয়ে। এতোকিছুর পরে আমাকে কি শুধুই একটা কুৎসিত মেয়ে বলেই মানা যায়? মনে হয় না, আমি সুন্দরী! আমি প্রেমিকা? নাকি, তুমিও বাকিদের মতোই গায়ের রঙ দিয়ে মানুষ বিচার করো? বর্ণবাদে বিশ্বাস করো, মাহতাব?
অবশ্য, আমি জোর করব না। জোর করে হৃদয় বাঁধা যায় না। আর না, চোখের অশ্রুকে বানাব আমার প্রেমের হাতিয়ার। যদি তোমার আমাকে ভালো না লাগে, একান্তই অপছন্দ করো তবে আমি নিঃশব্দে দূরে সরে যাব তোমার থেকে। যেতে যেতে হয়তো বলব,
আবার আসিব ফিরে, আবার আসিব ফিরে…
আচ্ছা শোনো, যদি আমাদের সম্পর্ক আর বেশিদূর না এগোয়— তবুও প্লিজ, আমার এ চিঠি মূল্যহীন কাগজের স্তূপে ফেলে দিও না। রেখে দিও পুরনো বইয়ের ভাঁজে। যদি অদূর ভবিষ্যতে কোনোদিন এই চিঠি ফের হস্তগত হয় তবে পড়ে একটু হেসে ফেলো তুমি। মনে করো, নবনী নামের এক পাগল প্রেমিকা ছিল তোমার। মাহতাব, তোমার স্মৃতিতে কি তখনও থাকব আমি? দেখো, উন্মাদের মতো ভবিষ্যতের চিন্তায় এখুনি বিভোর হয়েছি আমি। তবে বলো, কি করে তোমার থেকে আলাদা হবো? কোন উপায়ে?
এখন বলো, কেমন আছো? এখনো বাসো ভালো?
—ইতি
নবনী
১৫.০৩.২০২২
চিঠিটা লিখে স্কচটেপ দিয়ে ডায়েরির ভাঁজে লুকিয়ে রাখলাম আমি। অতঃপর খুব সুন্দর করে গিফটের কাগজে মুড়িয়ে নিলাম আমার যৌবনের সবটুকু আবেগ। যা তুলে দেব— প্রিয়জনের হাতে। অতঃপর নিজেকে যথাসম্ভব গুছিয়ে চলে গেলাম মানুষটার সাথে দেখা করতে। বাড়িতে বলে গেলাম— কলেজে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হবে।
ওর সাথে একা একা দেখা করতে যাওয়ার মতো সৎ সাহস আমার কখনোই ছিল না। শুনেছি, বদ লোকেরা প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে নির্জনে ডেকে নিয়ে মেয়েদের সাথে অসভ্যতা করে। সেই ভয় থেকে আমি সঙ্গে নিলাম বান্ধবীকে। ধড়ফড় বুকে প্রিয় বান্ধবীর হাত চেপে ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম মানুষটার আগমনের। আমরা দেখা করলাম উপজেলা ভবনে। সেখানটায় বিশাল মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলাম জড়োসড়ো হয়ে। বহুক্ষণ পরেও মানুষটা যখন এল না আমরা হাঁটতে লাগলাম। উপজেলা ভবনের মধ্যিখানে অসংখ্য সুপারি গাছ লাগিয়ে পায়ে চলার পথ তৈরি করা হয়েছে। বিশাল চত্বরটির চারিদিকে শোভা পাচ্ছে বাহারি ফুলের গাছ।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখা মিলে মস্ত বড় ঘাট বাঁধানো এক পুকুরের। পুকুরের চারিদিকে বুক অবধি গ্রিল দিয়ে বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। এবং এই মস্ত পুকুরের মাঝখানে গিয়ে মাছ ধরার জন্য ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হয়েছে সেতু। সেই সেতুটি ধরে এগিয়ে গেলে পাওয়া যায় মস্ত গোলাকার ইট-সিমেন্টের বৃত্ত। সূর্যের আলো থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর একইভাবে তৈরি করা হয়েছে সিমেন্টের ছাতা। সেই ছাতার উপর আবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে খাবার। অসংখ্য পায়রা এসে খাচ্ছে তা। কি যে সুন্দর দৃশ্য! আমার চোখ জুড়িয়ে গেল।
আমরা দুজন মুগ্ধ হয়ে সেখানটায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম স্বচ্ছ পানিতে মাছের খেলা। কি সুন্দর আপনমনে মাছগুলো সাঁতার কাটছে। একসময় মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলল,
“আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব নবনী? তোর ফেসবুক প্রেমিকের তো দেখা নেই। ওই ব্যাটা সত্যিই আসবে তো?”
প্রভার সন্দেহ প্রকাশ দেখে আমিও ভুগলাম দ্বিধাদ্বন্দ্বে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সময় ধরে অপেক্ষা করছি। বরাবর অধৈর্য আমার ধৈর্যের বাঁধ সেদিন ভাঙল না। হঠাৎ করেই অনুভব করলাম আমিও কারো জন্য অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতে পারি।
মানুষটা এল ঝিম ধরা দুপুরে। আমরা তখন হতাশ হয়ে বসে বসে ঝালমুড়ি চিবুচ্ছি। কাঁচা মরিচের ঝালে লাল হয়ে উঠেছে ঠোঁট জোড়া। মানুষটার কল এল তখন। এতকাল সিমে টেক্সট করা মানুষটা আচমকা কল করে বসল আমায়। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল মানুষটা এসে গেছে। সে আছে আমার আশেপাশে। আমি হঠাৎ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গেলাম। লজ্জায় আড়ষ্টতায় চেপে ধরলাম প্রভার হাত। বললাম,
“ও কল করছে! কি করব?”
প্রভা বিস্মিত হয়ে বলল,
“কে কল করছে?”
“মা- মাহতাব।”
“ধর। ধরে বল, আমরা শিমুল গাছের নিচে বেঞ্চিতে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছি।”
আমি কল ধরলাম না। আতঙ্কে তখন আমার হাত-পা কাঁপছে। বুকের ভেতর উত্তাল ঝড় উঠেছে। অচল হয়ে গেছে স্নায়ু। আমি তাকালাম উপজেলা ভবনের মূল ফটকের দিকে। দেখলাম একটা কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক চারিদিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে কানে ফোন চেপে এগিয়ে আসছে। আমি তাকালাম আমার হাতে অবিরত বাজতে থাকা ফোনের দিকে। কেটে দিলাম। দেখতে পেলাম কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোক ফোনটা নামিয়ে এনে মুহূর্তের ব্যবধানে আবার কানে চেপে ধরলেন। দূর থেকে ওই অস্ফুট মুখ আর ব্যাকুল ভাব দেখেই আমি টের পেলাম এই সেই ব্যক্তি। উনিই সেই পুরুষ। মাহতাব। আমার প্রেমিক মাহতাব। তাকে দেখেই স্তব্ধতায় ছেয়ে গেল আমার গোটা পৃথিবী। চারিদিকের সব কোলাহল ছাপিয়ে, দৃষ্টির সম্মুখের অসংখ্য দৃষ্টি এড়িয়ে একমাত্র মাহতাব নামের মানুষটিতে কেন্দ্রীভূত হলো আমার হৃদয়মন।
মাহতাব এগিয়ে আসছে। কি আছে ওর ধীর পদক্ষেপে পা ফেলা ওই মৃদু ছন্দের হাঁটায়। কেন তার প্রতিটি কদম নাড়িয়ে দিচ্ছে আমার অস্তিত্বের ভিত? মানুষটা একবার আমার দিকে তাকাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি বুঝল কে জানে? তবে সে এগিয়ে আসতে লাগল এদিকেই। আমার মনটা বিক্ষিপ্ত হলো। এতক্ষণ যেই আমি মাহতাবের কল ধরিনি সেই আমি ক্রমাগত কল করতে লাগলাম তার নাম্বারে। মনে দুরন্ত ইচ্ছে, কল ধরলেই তাকে বলব,
“মাহতাব শোনো, আজ তোমার সাথে দেখা করতে পারব না আমি। প্লিজ আজ তুমি চলে যাও। আমরা অন্যদিন দেখা করব। আমার খুব ভয় করছে মাহতাব। প্লিজ আজ তুমি দেখা করতে চেও না। যাও। ফিরে যাও।”
কিন্তু তা আর বলতে পারলাম কই? মাহতাব আমার কল ধরল না। বরং যত এগিয়ে এল ততই হাঁটার গতি মন্থর হলো তার। একহাতে একটা শপিং ব্যাগ আর এক হাত পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে, ঠোঁটের কোণে সর্বভাব ব্যঞ্জনাময় হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে এল সে। আমার গোটা পৃথিবী দুলে উঠল তখন। প্রভার হাত চেপে ধরলাম আমি। তাড়া দিলাম,
“চল প্রভা। আর এখানে থাকা যাবে না। আয় আয়..”
বলা বাহুল্য এক প্রকার ছুট লাগালাম আমি। বোকার মতো মেয়েটা আমার পেছন পেছন আসতে লাগল। ঝালমুড়ি বিক্রেতা তখন চেঁচিয়ে বলল,
“ও আফা টাকা না দিয়া কই যান?”
কিসের টাকা, কিসের কি? আমি পাত্তাই দিলাম না সেসব। ছুটলাম শুধু। দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পেছনে ফিরে দেখলাম মানুষটা ঝালমুড়ি বিক্রেতার টাকা দিয়ে দিচ্ছে। তার এই কাজে ভীষণ লজ্জিত হলাম আমি। প্রথম সাক্ষাতই ঋণী হয়ে গেলাম তার কাছে। শতবার বলেও কি এই বিশ টাকা তাকে আর দিতে পারব কখনো? উফ! এই মানুষটা বিল মিটিয়ে আবার এদিকেই আসছে কেন? সে কেন চলে যাচ্ছে না? আমার অসহ্য লাগতে শুরু করল। আমি দেখা করব না তার সাথে। কোনো ভাবেই না। আমি ভীষণ বোকা তাই না? আমার সাথে দেখা করার জন্য যে লোকটা সুদূর রাজশাহী থেকে গাজীপুর চলে এসেছে তার সাথে দেখা করব না? তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি? পরে অবশ্য ভেবেছিলাম— মানুষটা যদি ফিরে যেত আমি কি খুশি হতে পারতাম? আমার ব্যাকুলতাটা তো আমি ভিন্ন আর কেউ জানে না।
ছুটতে গিয়ে যখন হাঁপিয়ে উঠেছি তখন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল প্রভা। কড়া চোখে তাকাল আমার দিকে। এরপর আমাদের পিছু পিছু আসা মানুষটার দিকে। বলল,
“ছুটছিস কেন?”
“এমনি। চল পেছনের গেট দিয়ে বাড়ি চলে যাই।”
“আগে বল, দৌড়ানোর কারণ কি?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“ঘূর্ণিঝড় আসছে।”
“সেই ঘূর্ণিঝড়ের নাম কি মাহতাব?”
“হুঁ।”
“ঘূর্ণিঝড়কে তো রাজশাহী থেকে গাজীপুর এনে ফেলেছিস। এখনো কেন ঘুরাচ্ছিস? যা কথা বল।”
আমি আতঙ্কিত গলায় বললাম,
“পাগল হয়েছিস! আমি যাব না।”
“কেন?”
“আমার ভয় করছে।”
“প্রেম করার সময় ভয় করেনি?”
“না।”
“তাহলে এখন কেন করছে?”
আমি তাকিয়ে দেখলাম মাহতাব অনেকটা এগিয়ে এসেছে। তার ঠোঁটের কোণের ওই মিটিমিটি হাসিটি আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমার মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেল। উত্তেজিত হয়ে উত্তর দিলাম,
“জানি না প্রভা প্লিজ চল, ও এসে পড়েছে।”
আমি প্রভার হাত ধরে টানতে লাগলাম। প্রভা নড়ল না নিজের স্থান থেকে। আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর উলটো আমার হাত ধরল খপ করে। রূঢ়ভাবে বলল,
“আসুক। উনার আসার জন্যই তো অপেক্ষা করছি সকাল থেকে। আসার পর পালাই পালাই করছিস কেন? আশ্চর্য! গাধা নাকি তুই?”
এত কিছু আমি বুঝি না। আমার মাথায় ঢুকে না প্রভার কোনো কথা। আমি ছাড়িয়ে নিতে চাই নিজের হাত। মেয়েটা শক্ত করে ধরে রেখেছে আমায়। আমি পালাতে চেয়েও পারছি না। ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি। একসময় মানুষটা আমাদের পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো। সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম।”
সালামের জবাব দিল প্রভা। আমি ততক্ষণে নিজের নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করেছি মেয়েটির হাত। মানুষটার সাথে প্রভার কুশলাদি বিনিময়ের পর্ব শেষ হবার পর প্রভা আমার হাত ছেড়ে দিল। কিন্তু এবার আর আমি ছাড়লাম না। খামচে ধরলাম তার বাহু। ছাড়াতে চেষ্টা করতেই শিল্পীর আঁচড়ের মতো আবার দাগ তার বাহুতে। সে দাঁত কিড়মিড় করে ফিসফিস করে বলল,
“মেরে ফেলবি নাকি? এতো চিমটি কাটতে মন চাইলে প্রেমিককে চিমটি কাট। আমাকে কেন? যা সর!”
সে জোরপূর্বক আমার হাত সরিয়ে দিল। মাহতাবকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, আপনারা কথা বলুন। আমি ফুসকা খাই গিয়ে। বিলটা কিন্তু আপনি দিবেন।”
মাহতাব হাসলো। যেন বুঝাল— বিল কেন? আপনার এই বান্ধবীটির জন্য আমি নিজের প্রাণটাও নির্দ্বিধায় বলিদান দিতে পারি। মাহতাবের থেকে সম্মতি পেয়ে প্রভা হাঁটা ধরল। একা একা একটা ছেলের সাথে আমাকে রেখে মেয়েটা চলে যাচ্ছে? আমি তার নিষ্ঠুরতায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে আবার তার পিছু নিলাম। চেপে ধরলাম হাত। জোরপূর্বক আবার ছাড়িয়ে নিল সে। কটমট করে বলল,
“গাধা নাকি তুই? ছাড় তো!”
সে যে আমার ব্যবহারে চরম বিরক্ত হয়েছে তা টের পেলেও তাকে ছাড়তে আমার যত রাজ্যের আপত্তি। আচমকা একটা কণ্ঠ আমার সকল তৎপরতা থামিয়ে দিল। রাশভারী মানুষটির কণ্ঠে উচ্চারিত হলো আকুল বাক্য—
“চলে যাচ্ছ কেন নবনী? কথা বলবে না আমার সাথে?”
থেমে গেল আমার পা। থেমে গেল হাত। ছি ছি! যাকে দেখার জন্য আমার এতো উচ্ছ্বাস, যার সাথে সাক্ষাতের আশায় আমার এতো ব্যাকুলতা তার সাথে কথা বলব না? ছি! কি ভয়ানক ভুলটাই না করেছি। মরমে মরে যেতে মন চাইল আমার। আর ব্যস্ত হলাম না প্রভাকে আগলে রাখার চেষ্টায়। সে চলে গেল আপন কাজে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম পাথরের মূর্তির ন্যায়। আচমকা এই মানুষটির কণ্ঠ আমার সবটুকু চপলতা কেড়ে নিল। জমে গেলাম আমি। তাকালাম না অবধি তার দিকে। ইটের রাস্তার দিকে অপলক নয়নে চেয়ে রইলাম। এভাবে কত সময় ব্যয় হলো আমি জানি না। আমার সে খেয়াল নেই। তবে বুঝলাম মানুষটা আমাকে এই পুরোটা সময় মুগ্ধ চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টির খোঁজ তার দিকে না তাকিয়েও পাওয়া যায়। এক সময় সে বলল,
“বুঝলে নবনী, মানুষ হয়ে বড্ড ভুল হয়ে গেল।
আমি যদি প্রেয়সীর হেঁটে যাওয়া পথের বালুকণা, কিংবা কংক্রিট হতাম তবে বোধহয় এমন করেই চেয়ে দেখত সে আমায়। মুগ্ধ হতো, প্রেমের কবিতা শোনাত, তাই না?”
কি আশ্চর্য! আমি আবার সামান্য ইট, বালুর উপর মুগ্ধ হলাম? কখন তাদের প্রেমের কবিতা শোনালাম? ফ্যালফ্যাল চোখে চাইলাম আমি তার মুখের দিকে। আশ্চর্য কাণ্ড, তার মুখের দিকে তাকালেও আমি তাকে দেখতে পেলাম না। তার মুখ, চোখ ছাপিয়ে আমার চোখ আটকে গেল দূরের ওই কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে। আমি তার দিকে শত চেষ্টা করেও তাকাতে পারছি না। কোনো ভাবেই পারছি না।
“আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম।”
আজান শেষে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসা এই শেষ ধ্বনিটুকুই কানে এল আমার। ঘুম ভেঙে গেল তখন। এখন ভোর। খুব ভোরে এখন আমার আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। প্রতিদিন একটা না একটা সমস্যা হচ্ছে। খুব যে উল্লেখযোগ্য কিছু তাও নয়। অকারণেই ভোরবেলাটা আমার অসহ্য কাটে। আমি ঘুম থেকে উঠে বসলাম। রাতের তীব্র তমসা কেটে গিয়ে ভোর হয়েছে। বিছানার একপাশে তাকিয়ে দেখলাম মাহতাব নেই। নিশ্চয়ই নামাজ পড়তে গিয়েছে। আমি অস্বীকার করতে পারি না মাহতাব খুব ভালো মানুষ। সে ধর্মভীরু দায়িত্বশীল স্বামী। তার মতো একজন ভালো মানুষকে নিয়ে কেন আমার এতো সমস্যা? আমি কেন তৃপ্ত হতে পারি না? আমার মন কি অতিরিক্ত আশাবাদী?
কিন্তু কিই বা আশা করব আর? মাহতাব আশা করার আগেই আমাকে সবটা দিয়েছে। নিজেকে উজাড় করে ভালোবেসেছে। তবে কেন আমি এমন করছি? গতকাল রাতের ঝগড়ার জন্য আমার মন খারাপ হলো। না আমি আর মাহতাবের সাথে ঝগড়া করব না। অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য অজু করে নামাজ পড়লাম। মোনাজাতে খুব কাঁদলাম আমি। আমার মনে তখনো ওই ভ্রান্ত ধারণা গাঁট হয়ে আছে— আমি কখনোই মা হতে পারব না। ধ্রুব সত্য হিসাবে এটাই মেনে নিয়েছি আমি।
—চলমান—
