#নিষ্ঠুর_নিয়তি
পর্ব – ৩
Kzal Mithun
আমি আস্তে করে আমার হাসব্যান্ডের হাতটা আমার কোমর থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম । পেটে ক্ষিদা , মন মেজাজ ভালো নেই আমার । রাত দুপুরে উনার এসব ন্যাকামি একদম ভালো লাগছে না আমার । উনি যে আমাকে ভালোবেসে কাছে টানছে না ,সেটা আমি বেশ বুঝতে পারছি । বিয়ে বাড়িতে সুন্দরি সুন্দরি মহিলাদের দেখে উনার মাথা গরম হয়ে আছে ।
বিরক্ত হয়ে বললাম – প্লিজ ছাড়ো আমাকে । ভালো লাগছে না এসব ! তুমি জানো আমি অসুস্থ ! তারপরও তুমি ….! আমার কথা শেষ না হতেই আমার হাসব্যান্ড আমার কোমর ছেড়ে দিলো । মুখে অসম্ভব রকমের বিরক্তির ভাব নিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো । ধ্যুর ! অহস্য ! সরে যাও আমার কাছ থেকে । এই অসুস্থতার নাটক আর কতদিন করবা বলোতো ..? বা..লের এক প্যানপ্যানি আর ভালো লাগে না । সারাদিন খেটুখুটে বাসায় আসি , আর উনি আমাকে রাতের বেলায় পা ভাঙার নাটক দেখান ! আর জাস্ট নিতে পারছি না । বিরক্ত লাগছে আমার ! দাঁত মুখ খিচিয়ে চেচিয়ে উঠলো সে ।
রাত দুপুরে হাসব্যান্ডের এমন অসভ্য আচরনে আমি একদম ফ্রিজ হয়ে গেলাম । ছি ! ছি ! ছেলে মেয়ে বড় হয়েছে । দুজনেই ওরা প্রাপ্ত বয়স্ক । ওরা মনে হয় এখনও ঘুমায়নি । পাশের রুমেটাই আমার ছেলের । ওদের বাবার চিৎকার কথা শুনে জানি কি ভাবছে ওরা ! ইস্ ! কি লজ্জা ! কি লজ্জা ! মনে হচ্ছে আমি মাটির নিচে লুকাতে পারলে বাচঁতাম ।
চাপা কন্ঠে বললাম – প্লিজ চুপ করো । পাশের রুমে ছেলে আছে । রাত দুপুরে তোমার চিৎকার শুনলে কি ভাববে বলতো ?
লেকচার মেরো না । সারাক্ষন শুধু জ্ঞান দিতে থাকে । বিরক্তিকর ! যাও , পাশের রুমে গিয়ে ঘুমাও । বলেই উনি পাশ ফিরে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে পড়লো ।
হাসব্যান্ডের এতো অপমান সত্তেও ঘর থেকে বের হতে পারলাম না শুধু লজ্জায় । ছেলে মেয়ের সামনে মুখ দেখাবো কেমন করে ? যদি জিজ্ঞেস করে – ওদের বাবা কেনো আমাকে রাত দুপুরে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে ? নিজের সন্মান বাঁচাতে শক্ত পাথর হয়ে বসে থাকলাম উনার পাশেই ।
সারারাত এক ফোটা চোখের পাতা এক করতে পারিনি । পাশে শুয়ে থাকা মানুষটা গভির ঘুমে আচ্ছন্ন ; অথচ তার প্রতিটা নিশ্বাস যেনো আমার কানের কাছে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছিলো । যে মানুষটা সারা সন্ধ্যা অন্য নারীদের সাথে পান , মিষ্টি খেয়ে আনন্দ ফুর্তি করেছে ; সে মানুষটা একবারও ভাবিনি যে তার অসুস্থ স্ত্রী ঘরে না খেয়ে বসে আছে । আমার শরীরের পঙ্গুত্বের চেয়ে আমার মনের পঙ্গুত্ব এখন আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে ।
ফজরের আযান দিলে নিজের রুম থেকে বের হলাম । লাঠি নিলাম না হাতে শব্দ হবে বলে। দেয়াল ধরে আস্তে করে দরজা খুললাম । তারপর এক পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ডাইনিং এ আসলাম । কাল রাতে বাকি ওষুধগুলো না খাওয়াতে ব্যথা কমেনি । ঠোঁট ব্যথায় টন টন করছে । তবে পায়ের ব্যথাটা একটু কম মনে হলো । একটা চেয়ার টেনে বসলাম । বেড রুম থেকে এ পর্যন্ত আসতেই কেমন জানি হাপিয়ে গেলাম । এ কদিনে শরীরটা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে । গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে । এক গ্লাস পানি ঢেলে ঢক ঢক করে এক নিশ্বাসে খেলাম । মুহূর্তে ভুলে গেলাম ঠোঁটের ব্যথা । উফ্ ! শান্তি ! আলহামদু লিল্লাহ !
আমি উঠার পর পরই দেখলাম আমার ছেলে আলিফ উঠে এসেছে । ওকে দেখে চমকে উঠলাম ! আলিফের চোখ দুটো একদম রক্ত লাল হয়ে আছে । চুলগুলো এলোমেলো । মুখটা শুকনো । সারারাত ঘুমায় নি মনে হচ্ছে আমার ছেলেটা । বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো । হাত বাড়িয়ে ছেলেকে কাছে টেনে নিলাম । কি হয়েছে আব্বা ! মুখটা এমন শুকনো কেনো রে ? আমার মনে হচছে তুই কাল বিয়ে বাড়িতে পেট ভরে খাসনি ।
ছেলে আমার কথা শুনে আমার বুকে মুখ লুকালো । আমি ছেলেকে জড়িয়ে ধরলাম বুকের মধ্যে । কি যেনো একটা বলতে চায় ও আমাকে । কিন্তু এখনি কিছু শুনতে চাই না আমি । পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা । রাতের ওষুধগুলোও খাওয়া হয়নি । সবার আগে কিছু খেয়ে ওষুধ খেতে হবে । ডোজ কমপ্লিট না করলে সহজে সুস্থ হবো না আমি । এখন যদি ছেলের মুখে নিজের আপন লোকজন সম্পর্কে নেগেটিভ কিছু শুনি , তাহলে আমার খাওয়ার মুডটাই নষ্ট হয়ে যাবে । মনের উপর এখন আর আমি চাপ বাড়াতে চাচ্ছি না । ছেলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম – আমাকে একটু চা করে খাওয়াবি আব্বা ? ভিষন ক্ষুধা পেয়েছে রে । তুই চা কর আমি নামাজটা পড়ে নিই ! আর হ্যা ! পারলে দুটো পরোটা ভাজিস আব্বা ! শুধু বিস্কিট চা খেয়ে পেট ভরবে না এখন ।
আমার ছেলে পরোটা ভেজেছে , দুইটা ডিম পোচ করেছে । ফ্রিজে মাংস ছিলো সেটাও গরম করেছে । মা ছেলে খেতে বসেছি । ছেলে বেশ আদর নিয়ে জিজ্ঞেস করলো – আম্মু ! খাইয়ে দেবো ? মাথা ঝাকিয়ে বললাম না ! চল , মা ছেলে মিলে দুজন একসাথে খাই ।
খাওয়া প্রায় শেষের দিকে । ওরা বাপ বেটি তখনও ঘুম থেকে উঠেনি । সকাল প্রায় ৯ টা বাজে । ফোন বাজলো আমার । ভাশুরের বউর ফোন । ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বললাম – এতো সকালে এই মহিলা কেনো ফোন দিচ্ছে ? নিশ্চয় কোনো মতলব আছে । ছেলের দিকে তাকালাম । ছেলে ফোন ধরতে না করলো । বললো – আগে খাওয়া শেষ করো আম্মু ! উনার দরকার হলে আবার উনি ফোন করবে । তুমি জানোনা আম্মু , কাল হলুদের অনুষ্ঠানে বড় চাচি আর ছোট চাচি মিলেই আপুনিকে নাচতে পাঠিয়েছে । আমি বার বার আপুনিকে না করলাম কিন্তু শুনলো না । ছোট চাচি ইচ্ছে করেই ক্যামেরাম্যানকে দিয়ে আপুনিকে বাজে ভাবে ভিডিও করিয়েছে যাতে দেখতে বাজে দেখায় , আর উনার ভিউ ব্যবসা ভালো হয় । উনার ব্লগের ভিউ বাড়ানোর জন্য আমার বোনটাকে উনারা দুজন মিলে সবার সামনে হাসির পাত্র বানিয়েছে আম্মু ।
মেজাজটা চট করে উঠে গেলো – তোর বাবা কি তখন ওখানে বসে ঘাস কাটছিলো ? সে দেখেনি যে তার মেয়েটাকে ওরা বোকা বানাচ্ছে ! বাবা তো তখন অন্য আন্টিদের সাথে মজা করতে ব্যস্ত ! বলেই ছেলে মাথা নিচু করে ফেললো । আহারে বাচ্চাটা আমার ! নিজের বোনের অপমান আর চোখের সামনে নিজের বাবার অসভ্য আচরন মেনে নিতে পারছে না । তাইতো কাল সারারাত আমার ছেলেটা ঘুমোতে পারিনি ।নিজেকে এ মুহুর্তে খুব অসহায় লাগলো । ঘর বন্দি হয়ে আছি দুই সপ্তাহও হয়নি । অথচ আসে পাশের আপন মানুষগুলো পিঠে ছুরি চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ! কিভাবে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করা যায় , সেই নেশায় এখন মত্ত এরা । বুক চিরে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম । নাহ্ ! এভাবে শুয়ে বসে থাকলে হবে না । সুস্থ হতে হবে আমাকে ।
ছেলের রুমে ঘুমিয়েছিলাম আমি । বাসায় লোকজনের কোলাহলে ঘুম ভাঙলো আমার । ঘড়ির দিকে তাকালাম । বেলা এগারোটা বেজে গেছে । ছেলে আমাকে ওর রুমে দিয়ে দরজা আটকে দিয়েছিলো যাতে আমি না উঠি ।একটু ঘুমিয়ে অবশ্য ফ্রেশ লাগছে এখন । কিন্তু ! কারা এলো বাসায় ? তখনি মেয়ে দরজা খুললো । বিছানায় কেবল উঠে বসেছি আমি । আম্মু ! দাদা – দাদু আর ছোট চাচিরা এসেছে । শিগগির ওঠো ! আর কতো ঘুমাবা ?মেয়ের কথা শুনে ভিষণ অবাক হলাম আমি । নিজের কান দুটোকে বিশ্বাস হলো না আমার । মুখটা বিকৃত করে নাক মুখ কুঁচকে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম – কারা এসেছে ? মেয়ে গলা চেপে আবার বললো – আরে দাদা দাদীরা এসেছে সেই কখন ! তুমি ঘুমাচ্ছো বলে আলিফ তোমাকে ডাকতে নিষেধ করেছে । এতে কিন্তু দাদী খুব মাইনড করেছে । বাবাও ক্ষেপে আছে আলিফের উপর !
যতটুকু না সুস্থ লাগছিলো তার চেয়েও এখন বেশি অস্বস্তি লাগতে লাগলো উনাদের আসার কথা শুনে । বিয়ে বাড়ি রেখে আমার বাসায় এতো ভিড় করার কি মানে সেটা বুঝলাম না । দরজা খোলা দেখে ছোট দেবরের বউ ছেলের রুমে ঢুকলো । আরে ভাবি কি অবস্থা তোমার ? পা কি সত্যিই ভেঙেছে নাকি হুদাই ব্যান্ডেজ লাগাইছো … হা ..হা . হি .. হি বলেই সে অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লো । মেজাজ ঠান্ডা রাখলাম । পাত্তা দিলাম না ওর কথায় । মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে এখন আমাকে ।
শশুর শাশুড়ির সাথে দেখা করার জন্য লাঠি ছাড়াই দেয়াল ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ড্রইংরুমে আসলাম । শাশুরির মুখটা বেশ গম্ভির হয়ে আছে দেখলাম । শশুর আব্বা আর আমার ছেলে ব্যস্ত হয়ে উঠলো – আহা ! তুমি কষ্ট করে উঠে আসতে গেলে কেনো ? ছেলে দৌড়ে এসে আমাকে ধরলো । আমার হাসব্যান্ড তার মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে সোফার এক কোনায় বসে আছে দেখলাম ।আমাকে দেখে বেশ ভারি গলায় বললো – দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করো তো জলদি । আম্মা – আব্বা ঐ বাসায় পোলাও বিরিয়ানি খেতে পারছে না । একটু মাছ তরকারি রান্না করো !
আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমার হাসব্যান্ডের কথা শুনে । সে দেখছে যে আমি এখনও ঠিকমত দাঁড়াতে পারছি না , সে আমাকে হুকুম করছে মাছ তরকারি রান্না করতে !! কাল রাতের শোধ তুলছে বুঝতে পারলাম । শালা বাজে লোক একটা ! ইচ্ছে করছে মুখের উপরে ঠাস করে বলে দিই যে – পারবো না । তোমার আত্মীয়দের তুমি রান্না করে খাওয়াও । আমার কি দায় ঠেকেছে ? কিছুই বললাম না ।কারন আমার বাবা – মা আমাকে সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন ।
রান্নাঘরে টুলে বসে রান্না করছি । কাজের মেয়েটা আসেনি আজকে । ওরা যখনি বিপদ দেখে তখনই যেনো বেশি বেশি কাজে কামাই করে । গরমে ঘেমে নেয়ে একদম ভিজে গেছি আমি । ভিষন অস্থির লাগছে আমার । এরই মধ্যে ছোট বউ রান্না ঘরে ঢুকলো – হ্যালো বন্ধুরা ! কেমন আছেন সবাই …? এখন আমি আমার মেজো জায়ের রান্নাঘর থেকে সরাসরি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি । দেখেন আপনারা – এই অসুস্থ অবস্থায় , ভাঙা পা নিয়েও আমাদের প্রিয় মেজো ভাবি আমাদের জন্য ইলিশ মাছ রান্না করছে ।বলেই ছোট বউ ওর মোবাইল ক্যামেরা আমার পায়ের দিকে ধরলো । তারপর আবার শুরু করলো – শুধু ভাবির পা ভাঙেনি বনধুরা ! ভাবির ঠোঁট কেটেও দুটো সেলাই লেগেছে কিনতু ! এতো অসুস্থ হওয়া সত্তেও ভাবি আমাদের জন্য রান্না করছে । বন্ধুরা একেই বলে আদর্শ গৃহিনী ।
কথা বলতে বলতেই আমার ছোট জা এবার তার মোবাইল ক্যামেরা আমার মুখের দিকে ঘুরালো । আমি পিছন ফিরে বসে ছিলাম। আমাকে দেখা যাচ্ছে না বলে সে আমার মুখটা ধরে ক্যামেরার দিকে ঘুরিয়ে নিতে গেলো । ভয়ঙ্কর ভাবে রেগে গেলাম আমি । আমি বাচঁতেছি না আমার জ্বালায় , উনি আসছে আমার সাথে ইয়ারকি করতে । আমাকে সাহায্য করবে কি ! তা না ! ফাইজলামি শুরু করেছে আমার বাসায় এসে ।
রাগে মুখটা ঘুরিয়ে নিলাম আমি । খুব তেতো করে বললাম – এসব ন্যাকামি আমার একদম পছন্দ না । প্লিজ রান্নাঘর থেকে যাও । আরে আরে রাগ করছো কেনো ভাবি ? আমি আমার দর্শকদের সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি । দেখো দেখো কতগুলো লাইক কমেনট এসেছে ! দেখবা তুমি কিছুক্ষনের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যাবা ! দেখলা না , আমাদের মাইশা কেমন একদিনেই ফেমাস হয়ে গেছে ..!
আমার মাইশার কথা বলাতে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না । রাগে আমার সারা শরীর কাঁপতে লাগলো । ইচ্ছে করছে ছোট জার গালে ঠাস করে একটা থাপ্পর লাগায় ! কিন্তু সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে । সেটা না করে ওর মোবাইল ধরা হাতটা আমার ডান হাত দিয়ে এক ঝটকায় সরিয়ে দিলাম । ছোট বউ ঠিক বুঝে উঠার আগেই ওর হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেলো মেঝেতে …..!
চলবে …..!
