#নিষ্ঠুর_নিয়তি
২য় – পর্ব
Kzal Mithun
খুব মন খারাপ করে ফোন রাখলাম । ছেলে মেয়েকে রেডি হতে বললো আমার হাসব্যান্ড ।অথচ আমার কথা বললো না । ওরা তো আর হেটে যাবে না । গাড়ি করেই তো যাবে । আমিও যেতে পারতাম ।হয়তো আমি সাঁজ গোছ করতে পারবো না এখন । কিন্তু একটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার মতো মোটামুটিভাবে তো রেডি হয়ে যেতে পারতাম । কয়েকদিন ধরে সারাক্ষন তো ঘরে শুয়ে বসে আছি ।আর ভালো লাগছে না । বিরক্ত লাগছে আমার । বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে , সবার সাথে দেখা হলে আমার একটু ভালো লাগতো ।পায়ের কারনে হয়তো হাঁটা চলা করতে পারতাম না । কিন্তু এক যায়গায় বসে থেকে পরিচিত মুখ গুলো দেখেও তো শান্তি পেতাম । বুকের ভিতর একটা চাপা কষ্ট অনুভব করলাম । ঠোঁট আর পায়ের ব্যথার থেকেও মনের ব্যথাটা টন টন করতে লাগলো ।
মেয়ে সাজুগুজু করে আমার রুমে ঢুকলো । শাড়ি পরেছে আমার মেয়ে । লাল শাড়িতে আমার মেয়েকে একদম পরির মতো সুন্দর লাগছে । মনে মনে বললাম – মাশা আল্লাহ ! কারো নজর না লাগে ! মেয়ের হাতে একটা শপিং ব্যাগ দেখলাম । জিজ্ঞেস করলাম – ব্যাগে কি নিচ্ছো ? বললো – নাচের জন্য আলাদা করে একটা ড্রেস নিচ্ছি । ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম – মানে ? কোথায় নাচবা তুমি ? আরে সিয়াম ভাইয়ার হলুদের প্রোগরামে । আজকালকার গায়ে হলুদের প্রোগরামে উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের নাচা – গানা আমার একদম পছন্দ না । কি যে সব শুরু হয়েছে এখন ! মেয়ের কথা শুনে একটু রেগে গেলাম আমি । তুমি হলুদের অনুষ্ঠানে নাচবা সেটা আমাকে জানাও নি কেনো ?
আশ্চর্য ! নিজের আপন কাজিনের গায়ে হলুদে একটু নাচানাচি করবো , আনন্দ করবো , সেটাতেও তোমার পারমিশন লাগবে ? আজব তো ! মেয়ে বেশ চোখ রাঙিয়ে দাঁত মুখ খিচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো ।
আহত হলাম ওর এমন আচরনে । মুখে কিছুই বললাম না । তাছাড়া ঠোঁটের ব্যথায় কথা বলতেও কষ্ট হয় আমার এখন । রাগটা আপাতত পুষে রাখলাম । মনে মনে বললাম – বহুত বাড় বেড়েছিস এ কদিনে । আমাকে একটু সুস্থ হতে দে । তারপর দেখাবো মজা ।
ছেলে ঢুকলো রুমে । ওর এক হাতে আমার ব্যথার ওষুধ আর এক হাতে পানির গ্লাস । ওষুধ খুলতে খুলতে বললো – আম্মু নাও , ব্যথার ওষুধটা খেয়ে নাও । ব্যথা কমলে কিছু খেয়ে নিও । আমি তোমার খাবারটা রুমে দিয়ে যাচ্ছি । বাকি ওষুধগুলো আমি বাসায় এসে তোমাকে খাইয়ে দিবো । আর হ্যা ! শরির খারাপ লাগলে আমাকে ফোন করবা আম্মু । আমি চলে আসবো । ছেলের কথার মধ্যে তেমন কোনো আদর ছিলো না । কেমন যেনো একটা দায়সারা ভাব ছিলো ।
তবুও মনকে বুঝ দিলাম – যাক্ ! আমার ছেলেটা তাহলে এখনও অতোটা নিষ্ঠুর হয়ে পারিনি ।
নিজের রুমে একদম একা বসে আছি । বাচ্চারা চলে যাওয়ার পর ভিষন একা লাগছে অমার । ওরা তো গিয়েছে প্রায় ঘন্টা খানেক হলো । গিয়ে তো ফোন দেয়ার কথা , দিলো নাতো ! বিয়ে বাড়িতে সবাই আনন্দ ফুরতি নিয়ে ব্যস্ত । ফোন করার কথা হয়তো ভুলেই গেছে । ভাশুরের বাড়িতে আজ কতো আত্মীয়স্বজন এসেছে । সবাইতো নিজেদেরই লোকজন । কই ? আমার খোঁজ তো কেউ করলো না ? অবশ্য সবাই তো আর জানে না যে আমি অসুস্থ ! আচ্ছা , যদি জানেও … তাও তো কেউ জানতে চাইলো না আমি এখন কেমন আছি ? হুহ্ ! নিজের হাসব্যান্ডই এখনও একটা ফোন দিলো না তো বাইরের মানুষ আমার কি খোঁজ নিবে ..! একটু তাচ্ছিল্যের হাসি দিলাম ।
হঠাৎ বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠলো । কেমন যেনো একাকিত্বে পেয়ে বসলো আমার । সারা বাসা শুনশান নিরাবতা । ভয় করতে লাগলো আমার । ওরা যে আমাকে এই অবস্থায় একা ফেলে রেখে চলে গেলো , কখন আসবে তারও তো কোন ঠিক নেই ..! এর মধ্যে আবার যদি আমার শরিরটা খারাপ হয় ? প্রেসার বেড়ে আবার যদি এই খোড়া পা নিয়ে নিচে পড়ে যাই …? আরো খারাপ কিছুও হতে পারে আমার সাথে ! এতোক্ষন হয়ে গেলো কেউ আমার একটা খবর নিলো না এখনও পর্যন্ত ! আরে আমি তো মরিনি এখনও । বেচে থেকেও এতো অবহেলা এখনিই ? মাত্র কদিন হলো অসুস্থ হয়েছি । এরই মধ্যে আমি এতো পর হয়ে গেলাম সবার ?
অথচ সুস্থ থাকতে দিন রাত ওদের সেবায় নিজেকে সারাক্ষন ব্যস্ত রেখেছি । জ্বর , মাথা ব্যথা , হাই প্রেসার এগুলো পাত্তা দিই নি কখনও । সকাল থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সারাদিন বিছানায় পিঠ দিতে পারিনা আমি । হাসব্যান্ডকে সকালের নাস্তা খাইয়ে অফিসে পাঠাই আবার তাকে দুপুরের খাবার বক্স করে দিয়ে দিই । উনি আবার অফিসের ক্যানটিনের খাবার খেতে পারেন না সেজন্য । ছেলেকে কলেজে দিয়ে আসি প্রতিদিন । আমি চাই না ছেলে কোনো খারাপ সঙ্গে মিশুক । তাকেও নাস্তা খাইয়ে , তার টিফিন দিয়ে কলেজে দিয়ে আসি । মেয়েকেও আমি প্রায় সময় ভারসিটিতে নিয়ে যাই ওর সিরিউরিটির কথা ভেবে । ছায়ার মতো সঙ্গ দিই ওদেরকে আমি ।
তারপর একে একে ওরা যখন বাসায় ফেরে , তখন শুরু হয় আমার ২য় ইনিংস । সন্ধ্যার নাসতা , রাতের খাবার , ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খোঁজ নেয়া , হাসব্যান্ডের জন্য আমাকে রাতে টাটকা খাবার রানতে হয় । কারন উনি আবার এক তরকারি একবারের বেশি খান না ।আমার অনেক কষ্ট হয় । কিন্তু তারপরও আমি আমার স্বামী সন্তানের জন্য হাসিমুখেই সবকিছু করি ।
ফোন বেজে উঠাতে ভাবনায় ছেদ পড়লো আমার । ফোন হাতে তুললাম । ভাশুরের বউর ফোন । যাক্ ! উনি তাহলে মিস করছে আমাকে । সেই যে বিয়ের কার্ড দিয়ে জামাই বউ গেলো , আর এ পর্যন্ত একটা খোঁজ নেয়নি আমার । ভাগ্যিস আমার পাটা আপাততো অকেজো , আমি অসুস্থ । তা না হলে সব মেহমান আমার বাসায় পাঠিয়ে ছাড়তো উনি । আল্লাহ বাঁচাইছেন । মনে মনে বললাম ।
হ্যালো মেজো বউ !! কেমন আছিস এখন ? আস্তে করে বললাম – ভালো না ভাবি । পায়ের ব্যথাটা কিছুতেই কমছে না গো । প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম – আমার বাবুরা ঠিকঠাক আছে তো ভাবি ? ওরা পৌছে আমাকে একটা কল দিলো নাতো । তাই জিজ্ঞেস করছি । আরে ওরা খুব মজা করছে সবাই । আমাদের মাইশার নাচ দেখে তো সবাই ভিষন অবাক ! ফাটিয়ে দিয়েছে একেবারে ! ও কবে কবে এমন নাচ শিখলো রে ? ভাবি দেখলাম খুব রসিয়ে রসিয়ে আমার মেয়ে মাইশার প্রশংসা করছে । কেমন জানি একটু খোঁচা দিয়ে বলার মতো মনে হলো আমার । চুপ করে গেলাম ।
শোন্ মেজো বউ ! তোর খাবার আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি । আর হ্যা ! আব্বা -মা (শশুর শাশুড়ি) আর রফিক (ছোট দেবর ) রফিকের বউ বাচ্চা সহ ওদেরকে তোর ওখানে পাঠাচছি । আমার বাসায় এতো মেহমান রাখার যায়গা নেই রে । ওরা বউভাত পর্যন্ত তোর ওখানে থাকবে । ভাবির কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো । চট করে মেজাজটা গরম হয়ে গেলো আমার । তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলাম আমি । ফাজিল মহিলা বলে কি ? দেখছে আমি অসুস্থ ! তার ছেলের বিয়ে , অথচ এই খোঁড়া পা , কাটা ঠোঁট নিয়ে আমি মেহমানদারি করবো ? নিজে বিছানা থেকে নামতে পারি না। এক সপ্তাহর বেশি হয়ে গেলো , এক বক্স খাবার তো দুরের কথা , কেউ একটা খোঁজ নিলো না কেমন আছি ? এখন আসছে আমাকে প্যারা দিতে !
পারবো না ! মুখের উপর ঠাস করে না করে দিলাম আমি । তোমার পাঁচ তলা বাড়ি ভাবি । শুনেছি তুমি একটা ফ্লাট খালি করেছো সিয়ামের বিয়ে উপলক্ষে । আব্বা – মাকে ওখানেই রাখো । প্লিজ আমার বাসায় কোনো মেহমান পাঠাবা না । তোমার মেজো দেবরকে বলে দিও – সে যেনো এই বিষয় নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি না করে । আর হ্যা ! আমার জন্য খাবার পাঠানোর কোনো দরকার নেই । বলেই আমি লাইন কেটে দিলাম
ফোন হাতে থাকতেই ফেইসবুক নটিফিকেশন এলো । কেউ বোধহয় লাইভে আছে । হুম ! ছোট দেবরের বউ ফেইসবুক লাইভে । সে আবার ব্লগার । একটু পর পর লাইভে আসে । রিল শেয়ার করতে থাকে সারাক্ষন । ঘন্টায় ঘন্টায় ছবি পোস্ট করে । দেখলাম সিয়ামের হলুদ অনুষ্ঠানের অনেক ছবি সে পোস্ট করেছে । স্ক্রল করতে থাকলাম । আমার হাসব্যান্ডের বেশ কিছু ছবি আছে দেখলাম । কিছু ছবিতে আমার চোখ আটকে গেলো । বেছে বেছে সুন্দরি সুন্দরি মহিলাদের সাথে বেশ আন্তরিক হয়েই সে ছবিতে পোজ দিয়েছে । কাউকে কাউকে দেখলাম মুখে তুলে মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছে । কারো মুখে পান গুঁজে দিয়ে হেসে লুটিয়ে পড়েছে । কোনো মহিলাকেই চিনতে পারলাম না । বোধহয় সিয়ামের শশুর বাড়ির আত্মীয় হবে । তার মানে আমি না যাওয়াতেই আমার স্বামী খুব ফূর্তিতে আছেন ।
স্ক্রল করতে করতে এবার আমার মেয়ের নাচের ভিডিও সামনে এলো । মেয়ের নাচ দেখে তো আমার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো । কে দিলো পিরিতের বেড়া ..! লিচুরও বাগানে ! পারলে বেড়া ডিঙ্গায় আসো …. ! দুষ্ট কোকিল ডাকে রে ….! এইসব বাজে গানের সাথে কি বিশ্রি অঙ্গ ভঙ্গি দিয়ে একটা অপরিচিত ছেলের সাথে আমার মেয়ে নাচছে । ছেলেটা বার বার আমার মেয়ের শরিরে টাচ করার চেষ্টা করছে । চোখের চাহনি কি অশ্লিল ! মাইশা কৌশলে সরে যাচ্ছে । উফ আল্লাহ ! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না ।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার মেয়ের নাচ ভাইরাল হয়ে গেছে । হাজার হাজার শেয়ার । কি সব বাজে বাজে কমেনট ! নিজের বাচ্চার সম্পর্কে এসব মন্তব্য সহ্য করা যায় না । উফ্ আল্লাহ ! হেফাজত করেন আমার বাচ্চাটাকে । এখন বুঝতেছি কেনো ভাশুরের বউ আমাকে খোঁচা দিয়েছে । আমার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে আমার বাচ্চাটাকে ব্যবহার করেছে ওরা । রাগে অভিমানে চোখে পানি চলে এলো আমার । মানুষ এতো খারাপ হয় ? আমার মেয়ে তো ওদেরই আপন রক্ত । আমাকে ছোট করে ওদের এতো শান্তি ? ছি! কি নিচু মানসিকতা ওদের ।
বেশ রাত করে বাসায় ফিরলো ওরা । না , সাথে কোনো মেহমান আসিনি । আমার ছেলের মুখটা বেশ থমথমে হয়ে আছে দেখলাম । সম্ভবত তার বোনের বিষয়টা তার ভালো লাগেনি ।বাপ বেটিকে একদম স্বাভাবিক দেখলাম । বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা আমি ! ওরা কি এখনও ফেইসবুকে ঢুকেনি ?
কাউকে কিছুই বললাম না । সকাল হোক । এখন সবাই ক্লান্ত । রাত দুপুরে অনর্থক ঝামেলা করার দরকার নেই । হাসব্যান্ড চেইনজ করে আমার পাশে খুব ঘনিষ্ট হয়ে শুয়ে পড়লো । মন মেজাজ কোনোটাই ভালো নেই আমার । আমি একটু সরে গেলাম । সে দেখলাম , আমার কোমরটা জড়িয়ে ধরে আরো কাছে টেনে নিলো …! শালা ! বাসায় ফিরে কিছু খেলাম কিনা , ওষুধ খেয়েছি কি না , সেসব কিছু জানতে চাইলো না ! এখন রাত দুপুরে আসছে পিরিত মারাইতে !
কেনো জানি গা টা ঘিন ঘিন করে উঠলো অমার ..!
চলবে ….!
