#নিষিদ্ধা
#পর্ব_৯
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
মখমলের বাক্সে রাখা লকেটটি থেকে নির্গত নীল আলোয় মেহরাবের পুরো পড়ার ঘর অপার্থিব এক রূপ ধারণ করেছে। কুড়িটি বছর এই লকেটটি নিস্প্রাণ পড়ে ছিলো। অথচ আজ যেন হঠাৎ তা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মেহরাব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। তার মন কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না, কিন্তু তার মন এক অজানা আশঙ্কায় দুলছে।
“নিহা! এটা কি তোমার কোনো সংকেত?”
মেহরাব বিড়বিড় করে বলল।
সে হাত বাড়িয়ে লকেটটি স্পর্শ করতে গেল। কিন্তু তার আঙুল লকেটটি ছোঁয়ার আগেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। লকেটটি বাক্স থেকে নিজে থেকেই শূন্যে ভেসে উঠল! সাথে সাথে মেহরাব ভয়ে দু’কদম পিছিয়ে গেলো। লকেটটি স্থির নেই, সেটা ঠিক লাটিমের মতো বনবন করে ঘুরছে। তার ঘূর্ণনের সাথে সাথে নীল আলোর তীব্রতা বেড়েই চলেছে। মেহরাব দেখলো, লকেটটি ধীরে ধীরে পড়ার ঘরের মেইন দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দরজা বন্ধ থাকা স্বত্বেও লকেটটি অবলীলায় বাইরের অন্ধকারের দিকে যেতে লাগলো। মেহরাবের মনে হলো, এই লকেটটি এতগুলো বছর নিস্প্রাণ বস্তু হিসেবে থাকলেও আজ, এটি একটি পথপ্রদর্শক। নিশ্চয়ই লকেটটি মেহরাবকে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যেতে চাইছে। সবকিছু বুঝতে না পারায় মেহরাব খুব চিন্তায় পড়ে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“নিহা! তুমি কি আমাকে ডাকছো? আমার খুব অসহায় লাগছে, নিহা! আমি আসছি!”
মেহরাব আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। টলমল চোখ জোড়া হাত দিয়ে মুছে, টেবিলের ওপর থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিয়ে সে বাসা থেকে দৌড়ে বের হলো। আজ ওর মনে এক দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে-এই লকেট তাকে নিহার কাছে, অথবা নিহার সাথে সম্পর্কিত কোনো চরম সত্যের কাছে নিয়ে যাবে। কুড়ি বছরের প্রতীক্ষার অবসান হয়তো আজ রাতে হতে চলেছে।
মেহরাব দ্রুত গাড়িতে গিয়ে বসল এবং স্টার্ট দিলো।
রাতের নিস্তব্ধ শহর চিরে মেহরাবের গাড়ি ছুটে চলল। তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। সেই নীল লকেটটি একটি ধুমকেতুর মতো নির্দিষ্ট এক দিকে উড়ে চলেছে।
**
অন্যদিকে, হিমাদ্রী আর প্রেরণা নিজেদের রুমে এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়তে চলেছে। সানজিদা চলে যাওয়ার পর রুমের পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে উঠেছে। প্রেরণা হিমাদ্রীর কোলে অচেতন হয়ে পড়ে আছে, তার গায়ের নীল আলো এখন কমে এসেছে, কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা বরফের মতো ঠান্ডা।
হিমাদ্রী কিছুতেই অবিশ্বাসের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তার স্ত্রী পরী রাজকন্যা? তার শ্বশুর বিখ্যাত লেখক মেহরাব? এসব কোনো গল্প বা রূপকথা নয়, তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বাস্তব। সে প্রেরণার কপালে হাত রেখে ভাবছিল, সানজিদার কথা মতো কীভাবে মেহরাবের সাথে যোগাযোগ করবে। মেহরাব কি আদৌও প্রেরণাকে মেয়ে হিসেবে মেনে নিবে? হিমাদ্রীর মাথায় এখন অনেক চিন্তা এসে ভর করেছে। তার বাবা-মা যখন প্রেরণার সত্যিটা জানবে, তখন কী হবে? হিমাদ্রী যখন তার ভাবনায় বিভোর ঠিক তখনই রুমের দরজাটা বিকট শব্দে কেঁপে উঠল। যেন বাইরে থেকে কেউ প্রবল শক্তিতে ধাক্কা দিচ্ছে। হিমাদ্রী চমকে উঠল। মেহেদী আর মরিয়ম তো নিচে ঘুমাচ্ছেন, তাহলে ওপরে কে?
“কে? কে ওখানে?”
হিমাদ্রী উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করল। কোনো উত্তর এল না, বদলে দরজায় আঘাতের তীব্রতা বাড়ল। হিমাদ্রী দেখল, দরজার নিচ দিয়ে এক ধরণের কুচকুচে কালো ধোঁয়া ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছে। সেই ধোঁয়া ঘরে ঢোকার সাথে সাথে ঘরের তাপমাত্রা আরও কমে গেল এবং এক ধরণের পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
হিমাদ্রী বুঝতে পারল, সানজিদার সতর্কতা সত্যি হয়েছে। রানী মালিকার দূতরা এসে গেছে! সে প্রেরণাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে দ্রুত এগোলো দরজার দিকে। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল তিনটি ছায়ামূর্তি। তাদের কোনো নির্দিষ্ট অবয়ব নেই, শুধু জ্বলন্ত লাল চোখ দুটো অন্ধকারে ঠিকরে বের হচ্ছে।
“ প্রেরণা! রানী মালিকা তোমার শক্তি চান। তোমাকে যেতে হবে আমাদের সাথে!”
ছায়ামূর্তিগুলোর কণ্ঠস্বর কেমন অদ্ভুত শোনালো।
হিমাদ্রী সাহসে নিয়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। প্রেরণার জন্য হিমাদ্রী সবকিছু করতে পারে।
“খবরদার! ওর কাছে আসবে না!”
ছায়ামূর্তিগুলো অবজ্ঞার হাসি হাসল। তাদের একজন হাত বাড়াতেই এক অদৃশ্য শক্তিতে হিমাদ্রী ছিটকে গিয়ে দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল এবং নিচে পড়ে গেল। তার মাথা ফেটে রক্ত বের হতে লাগল।
ছায়ামূর্তিগুলো এবার বিছানার দিকে এগোলো। অচেতন প্রেরণার চারপাশের নীল আলো এখন বিপদের সংকেত পেয়ে আবার তীব্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে অবশ, নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা তার নেই।
ছায়ামূর্তিগুলো যখন প্রেরণার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের জানালার কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল সেই লকেটটি! লকেটের তীব্র নীল আলো ছায়ামূর্তিগুলোর ওপর পড়তেই তারা আর্তনাদ করে পিছিয়ে গেল। এই আলো তারা সহ্য করতে পারছে না।
লকেটটি সরাসরি গিয়ে অচেতন প্রেরণার বুকের ওপর পড়লো। সাথে সাথে প্রেরণার সারা শরীর থেকে এক বিশাল আলোকরশ্মি বের হলো। সেই আলোক রশ্মি একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করল প্রেরণার চারপাশে। ছায়ামূর্তিগুলো সেই সুরক্ষাবলয় ভেদ করতে পারছে না, তারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের খোলা দরজা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকলো মেহরাব! সে গাড়িতে করে লকেটটিকে অনুসরণ করতে করতে এই অচেনা বাড়ির সামনে এসে পৌঁছেছিল। লকেটটি সদরদরজা খুলে ভেতরে ঢোকার পর মেহরাবও গাড়ি থামিয়ে দৌড়ে ওপরে উঠে এসেছে।
রুমে ঢুকেই মেহরাব স্তব্ধ হয়ে গেছে। মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় এক যুবক -হিমাদ্রী, বিছানায় অচেতন অবস্থায় এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতী। যার বুকের ওপর তার লকেটটি জ্বলছে, আর তাকে ঘিরে রেখেছে তিনটি ভয়াবহ ছায়ামূর্তি! এসব কী হচ্ছে? কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও মেহরাবের দৃষ্টি স্থির হলো বিছানায় শুয়ে থাকা প্রেরণার মুখের ওপর। রুমের আবছা আলো আর লকেটের নীল আভায় মেয়েটির মুখ দেখে মেহরাবের হৃৎস্পন্দন যেন থেমে গেল। এই মুখ, এই কপাল, এই নাক! এ তো হুবহু কুড়ি নিহার মতো!
মেহরাব কাঁপাকাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,
“কে তুমি! না, এ তো নিহা নয়। কিন্তু… কিন্তু কে এ? আমার নিহার সাথে এত মিল কীভাবে! “
মেহরাব যখন এসব ভাবতে ভাবতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তখনই প্রেরণার বুকের ওপর থাকা লকেটটি সূর্যের মতো প্রচণ্ড তেজে জ্বলে উঠল। সেই তীব্র আলো ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়লো। ছায়ামূর্তিগুলো সেই আলোর স্পর্শ পাওয়া মাত্রই যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল। তাদের কালো ধোঁয়ার মতো শরীরগুলো এই আলোর সামনে টিকতে পারল না। মুহূর্তের মধ্যে তারা বাতাসের সাথে মিশে উবে গেল, যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
ঘরটা আবার শান্ত হয়ে এলো।
“হিমাদ্রী! প্রেরণা! কী হয়েছে তোদের?”
নিচে থেকে চিৎকার করতে করতে ওপরে ছুটে এলেন মেহেদী আর মরিয়ম। ঘরের ভাঙা দরজা আর ভেতরে এক অচেনা মানুষকে দেখে তারা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় হিমাদ্রীকে পড়ে থাকতে দেখে মরিয়ম আর্তনাদ করে উঠলেন।
“আমার ছেলে! হিমাদ্রী, চোখ মেল বাবা!”
মেহেদী সাহেব দ্রুত প্রেরণার পাশে বসে পড়লেন। তারপর কপালে ভাঁজ ফেলে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি কে? আমাদের ঘরে কীভাবে ঢুকলেন? আমার ছেলেমেয়ের এই অবস্থা কেন?”
মেহরাব তখনও ঘোরের মধ্যে আছে। সে বিছানায় শুয়ে থাকা প্রেরণার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,
“আমি… আমি মেহরাব। সৃষ্টিকর্তাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আপনারা আগে ওদের বাঁচান। ওদের অবস্থা ভালো নয়। তারপর সব বলব।”
মেহেদী মেহরাবের নামটা শুনে কিছুটা থমকালেন। বিখ্যাত লেখক মেহরাবকে তিনি চিনতেন, তবে হুট করে দেখে চিনতে পারেননি এতক্ষণ। কিন্তু এই মধ্যরাতে মেহরাবের উপস্থিতির কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না মেহেদী। তবে এখন তর্কের সময় নয়। তিনি দেখলেন হিমাদ্রীর মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছে আর প্রেরণা হিমাঙ্কের চেয়েও বেশি ঠান্ডা হয়ে আছে।
“মরিয়ম, কান্না থামাও! আগে ওদের হসপিটালে নিতে হবে।”
মেহেদী সাহেব দৃঢ় কণ্ঠে বললেন।
মেহরাব আর এক মুহূর্ত দেরি না করে এগিয়ে এলো।
“আমি সাহায্য করছি। আমার গাড়ি বাইরেই আছে। চলুন দ্রুত!”
মেহরাব আর মেহেদী মিলে হিমাদ্রীকে পাঁজাকোলা করে ধরলেন। আর মরিয়ম ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে প্রেরণাকে আগলে ধরলেন। তারা তিনজন মিলে ধরাধরি করে দুজনকে গাড়িতে তুললেন। মেহরাব নিজেই ড্রাইভ করতে বসল।
গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সময় আয়নায় একবার প্রেরণার দিকে তাকাল মেহরাব। প্রেরণার গলায় এখন লকেটটি শান্ত হয়ে ঝুলে আছে। আশ্চর্যজনকভাবে লকেটটি এখন আর অস্বাভাবিক আচরণ করছে না। যেন সে তার আসল জায়গায় চলে এসেছে। মেহরাবের বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে, বিশ বছর আগে যে গল্পের ইতি ঘটেছিল বলে ভেবেছিল, তা হয়তো শেষ হয়নি। হয়তো কোনো রহস্য আছে।
রাতের নিস্তব্ধ রাস্তা চিরে গাড়িটি হাসপাতালের দিকে ছুটে চলল।
চলবে…
