#নিষিদ্ধা
#পর্ব_১১
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
সন্ধ্যা নেমেছে পৃথিবীর বুকে। আকাশটা আজ বড্ড অন্ধকার লাগছে। চারদিকে কালো মেঘের ভেলা। হয়তো বৃষ্টি নামবে। জানালার দিকে তাকিয়ে বসে আছে প্রেরণা। মেহরাব মাত্র কেবিনে ঢুকল, প্রেরণা তার দিকে তাকিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলো। আজকে সারাদিন যেন মেহরাবের জন্যই অপেক্ষা করে বসেছিলো প্রেরণা!
“বাবা!”
মেহরাব থমকে দাঁড়াল। সন্দেহপ্রবন দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ তুমি? তুমি আমার মেয়ে? “
প্রেরণা ছলছল নয়নে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। মেহরাব লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তার সারা জীবনের অপেক্ষা যেন ওই একটা শব্দে সার্থক হয়ে গেলো আজ। তিনি হন্তদন্ত হয়ে গিয়ে প্রেরণাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। প্রথম থেকেই মেহরাব প্রেরণাকে নিয়ে ভাবছিলো। প্রেরণার শক্তি, চেহারার গঠন সবকিছুর সাথে নিহার সাদৃশ্য আছে। আজকে সেই সাদৃশ্যের কারণ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে।
“ কেমন আছেন বাবা? “
মেয়ের মুখে বাবা ডাক শুনে মেহরাব খুব আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছে। সে প্রেরণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ ভালো ছিলাম না রে মা। তোকে, তোর মা’কে ছাড়া এক মুহুর্তও ভালো ছিলাম না আমি। তবে আজ তোকে ফিরে পেয়ে আমার জীবনের অপূর্ণতা ঘুচেছে। তোর মা’কে না পেলেও…..”
“ আজ রাত বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন বাবা। কাল সূর্য ওঠার আগেই আমি আমাদের হারিয়ে যাওয়া জগতটা ফিরিয়ে আনবো। মা’কেও মুক্ত করবো।”
মেহরাব বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল।
“ তোমার মা? নি…হা!”
মেহরাবের চোখ থেকে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। প্রেরণা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এত ভালোবাসা সত্বেও তার বাবা-মা আলাদা আছে – এটা ভেবেই কষ্ট হচ্ছে ওর।
“ হ্যাঁ, বাবা। আপনি শুধু দোয়া করুন। আমি সবকিছু ঠিক করে দেবো। আমাকে ঠিক করতেই হবে। “
মেহরাব চোখের জল মুছে নিহার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। এরমধ্যে কেবিনে হিমাদ্রী প্রবেশ করলো। হসপিটালে ভর্তি হওয়ার পর এই প্রথম প্রেরণার কাছে এসেছে হিমাদ্রী। তার শরীর এখনও দূর্বল। মেহরাবকে এভাবে প্রেরণার সাথে দেখে হিমাদ্রী অবাক হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।
“ হিমাদ্রী!”
মেহরাব মুচকি হেসে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল এবং হিমাদ্রীকে বুকে জড়িয়ে নিলো। হিমাদ্রী তো কিছু বুঝতে পারছে না। প্রেরণা নিজের চোখের জল মুছে, ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ হিমাদ্রী উনি আমার বাবা। “
“ বাবা?”
মেহরাব হিমাদ্রীর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ হ্যাঁ। আমি প্রেরণার জন্মদাতা বাবা, হিমাদ্রী। “
“ আমি কিছু বুঝতে পারছি না, প্রেরণা। প্লিজ একটু ডিটেইলস বলবে?”
প্রেরণা মুচকি হেসে সম্মতি জানালো। তবে তার আগে প্রেরণার শ্বশুর, শ্বাশুড়িকেও ডেকে আনলো হিমাদ্রী। সবাইকে একসাথে বসিয়ে নিজের জীবনের সব রহস্য বলতে লাগলো প্রেরণা। আর মেহরাবও নিহার সাথে তার পরিচয়ের ঘটনা জানালো। সবকিছু শুনে হিমাদ্রীর মা বেশ ভয় পেয়েছে। তবে মেহেদী মোটেও বিচলিত হননি। হিমাদ্রীও প্রেরণার পাশে আছে। এখন শুধু রাত বারোটার অপেক্ষা!
***
পৃথিবীর ঘড়িতে এখন রাত এগারোটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট। কিন্তু ‘নীলমণি রাজ্যে’ সময়ের হিসাব চলে নক্ষত্রের কক্ষপথ ধরে। আজ সেই বিশেষ রাত, যখন আকাশের তিনটি নক্ষত্র একই সরলরেখায় এসে দাঁড়িয়েছে। পুরো রাজ্য জুড়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। স্ফটিকের পাহাড়গুলো থেকে চুইয়ে চুইয়ে নীল রঙের বিষাক্ত কুয়াশা নামছে উপত্যকায়। রাজপ্রাসাদের গুপ্তকক্ষে রানী মালিকা অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। তার পরনে আজ কুচকুচে কালো জাদুকরী পোশাক। কক্ষের মাঝখানে রাখা একটি বিশাল জলঘড়ির দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে। জলঘড়ির শেষ বিন্দুটি পড়ার সাথে সাথেই প্রেরণার বিশ বছর পূর্ণ হবে।
“আরহাম! সব প্রস্তুতি শেষ তো?”
মালিকার কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা। আরহাম একপাশে দাঁড়িয়ে তার তলোয়ারে শান দিচ্ছিল। তলোয়ারের ফলা থেকে আগুনের মতো লাল আভা বের হচ্ছে। সে ক্রুর হেসে বলল,
“ভয় পাবেন না মা।হাসপাতালে আমি আমার সেরা শিকারি ছায়াদের পাঠিয়েছি। তবে এবার তারা একা নয়, আমার জাদুকরী মন্ত্রে তারা এখন সাধারণ কোনো লকেটে দমে যাবে না। আর ঠিক বারোটা বাজার সাথে সাথেই আমি নিজে পৃথিবীতে পা রাখব।”
হঠাৎ পুরো প্রাসাদটা কেঁপে উঠল। মাটির নিচ থেকে এক গভীর গুঞ্জন শোনা গেল। রানী মালিকা চমকে উঠে কক্ষের মাঝখানে রাখা সেই ধূসর পাথরটির দিকে তাকালেন। এটিই সেই ‘নীলমণি পরী দণ্ড’, যেটি কয়েকশ বছর ধরে নিস্প্রাণ পাথরের মতো পড়ে আছে। আজ সেই পাথরের গায়ে ফাটল দেখা দিচ্ছে। ফাটলের ভেতর দিয়ে রক্তের মতো লাল নয়, বরং নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল নীল আলো বেরিয়ে আসছে। দণ্ডটি মৃদু কাঁপছে। কোনো এক অমোঘ আকর্ষণে সে মাটি ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে।
“অসম্ভব!”
মালিকা চিৎকার করে উঠলেন।
“দণ্ডটি জাগছে কেন? প্রেরণা তো এখনও পৃথিবীতে! সে তো এখনও জানে না কীভাবে এই দণ্ডকে আহ্বান করতে হয়!”
আরহাম দ্রুত দণ্ডটি ধরতে গেল, কিন্তু কাছে পৌঁছাতেই এক প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ঝটকায় সে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল। তার হাতটা পুড়ে কালো হয়ে গেল।
“ছুঁবি না ওটা আরহাম!”
মালিকা গর্জে উঠলেন।
“ওটা ওর রক্তের ডাক শুনছে। প্রেরণা হয়তো ওকে আহ্বান জানিয়েছে। বারোটা বাজতে আর মাত্র দুই মিনিট বাকি!”
এদিকে,
প্রাসাদের একদম নিচে অন্ধকার কুঠুরিতে নিহা শিকলবদ্ধ অবস্থায় দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার সারা শরীর যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেছে, কিন্তু তার ঠোঁটে আজ এক বিজয়ী হাসি। সে অনুভব করতে পারছে, তার নাড়ির স্পন্দন যেন বহুদূরে থাকা কোনো এক হৃদপিণ্ডের সাথে একাত্ম হয়ে গেছে।
নিহা অস্ফুট স্বরে বলল,
“ আর মাত্র কিছুক্ষণ মা! ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছোঁয়া মাত্রই এই শিকল ছিঁড়ে যাবে। তুই ডাকলেই দণ্ড তোর কাছে পৌঁছাবে। নীলমণি রাজ্যের আসল উত্তরাধিকারিণী আজ জেগে উঠছে।”
***
হাসপাতালের করিডোরে দেয়াল ঘড়ির কাঁটাটা টিকটিক শব্দে এগোচ্ছে। রাত বারোটা বেজেছে। প্রেরণা সানজিদার বলা উপায়ে দন্ডকে আহ্বান করে যাচ্ছে। পুরো হাসপাতাল যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। করিডরে মেহরাব আর হিমাদ্রী উদ্বেগে পায়চারি করছে। দুজনেরই মনে হচ্ছে, বাতাসের চাপ হঠাৎ বেড়ে গেছে। হঠাৎ হাসপাতালের সব লাইট দপ করে নিভে গেল। জেনারেটর চালু হওয়ার আগেই এক পৈশাচিক শীতলতা ধেয়ে এল করিডোর দিয়ে। কেবিনের দরজার নিচ দিয়ে গলগল করে কালো ধোঁয়া ঢুকতে শুরু করল।
“হিমাদ্রী, ওরা এসে গেছে!”
মেহরাব চিৎকার করে উঠল। তার পকেটে থাকা সেই অক্ষয় কবচটি আবার তীব্রভাবে কাঁপতে শুরু করল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার পাল্লা দুটো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ডজনখানেক ছায়ামূর্তি লাল চোখ নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। তাদের লক্ষ্য কেবল বিছানায় বসে থাকা প্রেরণা। তারা যখনই প্রেরণার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ এক প্রচণ্ড শব্দে পুরো হাসপাতাল ভবনটি কেঁপে উঠল। বিছানা থেকে প্রেরণা ধড়মড় করে উঠে বসল। তার শরীর থেকে এক তীব্র, চোখ ধাঁধানো নীল আলো বিচ্ছুরিত হলো যা ছায়ামূর্তিগুলোকে কয়েক হাত দূরে ছিটকে দিল।
প্রেরণার চোখ দুটো এখন আর সাধারণ মানুষের মতো নেই! তা সম্পূর্ণ বেগুনি বর্ণ ধারণ করেছে এবং সেখান থেকে যেন নক্ষত্রের অগ্নিশিখা বের হচ্ছে। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে মেঝেতে পা রাখল। তার পায়ের ছোঁয়ায় হাসপাতালের সাধারণ টাইলসগুলো কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে নীল রঙ ধারণ করতে লাগল।
“তোদের রানীকে গিয়ে বল, রাজকন্যা প্রেরণা জেগে উঠেছে!”
প্রেরণার কণ্ঠস্বর এখন আর ভীতু মেয়ের মতো নয়, তাতে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। ছায়ামূর্তিগুলো শেষবারের মতো আক্রমণ করতে এগিয়ে এলে প্রেরণা শুধু তার ডান হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল। তার হাতের তালু থেকে এক বিশাল আলোক রশ্মি ছিটকে বেরিয়ে এল। মুহূর্তের মধ্যে ছায়ামূর্তিগুলো ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ ঘরে এখন কেবল প্রেরণার শক্তির গর্জন শোনা যাচ্ছে।
মেহরাব আর হিমাদ্রী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছেন। প্রেরণা মেহরাবের দিকে ফিরে তাকালো। তার চোখে দৃঢ়তা।
“বাবা, হিমাদ্রী… সময় হয়ে গেছে। আমার মা ওখানে একা কষ্ট পাচ্ছেন। আমি আর এক মুহূর্ত দেরি করতে পারবো না। আমাকে পরী রাজ্যে যেতেই হবে।”
হিমাদ্রী এগিয়ে এসে প্রেরণার হাত ধরতে চাইল, কিন্তু প্রেরণার শরীরের অলৌকিক শক্তির কারণে সে কাছে যেতে পারল না।
“প্রেরণা, তুমি একা যাবে না! আমিও তোমার সাথে যাব।”
প্রেরণা ম্লান হাসল।
“এখনও সেই সময় আসেনি হিমাদ্রী। এই লড়াইটা আমার একার। বাবা, আপনি আপনার লকেটটা আগলে রাখুন, ওটাই আমার শেকড়। আমি ফিরবো… মাকে নিয়ে ফিরবো।”
কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই প্রেরণা শূন্যে হাত তুলে আবারও নীলমণি দণ্ডকে আহ্বান করল।
“হে নীলমণি দণ্ড! তোমার উত্তরাধিকারিণীর ডাক শোনো! অন্ধকার ছিঁড়ে আমার হাতে ধরা দাও!”
সাথে সাথে হাসপাতালের ছাদ ভেদ করে এক বিশাল আলোর স্তম্ভ নেমে এল। সেই আলোর স্তম্ভের ভেতর দিয়ে উড়ে এসে প্রেরণার হাতে ধরা দিল নীলমণি দণ্ড। দণ্ডটি হাতে নেওয়া মাত্রই প্রেরণার পিঠে এক জোড়া বিশাল ডানা দৃশ্যমান হলো।
পুরো ঘরটি এক অপার্থিব নীল আলোয় ভরে গেল। মেহরাব আর হিমাদ্রীকে অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়ে প্রেরণা সেই আলোর স্তম্ভের ভেতরে মিলিয়ে গেল। এক লহমায় সে মানুষের জগত ছেড়ে পাড়ি দিল নীলমণি রাজ্যের পথে।
চলবে….
