#নিষিদ্ধা
#পর্ব_১২
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
হাসপাতালের কেবিনটা এখন একদম খালি। কেমন যেন একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে হিমাদ্রী। ভদ্রলোক এখনও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বিজ্ঞান আর যুক্তি নিয়ে পড়ালেখা করা ছেলেটা জীবনের এই পর্যায়ে এসে এমন কিছু দেখে চলছে, যার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। চোখের সামনে একটা মানুষ, প্রেরণা তার স্ত্রী ডানা মেলে উড়ে চলে গেলো,এটা ভাবলেই তার মাথা ঝিমঝিম করছে।
হিমাদ্রী বিছানার পাশে ধপ করে বসে পড়ল। ওর এখনও মনে হচ্ছে সে কোনো স্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। প্রেরণাকে নিয়ে স্বাভাবিক একটা জীবন কাটাবে। কিন্তু ভাঙা কাঁচ আর ঘরের নীলচে আভা জানান দিচ্ছে সবই সত্যি ছিল। এরমধ্যে হিমাদ্রীর মা মরিয়ম বেগম তাকে আড়ালে টেনে নিয়ে গেলেন। হাসপাতালের করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“হিমাদ্রী, তুই কি ওই মেয়েকে নিয়ে সংসার করবি?”
হিমাদ্রী ক্লান্ত গলায় বলল,
“মা, এখন এসব নিয়ে কথা বলার সময় না।”
মরিয়ম বেগম ছেলের হাত শক্ত করে ধরলেন। তার চোখেমুখে আতঙ্ক।
“সময় এখনই! শোন বাবা, আমার একটাই ছেলে তুই। আমি তোকে কোনো বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারব না। প্রেরণা যখন ফিরে আসবে, তুই ওকে সোজা তালাক দিয়ে দিবি। আমরা আমাদের মতো সাধারণ কোনো ঘরের মেয়ে দেখে তোর বিয়ে দেব। এসব পরী-টরীর সাথে আমাদের সংসার করা সম্ভব না। কখন কী বিপদ নিয়ে আসে কে জানে!”
‘তালাক’ শব্দটা শুনে হিমাদ্রী যেন চমকে উঠল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
“মা! তুমি এটা কী বলছ? ও আমার স্ত্রী। ও কি তোমার কোনো ক্ষতি করেছে?”
মরিয়ম বেগম জেদ ধরে বললেন,
“সে মানুষ ছিল যখন, তখন আমাদের পুত্রবধু ছিল। এখন সে তো অন্য জগতের কেউ। আমি মা হিসেবে বলছি, এই সম্পর্ক রাখা যাবে না। ও ফিরে এলে তুই ওকে ছেড়ে দিবি।”
হিমাদ্রী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শান্ত স্বরে সে মাকে বলল,
“মা, আমি একজন ডাক্তার। আমি বিজ্ঞান মানি। কিন্তু আমি এটাও জানি যে আমি প্রেরণাকে ভালোবাসি। ও পরী কি না, ও বিপদজনক কি না তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছি, সে অনেক ভালো একটা মেয়ে। ও এখন নিজের মাকে বাঁচাতে লড়াই করতে গেছে। এই সময়ে আমি ওকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারি না।”
“তুই বিপদে পড়বি হিমাদ্রী!”
মরিয়ম আবারও সতর্ক করলেন।
“বিপদ এলেও আমি আছি মা। প্রেরণা যদি ফিরে আসে, তবে সে এই বাড়ির বউ হয়েই ফিরবে। তালাকের কথা তুমি আর মুখে এনো না।”
ছেলের দৃঢ় কথা শুনে মরিয়ম বেগম চুপ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝলেন, হিমাদ্রীকে ফেরানো অসম্ভব। ওদিকে,
একপাশে দাঁড়িয়ে মেহরাব সব শুনছিলো। সে এগিয়ে এসে হিমাদ্রীর কাঁধে হাত রাখলো। মেহরাবকে দেখে মরিয়ম অন্য পাশে চলে গেলেন।
“হিমাদ্রী, তোমার ভালোবাসাই প্রেরণাকে জয়ী হতে সাহায্য করবে। বিশ্বাস হারিও না, আমার মেয়ে নিশ্চয়ই ফিরবে। সবকিছু আবার স্বাভাবিক হবে।”
হিমাদ্রী মেহরাবের চোখের দিকে তাকাল। দুজনের মনেই এখন একই ভয়, একই অপেক্ষা। প্রেরণা কি পারবে জয়ী হয়ে ফিরে আসতে?
**
ওদিকে আকাশ চিরে এক তীব্র নীল আলোর গোলক এসে আছড়ে পড়ল নীলমণি রাজ্যের প্রবেশদ্বারে। ধুলো আর ধোঁয়া সরে যেতেই দেখা গেল প্রেরণাকে। ওর পরনে সাধারণ পোশাক থাকলেও তার পিঠে বিশাল মায়াবী ডানা আর হাতে ধরা সেই প্রাচীন ‘নীলমণি দণ্ড’ আছে। যেটা তাকে এক অপার্থিব রাজকীয় মহিমা দান করেছে।
প্রেরণা একবার চারপাশে তাকালো। এককালে এই রাজ্য ছিল রূপকথার মতো সুন্দর, কিন্তু আজ সেখানে কেবল বিষাক্ত নীল কুয়াশা আর হাহাকার। স্ফটিকের গাছগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে।
“থামো!”
এক বজ্রগম্ভীর চিৎকারে আকাশ-পাতাল কেঁপে উঠল। প্রেরণা দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী। তাদের নেতৃত্বে কালো ঘোড়ায় বসে আছে আরহাম। তার তলোয়ার থেকে আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে।
“তোর সাহস তো কম নয়! একেবারে সরাসরি আমার সামনে হাজির হয়েছিস!”
আরহামের গলায় তাচ্ছিল্যের সাথে ঘৃণা প্রকাশ পাচ্ছে।
প্রেরণা কোনো উত্তর না দিয়ে দণ্ডটি মাটিতে ঠুকে দিলো। সাথে সাথে মাটি কেঁপে উঠলো। সে শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল,
“আমি এখানে কারো সাথে কথা বলতে আসিনি। আমার মা’কে মুক্ত করতে এসেছি। ক্ষমতা আর সিংহাসনের লোভে তুই আর তোর মা এই রাজ্যকে নরক বানিয়ে ফেলেছিস। আজ তার শেষ হবে।”
“অহংকার দেখাস না!”
আরহাম তার বাহিনীকে আদেশ দিলো,
“আক্রমণ করো! ওর ডানা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলো!”
শুরু হলো এক ভয়াবহ লড়াই। শয়ে শয়ে ছায়ামূর্তি আর জাদুকরী সৈনিক প্রেরণার দিকে ধেয়ে এলো। তাদের তীরের ফলা থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে।
প্রেরণা তার নীলমণি দণ্ডটি শূন্যে ঘোরাতেই এক বিশাল নীল ঘূর্ণিবাতাস তৈরি হলো। সেই বাতাসের ঝাপটায় প্রথম সারির সৈনিকরা শুকনো পাতার মতো উড়ে গেলো। দণ্ড থেকে বের হওয়া বিদ্যুৎ রেখায় ছায়ামূর্তিগুলো ভস্ম হয়ে ধুলোয় মিশে যেতে লাগল।
আরহাম আর সহ্য করতে পারল না। সে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে তার জাদুকরী তলোয়ার দিয়ে প্রেরণাকে আঘাত করতে চাইলো। তলোয়ার আর দণ্ডের সংঘর্ষে এক প্রচণ্ড বিষ্ফোরণ ঘটলো। আগুনের লাল আভা আর দণ্ডের নীল জ্যোতিতে পুরো যুদ্ধক্ষেত্র আলোকিত হয়ে উঠল।
“তুই কোনোদিন আমাদের হারাতে পারবি না!” আরহাম দাঁত কিড়মিড় করে বলল।
প্রেরণার চোখে এখন আগুনের তেজ। সে এক ধাক্কায় আরহামকে দূরে সরিয়ে দিয়ে দণ্ডটি আকাশের দিকে উঁচিয়ে ধরলো। তাকে আজ জিততেই হবে।
“হে নীলমণি রাজ্যের পূর্বপুরুষগণ! তোমাদের আশীর্বাদ এই অন্ধকার দূর হোক। আর আমার মায়ের দীর্ঘ বিশ বছরের হাহাকার শেষ হোক আজ। আপনারা সাহায্য করুন।”
হঠাৎই আকাশ থেকে বিশাল এক বজ্র এসে দণ্ডের মাথায় লাগল। সেই শক্তি দণ্ড দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পুরো জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। আরহামের সৈন্যরা এক মুহূর্তের মধ্যে পাথরে পরিণত হলো। আরহাম নিজেও সেই শক্তির ধাক্কায় দূরে এক পাহাড়ের গায়ে ছিটকে পড়ল।
হাঁপাতে হাঁপাতে প্রেরণা সামনের দিকে তাকালো। দূরে দেখা যাচ্ছে শাপলা টাওয়ার, যেখানে তার মা নিহা বন্দি হয়ে আছে। চারিদিকের জাদুকরী বাধাগুলো এক এক করে সরে যাচ্ছে। প্রেরণা বুঝতে পারছে, আসল লড়াই এখনও বাকি। রানী মালিকা নিশ্চয়ই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র নিয়ে টাওয়ারের চূড়ায় অপেক্ষা করছেন। কিন্তু প্রেরণা আজ আর ভয় পাচ্ছে না। তার মনপ্রাণে আজ এখন বাবার ভালোবাসা আর হিমাদ্রীর গভীর বিশ্বাসের জোর। আর মা’কে মুক্ত করার অদম্য ইচ্ছে।
সে তার ডানা ঝাপটিয়ে আকাশের দিকে উড়াল দিলো। প্রেরণার লক্ষ্য একটাই, নিাহকে শাপলা টাওয়ারের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শাপলা টাওয়ারে পৌঁছে গেলো সে। সেখানেই মালিকা ছিলো।
“ অবশেষে তুই চলে এলি!”
“ হোক এসেছি, তোর ধ্বংস করতে এসেছি। “
মালিকা হেসে উঠলো জোরে। তারপর শুরু হলো এক ভয়ানক লড়াই। শাপলা টাওয়ারের চূড়ায় এখন প্রলয়ংকরী দশা। রানী মালিকা তার সমস্ত কালো জাদু এক করে এক বিশাল অগ্নিবলয় তৈরি করেছেন। কিন্তু প্রেরণার হাতে থাকা ‘নীলমণি দণ্ড’ থেকে নির্গত নীল জ্যোতির সামনে সেই আগুনের তেজ ম্লান হয়ে আসছে। প্রেরণার প্রতিটি পদক্ষেপে অপার্থিব এক তেজ।
“তোর দম্ভ আজ ধুলোয় মিশিয়ে দেব মালিকা!”
প্রেরণার কণ্ঠে যেন অগ্নি ঝরছে। সে তার দণ্ডটি দুই হাতে ধরে মাথার ওপর তুলল। আকাশ থেকে হাজারো নক্ষত্রের আলো যেন সেই দণ্ডের মাথায় এসে জমা হলো। এক তীব্র বিষ্ফোরণে মালিকার তৈরি করা মায়াজাল কাঁচের মতো ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ল। মালিকা আর্তনাদ করে ছিটকে পড়লেন। তার কালো জাদুর ক্ষমতা কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে তাকে এক জীর্ণ, বৃদ্ধা নারীতে পরিণত করলো। নীলমণি রাজ্যের আকাশ থেকে কালো মেঘ সরে গিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর ভোরের প্রথম স্নিগ্ধ আলো উঁকি দিল।
বিজয়ী প্রেরণা এক মুহূর্ত দেরি না করে টাওয়ারের ভূগর্ভস্থ অন্ধকার কুঠুরির দিকে ছুটে গেলো। প্রতিটি সিঁড়ি অতিক্রম করার সময় তার বুক দুরুদুরু কাঁপছে। নিচতলায় পৌঁছাতেই সে দেখল এক জং ধরা লোহার দরজা। দণ্ডের এক স্পর্শে সেই দরজা চুরমার হয়ে গেলো। ভেতরে স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকারের মাঝে দেওয়ালের সাথে শিকলবন্দী হয়ে ঝুলে আছে এক নারী। ধুলোমাখা জীর্ণ পোশাক, উস্কোখুস্কো চুল কিন্তু তার চেহারায় এক অলৌকিক আভা। হ্যাঁ, তিনিই নিহা।
প্রেরণা কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকলো,
“মা!”
নিহা ধীরে ধীরে চোখ মেললো। ঝাপসা চোখে সে দেখলো সামনে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যার চোখ দুটো যেন হুবহু তার মতো। নিহা ফিসফিস করে বলল,
“প্রেরণা? আমার মা? তুই এসেছিস?”
প্রেরণা দৌড়ে গিয়ে নিহার পায়ের শিকলগুলো দণ্ডের ছোঁয়ায় গলিয়ে দিলো। নিহা টলতে টলতে পড়ে যেতে নিলে প্রেরণা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কুড়ি বছরের জমে থাকা হাহাকার আজ দুই চোখের নোনা জলে ধুয়ে যাচ্ছে।
“ হ্যাঁ, মা। আমি এসেছি। “
প্রেরণা নিজের মা’কে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। নিহা প্রেরণার মুখটা দুই হাতে আগলে ধরে বলল,
“তোর বাবা… মেহরাব? সে কেমন আছে রে মা?” প্রেরণা কেঁদে ফেলেছে।
“বাবা ভালো আছে মা। সে বিশ বছর ধরে প্রতিটা সেকেন্ড শুধু তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে। সে জানত না আমি আছি, কিন্তু তোমার দেওয়া লকেটটাই আজ আমাদের মিলিয়ে দিয়েছে।”
নিহা তার মেয়ের কপালে গভীর এক চুম্বন এঁকে দিলো। তার বিশ বছরের বন্দীত্ব আর যন্ত্রণার গ্লানি এক নিমিষেই মুছে গেলো। সে অনুভব করল, তার মেয়ে আজ তাকে ছাড়িয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
প্রেরণা নিহার হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো।
“চলো মা। আমাদের জগত আমাদের ডাকছে। নীলমণি রাজ্য আজ স্বাধীন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, বাবা আর হিমাদ্রী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ সব বিচ্ছেদের শেষ হবে।”
নিহা হাসলো। তার মেহরাব! এতগুলো বছর কেটে গেলো তবুও ভালোবাসা কমেনি যেন।
প্রেরণা ও নিহা সেখান থেকে বের হলো। নীলমণি রাজ্যের প্রজারা কুঠুরির বাইরে সমবেত হয়ে জয়ধ্বনি দিতে লাগলো।
চলবে….
