#নিষিদ্ধা
#পর্ব_১০
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সময় আয়নায় একবার প্রেরণার দিকে তাকালেন মেহরাব। মেয়েটির গলায় এখন লকেটটি শান্ত হয়ে ঝুলে আছে। আশ্চর্যজনকভাবে লকেটটি এখন আর অস্বাভাবিক আচরণ করছে না। যেন সে তার আসল জায়গায় চলে এসেছে। মেহরাবের বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে, বিশ বছর আগে যে গল্পের ইতি ঘটেছিল বলে ভেবেছিল, তা হয়তো শেষ হয়নি। হয়তো কোনো রহস্য আছে। রাতের নিস্তব্ধ রাস্তা চিরে গাড়িটি হাসপাতালের দিকে ছুটে চলল।
***
মানুষের জগতের সীমানা যেখানে শেষ, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়াপুরী-নীলমণি পরী রাজ্য। সিংহাসনে বসে আছেন রানী মালিকা। তার চোখের মণি সাপের মতো সরু হয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে তার ছেলে আরহাম। যার চোখে এখন কেবল ক্ষমতার লোভ।
হঠাৎ কক্ষের মাঝখানে তিনটি কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল। পৃথিবী থেকে ফিরে এসেছে রানী মালিকার বিশ্বস্ত ছায়ামূর্তিরা। কিন্তু তাদের অবয়ব আজ ছিন্নভিন্ন। দেখে মনে হচ্ছে, কোনো প্রচণ্ড আগুনে তারা দগ্ধ হয়েছে।
“খবর কী? নিহার জারজ সন্তানকে কি বন্দি করতে পেরেছিস?”
মালিকার কর্কশ কণ্ঠস্বর প্রাসাদের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। ছায়ামূর্তিদের একজন কম্পিত স্বরে উত্তর দিল,
“ক্ষমা করবেন মহারানী! আমরা তাকে খুঁজে পেয়েছিলাম। আমরা তার ঘরে হানা দিয়েছিলাম। তার শরীরে শক্তির জাগরণও শুরু হয়ে গিয়েছিল।”
আরহাম উত্তেজিত হয়ে সামনে এগিয়ে এলো।
“তাহলে তাকে নিয়ে আসিসনি কেন? তোদের মতো শক্তিশালী ছায়ামূর্তিদের হাত থেকে বাঁচার ক্ষমতা তো ওই সামান্য মানবীর নেই!”
“আমরা তাকে প্রায় কব্জা করে ফেলেছিলাম যুবরাজ। কিন্তু ঠিক সেই সময় সেখানে এক একজন মানুষ উপস্থিত হয়। তার হাতে ছিল অক্ষয় কবচ। যে লকেটটি কুড়ি বছর আগে রাজকন্যা নিহা সেই মানুষকে দিয়ে এসেছিল। সেই লকেটের অদ্ভুত আলো আমাদের স্পর্শ করতেই আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। আমরা কিছুই করতে পারিনি মহারানী।”
“কী বললি?”
মালিকা সিংহাসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার চারপাশ থেকে আগুনের ফুলকি ঠিকরে বের হতে লাগল।
“এক সামান্য মানুষ! যার কোনো অলৌকিক ক্ষমতা নেই, সেই মেহরাব আমার ছায়ামূর্তিদের রুখে দিল কীভাবে?”
আরহাম রাগে পাশের একটি স্ফটিকের স্তম্ভে লাথি মারল।
“মা! আমি বলেছিলাম ওই মেহরাবকে বিশ বছর আগেই শেষ করে দেওয়া উচিত ছিল। এখন ওই পৃথিবীর মানুষের ভালোবাসা আর লকেটের শক্তি আমাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
মালিকা ক্রূর হাসলেন। তার হাসিতে যেন ধ্বংসের সংকেত আছে।
“মেহরাবের ধমনীতে প্রবাহিত ভালোবাসা ওই লকেটকে প্রাণ দিয়েছে। ওই লকেট একা কিছু করতে পারত না, যদি মেহরাব সেখানে উপস্থিত না হতো। বাবা আর মেয়ের এই মিলন আমাদের জন্য বিপদ সংকেত।”
মালিকা এবার আরহামের দিকে ফিরে তাকালেন।
“আরহাম, ছায়ামূর্তিরা দুর্বল। ওরা ওই আলো সহ্য করতে পারে না। কিন্তু তুমি তো আমার রক্ত। মেহরাব আর ওই মেয়ে এখন হসপিটালে। এই সুযোগ! মানুষ যখন অসহায় থাকে, তখনই আঘাত করা সহজ।”
আরহামের ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।
“আপনি চিন্তা করবেন না মা। ওই অক্ষয় কবচ মেহরাবকে রক্ষা করতে পারে, কিন্তু আমার মরণঘাতী জাদুকে নয়। আমি নিজেই পৃথিবীতে যাবো। প্রেরণার ওই উজ্জ্বল রক্ত আর মেহরাবের শেষ নিঃশ্বাস – দুটোই আমি আপনার পায়ে এনে দেবো।”
এ কথা বলেই আরহাম সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
অন্যদিকে,
প্রাসাদের নিচতলায় বন্দী নিহা তার অন্ধকার কুঠুরি থেকে মুচকি হেসে উঠল। সেই হাসি পৌঁছে গেল মালিকার কান পর্যন্ত। মালিকার মনমেজাজ এমনিতেই খারাপ ছিলো। তারমধ্য নিহার এমন হাসি তাকে আরও রাগান্বিত করে তুলল। সে তৎক্ষণাৎ অন্ধকার কুঠুরিতে এসে হাজির হলেন।
“হাসছো কেন নিহা?”
মালিকা চিৎকার করে উঠলেন। নিহার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“হাসছি তোমার মূর্খতা দেখে মালিকা। যে ভালোবাসার টানে মেহরাব বিশ বছর পর নিজের মেয়েকে খুঁজে পেয়েছে, সেই ভালোবাসার সামনে তোমার অন্ধকার জাদু খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। আমার প্রেরণা আসছে, আর তার সাথে আসছে মেহরাবের এত বছরের জমে থাকা হাহাকার। তোমরা কেউ বাঁচবে না!”
“চুপ কর!”
মালিকা গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলেন।
নীলমণি রাজ্যের আকাশে আজ কালবৈশাখীর মতো কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। এক ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজছে দুই জগতের সন্ধিস্থলে। নিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এখন শুধু অপেক্ষা!
***
পরের দিন সকাল। হাসপাতালের ডাক্তাররা রীতিমতো বিস্মিত হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা আগে যে মেয়েটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল, সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। শুধু সুস্থই নয়, প্রেরণার শরীর থেকে বের হওয়া এক ধরণের অলৌকিক সজীবতা পুরো কেবিনটাকে যেন প্রাণবন্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে, হিমাদ্রির জ্ঞান ফিরেছে, তবে সে এখনও বেশ দুর্বল। সে পাশের কেবিনে শুয়ে একদৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে গত রাতের সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করছে। প্রেরণাকে নিয়ে সে খুবই চিন্তিত। যে করেই হোক তার প্রিয়তমা স্ত্রী’কে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? ওই ছায়ামূর্তিগুলো এতটা শক্তিশালী যে মেহরাব চাইলেও কিছু করতে পারবে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল হিমাদ্রী।
দুপুরের দিকে মেহরাব আর হিমাদ্রির বাবা-মা হাসপাতালের ক্যাফেটেরিয়ায় গেলেন। এতক্ষণ তারা সবাই প্রেরণার কাছে ছিলেন। মেহরাবের থেকে সবকিছু শুনে মেহেদী সাহেব তো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সত্যি সত্যি যে পরী রাজ্য আছে – সেসব ভেবেই হিমাদ্রীর বাবা-মা বেশ ঘাবড়ে গিয়েছেন। তারচে বড় কথা, তাদের পুত্রবধূ একজন পরী! সবকিছুই কেমন অবিশ্বাস্য তবে বাস্তবতা৷
এদিকে, প্রেরণার কেবিনের তাপমাত্রা হঠাৎ করে কমতে শুরু করল। জানালার পর্দাগুলো আপনাআপনি দুলে উঠল। প্রেরণা সবে শোয়া থেকে উঠে বসেছিল, হঠাৎ সে দেখল জানালার পাশে সেই সানজিদা দাঁড়িয়ে আছেন।
“তুমি জেগে উঠেছো প্রেরণা? আমি জানতাম তুমি দ্রুত সুস্থ হতে পারবে।”
“ আপনি! কী হচ্ছে আমার সাথে? “
প্রেরণা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
সানজিদা ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন।
“ তোমাকে তো আগেই সবকিছু বলেছিলাম, তুমি একজন পরী। সবকিছু মেনে নাও, প্রেরণা। “
চোখ বন্ধ করে ফেলল প্রেরণা। সবকিছু ভুলে নিজের মায়ের কথা ভাবলো সে। হঠাৎ প্রেরণা ব্যাকুল হয়ে বলল,
“আন্টি! আপনি কাল বলেছিলেন মেহরাব সাহেব আমার বাবা। এটা কি সত্যি? আমার মা কোথায়?”
সানজিদা প্রেরণার পাশে বসলেন। তার চোখের মণি ভিজে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন কুড়ি বছর আগের সেই ইতিহাস। মেহরাবের সাথে নিহার সেই অমর প্রেম, নীলমণি রাজ্যের ষড়যন্ত্র, আর নিহার আত্মত্যাগ যা প্রেরণা আর মেহরাবকে বাঁচানোর জন্য ছিল। কারণ নিহা মালিকার কাছে ধরা না দিলে তার সন্তান এবং প্রিয়তমর ওপর আক্রমণ করা হতো।
“মেহরাব গত বিশ বছর ধরে এক ফোঁটা শান্তির জন্য হাহাকার করেছে প্রেরণা। সে জানত না তার একটা অংশ এই পৃথিবীতে বেঁচে আছে। আর তোমার মা… সে আজও সেই অন্ধকার শাপলা টাওয়ারে বন্দি হয়ে আছে শুধু তোমার জন্য। মালিকা তাকে তিলে তিলে শেষ করছে, কিন্তু নিহা হার মানেনি। সে শুধু আজকের এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল।”
সব শুনে প্রেরণার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুর ধারা নেমে এলো। যে বাবাকে সে সারা জীবন মনে মনে খুঁজেছে, সে তার এত কাছে ছিল অথচ সে জানত না! আর তার মা! যাকে সে কোনোদিন দেখেনি, সে তার জন্য নরক যন্ত্রণা সহ্য করছে। নিজের মা-বাবার কথা ভেবে মনে এক অদম্য সাহস পেলো সে।
প্রেরণা চোখের জল মুছে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“বিশ বছর আমার বাবা একা কেঁদেছে। মা বন্দি হয়ে আছে। আর না! আমি তাদের এই বিচ্ছিন্নতা শেষ করব। আমি আমার মাকে ফিরিয়ে আনবো আর বাবাকে তার প্রাপ্য সুখ ফিরিয়ে দেব। আমি কথা দিচ্ছি, আন্টি আমি নীলমণি পরী রাজ্যে যাবোই।”
সানজিদা প্রেরণার মাথায় হাত রাখলেন।
“তোমার এই জেদই তোমার আসল শক্তি মা। তবে শোনো, আজ রাত বারোটার পর তোমার বিশ বছর পূর্ণ হবে। ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছোঁয়া মাত্রই তোমার ধমনীতে পরী রাজবংশের পূর্ণ শক্তি জেগে উঠবে। তখন তুমি আর সাধারণ কোনো মানবী থাকবে না। তোমার ইশারায় আকাশ কাঁপবে, মাটি দুলবে।”
সানজিদা আরও নিচু স্বরে বললেন,
“আর মনে রেখো, ওই সময় তুমি নীলমণি দণ্ডকে আহ্বান করবে। ওটা তোমার ডাক ছাড়া আসবে না। ওটাই তোমার মারণাস্ত্র! “
কথা শেষ করে সানজিদা অদৃশ্য হয়ে গেলেন। প্রেরণা জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এখন আর ভয় নেই, আছে এক অজেয় সংকল্প।
চলবে….
