#নিষিদ্ধা
#পর্ব_৮
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
সকালের মিষ্টি রোদ উঠোন পেরিয়ে নাস্তার টেবিলে এসে পড়েছে। এরমধ্যে কেটে দু’দিন। হিমাদ্রী আর প্রেরণা পাশাপাশি বসে আছে। মরিয়ম পরম মমতায় লুচি আর আলুর দম বেড়ে দিচ্ছেন। প্রেরণাকে এখন পর্যন্ত রান্নাঘরে ঢুকতে দেননি মরিয়ম। শ্বাশুড়ি হিসেবে তিনি এতটা ভালো হবে সেটা হয়তো হিমাদ্রী নিজেও ভাবতে পারেনি। এদিকে মেহেদী খুশিমনে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের গল্প করছেন। সবকিছু একদম স্বাভাবিক, দশটা সাধারণ আটপৌরে পরিবারের মতো।
হিমাদ্রী একটা লুচি ছিঁড়তে যাবে, ঠিক তখনই প্রেরণা হঠাৎ চমকে উঠে নিজের ডান হাতটা টেবিলের নিচে সরিয়ে নিল। তার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
“কী হয়েছে প্রেরণা? শরীর খারাপ লাগছে?”
হিমাদ্রী তৎক্ষণাৎ খাওয়া থামিয়ে ওর দিকে তাকালো।
প্রেরণা কোনোমতে বলল,
“না, মানে… হাতে কেমন একটা সুড়সুড়ি আর জ্বালাপোড়া করছে।”
সে ভয়ে হাতটা টেবিলের ওপরে তুলতেই সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। প্রেরণার ফর্সা হাতের তালুর ভেতর দিয়ে কেমন যেন একটা অতি সূক্ষ্ম, রূপোলি আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। মনে হচ্ছে চামড়ার নিচ দিয়ে রক্তের বদলে এক ধরণের উজ্জ্বল তরল প্রবাহিত হচ্ছে। আলোটা স্থির নয়, নিঃশ্বাসের তালে তালে কাঁপছে।
মেহেদী আর মরিয়ম কথা হারিয়ে ফেলেছেন। হিমাদ্রী দ্রুত প্রেরণার কবজিটা ধরল। একজন ডাক্তার হিসেবে তার প্রথম চিন্তা ছিল কোনো জটিল স্নায়বিক সমস্যা বা চর্মরোগ।
“শান্ত হও, অস্থির হয়ো না। দেখি হাতটা,”
হিমাদ্রী বেশ পেশাদার ভঙ্গিতে হাতটা পরীক্ষা করতে লাগল।
“হয়তো মেটাবলিক কোনো ডিসঅর্ডার, অথবা বিয়ের মেহেদি বা কোনো কসমেটিকস থেকে সিভিয়ার অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন হয়েছে। এটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় অনেক সময় ‘ফটো-সেন্সিটিভিটি’ বলা যায়, যদিও এতটা উজ্জ্বল আলো সচরাচর দেখা যায় না।”
হিমাদ্রী মুখে বিজ্ঞানের বুলি আওড়ালেও তার নিজের কপাল ঘামতে শুরু করেছে। প্রেরণার নাড়ি স্পন্দন পরীক্ষা করতে গিয়ে সে দেখল, নাড়ির গতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি, আর শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা।
“বাবা, আমি ওকে একটু রুমে নিয়ে যাচ্ছি। ওর প্রেশার আর পালসটা ডিটেইলসে দেখা দরকার। তোমরা চিন্তা করবে না, হয়তো ওষুধের রিঅ্যাকশন।”
“ যা করার দরকার সেটাই তুই কর হিমাদ্রী। শুধু প্রেরণার যেন কষ্ট না হয় সেই ব্যবস্থা কর। ভালো ঔষধ দে জলদি। “
বাবার কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো হিমাদ্রি। প্রেরণা মনে মনে বেশ ঘাবড়ে গেছে। গতকাল থেকেই এরকম হচ্ছিল। তবে আজকে অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে। মেয়েটা ভেবেছিল সবকিছু এমনি হয়েছে হয়তো। কোনো এলার্জি জনিত সমস্যা অথবা অন্য কিছু!
হিমাদ্রী আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। প্রেরণার কাঁধে হাত দিয়ে প্রায় আগলে ধরে ওকে নিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে হাঁটা দিল। মেহেদী আর মরিয়ম দুশ্চিন্তায় আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
রুমে ঢুকে দরজাটা আটকে দিল হিমাদ্রী। প্রেরণাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সে জানালার পর্দাগুলো টেনে দিল যাতে বাইরের আলো না ঢোকে। অন্ধকার ঘরে প্রেরণার হাতের সেই রূপোলি আলো এখন আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। পুরো রুমটা যেন এক অদ্ভুত মায়াবী নীলচে আলোয় ভরে গেছে।
“হিমাদ্রী, আমি খুব ভয় পাচ্ছি। আমার ভেতরে কী হচ্ছে আমি জানি না!”
প্রেরণার কণ্ঠস্বর কাঁপছে।
হিমাদ্রী প্রেরণার সামনে বসে ওর দু’হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। হিমাদ্রীর মনে হলো, সে কোনো মানুষের হাত নয়, বরং কোনো নক্ষত্রকে ছুঁয়ে আছে।
“প্রেরণা, আমার দিকে তাকাও। আমি আছি তো। কিন্তু এটার কী সেটা বুঝতে পারছি না। এটা কোনো রিয়্যাকশন নয়, এটা অন্য কিছু। তোমার শরীরে এমন কিছু ঘটছে যা আমার জ্ঞানের বাইরে। “
হিমাদ্রীর চোখে বিস্ময়। প্রেরণার সাথে ঠিক কী হচ্ছে সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না সে। একদিকে স্ত্রী’র প্রতি ভালোবাসা অন্যদিকে কৌতূহল ও বিস্ময় । সে বুঝতে পারছে, তার স্ত্রী প্রেরণা কোনো সাধারণ মানবী নয়। কিন্তু এই সত্যটা সে কীভাবে সামলাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ঠিক সেই মুহূর্তে প্রেরণার কানে আবার সেই ক্ষীণ কণ্ঠস্বরটা বেজে উঠল!
“সময় শুরু হয়ে গেছে প্রেরণা!”
প্রেরণা হঠাৎ কাঁদতে লাগলো। শরীরের অদ্ভুত পরিবর্তন ও সেই কন্ঠস্বর তাকে ভীত করে তুলেছে। হিমাদ্রী প্রেরণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো এবার। প্রেরণা তার বুকে মুখ গুঁজল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“হিমাদ্রি, আমি কি মরে যাচ্ছি? আমি নিজেকে নিজের শরীরের মধ্যে ধরে রাখতে পারছি না।”
হিমাদ্রীএবার প্রেরণার চোখের দিকে তাকালো। ঘরের আবছা অন্ধকারে সে স্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রেরণার চোখ দুটোর মণি এখন আর কালো নেই, তা সম্পূর্ণভাবে উজ্জ্বল বেগুনি রঙ ধারণ করেছে। ওর চোখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে কোনো এক গভীর মহাজাগতিক গহ্বর তাকে টেনে নিচ্ছে।
“না প্রেরণা, তুমি মরছো না। তুমি বরং… তুমি নতুন করে কিছু একটা হচ্ছো।”
হিমাদ্রীকাঁপাকাঁপা হাতে প্রেরণার গাল ছুঁলো। এমন অলৌকিক ঘটনা আগে কখনো দেখেনি সে। এরমধ্যেই ঘটলো আরেক বিষ্ময়কর ঘটনা!
হিমাদ্রীলক্ষ্য করল, প্রেরণার হাতের সেই তীব্র আলোটা ধীরে ধীরে তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। হিমাদ্রির মনে হচ্ছে, প্রেরণা কোনো রক্ত-মাংসের মানবী নয়, বরং এক জীবন্ত নক্ষত্র। বিজ্ঞানের সব বই, সব লজিক আজ এই ঘরের দরজার ওপাশে পরাজিত হয়ে পড়ে আছে।
হিমাদ্রীহঠাৎ প্রেরণাকে ছেড়ে দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। তার মাথা কাজ করছে না। বারবার সে নিজেকে চিমটি কাটছে দেখার জন্য যে এটা কোনো স্বপ্ন কি না। কিন্তু না, সবকিছুই জীবন্ত। তার সামনে বসে থাকা মেয়েটি এই পৃথিবীর কোনো রোগে আক্রান্ত হয়নি।
“হিমাদ্রি? আপনি আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন কেন? ভয় পাচ্ছেন আমাকে?”
প্রেরণার করুণ প্রশ্ন। হিমাদ্রীমাথা নেড়ে জানাল, না। কিন্তু তার ভেতরটা তোলপাড় হচ্ছে। সে একজন ডাক্তার, তার জগতটা যুক্তি আর প্রমাণের। অথচ আজ সে এমন এক সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে যুক্তি অসহায়। সে বুঝতে পারছে, প্রেরণা কেবল তার স্ত্রী নয়, সে এক বিশাল রহস্যের নাম। যার চাবিকাঠি হয়তো এই পৃথিবীর কারো কাছে নেই। প্রেরণার এই অবস্থা দেখে হিমাদ্রী আবারও তার কাছে গিয়ে বসলো। বুকে জড়িয়ে নিলো।
ঠিক তখনই জানালার কাঁচটা মৃদু কম্পনে কেঁপে উঠল। হিমাদ্রীঅস্ফুট স্বরে বলল,
“প্রেরণা, তুমি আসলে কে? তুমি কি সত্যি মানুষ?
“ আমি! আমি মানু….”
এতটুকু বলে থেমে গেলো প্রেরণা। তারপর আবার বলল,
“ এতদিন জানতাম আমি মানুষ কিন্তু আজ যা ঘটছে তাতে আমি কিছু বলতে পারছি না হিমাদ্রী।”
হিমাদ্রীকিছুতেই অবিশ্বাসের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছে না। এরমধ্যে রুমের ভেতর এক অদ্ভুত শীতল বাতাস বয়ে গেল। অথচ জানালার সব পর্দা টানা, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। হঠাৎ ঘরের এক কোণে ছায়া ঘনীভূত হতে শুরু করল এবং মুহূর্তের মধ্যে সেখানে এক মধ্যবয়সী অথচ অপূর্ব সুন্দরী এক নারী আবির্ভূত হলেন। এক ধরণের ধূসর মায়াবী আভা তাকে ঘিরে রেখেছে। তাকে দেখা মাত্রই প্রেরণার হাতের সেই রূপোলি আলো আরও তীব্র হয়ে উঠল, যেন সে তার স্বগোত্রীয় কাউকে চিনতে পেরেছে।
হিমাদ্রীলাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তড়িৎ বেগে সে প্রেরণাকে নিজের আড়ালে নিয়ে এল।
“আপনি কে? এই বন্ধ ঘরে কীভাবে ঢুকলেন?”
নারীটি শান্ত চোখে হিমাদ্রির দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টিতে কোনো কুটিলতা নেই। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বললেন,
“ভয় পেও না হিমাদ্রি। আমি সানজিদা, প্রেরণার মা নিহার বাল্যবন্ধু। কুড়ি বছর ধরে আমি ছায়ার মতো ওকে আগলে রেখেছি, আজ ওর চরম সংকটে সামনে আসতে বাধ্য হলাম।”
প্রেরণা কাঁপতে কাঁপতে হিমাদ্রির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। ছোটো থেকে প্রেরণা সত্যিটা না জানলেও বড় হওয়ার পর সে জেনেছিল, রহিম ও আসমা তার প্রকৃত মা-বাবা না। আজকে নিজের মায়ের কথা শুনতেই মেয়েটা তাই আবেগি হয়ে উঠলো।
“আমার মা? নিহা? আপনি তাকে চেনেন?”
সানজিদা এক টুকরো ম্লান হাসি হাসলেন।
“ হ্যাঁ, প্রেরণা। খুব ভালো করে চিনি আমি তোমার মা’কে। সে এই মুহূর্তে নীলমণি রাজ্যের শাপলা টাওয়ারে বন্দী হয়ে আছে। প্রেরণা, আজ রাতে তোমার বিশ বছর পূর্ণ হবে। তোমার শরীরে যে আলো দেখছো, তা কোনো রোগ নয়। তা তোমার রক্তে থাকা আদি পরী রাজবংশের পবিত্র শক্তি। হিমাদ্রীযা দেখছে, তা বিজ্ঞানের অতীত এক জগত।”
হিমাদ্রীস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে। তার বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্ক চিৎকার করে বলছে এসব অসম্ভব, কিন্তু চোখের সামনে যা ঘটছে তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সানজিদা হিমাদ্রির দিকে ফিরে বললেন,
“ আর মাত্র সাতটা দিন! এই সাত দিনের মধ্যে ওর শক্তি পূর্ণতা পাবে। কিন্তু সাবধান! নীলমণি রাজ্যের রানী মালিকা আর তার ছেলে আরহামও এই শক্তির কথা জেনে গেছে। তারা প্রেরণাকে ধ্বংস করতে মর্ত্যে দূত পাঠাবে।”
প্রেরণা আর্তনাদ করে উঠল,
“আমি এসব চাই না! আমি সাধারণ মানুষের মতো হিমাদ্রির সাথে সংসার করতে চাই। আর শুধু আমার আসল বাবা-মাকে ফিরে পেতে চাই। এই শক্তি আমি চাই না। আমাকে বাঁচান!”
সানজিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রেরণার মাথায় হাত রাখলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সানজিদার স্পর্শে প্রেরণার হাতের সেই তীব্র আলোটা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলো।
“পালানোর পথ নেই মা। তোমার এই শক্তিই তোমার ভবিতব্য। হিমাদ্রি, তুমি যদি একে সত্যিই ভালোবেসে থাকো, তবে এই সাত দিন একে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি আগলে রেখো। আর মনে রাখবে, মেহরাবকে তোমার প্রয়োজন হবে। মেহরাব ছাড়া প্রেরণার এই শক্তির উৎস অসম্পূর্ণ।”
হিমাদ্রীঅবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মেহরাব? বিখ্যাত লেখক মেহরাব?”
সানজিদা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। হিমাদ্রী ফের প্রশ্ন করলো,
“ তার সাথে প্রেরণার কী সম্পর্ক?”
সানজিদা জানালার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন,
“মেহরাব কেবল একজন লেখক নন, তিনি প্রেরণার জন্মদাতা পিতা। যে সত্য তিনি কুড়ি বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তা আজ তার সামনে আসবে। সময় খুব কম। হিমাদ্রী তুমি মেহরাবের সাথে আগামীকাল দেখা করে সবটা জানাও। এখন আমি আসছি।”
কথা শেষ হতে না হতেই সানজিদার অবয়বটা ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যেতে শুরু করল। ঘরের নীলচে আলোটাও ম্লান হয়ে এল। হিমাদ্রী দেখল প্রেরণা লুটিয়ে তার কোলে।
***
রাত গভীর। মেহরাব তার পড়ার ঘরে বসে পুরনো কিছু চিঠিপত্র ঘাটছিল। হঠাৎ তার ড্রয়ারের ভেতরে রাখা একটি পুরনো মখমলের বাক্স থেকে নীলচে আলো বের হতে শুরু করল। মেহরাব চমকে উঠে বাক্সটি খুলল। ভেতরে রাখা সেই রূপোলি লকেটটি! ওটা নিহা কুড়ি বছর আগে তার গলায় পরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আজ তা হঠাৎ জ্বলছে।
চলবে…
