#নিষিদ্ধা
#পর্ব_৭
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
একাকীত্ব শব্দটা শুনতে যতটা ছোট, এর গভীরতা তার চেয়ে অনেক বেশি। ঢাকা শহরের এই ব্যস্ততম এলাকায় মেহরাবের ফ্ল্যাটটা যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। বাইরের কোলাহল, ট্রাফিক জ্যাম আর মানুষের ভিড় সবই আছে, কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতরে সময় যেন কুড়ি বছর আগে এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরাব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকালে তার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। এই কুড়ি বছরে সে অনেক কিছু পেয়েছে। যশ, খ্যাতি, অর্থ সব। তার লেখা উপন্যাসগুলো পাঠকদের টেবিল থেকে টেবিলে ঘোরে। কিন্তু এই সফলতার আড়ালে যে মানুষটা বাস করে, সে ভীষণ নিঃস্ব। রাতে যখন শহর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়, মেহরাব তখন তার বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। হাতে আধপোড়া সিগারেট আর এক বুক হাহাকার। লোকে তাকে জিজ্ঞেস করে,
“মেহরাব সাহেব, কেন একা থাকলেন? সংসার সাজালেন না কেন?”
মেহরাব শুধু রহস্যময় হাসি হাসে। সে কাউকে বলতে পারে না, তার এই সিন্ধান্তের কারণ। মেহরাবের মনে হয়, সে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার কারিগর। সেই রাতের মায়া তাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে যে, অন্য কোনো মানবীকে তার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে কল্পনা করাটাও তার কাছে অপরাধ মনে হয়। নিহা তাকে বলেছিল, সে আর আসবে না। কিন্তু মেহরাব আজও ঘুমের ঘোরে যেন নিহার পায়ের নূপুরের শব্দ শোনে। সে জানে ওটা তার মনের ভুল, হয়তো দীর্ঘদিনের একাকীত্ব থেকে জন্ম নেওয়া কোনো হ্যালুসিনেশন। তবুও এই মিথ্যে টুকু নিয়েই সে দিব্যি বেঁচে আছে।
তার ডায়েরির পাতায় পাতায় নিহার বর্ণনা। সে তার উপন্যাসের প্রতিটি নায়িকার মাঝে নিহাকে খোঁজে। পাঠকরা ভাবে লেখকের কল্পনাশক্তি কত প্রখর! নিহার স্মৃতিগুলো কখনো কখনো রক্তক্ষরণ ঘটায়, আবার কখনো বেঁচে থাকার রসদ জোগায়।
আজ সারাটা দিন মেহরাবের বুকটা কেমন যেন খালি খালি লাগছে। শরীরের প্রতিটি কোষে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কলম হাতে নিলেও শব্দরা ধরা দিচ্ছে না। ডায়েরির পাতায় শুধু কাটাকুটি। একবার লিখছে, আবার কেটে ফেলছে। মাঝে মধ্যে মেহরাবের মনে হয় নিহা যেন তার সাথেই আছে। কিন্তু সে জানে এসব তার মনের ভুল ধারণা।
মেহরাব চোখ বন্ধ করলো। বিড়বিড় করে বলল,
“নিহা, তুমি কি আজও আমার চারপাশে আছো? নাকি আমার এই একাকীত্বই আজ আমাকে পাগল করে দিচ্ছে?”
অন্ধকারে মেহরাবের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠলো। এত বছরের জমে থাকা নিঃসঙ্গতা মাঝে মধ্যে বাঁধ ভাঙতে চায়। সে জানে না তার গন্তব্য কোথায়, কিন্তু তার অবচেতন মন তাকে ডাকছে-এক মায়াবী গন্তব্যের দিকে, যেখানে হয়তো তার অসম্পূর্ণ গল্পের শেষ লাইনটি লেখা আছে।
***
বাসর ঘরের চার দেয়াল রজনীগন্ধার মায়াবী সুঘ্রাণে ম ম করছে। সাদা আর লাল গোলাপের কারুকাজে বিছানাটা যেন এক টুকরো মেঘের মতো নরম হয়ে আছে। জানালার পর্দা সরিয়ে দিতেই বাইরে থেকে এক ফালি স্নিগ্ধ চাঁদনী ঘরে এসে পড়েছে। প্রেরণা জানালার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। লাল বেনারসির ভারী আঁচলটা তার কাঁধ থেকে গড়িয়ে পড়ছে বারবার।
দরজা খোলার মৃদু শব্দে সে কিছুটা সচকিত হলো। হিমাদ্রী ঘরে ঢুকে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। পরনে তার নরমাল সাদা পাঞ্জাবি। হিমাদ্রীকে এই বেশে বেশ মানিয়েছে। কিছুক্ষণ আগে রুমে এসেছিল সে কিন্তু জরুরী কল আসাতে একটু বাইরে বের হয়েছিল। ডাক্তারদের ইমার্জেন্সি কল আসাটা স্বাভাবিক বিষয়।
“কী ভাবছো এত?”
হিমাদ্রী ধীর পায়ে এগিয়ে এসে প্রেরণার পাশে দাঁড়াল। প্রেরণা একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
“না, তেমন কিছু না। শুধু ভাবছি দিনটা কত তাড়াতাড়ি কেটে গেল।”
হিমাদ্রী হাসল। সেই চিরচেনা স্নিগ্ধ হাসি, যা প্রেরণাকে এক নিমিষেই শান্ত করে দেয়। হিমাদ্রী আলতো করে প্রেরণার কপালে হাত রাখল। ডাক্তারী অভ্যাসটা তার যাবে না কোনোদিন।
“শরীরের তাপমাত্রা তো স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। মাথা ঘুরছে না তো আর? প্রেসারটা একটু মেপে দেখব নাকি?”
হিমাদ্রীর কথা শুনে প্রেরণা হেসে ফেলল।
“আপনি কি এখন ডাক্তারী করবেন? আজ তো অন্তত প্রেসার মাপার মেশিনটা দূরে রাখতে পারতেন!”
হিমাদ্রী কাঁচুমাচু মুখ করে বলল,
“অভ্যাস রে, অভ্যাস! তবে রোগী যদি এমন সুন্দরী হয়, তাহলে ডাক্তাররা প্রেসার মাপতে গিয়ে নিজেরাই প্রেসার হারিয়ে ফেলতে পারে।”
প্রেরণা এবার শব্দ করে হেসে উঠল। হিমাদ্রীর এই সহজ আর রসিক স্বভাবটাই তাকে সবচেয়ে বেশি টানে।
“প্রেরণা,”
হিমাদ্রী তার কণ্ঠস্বর কিছুটা নিচু করল। প্রেরণার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে সে বলল,
“আমি জানি আজ দিনটা তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে। সব মিলিয়ে তুমি হয়তো মানসিকভাবে বেশ ক্লান্ত।”
প্রেরণা কৃতজ্ঞ চোখে তাকালো। হিমাদ্রী ফের বলল,
“আমি চাই না আমাদের এই নতুন পথচলাটা কোনো তাড়াহুড়ো দিয়ে শুরু হোক। আজ রাতটা আমাদের একান্ত গল্পের হোক। আমরা একে অপরকে জানব, বুঝব। শারীরিক ঘনিষ্ঠতার চেয়ে আমাদের মানসিক মিলনটা আমার কাছে আগে। তোমার যদি সময় লাগে, আমি সারাজীবন অপেক্ষা করতে রাজি আছি। আর যদি সময় না লাগে তাহলেও আমি আছি। তুমি বললেই হবে….”
কথা শেষ করে চোখ টিপ্পনী কাটলো হিমাদ্রী। প্রেরণা হাসলো। তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে গেল। সে ভাবেনি হিমাদ্রী এতটাও সংবেদনশীল হবে। আধুনিক যুগের এই ব্যস্ত সময়ে এমন ধৈর্যশীল মানুষ মেলা ভার।
প্রেরণা মৃদু স্বরে বলল।
“ধন্যবাদ হিমাদ্রী,আমি সত্যিই খুব ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু আপনি সবটা কত সহজ করে দিলেন।”
“আরে বাবা! ডাক্তারদের একটু ধৈর্য বেশিই থাকে। নয়তো রোগীরা তো দুই দিনেই পালিয়ে যেত!”
হিমাদ্রী মজা করে বলল।
সারা রাত তারা পাশাপাশি বসে কথা বলল। প্রেরণা তার ছোটবেলার দুষ্টুমি আর রহিম আলীর আদরের গল্প শোনাল। হিমাদ্রী শোনাল তার মেডিকেল কলেজের দিনগুলোর মজার সব কাহিনী। হাসাহাসি আর খুনসুটিতে রাতটা যেন এক নিমেষেই ভোরের দিকে এগোতে লাগল।
***
মানুষের পৃথিবী থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে, মেঘেদেরও ওপারে এক মায়াবী জগত–নীলমণি পরী রাজ্য। এককালে যেখানে স্ফটিকের প্রাসাদে নক্ষত্ররা খেলা করতো, আজ সেখানে ধূসর কুয়াশার রাজত্ব। দশ বছর আগে দয়ালু পরী রাজার মৃত্যুর পর থেকেই এই রাজ্যে নেমে এসেছে অন্ধকারের ছায়া।
রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু এবং দুর্ভেদ্য ‘শাপলা টাওয়ার’-এ বন্দী হয়ে আছেন রাজকন্যা নিহা। দশটা বছর তাকে এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী করে রেখেছে তার সৎ মা রানী মালিকা এবং সৎ ভাই আরহাম।
“কতদিন আর এভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে নিহা? তোমার সেই জারজ সন্তান পৃথিবীতে বেঁচে নেই। সে তোমাকে বাঁচাতে আসবে না।”
রানী মালিকার কর্কশ কণ্ঠস্বরে নিহা ফিরে তাকালো। মালিকার পরনে রাজকীয় পোশাক, চোখে ক্রূর হাসি। পাশেই দাঁড়িয়ে তার উদ্ধত ছেলে আরহাম।
নিহা শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“সে জারজ নয় মা। সে আমার আর মেহরাবের ভালোবাসার পবিত্র ফসল। আর সময় ঘনিয়ে আসছে। কুড়ি বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র কয়েকটা প্রহর বাকি।”
যরগাম অট্টহাসি দিয়ে উঠল।
“কুড়ি বছর পূর্ণ হলেই কি সে ডানা মেলে উড়ে এখানে চলে আসবে? সে তো বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে আমরা ঠিকই খুঁজে পেতাম।”
নিহা কোনো কথা বলল না, শুধু মনে মনে নিজের মেয়ের জন্য প্রার্থনা করল। তার সৎ মা ও ভাই আর-ও কিছুক্ষণ কথা শোনালো তাকে। তারপর চলে গেলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো নিহা।
অন্যদিকে,
প্রাসাদের এক গোপন কক্ষে বসে এক বিশাল জলঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে নিহার বান্ধবী
সানজিদা। সে এই রাজ্যে রানী মালিকার অনুগত থাকার ভান করলেও মনে প্রাণে নিহার শুভাকাঙ্ক্ষী। এই দীর্ঘ বিশটি বছর সে ছায়ার মতো নজর রেখেছে প্রেরণার ওপর। সানজিদা জলঘড়ির আয়নায় দেখছে প্রেরণার বাসর ঘরের দৃশ্য। দেখছে হিমাদ্রীর সাথে প্রেরণার সেই নির্মল হাসি। সানজিদা বিড়বিড় করে বলল,
“আর মাত্র কিছু সময় প্রেরণা! শীঘ্রই তোমার বিশ বছর পূর্ণ হবে। তখন তোমার শরীরের প্রতিটি কোষে জেগে উঠবে আমাদের আদি পরী রাজবংশের সেই সুপ্ত শক্তি। তুমিই হবে এই নীলমণি রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সত্তা। নিহার দশ বছরের এই বন্দীত্বের অবসান তোমার হাতেই হবে মা।”
চলবে….
