#নিষিদ্ধা
#পর্ব_৬
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
কুড়িটি বসন্ত পেরিয়ে আজ রহিম আলীর উঠোনে নক্ষত্ররা নেমে এসেছে। চারদিকে আলোকসজ্জা আর রজনীগন্ধার তীব্র ঘ্রাণ। বাড়ির একমাত্র আদরের মেয়ে প্রেরণার বিয়ে আজ। নিজের রুমে আয়নার সামনে বসে আছে প্রেরণা। টকটকে লাল বেনারসি আর গয়নাতে ওকে কোনো পৃথিবীর মানুষ মনে হচ্ছে না। বরং কোনো অপ্সরার মতোই সুন্দর লাগছে তাকে। প্রেরণার বান্ধবীরা ওর চারপাশে দাঁড়িয়ে হাসি তামাশা করছে। প্রেরণাও ওদের কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসছে।
এদিকে রহিম আলী একবার দরজায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখছেন মেয়েকে। এই নিয়ে প্রেরণার জন্য দ্বিতীয় বার বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথমবার পাত্র বিয়ের দিন অন্য মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেজন্য রহিম আলী খুব মন খারাপ করেছিলেন। এলাকার লোকজনের কথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু প্রেরণা খুব শক্ত মনের মেয়ে। ছেলে তার প্রেমিকার সাথে পালিয়ে গেছে তাতে মেয়ে, মেয়ের বাড়ির লোকজনের কী দোষ? গেলে তো ওই ছেলে পালিয়ে গিয়েছিল, প্রেরণা তো যায়নি। তাই এই নিয়ে মেয়েটা একটুও মন খারাপ করেনি। রহিমের স্ত্রী আসমাও খুব ভালো মনের মানুষ। তিনিও ছোটো থেকে প্রেরণাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। যদিও উনাদের আরও দু’টি মেয়ে আছে কিন্তু প্রেরণার প্রতি ভালোবাসা একটু বেশিই। রহিম আলীর মতে প্রথম সন্তানরা বিশেষ হয়। কারণ তাদের মাধ্যমেই একজন নর অথবা নারী প্রথম সন্তান সুখ লাভ করে।
“ বাবা? ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে এসো!”
বাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রেরণা খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলো। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। রহিম আলীও হেসে রুমে ঢুকলেন। মেয়েকে যতবার দেখেন রহিম আলী ততবারই অবাক হয়ে যান।
প্রেরণার গায়ের রং দুধের স্বাদে আলতা মেশালে যেমন হয়, ঠিক তেমন। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ওর চোখ দুটো। যখন ও খুব খুশি হয় বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, তখন সেই চোখের মণি কেমন যেন হালকা বেগুনি আভা ধারণ করে। রহিম আলী আর তার স্ত্রী অনেক চেষ্টা করেও এই অলৌকিকত্বের কোনো ব্যাখ্যা পাননি।
“মা আমার, অনেক সুন্দর লাগছে তোকে। এবার যেন সবকিছু ভালোয় ভালোয় হয়ে যায় – এটাই প্রার্থনা করি।”
রহিম আলী মাথায় হাত রাখতেই প্রেরণা ম্লান হাসলো।
“ সবকিছু ঠিকঠাক হবে বাবা। এত চিন্তা করিও না। মা কোথায়? “
“ তোর মা? সে তো তদারকিতে ব্যস্ত। হিমাদ্রীরা এসে গেছে। “
হবু বরের নাম শুনেই প্রার্থনা লজ্জায় চুপ করে গেলো। রহিম আলী ফের বললেন,
“ তুই থাক, মা। আমি ওদিকে কী হচ্ছে দেখে আসছি। “
“ আচ্ছা বাবা।”
রহিম আলী মেয়েকে রেখে অন্য দিকে চলে গেলেন।
প্রেরণা হিমাদ্রীর কথা ভাবতে লাগলো।
হিমাদ্রী পেশায় ডাক্তার হলেও মনে-প্রাণে অসম্ভব শান্ত স্বভাবের মানুষ। পারিবারিকভাবে ঠিক হওয়া এই বিয়েতে সে প্রেরণাকে দেখার পরই বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। বলাবাহুল্য হিমাদ্রীর বিয়ে-শাদির কোনো প্ল্যান ছিলো না এখন। মায়ের জোড়াজুড়িতেই পাত্রী দেখতে এসেছিল সে। কিন্তু কে জানতো সেই মেয়ে দেখতে এসেই প্রেমে পড়ে যাবে! যাকে বলে প্রথম দেখায় প্রেম! প্রার্থনা প্রেমে না পড়লেও হিমাদ্রীকে তারও পছন্দ হয়েছে। তাই দুই পরিবারের সবাই বিয়েটাও তাড়াতাড়ি দেওয়ার সিন্ধান্ত নিয়েছিল।
ফোনের টুংটাং শব্দে ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো প্রেরণা। ফোন হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতেই হিমাদ্রীর নম্বরটা চোখে পড়লো। ম্যাসেজ এসেছে।
“ প্রেরণা? তোমাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছি। একটু তাড়াতাড়ি চলে এসো না, প্লিজ?”
ম্যাসেজটা পড়ে লজ্জায় মিটিমিটি হাসছে প্রার্থনা। এই ছেলেটা পাগল! কয়েকদিনের আলাপেই এমনভাবে ট্রিট করে যেন প্রার্থনা তার পুরো পৃথিবী!
“ হুম।”
এতটুকু লিখে রিপ্লাই করলো সে। তারপর ফোনটা আগের জায়গায় রেখে, চুপচাপ বসে রইলো। এখন শুধু অপেক্ষা!
কিছুক্ষণের মধ্যেই পাত্রীকে বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে বসানো হলো। হিমাদ্রী বারবার আড়চোখে সেদিকে তাকাচ্ছে। ভদ্রলোকের পরনে সাদা শেরওয়ানি, একেবারে যাকে বলে শুভ্র পুরুষ। দুই পরিবারের সবাই খুশি। এরমধ্যেই হঠাৎ বাড়ি জুড়ে অন্ধকার নেমে এলো। সবাই কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। রহিম আলী সবাইকে শান্ত হয়ে বসতে বলছেন। প্রেরণার বন্ধু আতিক ব্যাপারটা দেখতে গেছে। প্রাচী আর স্বর্না প্রেরণার পাশেই বসে আছে। তিন বোনের মধ্যে খুব ভাব। হঠাৎ প্রেরণা অনুভব করলো কেউ তার হাত টেনে ধরেছে। একপ্রকার টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে ফেলছে ওকে। প্রেরণার একবার মনে হলো এটা হয়তো হিমাদ্রী। সে তাই লজ্জা পেলো। একপাশে গিয়ে দাঁড়াল তার সাথে। অন্ধকারে সবকিছু আবছা দেখা যাচ্ছে। প্রেরণা বলল,
“ কী করছেন! হঠাৎ আলো জ্বললে সবাই দেখে ফেলবে হিমাদ্রী। বেশ লজ্জায় পড়তে হবে। “
“ প্রেরণা! তুমি এই বিয়ে কেন করছো? তোমার জগত আলাদা। তুমি এই পৃথিবীর নও।
চমকাল প্রেরণা। এটা কে! মুহুর্তের মধ্যে দূরে সরে দাঁড়াল প্রেরণা। এই কণ্ঠস্বর ওর চেনা! এটা সেই স্বপ্নের ভদ্রমহিলা, যে মাঝে মধ্যে প্রেরণার সাথে কথা বলে স্বপ্নে। কীসব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে সে!
“ আপনি! আপনি তো স্বপ্নে ছিলেন!”
“ স্বপ্ন থেকে বাস্তবে আসতে বাধ্য হলাম আজ। প্রেরণা! মা আমার, আর মাত্র সাতদিন! এরপর তুমি আমাদের রাজ্যের উপযুক্ত হবে। তখন যদি এই পৃথিবীর মানুষের মায়ায় পড়ে তুমি সেখানে না যেতে পারো, তখন! তুমি এই বিয়ে করো না।”
“ চুপ করুন! চুপ! কোন রাজ্য? কীসের উপযুক্ত? আমি কিছু শুনতে চাই না। আপনি চলে যান।”
হঠাৎ প্রেরণার চেঁচামেচি শুনে ভ্রু কুঁচকে ফেলল হিমাদ্রী। এরমধ্যে আলো জ্বলে উঠলো। প্রেরণা তখনও চোখ বন্ধ করে পাগলের মতো কাউকে চুপ করতে বলে যাচ্ছে। হিমাদ্রী দ্রুত নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং প্রেরণার নিকট এসে দাঁড়াল। প্রেরণা অস্বাভাবিক আচরণ করছে দেখে অনেকেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
“ প্রেরণা! কী হয়েছে তোমার? এদিকে তাকাও! কেউ নেই এখানে। আমি হিমাদ্রী!”
হিমাদ্রীর কথায় যেন কিছু যায় আসছে না প্রেরণার।
“ প্রেরণা! “
হিমাদ্রী উচ্চস্বরে ডাক দেওয়াতে প্রেরণা চোখ মেলে তাকালো। ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে মেয়েটা। আশেপাশে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাউকে একটা খুঁজছে। প্রাচী, স্বর্না বোনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
“ আপু? তোমার কী হয়েছে বলো তো? “
প্রাচীর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলোনা প্রার্থনা। তার আগেই চোখ বুজে আসতে লাগলো তার। হিমাদ্রী ব্যাপারটা বুঝতে পেরে, প্রেরণা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার আগেই ধরে ফেলল। রহিমা, আসমা দৌড়ে এসে দাঁড়ালেন মেয়ের কাছে। বিয়ে বাড়িতে কেমন একটা অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। একেই তো মেয়ের বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল, আবার এখন মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে কেউ কেউ কানাঘুঁষা শুরু করেছে।
“ কী হলো আমার মেয়ের! প্রাচীর বাবা তুমি ডাক্তারকে কল করো জলদি! “
আসমা বেশ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। হিমাদ্রী প্রেরণাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“ আগে ওকে রুমে নিয়ে যাওয়া দরকার, আন্টি।”
“ হ্যাঁ, বাবা। চলো।”
আসমা, প্রাচী ও স্বর্না হিমাদ্রীর পিছনে পিছনে গেলো। আর রহিম আলী ডক্টরকে কল করলেন।
ডাক্তার এসে প্রেরণাকে দেখে জানালেন অতিরিক্ত লো প্রেশার ও টেনশনের ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে সে। তেমন গুরুতর কিছু না। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করলে আর চিন্তা না করলেই ঠিক হয়ে যাবে। বাড়ির সবাই যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। হিমাদ্রীর বাবা মেহেদী খান, ছেলেকে একপাশে ডেকে নিয়ে গেলেন। হিমাদ্রীর কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে।
“ কী হয়েছে বাবা?”
“ এসব কী হচ্ছে, হিমাদ্রী? প্রার্থনা তো সেদিনও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো। তোর সাথে বের হয়েছিল তখন, তুই বলেছিলি। তখনও ডাক্তার এককথাই বলেছিলেন। এত দূর্বল মেয়েটা, তুই কেন খেয়াল রাখিস না?”
হিমাদ্রী যেন আকাশ থেকে পড়লো। তার বাবা এমনভাবে বলছে যেন প্রার্থনা তাদের বাড়িতে থাকে। অর্থাৎ তাদের বিয়ে হয়ে গেছে।
“ বাবা! আমি কীভাবে দেখব! আমি তো কলে যতবার কথা বলি, ততবারই খাওয়াদাওয়ার খোঁজ নেই। আমি তো তোমার বউমার সাথে থাকি না। “
মেহেদী ছেলের মাথায় গাট্টা মারলেন।
“ বকবক না করে গিয়ে দেখো, হুঁশ ফিরলো কি-না ওর। কোনোরকম জ্ঞান ফিরলেই বিয়ে করে ফেলো। আমাদের বাড়ি নিয়ে যাই, তারপর দেখব কীভাবে লো প্রেশার থাকে!”
হিমাদ্রী ফিক করে হেসে ফেলল। মাঝে মধ্যে মনে হয় মেহেদী খান ওর বাবা না, বন্ধু।
***
কুড়ি বছর একটি দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়ে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, শহরের বুক চিরে নতুন নতুন অট্টালিকা উঠেছে, কিন্তু মেহরাবের জীবনটা যেন সেই এক জায়গায় থমকে আছে।
ঢাকা শহরে, তার পুরনো বাড়িটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিস্তব্ধ। মেহরাবের চুলে এখন আবছা রুপোলি রেখা দেখা যায়, চোখের কোণে বয়সের ছাপ। বয়স সাতচল্লিশ ছুঁইছুঁই।
মেহরাব আর বিয়ে করেনি। যে হৃদয়ে একবার এক রমণী তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে ছাপ ফেলে গিয়েছে, সেখানে অন্য কোনো মানবী স্থান পাবে – সেটা মেহরাব কল্পনাও করতে পারেনি।
মেহরাব এখন শহরের একজন নামকরা লেখক। তার প্রতিটি গল্পে এক রহস্যময়ী নারীর ছায়া থাকে, যার কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই, শুধু আছে এক বুক হাহাকার। পাঠকরা ভাবে এগুলো নিছক কল্পনা, কিন্তু মেহরাব জানে এগুলো তার জীবনের স্মৃতি। আজও মেহরাব নিহাকে খুঁজে বেড়ায়। যদিও সে জানে তাকে কখনো পাওয়া সম্ভব না। তবুও মানুষ আশায় বাঁচে। নিহার সাথে মেহরাবের কোনো মনের টান না থাকলেও সেই রাতের পর মেহরাব ধীরে ধীরে অনুভব করেছিলো মেয়েটিকে সে ভালোবেসে ফেলেছে। এবং সেই ভালোবাসা এতটাই প্রখর যে আজ পর্যন্ত অন্য কেউ মেহরাবের জীবনে আসতে পারেনি।
চলবে….
