#নিষিদ্ধা
#পর্ব_৫
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
পর্বটি রোমান্টিক।
মায়ের সাথে করা অন্যায়ের কথা মনে করে মেহরাব চুপ করে গেলো। দীর্ঘশ্বাস ফেললো শুধু। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে ফেললো ধোঁয়া রূপী জিনটা। লোকটাকে মারার সাথে সাথে বাতাসের সাথে কোনো মহিলার হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। তা ক্রমে ক্রমে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যেতেই নিহা মুচকি হেসে বললো,
” আপনি ওপর থেকে সম্পূর্ণভাবে জিনের আসর কেটে গেছে। আর ফিরবে না সে। ”
” আমার মাথায় কোনো কাজ করছে না। ”
” শান্ত হোন। আপনার মা আপনার বাবার প্রতারণা সহ্য করতে পারেনি। আপনার মা উনার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কালো জাদুর মাধ্যমে এই জিনকে এই দুনিয়ায় নিয়ে এসেছিলেন। বলতে গেলে জিনটাকে একপ্রকার বাধ্য করে রেখেছিলেন এতদিন। আপনার মা শয়তানের সাথে চুক্তি করেছিল যদি আপনার বাবাকে জিন না মারতে পারে তাহলে আপনার শরীর কবজা করবে, রুহ শুষে নিবে। তারপর পৃথিবীতে শয়তানের প্রচার করবে। হলো তাই! আপনার বাবা এ বাড়িতে কখনো না আসার ফলে জিনটা তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। একসময় রেগে গিয়ে আপনার মা’কেও ওই জিন মেরেছে। আর এতদিন যে শাড়ি পরিহিত মধ্যবয়সী মহিলাকে দেখতেন ওটা আপনার মায়ের সাথে থাকা ক্বারিন জিন। ”
” মা এসব করেছিলেন! কিন্তু উনি তো অসুস্থ ছিলেন কতগুলো বছর। ”
” সবকিছু অভিনয় করতেন। কোনোভাবে ধরা পরার ভয় ছিল উনার মনে। ”
” কিছু বলার নেই। মায়ের জন্য কতগুলো নিরীহ মেয়ে মারা গেলো! আপনার বোনও…. ”
” হ্যাঁ। আপনাকে যদি জিনের হাত থেকে না বাঁচাতে পারতাম তাহলে আরো অনেক প্রাণ যেতো। ”
” জি। কিন্তু আপনি এতকিছু কীভাবে জানলেন নিহা? আর বাবাকে ডাকলেন কীভাবে? ”
মুচকি হাসলো নিহা। মেহরাব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এই হাসির কারণ কী?
” সেসব বলব আরেকদিন। অনেক রাত হয়েছে। ”
নিহার কথা শুনে দেয়ালঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করলো মেহরাব। রাত দু’টো ছুঁইছুঁই!
” হ্যাঁ। আপনি বরং আজ রাতে এখানে থেকে যান। না মানে এতরাতে যাওয়া কি ঠিক হবে? ”
” আমার কাছে রাতদিন সমান। ”
নিহা হেসে মেহরাবের বেডরুমের দিকে এগোলো। মেহরাব পেছন পেছন যাচ্ছে।
” তা ঠিক। আপনি অনেক সাহসী। আচ্ছা আপনি আমার রুমে থাকুন আমি বসার ঘরে সোফায় ঘুমিয়ে যাবো। রাতে কোনো দরকার হলে অবশ্যই ডাকবেন। ”
” ওকে। ”
মেহরাব নিহাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে এতটুকু বলে বসার ঘরের দিকে এগোলো। নিহা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহরাবের দিকে। ঠোঁটের কোণে তার রহস্যময়ী হাসির রেখা স্পষ্ট!
সবে চোখটা লেগে এসেছিল মেহরাবের। আচমকা শরীরে কারো স্পর্শ অনুভব করায় ঘুম ভেঙে গেছে তার। ঘুম ঘুম চোখে তাকাতেই চমকাল সে। নিহা মেহরাবের পাশে অর্ধনগ্ন হয়ে বসে আছে। পরনে ক্ষীণ পোশাক! মেহরাব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুয়েই আছে। কী হচ্ছে কিছু ভাবার মতো চিন্তাশক্তিও বুঝি হারিয়ে ফেলেছে সে।
” আজকের রাতটা একান্ত আমাদের হতে পারে না মেহরাব? কথা দিচ্ছি আর কখনো আপনার মুখোমুখি হবো না। ”
নিহার কথাগুলো কেমন নেশালো শোনাল মেহরাবের কাছে। কামনার অনলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে সে-ও। তবে সবকিছু অস্বাভাবিক লাগছে ওর কাছে। নিহার শরীরের প্রতিটি ভাজ মেহরাবকে চুম্বকের মতো টানছে। কিছুতেই ওকে অগ্রাহ্য করতে পারবে না এমন মনে হচ্ছে।
” এসো!”
মেহরাব ধীরে ধীরে নিহাকে নিজের দিকে টেনে নিল, চোখে গভীর মোহ এবং আকাঙ্ক্ষা। নিহার চোখে এক ধরনের চঞ্চলতা, যেন সমস্ত আবেগ একসঙ্গে উথলে উঠেছে। সে মেহরাবের চোখে চোখ রেখে নিজেকে তার সামনে উন্মোচন করলো, নিজের সমস্ত অনুভূতি, তার সমস্ত নারীত্ব মেহরাবের প্রতি নিবেদন করলো। মেহরাবের হৃদয় যেন তার শ্বাসের তালে তালে নাচছে, তার প্রতিটা স্পর্শে নিহা আরও মুগ্ধ হয়ে উঠছে।
চার দেয়ালের নির্জনতা যেন তাদের নিজেদের এক আলাদা পৃথিবী করে তুলেছে, যেখানে কেবল তারাই আছে, আর তাদের গভীর আকর্ষণ। রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে, তাদের দ্রুত শ্বাসের শব্দ এবং হৃদয়ের স্পন্দন ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। একে অপরের মাঝে মিশে গিয়ে, তারা যেন সমস্ত পৃথিবী ভুলে গেছে। সময় থেমে গেছে তাদের জন্য; অনুভূতির এই গভীরতাই যেন তাদের নিয়ে গেছে অন্য এক জগতে, যেখানে কেবল তাদের ভালোবাসার উষ্ণতা এবং মোহের নাচন চলছে।
আজ চারদিন হলো নিহার কোনো খোঁজখবর পাচ্ছে না মেহরাব। সেদিন রাতের পর থেকে সত্যি সত্যি মেয়েটা উবে গেছে। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই আজ শিয়াদের বাসায় অর্থাৎ নিহাদের বাসায় এসেছে মেহরাব। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। দারোয়ান আজমল মেহরাবকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুধালো,
” কে আপনি? কাকে চান? ”
মেহরাব এতক্ষণে বেশ সাহস পেলো। এবার নিহার কথা জিজ্ঞেস করা যাবে।
” নিহা চৌধুরী আছেন বাসায়? আমি উনার একজন রোগী। বিগত চারদিন ধরে উনাকে ফোনে পাচ্ছি না। ”
দারোয়ান আজমল মেহরাবের কথায় হা করে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে নিহা চৌধুরী নামটা বেশ অবাক করেছে তাকে।
” সে আবার কে? এই নামে তো চৌধুরী বাড়িতে কেউ থাকে না। ”
আজমলের কথায় চমকাল মেহরাব। নিজেকে সামলে জিজ্ঞেস করল,
” শিয়া চৌধুরীর যমজ বোন নিহা চৌধুরী? বিদেশে থাকেন উনি?”
” দেখুন আপনার ভুল হচ্ছে। চৌধুরী বাড়ির একটা মাত্রই মেয়ে ছিলো, শিয়া আপা। কিন্তু উনি তো নিখোঁজ! কেউ কেউ যদিও বলছে মারা গেছে। কিন্তু এখনো আপার লাশ পাওয়া যায়নি। ”
কথাগুলো বলতে বলতে আজমলের গলা ধরে এলো। মেহরাব সেদিকে খেয়াল করেনি। খেয়াল করার অবস্থায়ও নেই। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে আবারও। নিহা যদি শিয়ার যমজ বোন না হয় তাহলে কে? আর কীভাবেই শিয়ার মতো হুবহু দেখতে ওকে? মেহরাবের মাথা কাজ করছে না। আজমলকে আরকিছু না বলে শিয়াদের বাসার সামনে থেকে চলে যায় সে। নিহাকে খুঁজতে হবে। তার আগে মেহরাবের মনে আর একটা প্রশ্ন ঘুরছে নিহা তার মনের ভুল ছিলো না তো? নাহ, সেটা অসম্ভব। যার সাথে নিজের সবটা ভাগ করে নিলো তার অস্ত্বিত্ব কেবল কল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সারা পথ নিহাকে নিয়ে ভাবতে থাকে সে। অদ্ভুত বিষয় হলো নিহা সব সময় রাতে অথবা খুব সকালেই ওর বাসায় আসতো। দু’টো নির্দিষ্ট সময়! কিন্তু কেনো? মেহরাব নিজের বাসায় গিয়ে সর্বপ্রথম সিসিটিভি ফুটেজগুলো চেক করে। সবটা ভ্রম না-কি সত্যি তবুও সন্দেহ হচ্ছে ওর। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অবাক হয় মেহরাব। বিগত সাতদিনের সিসিটিভি ফুটেজে এই বাসায় ওর বাবা ছাড়া আর কেউ আসেনি। তাহলে নিহা? কে ছিলো নিহা? হঠাৎ জিনের বলা একটা কথা মনে পড়লো মেহরাবের। সেদিন জিনটা কথা বলার সময় নিহাকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল৷ কিন্তু নিহা তাকে চুপ করিয়ে ফেলে। কী হচ্ছে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না মেহরাব। সবকিছু পরিষ্কার হয়েও আবার ধোঁয়াশা হয়ে গেল।
সন্ধ্যা নেমেছে শহরের বুকে। রাস্তার আলোগুলো একে একে জ্বলে উঠছে, আলো আর অন্ধকারের এক অদ্ভুত মিশ্রণ তৈরি করছে। দিনের কোলাহল কমে গিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে, যেন একটা মায়াবী পরিবেশ ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো শহরে। দিগন্তে ম্লান লাল রং মিশে গেছে ঘন নীল আকাশে, আর তার মাঝে উঁকি দিতে শুরু করেছে একে একে তারাগুলো। দূরের কোনো মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে, যেন সন্ধ্যার এই মায়াবী পরিবেশটাকে আরও গভীর ও পবিত্র করে তুলছে। মানুষজন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরছে, কেউ কেউ আবার রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে বসে চা-সিগারেটের কাপে সন্ধ্যার গল্প জুড়েছে।
মেহরাব নিজের বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটছে, কিন্তু কোনোভাবেই মনের শান্তি খুঁজে পাচ্ছে না। এই কয়দিনেই নিহাকে ভালোবেসে ফেলেছে সে। অথচ যার জন্য হৃদয় জুড়ে এত ভালোবাসা জমেছে, তার সাথে আর কখনো দেখা হওয়া তো দূরে থাক, তার পরিচয়টুকুও জানে না মেহরাব। হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকায়। হঠাৎ করে বাতাসে ক্ষীণ কণ্ঠ ভেসে এলো, যেন কেউ দূর থেকে তার নাম ধরে কিছু বলছে!
“ আমায় তুমি খুঁজো না মেহরাব। এই পৃথিবীর কেউ নই আমি। আমি তোমার সাধ্যির বাহিরে। যতটুকু পেয়েছ ততটুকু মনে করে খুশি থেকো। বিদায়! ”
মুহূর্তেই চমকে উঠল মেহরাব। বাতাসে হঠাৎ ভেসে এলো এক মিষ্টি সুঘ্রাণ, যা ওর মনে গভীর শিহরণ জাগালো। খুব চেনা এই ঘ্রাণ! হ্যাঁ, এটা নিহার শরীরের ঘ্রাণ—যা ওকে প্রতিবারই যেন এক অজানা মায়ায় জড়িয়ে ফেলে। মেহরাব চোখ বন্ধ করলো, যেন সেই অনুভূতিটুকু ধরে রাখতে চায়।
কিছু কিছু মানুষ আমাদের জীবনে হুট করেই আসে, আবার হুট করেই হারিয়ে যায়। রেখে যায় শুধু স্মৃতির ক্ষুদ্র অংশগুলো। তবে মেহরাবের জীবনে সত্যিই কোনো নিহা ছিল কি না, সে প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। কিছু বিষয় হয়তো অমীমাংসিত থাকাই ভালো। মেহরাব আজ বুঝে গিয়েছে, নিহা তার কল্পনার একান্ত সঙ্গী, কিন্তু বাস্তবে সে এক ভিন্ন জগতের অধিবাসী।
চলবে…..
