#নিষিদ্ধা
#পর্ব_৪
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
বাতাসের মাঝে ভেসে আসছে চাপা কান্নার শব্দ, যেন অদৃশ্য কোনো উপস্থিতি তার আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মেহরাব ভয়ে চুপসে যাচ্ছে। কোনোমতে বিছানায় এসে বসলো আবার। গত এক সপ্তাহের অলৌকিক ঘটনাগুলো মেহরাবকে বেশ কাবু করে ফেলেছে। বারবার মনকে বোঝানো স্বত্বেও তার শরীরে ভয়ের কাঁপুনি, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। এবার সে অনুভব করছে কারো ভারী নিশ্বাস, এক পা দু পা করে এগিয়ে আসছে তার দিকে। ঘরের ভিতর একের পর এক অদ্ভুত আর ভয়ানক ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে। হঠাৎ করেই ঘরের বাতি নিজে নিজে জ্বলে উঠছে আর নিভে যাচ্ছে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি আলো নিয়ে খেলছে। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটাগুলো থেমে গেছে ঠিক মাঝরাতের বারোটায়, আর তখনই চারপাশে শুরু হয় চাপা হাসি আর ফিসফিস শব্দ।
টেবিলের ওপর রাখা জিনিসগুলো নিজে নিজে সরছে, কলমগুলো টেবিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গড়িয়ে যাচ্ছে। কখনো বইয়ের পাতা একা একাই উল্টে যাচ্ছে, যেন কেউ অদৃশ্য হাতে সেটা পড়ছে। ভয়ে আর স্থির থাকতে পারছে না মেহরাব। বসা থেকে উঠে দ্রুত দৌড়ে বসার ঘরে চলে এলো সে। ভয়ে ফোনে সূরা চালানোর কথা মাথা থেকে বের হয়ে গেছে তার। আচমকা দেওয়ালের দিকে নজর পড়তেই আঁতকে উঠল মেহরাব। আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখার বদলে সে দেখতে পাচ্ছে পেছনে একটা ছায়া, যা আসলে সেখানে থাকার কথা নয়। একটা ঠান্ডা হাওয়া ঘরের ভেতর দিয়ে বইছে, যেন কোনো অশুভ উপস্থিতি ঘরে প্রবেশ করেছে। অদ্ভুত কিচিরমিচির আওয়াজ, দরজার কপাটের কটকট শব্দ—সবকিছুই ঘরে একটা তীব্র ভয়ের আবহ তৈরি করছে। মেহরাব আর সহ্য করতে পারছে না। দৌড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে এমন সময় সেই সাদা শাড়ি পরিহিত মধ্যবয়সী মহিলাকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। মেহরাব ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল। কীভাবে দরজা দিয়ে বের হবে এখন?
অক্টোবর পেরিয়ে নভেম্বর চলে এসেছে। ঘড়িতে এখন সকাল দশটা। শীতের মৃদু স্পর্শ শহরের গা থেকে কুয়াশা সরিয়ে দিয়েছে, আর পুরো আকাশটা ধীরে ধীরে সোনালি আলোয় ভরে উঠেছে। রোদটা কড়া নয়, মোলায়েম—মাথার ওপর ঝুলে থাকা আকাশে স্নিগ্ধভাবে মিশে আছে। বাতাসে হালকা ঠান্ডা ভাব থাকলেও, তার সাথে ঢাকার চিরচেনা ব্যস্ততার গুঞ্জন মিশে গিয়ে যেন এক অন্যরকম পরিবেশের জন্ম দিয়েছে।
রাস্তাগুলোতে এখনো ভিড়। বাস, রিকশা, প্রাইভেট কার—সব কিছু মিলিয়ে ঢাকার সেই চিরন্তন গতি যেন নতুন করে শুরু হয়েছে। ফুটপাতে অফিসগামী মানুষদের তাড়াহুড়ো, পাশের চায়ের দোকানে কাগজে মুখ গুঁজে থাকা কয়েকজন আর ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠার গন্ধে যেন সকালের চিত্রটা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সকাল দশটার এ সময় রাস্তার পাশের গাছগুলো রোদের আলোয় স্নান করে। কিছু জায়গায় পাতার ফাঁকে রোদের ছোট ছোট ফোঁটা মাটিতে ছায়ার মতো ছড়িয়ে পড়ে, আর সেই আলোছায়ার খেলায় ফুটে ওঠে ঢাকার সকালের এক আলাদা সৌন্দর্য। সড়কে তখন মানুষের কোলাহল আর যানবাহনের শব্দে শহরের চেনা রূপ ফিরে আসে, যেন এই শহর সারাদিনের জন্য তার নিজের ব্যস্ততা আর যান্ত্রিক জীবনকে সাদরে গ্রহণ করেছে।
মেহরাবের জ্ঞান ফিরে বেলা এগারোটার দিকে। ফ্লোরে পড়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার জন্যই এতক্ষণ জ্ঞান হারিয়ে ছিলো বলে ধারণা করছে মেহরাব। কিন্তু নিহা? সে তো এখনো এলো না! মেহরাব নিহার কথা ভাবতে ভাবতে নিজের রুমে গিয়ে কল করলো তাকে। কিন্তু নিহার ফোন বন্ধ বলছে। দুশ্চিন্তা হচ্ছে মেহরাবের। কিন্তু কিছু করার নেই ওর। নিহার বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না। তারচে বরং রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয়।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতেই নিহা যথারীতি মেহরাবের বাসায় পৌঁছে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই বাসার দরজা খোলা দেখে কিছুটা ভড়কে গেছে সে। তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকতেই বসার ঘরে ফ্লোরে মেহরাবকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখল নিহা। কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও ডাইনিং রুম থেকে গ্রাসে করে পানি নিয়ে এসে মেহরাবের চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয় সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেহরাবের জ্ঞান ফেরে। নিহা মেহরাবকে সময় দেয় সবটা বলার জন্য। মিনিট বিশেক চুপচাপ বসে থাকে সে। তারপর নিহাকে বলে,
” গতকাল রাতে একটু বেশিই ভৌতিক ঘটনা ঘটেছে। বাসা থেকে বের হতেও পারছিলাম না। সাদা শাড়ি পরিহিত মধ্যবয়সী মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলো। রাতে ভয়ে ফ্লোরে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর সন্ধ্যায় শরীরটা কেমন জানি লাগছিল। তারপর কিছু মনে নেই। আচ্ছা আপনি ঠিক আছেন? ”
” হ্যাঁ আমি ঠিক আছি। আজকে ওরা আপনার শরীরের ওপর কবজা করবে। আপনার জ্ঞান থাকতেই করবে সেটা। তাই হাতে সময় কম। আমি যা করছি আপনি সাথে থাকুন। ”
নিহা এই কথা বলে ঘরের মেঝেতে একটা গোলাকার বৃত্ত আঁকতে লাগলো। মেহরাব চুপচাপ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় নিহাকে। মেহরাবকে সাথে নিয়ে বৃত্তের মধ্যে বসে নিহা। মেহরাব কৌতুহল সংবরণ করতে না পেরে শুধায়,
” এসব কী করছেন? ”
” অপেক্ষা করুন। তবে এই বৃত্তের বাইরে যাবেন না। ”
মেহরাব কিছু বলে না। নিহা বিভিন্ন সূরা পড়তে শুরু করে। যতই সময় এগোচ্ছে ততই রুমের পরিবেশ কেমন অস্বাভাবিক হচ্ছে। রুমের ভেতর শীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। সাথে মাঝে মধ্যে দমকা হাওয়া! মেহরাব ভয়ে নিহার হাত ধরে আছে। নিহা সূরা পড়ছে। রুমের ভেতর কেমন অদ্ভুত গর্জনের আওয়াজ ভেসে আসছে। দেয়াল থেকে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। নিহা চিৎকার করে বলে ওঠে,
” আপনি দয়া করে আর কারো ক্ষতি করবেন না। চলে যান। ”
নিহার কথা শেষে পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে। বৃত্তের চারপাশে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু একটা দৃশ্যমান হতে থাকে। ঠিক একটা অবয়বের মতো। সেই অবয়ব গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,
” না আমি যাবো না। আমি ওই ছেলেটার শরীরে ভর করে শয়তানের প্রচার করবো। তোকে মারলেই আমার উদ্দেশ্য সফল হবে। তুই আমার শেষ শিকার। বেরিয়ে আয় ওখান থেকে। ”
” তাতে কি আপনি মুক্তি পাবেন? আপনিও তো একটা গোলকধাঁধায় আঁটকে আছেন। কারো ইচ্ছেতে এসব করতে হচ্ছে আপনাকে। ”
নিহার কথায় চুপ করে আছে অবয়বটা। রুম জুড়ে এখন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। নিহা আবারও বললো,
” নিজের জগতে ফিরতে চাইলে এসব বন্ধ করুন। ”
” যে কারণে এ জগতে আসা সেই কারণটা আমি খুঁজে পাইনি। তাই এই ছেলেটার শরীরে ভর করে আমি শয়তানকে তুষ্ট করে তারপর ওর রুহ শুষে নিবো। এবং সেটা সম্ভব হবে তোকে অর্ধনগ্ন করে এই ছেলেটির সাথে যৌন মিলন করানোর মাধ্যমে। আর ছেলেটির মা নিজেই ওর শরীরে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছে আমাকে। ”
মেহরাব নিহার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। কোনো কিছুই ওর বোধগম্য হচ্ছে না।
” নিহা উনি কী বললেন! আমার মা করতে বলেছেন এসব? ”
” হুম। আমি পরে সবকিছু খুলে বলব আপনাকে। ধৈর্য ধরুন। ”
নিহা একটু থামল। চোখ বন্ধ করে ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বললো। তবে শোনার মতো কিছু ছিলো না।
তারপর চোখ মেলে তাকিয়ে অবয়বটাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
” আমি আপানকে এই দুনিয়া থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করবো। আপনি কি রাজি? ”
” হ্যাঁ রাজি। কিন্তু তুমিও….”
” আমার বিষয় বাদ দিন। শুনুন, এখুনি একজন লোক আসবে। আপনি সিঁড়ির কাছে তাকে আক্রমণ করবেন। তাকে শিকার করলেই আপনি মুক্তি পাবেন। ”
” ঠিক আছে। ”
আগের মতোই কর্কশ গলায় বললো অবয়বটা। মুহুর্তের মধ্যে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা গেলো দরজার বাইরে থেকে। ধোঁয়ার কুন্ডলি পাকানো অবয়বটা দরজার বাইরে চলে যেতেই নিহা ও মেহরাবও পেছন পেছন গেলো। সিঁড়ির কাছে দাড়িয়ে থাকা লোকটাকে ধোঁয়ার কুন্ডলিতে ঘিরে ধরেছে।
” কে উনি? ”
” আপনার বাবা। ”
” বাবা! তাহলে তো উনাকে বাঁচাতে হবে। ”
মেহরাব এ কথা বলে সামনে এগোতে চাইলে নিহা বাঁধা দিয়ে বলে,
” নাহ। কারো কারো পাপের শাস্তি এ পৃথিবীতেই পেতে হয়। আপনার বাবাও তেমনই অপরাধী। ”
মায়ের সাথে করা অন্যায়ের কথা মনে করে মেহরাব চুপ করে গেলো। দীর্ঘশ্বাস ফেললো শুধু। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে ফেললো ধোঁয়া রূপী জিনটা। লোকটাকে মারার সাথে সাথে বাতাসের সাথে কোনো মহিলার হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে।
চলবে……
