#নিষিদ্ধা
#পর্ব_৩
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
রাতটা রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে কাটানোর পর সকালে বাসায় ফিরে যায় মেহরাব। কিন্তু বাসায় ফিরে বেশ অবাক হয় সে। এমনিতে খুন হওয়ার পর সব এলোমেলো থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যেতো। কিন্তু আজকে ঘরের এই অবস্থা কেন! সমস্ত ঘর এলোমেলো। দেখে মনে হচ্ছে কেউ তন্নতন্ন করে কিছু একটা খুঁজেছে। তবে কি পুলিশ এসেছিল? কিন্তু পুলিশ এলে তো বাসায় ঢোকার জন্য দরজা খুলতো। মেহরাব নিজেই দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করায় পুলিশের বিষয়টা মাথা থেকে বাদ দিলো। তাহলে কে? এসব ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে গিয়ে বসে মেহরাব।
” শান্ত হয়ে বসুন মিস্টার মেহরাব। আমি করেছি এসব। সবকিছু গুছিয়ে দিবো তবে একটু সময় লাগবে। ”
আচমকা শিয়ার মতো দেখতে কাউকে দেখে চমকাল মেহরাব। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো সে।
” আপনি! ডক্টর শিয়া আপনি বেঁচে আছেন? ”
শিয়ার মতো দেখতে মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বিছানায় বসলো সে এবং ইশারায় মেহরাবকেও বসতে বলল। মেহরাব কোনো প্রশ্ন না করে বসলো।
” আমি নিহা। শিয়ার জমজ বোন। শিয়ার নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে দেশে ফিরেছি৷ ”
নিহার কথায় অবাক হলো মেহরাব। আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” বুঝলাম কিন্তু আমার বাসায় কেনো এবং কীভাবে এলেন? প্লিজ সবকিছু একটু খুলে বলুন। আমার মাথা কাজ করছে না আর। আমি খুব ক্লান্ত নিহা। ”
মেহরাবের অবস্থা দেখে বেশ মায়া হচ্ছে নিহার। ছেলেটার অবস্থা আসলেই খুব খারাপ।
” শিয়া একজন সাইকিয়াট্রিস্ট, বিজ্ঞানের ছাত্রী। তাই ভূতপ্রেত বা অতিপ্রাকৃত বিষয়ে তার একেবারেই অনীহা। আমি তার ঠিক উল্টো। পেশায় একজন ‘ঘোস্ট হান্টার’, আর এসব নিয়েই পড়াশোনা করেছি। তাছাড়া, ধর্ম মানলে জিন-পরীর অস্তিত্বকেও বিশ্বাস করতে হবে।
শিয়া সবসময় ওর ডায়েরিতে নানা কেস সম্পর্কে লিখত, বিশেষ করে যেগুলো ওর কাছে জটিল মনে হতো। বাসায় ফিরে একদিন ওর ডায়েরি ঘাঁটতে গিয়ে আপনার বিষয়ে জানতে পারি। তখন ভাবলাম, হয়তো আপনি মিথ্যা বলছেন, নয়তো সত্যিই কোনো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার। এ কারণে আপনার মানসিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে আমি চুপিসারে আপনার বাসায় ঢুকে পড়ি। আপনি অবাক হয়েছিলেন শিয়াকে দেখে—তবে সেটা ছিল আসলে আমি। সেই সুযোগে আপনার বাসায় লুকিয়ে থেকে সবকিছু খুঁজতে শুরু করি। কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই পেলাম না।
তবুও রাত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলাম। আপনি যখন বাসা থেকে বের হলেন, তখন থেকেই সবকিছু নজরে রাখছি। নিশ্চিত হলাম, আপনার ওপর একটি খারাপ জিনের নজর আছে, আর সেই জিনই এসব ঘটনার জন্য দায়ী। কেন এটা করছে, তা এখনো বের করতে পারিনি। তবে, আপনি পাশে থাকলে অবশ্যই সব রহস্য উন্মোচন করতে পারব।”
কথাগুলো বলে থামলো নিহা। মেহরাব কী বলবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ করে কেনো তার জীবনটা এমন এলোমেলো হয়ে গেলো? কিছুটা সময় নিয়ে মেহরাব জবাব দিলো,
” আমি আছি আপনার সাথে। প্লিজ আমাকে এইসব থেকে বাঁচান। ”
” শান্ত হোন। আজকে রাতে কিছুতেই ঘুমাবেন না। আগামীকাল দেখা করবো আমি। বেশকিছু কাজ বাকি আমার। হতাশ হবেন না, ইনশাআল্লাহ সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ”
নিহার কথায় যেনো একটু হলেও স্বস্তি পেলো মেহরাব। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।
” ঠিক আছে। ”
মেহরাবকে বলেকয়ে নিহা সেদিন বাসা থেকে চলে আসে। সারাদিন এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে সময় কাটে মেহরাবের। মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শরীরের ওপর প্রচন্ড ভারী কিছু অনুভব করে হাসফাস করে সে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে যাবে এমনকিছু । নিঃশ্বাস ক্রমেক্রমে আঁটকে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই চোখ মেলে তাকাতে পারছে না মেহরাব। হঠাৎ এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। মেহরাব ঘুমিয়ে থাকলেও টের পেল যে নিহা ফোন করেছে। কারণ নিহার নম্বরে সে আয়াতুল কুরসি সেট করে রেখেছে। আয়াতুল কুরসির আওয়াজে মেহরাব অল্প সময়ের মধ্যেই চোখ খুলে তাকায়। শোয়া থেকে উঠে বসে ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি কল রিসিভ করে সে।
” হ্যালো! ”
” আপনি ঠিক আছেন মেহরাব? ”
” না। আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল । আপনি কল না দিলে হয়তো…. ”
” কিছু হবে না। আপনি ফোনে যেকোনো সূরা চালিয়ে শুয়ে পড়ুন। আশা করি বাকি রাতটুকু কোনো সমস্যা হবে না। আমি সকালে আসছি। ”
” ঠিক আছে। ”
পরেরদিন সকাল সকাল মেহরাবের বাসায় আসে নিহা। বাসার গেট পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় আসতেই থমকে দাঁড়ায় সে। সিঁড়ির পাশে একজন সাদা শাড়ি পরিহিত মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে কী ভয়ানক! চোখের কোটর শূন্য, সেখান থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হচ্ছে। চোখগুলো গালে বসানো তার, দাঁতগুলো বিশ্রী। নিহা শুকনো ঢোক গিলে সূরা কালাম পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভয়ে কোনো সূরা মনে পড়ছে না এখন। বারবার চেষ্টা করেও কোনো সূরা পড়তে পারছে না। মহিলা নিহার দিকে কেমন রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে নিহার ওপর সে খুব রাগ করেছে। নিহা কী করবে বুঝতে পারছে না। মেহরাবের বাসায় তো ঢুকতে হবে! আর বাসায় ঢুকতে গেলে মহিলাকে পেরিয়ে সামনে এগোতে হবে। নিহা চোখ বন্ধ করে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে একটা দৌড় দেয়। অদ্ভুতভাবে মহিলা কিছু করেনি। নিহা নিরাপদভাবে মেহরাবের বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঘনঘন কলিং বেল বাজাচ্ছে। মেহরাব বেশি সময় নেয়নি, দ্রুত দরজা খুলে দিয়েছে। নিহাও হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। দরজা খোলা মাত্রই তাড়াতাড়ি বাসায় ঢুকে গেলো সে। তবে মহিলা এখনো নিহার দিকে সেরকম রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নিহাকে এরকম হাঁপাতে দেখে মেহরাব কিছুটা অবাক হয়েছে। বসার ঘরে নিহাকে বসতে বলে ডাইনিং টেবিল থেকে পানির গ্লাস নিয়ে নিয়ে এসেছে মেহরাব।
” নিন। ”
মেহরাব পানির গ্লাস নিয়ে নিহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে। নিহা গ্লাসটা নিয়ে পানি পান করে । মেহরাব ফের বলে,
” আপনার কী হয়েছে নিহা? ”
নিহা চুপ করে থাকে। কোনো উত্তর দেয় না। নিজেকে ধাতস্থ করতে সময় লাগছে তার। মেহরাব বিষয়টা বুঝতে পেরে আর কিছু বললো না। মিনিট পাঁচেক পরে নিহা নিজে থেকেই বলে উঠল,
” আপনার মা মারা গেছিলেন কীভাবে? ”
নিহার মুখে নিজের মায়ের কথা শুনে চমকাল মেহরাব। এই মেয়েকে তো সে তার মায়ের বিষয় কিছু বলেনি! তাহলে জানলো কীভাবে?
” আপনি আমার মায়ের কথা কীভাবে জানলেন? ”
” আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দিন আগে। ”
নিহা বেশ উত্তেজিত হয়ে বললো কথাটা। ফলশ্রুতিতে মেহরাব দমে গেলো।
” আমার মা ছিলেন মানসিক বিকারগস্ত। গত দুই বছর ধরে নিজেকে ঘরবন্দী করে রেখেছিলেন তিনি। বাসায় এক বুয়া কাজ করতেন তিনিই মায়ের দেখাশোনা করতেন। একদিন শুনলাম মা নিজেই নিজের চোখগুলো উপরে ফেলেছেন। ফলশ্রুতিতে তিনি মারা গেছেন। ”
” শুনেছিলেন? আপনি ছিলেন না আপনার মায়ের কাছে! ”
” আমার মা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে উনার কাছে তেমন যাওয়া হতোনা। অদ্ভুত আচরণ করতেন, রাগ করতেন। যার ফলে আমি তেমন উনার রুমে যেতাম না। বুয়ার কাছ থেকে সব খবর নিতাম। মা’কে ওভাবে দেখতে আমারও ভালো লাগতো না । মাকে যে বুয়া দেখাশোনা করতেন সে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার ফলে মা কিছুদিন একা ছিলেন। আমি এরকমই একদিন রাতে বাসায় ফিরে এসে দেখি মা নিজের চোখগুলো উপরে ফেলেছেন। ফ্লোরে পড়ে আছে উনার রক্তাক্ত লাশ! ”
কথাগুলো বলতে গিয়ে মেহরাব বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে গেছে। দু-চোখ ছলছল করছে তার।
” আচ্ছা আপনার বাবা আপানদের সাথে থাকেন না? ”
” নাহ! আমার বাবা-মায়ের লাভ ম্যারেজ ছিলো। বাবা পরকীয়াতে জড়িয়ে অন্য একজনের সাথে চলে যাওয়ার শকড মা হয়তো নিতে পারেননি। সেই থেকেই মা অসুস্থ। ”
নিহা মনে মনে ভাবলো, সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাই তাহলে মেহরাবের মা ছিলেন? নাহ! এখুনি এসব বিষয় মেহরাবকে বলা ঠিক হবে না। আগে সবকিছু নিশ্চিত হয়ে তারপরই জানানো ঠিক হবে।
” আচ্ছা বুঝলাম। আমি আপনার মায়ের রুমটা দেখতে পারি? ”
” রুম তো ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে তালাবদ্ধ করে রেখেছি। ”
” তবুও দেখতে চাচ্ছি। ”
” বেশ চলুন তাহলে। ”
মেহরাবের পেছন পেছন এগোচ্ছে নিহা। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা তালাবদ্ধ ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল দু’জন। রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ভালো করে চারদিকে নজর বুলিয়ে নিলো নেহা। সবকিছু সাজানো-গোছানো, পরিষ্কার। নিহার দেখা শেষে তারপর দু’জনেই আবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। নিহার হাবভাব পর্যবেক্ষণ করছে মেহরাব।
” আপনি কি কিছু বুঝতে পারলেন? ”
মেহরাব জিজ্ঞেস করলো। নিহা ভাবলেশহীনভাবে জবাব দেয়,
” নাহ। তবে আশা করি শীঘ্রই সবকিছু বুঝতে পারবো। আর হ্যাঁ আজ রাতে কিছুতেই ঘুমাবেন না। হয়তো আগামী শিকার আমি। আপনি ঘুমালে আমি শেষ! ”
আঁতকে উঠল মেহরাব। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা আরও ঘন হয়ে উঠেছে। নিহা কীভাবে বুঝল যে পরবর্তী খুনের শিকার হয়তো সে নিজেই? কৌতূহল সংবরণ করে নিলো মেহরাব।
” আমি ঘুমাবো না। আপনি সাবধানে থাকবেন। ”
” ওকে। ফোনে সূরা চালু করে রেখে বসে থাকবেন রাতে। খুব সমস্যা হলে বাসা থেকে বেরিয়ে যাবেন, কিন্তু ঘুমাবেন না। আমি এখন আসছি, আগামীকাল সকালে আবার আসবো। ”
নিহা এ কথা বলে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো। মেহরাবের মনে নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এসবকিছু কেনো হচ্ছে? আর এসবের সাথে তার মায়েরই বা কী সম্পর্ক! আর এই নিহা মেয়েটা প্রতিদিন সকালে অথবা রাতে একটা নির্দিষ্ট সময় কেনো আসে? আরকিছু ভাবতে পারছে না মেহরাব। মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে অতিরিক্ত চিন্তা, অনিদ্রা এসবের ফলে এরকম হচ্ছে।
রাত গভীর হয়েছে। পুরো শহর নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেছে, যেন অশুভ কোনো শক্তির আবির্ভাব ঘটছে। আকাশে কালো মেঘ জমে রয়েছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, যেন দূর থেকে কেউ মেহরাবকে সতর্ক করে দিচ্ছে। রাতের হাওয়া হালকা হিমেল হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই হাওয়ার মধ্যে ভৌতিক একটা স্রোত বইছে। চারপাশের বাতাস ভারী, যেন কোনো অলৌকিক শক্তি প্রবেশ করেছে। মেহরাব নিজের ঘরে বসে আছে। আজকে সবকিছু অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে আরো ভয়াবহ কিছু ঘটবে। কী করবে বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে একজোড়া শীতল চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। আশেপাশে নজর বোলাতে লাগলো মেহরাব। নিহাকে কি একবার কল দিবে? কিন্তু কল দিলে কী লাভ? নিহা তো কাল সকালে আসবে বলেছে। আচমকা জানালার দিকে দৃষ্টিপাত করলো মেহরাব। জানালাগুলো বন্ধ করতে হবে ভেবে বসা থেকে উঠে জানালার দিকে এগোলো সে। কিন্তু ঘরের জানালা বন্ধ করেও যেন সে ভয়ানক শীতলতা অনুভব করছে, যেমনটা প্রতিদিন রাতে শুরু হয়। হঠাৎ চারপাশে কোনো ছায়ার সাড়া দেখা যাচ্ছে।
চলবে….
