পর্ব -৩
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখনিতে : #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা
মেহুল ভার্সিটি থেকে যখন বাসার কাছাকাছি এসে পরেছে তখন সময় দুপুর। কাঠফাটা রোদে ওর মুখের অবস্থা নাজেহাল।ও যখন রাফিনদের বাড়ি পার হবে তখন গেইট থেকে দেখতে পেলো রাফিন বাড়ির সামনের বাগানে সাইকেল চালাচ্ছে। মেহুল আরেকটু দেখার চেষ্টা করলো আর তাতে বুঝলো রাফিনের মন খারাপ। তাই মেহুল বাড়ি যাওয়ার আগে রাফিনের সাথে দেখা করতে গেলো।
রাফিন একা একা এই রোদের মধ্যে সাইকেল চালাচ্ছিলো। ওর মন কাল থেকে ভালো নেই। বাবাই ও ওকে বকা দিয়েছে তাই ও বাবাইয়ের সাথে ও কথা বলছে না। রাগ করেই এখানে এসে বসে আছে। রাফিন দেখলো ওর সামনে কে যেন এসে দাড়িয়েছে। তাই সে উপরে তাকাতেই দেখলো তার মেহুল আন্টি।
মেহুল রাফিনের সামনে এসে বসলো।
” কালকের জন্য সরি বাবা৷ আমার শরীর টা একটু খারাপ ছিল তো তাই আর বের হতে পারি নি। প্লিজ আন্টিকে মাফ করে দেও। ”
মেহুল আন্টির শরীর খারাপ ছিল এটা শুনে রাফিন আর রাগ রাখলো না৷
“এখন তুমি ভালো আছো তো আন্টি? ”
” হ্যা বাবা এখন আমি ভালো আছি আর আন্টি তোমার জন্য সারপ্রাইজ ও এনেছি। ”
মেহুল ব্যাগ থেকে জবা ফুল আর আইসক্রিম টা বের করে রাফিনের সামনে ধরলো। জবা ফুলটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে ব্যাগে রাখার কারণে তবুও দেখতে খারাপ লাগছে না। আইসক্রিম টা মেহুল আসার সময় নিয়ে এসেছিল দোকান থেকে বিকেলে রাফিনকে দিবে বলে কিন্তু এখন দিয়ে দিলো।
এমন সারপ্রাইজ পেয়ে রাফিন খুশিতে লাফি উঠলো। মেহুলকে জড়িয়ে ধরলো আদরে।
মেহুলও রাফিনকে খুশি করতে পেরে আনন্দ পেলো আর ছেলেটাকে আগলিয়ে নিলো।
তারা বাগানের কর্নারে বসার চেয়ার ছিল সেখানে বসে আইসক্রিম খেতে লাগলো।
রাফিন অনেক খুশি। সে যেন মন খুলে হাসছিল আজ মেহুলের সাথে।
অন্যদিকে তারা জানেই না তাদের এসব খুনসুটি নাবিল তার ঘরের বারান্দায় দাড়িয়ে দেখছে।
নাবিল কাজ থেকে ব্রেক নেওয়ার জন্য চা হাতে বারান্দায় এসে দাড়িয়েছিল৷ তখনই নিচের দৃশ্য গুলো ওর চোখে পড়লো। না চাইতেও নাবিল বার বার মেহুলের দিকে তাকাচ্ছে। সে জানে এটা ঠিক না তবুও সে নিজের চোখ কে কন্ট্রোল করতে পারছে না। অনেকদিন পর নাবিল আজ ছেলেকে এভাবে হাসতে দেখছে। হয়তো এজন্যই মেহুলের প্রতি তার এতো মুগ্ধতা কাজ করছে।
**
“আন্টি তুমি এখন আমার সাথে আইসক্রিম খেয়েছো তারমানে বিকেলে আর আমার সাথে ঘুরতে যাবে না ?”
” ইমম্ যদি না বলি?”
” তুমি কথা দিয়েছিলে আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে।”
“আচ্ছা তাহলে আজ বিকেলে পাক্কা আমি মাঠে আসবো আর আমরা একসাথে ঘুরবো ঠিক আছে বাবা!”
” ঠিক আছে আন্টি…. কিন্তু কালকের জন্য বাবা রাগ করে আছে আজ আমাকে দিবে না বের হতে। ”
রাফিনের মুখটা দুঃখে ভরে গেলো। মেহুলের মায়া লাগলো।
” মন খারাপ করে না বাবা তুমি আসরের আজান দিলে রেডি হয়ে থেকো আমি নিতে আসবো তোমাকে। নাবিল সাহেব না দিলে আমি কথা বলে তোমাকে নিয়ে যাবো ঠিক আছে!”
“সত্যি আন্টি! তাহলে ঠিক আছে।”
**
মেহুল বাসায় চলে এলো৷ এই টুকু বাচ্চা ছেলে রাফিন কিন্তু কথা বলে একদম বড়দের মতো৷ কি যেন দুঃখ ওর চোখে, তাকালেই মেহুলের মায়া লাগে৷
আজ আর মেহুল ঘুমালো না। ঘরের সব কাজ করতে করতেই আসরের আজান দিয়ে দিলো তাই ও নিজেও রেডি হয়ে বের হলো। তাদের বাসার একটু সামনেই একটা খেলার মাঠ আছে। সেখানেই গিয়ে সে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যখন দেখলো রাফিন বা ওর বাবা কেউ আসছে না তখন ও বুঝলো আসলেই নাবিল সাহেব আজ ছেলেকে বের হতে দেন নি। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহুল রাফিনের বাড়ির দিকে আগালো।
কলিংবেলের শব্দে সাবিহা জাহান এসে দরজা খুললেন। আজও কালকের ওই মেয়েটাকে দেখে তিনি খুশিই হলেন।
” আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম। ও তুমিহ্! আসো আসো ভিতরে আসো।”
” না আন্টি আসলে…
” আজ আর তোমার কোনো বাহানা শুনবো না বাপু। আসো ভিতরে এসে যা বলার বলবে আমি তারপর শুনবো।”
এতো আন্তরিকতায় মেহুল আর মানা করতে পারলো না। ভিতরে এসে সোফায় বসলো।
“কি খাবে বলো! ”
” না না আন্টি কিছু খাবো না এখন। আসলে আমি এসেছিলাম রাফিনের জন্য। ও আমাকে কাল বলেছিল বিকেলে আমার সাথে ঘুরবে কিন্তু আমি কাল আসতে পারি নি বলে ওর মন খারাপ ছিল৷ তাই আজ নিয়ে যাবো বলেছিলাম৷ যদি ওকে একটু দিতেন আমার সাথে…. ”
” হ্যা আমি জানি সব কিছুই। তুমি এতো হিচকিচাচ্ছো কেন! বাবা ছেলে তো সেই কখন থেকে বের হওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল। তুমি একটু বসো ওরা এই নিচে নামবে বলে। ”
” বাবা-ছেলে!”
” না মানে রাফিন তো বলছিল নাবিল সাহেব নাকি ওকে আজ বের হতে দিবে না। তাই আমি এসেছিলাম। ”
” হ্যা হ্যা দিতোই তো না কিন্তু পরে কি হলো কে জানে বললো আজ সেও নাকি যাবে সাথে ঘুরতে। অবশ্য ও কোথাও বের হয় না আজ ছেলের অছিলায় যদি একটু ঘুরে তাহলে ও ভালোই।”
” ও তাহলে আজ তারা বের হবে তাহলে আমি আজ আসি আন্টি।”
” আরে না তুমি চলে যাবে কেন? তোমার সাথেই তো বের হবে বলে রাফিন রেডি হচ্ছে। শুধু তোমাদের সাথে নাবিলও যাবে। তুমি বসো আমি আসছি।”
মেহুলের সব কিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এখন কি তাহলে নাবিল ও যাবে ওদের সঙ্গে! নাবিলের সাথে কিভাবে যাবে ও! কালকের ওই চিঠি আর মলম ওটার জন্য এখনও মেহুলের কেমন জানি লাগছে।
মেহুলকে বসিয়ে সাবিহা গেলেন রান্নাঘরে নাস্তা আনতে। মেহুল এই অব্দি দুইবার এসেছে তাদের বাড়িতে কিন্তু একবারও সে রাফিনের মা কে দেখলো না বিষয়টা একটু অদ্ভুত লাগলো তার কাছে।
মেহুলের ভাবনার মাঝে নাবিল আর রাফিন ড্রয়িং রুমে আসলো। মেহুলকে তাদের ঘরে বসে থাকতে দেখে রাফিন দৌড়ে তার কাছে আসলো-
” আন্টি…….ইয়ে… তুমি এসেছো। ”
মেহুল রাফিনকে জরিয়ে ধরে বললো-
‘” হ্যা বাবা এসেছি, প্রমিস করেছি আসতে তো হতোই আমাকে। ওয়াও রাফিন তোমাকে তো খুব সুন্দর লাগছে। ”
***
তারা বাসা থেকে বের হয়ে সামনের মাঠে এলো। আসেপাশের বাসার ছেলেরা ফুটবল খেলছে। তারা দাড়িয়ে সেই খেলা দেখতে লাগলো। নাবিল এতোক্ষণ চুপ ছিল তারপর মেহুল কে উদ্দেশ্য করে বললো-
” মিস মেহুল যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমরা অন্য কোথাও যাই। যেহেতু ঘুরতে বের হয়েছি বাসার সামনে তো আর ঘুরাঘুরি করে মজা পাওয়া যাবে না।”
” সরি মি. আমি আসলে….
” আমি জানি আপনার সাথে মাত্র ই পরিচয় হয়েছে আমাদের তাই এভাবে বলায় আপনি মানা করবেন সেটাই আশা করেছি আমি কিন্তু আপনি ব্যাপার টা ইজি ভাবে নিতে পারেন। আসলে রাফিনকে নিয়ে আমি কোথাও বেড়াতে যেতে পারি না কিন্তু আজ যাবো ঠিক করেছিলাম এখন আপনি ও সাথে গেলে রাফিন অনেক খুশি হবে। প্লিজ রাফিনের জন্য চলুন আমাদের সাথে।”
মেহুল কি করবে বুঝতে পারছে না৷ এভাবে একজন বিবাহিত পুরুষের সাথে কোথাও যাওয়া তো ঠিক হবে না। আবার রাফিনকে কথাও দিয়েছে আজ তার সাথে ঘুরতে যাবে। নাবিল না থাকলে ইজিলি সে রাফিনকে নিয়ে ঘুরতে পারতো।
” আন্টি আন্টি চলো না আমাদের সাথে। চলে না আন্টি প্লিজ। ”
রাফিন এতো করে বলছে তাই আর মেহুল মানা করলো না। সে ভাবলো একদিনেরই তো ব্যাপার। আজকের পর রাফিনকে এমন প্রমিজ ও কখনো করবে না আর কোথাও যাবেও না।
***
তারা হাঁটতে হাঁটতে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এলো। নাবিলই মূলত এখানে নিয়ে এসেছে তাদের। তারা ভিতরে প্রবেশ করতেই তাদের দেখে মেনেজার দৌড়ে আসলো। বিনয়ের সাথে বললো-
” হ্যালো স্যার, হ্যালো ম্যাম।”
” স্যার আজ সাথে গেস্ট নিয়ে আসবেন বলেন নি তো। ওওও ছোট স্যারও আছেন দেখছি । ”
” হ্যা হঠাৎ প্ল্যান হলো তাই জানাই নি। খুব স্পেশাল গেস্ট নিয়ে এসেছি কিন্তু মেনেজার সাহেব তাই খাবারে যেন কোন সমস্যা না হয়।
” হ্যা হ্যা স্যার চিন্তা করবেন না আমি নিজে সব দেখছি। আপনারা বসুন প্লিজ ”
নাবিল মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললো –
“আসুন মেহুল আমরা ওই কর্নারের টেবিলে বসি।”
মেহুলও সায় জানালো। মেহুলের কাছে রেস্টুরেন্টটার ডেকোরেশন খুবই সুন্দর লাগলো। আগে কখনো আসেনি সে এখানে। বাসার কাছে এতো সুন্দর রেস্টুরেন্ট আছে জানলে সে আরো আগেই আসতো এখানে।
” অনেক সুন্দর তো রেস্টুরেন্ট টা। আপনি এখানকার রেগুলার কাস্টমার নাকি! মেনেজার অব্দি ওয়েলকাম করতে চলে আসলো! ”
” হ্যা রেগুলার কাস্টমারই বলতে পারেন। কারণ এটা আমারই রেস্টুরেন্ট।”
” কিহ্”
বিস্মিত হলো মেহুল। এই জন্যই তো তাদের এতো খাতিরযত্ন করা হচ্ছিলো। তাহলে নাবিলের এ ব্যবসা।
” জ্বি এজন্যই এখানে নিয়ে আসলাম আপনাদের। আশা করি আপনার খারাপ লাগবে না। আচ্ছা বসুন আপনারা আমি খাবার অর্ডার দিয়ে আসছি। ”
নাবিল চলে গেলে মেহুল রাফিনের সাথে গল্প করতে থাকলো।
” রাফিন এভাবে যে তুমি আর তোমার বাবা আমার সাথে এসেছো এখানে তোমার আম্মু জানলে তোমার আর তোমার আব্বুর সাথে রাগ করবে না? তোমার আম্মুকেও সাথে নিয়ে আসা উচিত ছিল তোমার। ”
” আম্মু!”
” হ্যা তোমার আম্মু ”
” আমার আম্মু কীভাবে আসবে আন্টি আমার আম্মু তো এখানে থাকে না। ”
” ওমা তাই নাকি! তাহলে কোথায় গিয়েছে তোমার আম্মু! ”
“আমার আম্মু তো ওই আকাশে থাকে। ওখান থেকে কীভাবে আসবে!”
কথাটা বলার সময় রাফিনের চোখটা ছলছল করছিল। মেহুল ‘থ’ হয়ে গেলো শুনে। ওর মুখটা ফেকাসে হয়ে গেলো। রাফিনের তাহলে ‘মা’ নেই!
সে রাফিনকে টেনে জরিয়ে ধরলো।
এই জন্যই তো তাদের বাড়িতে একবারও ওর মা কে দেখতে পেলো না মেহুল ৷ ইস্ তাহলে এই জন্যই ছেলেটা এতো মন খারাপ করে থাকে সব সময় আর তার সাথেও এতো তারাতারি মিশে গিয়েছে। বাচ্চাটা একদম ভালোবাসার কাঙ্গাল।
এর মধ্যেই নাবিল চলে এলো সাথে খাবার নিয়ে এসেছে সে। এখানের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার গুলো সে নিয়ে এসেছে।
” এই যে খাবার চলে এসেছে। নিন মেহুল এবার খাওয়া শুরু করুন আর বলুন ডেকোরেশনের পাশাপাশি আমার রেস্টুরেন্টের খাবার কেমন লাগলো! ”
” রাফিন বাবার কাছে এসো বাবাই খায়িয়ে দিচ্ছি। ”
” না বাবাই আজ আমি আন্টির হাতে খাবো। ”
” রাফিন আন্টি ও তো খাবে তোমাকে খায়িয়ে দিলে আন্টি কীভাবে খাবে? জিদ করো না এদিকে এসো”
” থাক না ওকে আমিই খায়িয়ে দিবো সাথে নিজেও খাবো আমার সমস্যা হবে না প্লিজ মানা করিয়েন না। আপনিও শুরু করুন। ”
খাবার প্রায় শেষের দিকে। মেহুল নাবিলকে জিজ্ঞেস করবে নাকি করবে না বুঝতে পারছে না। মেহুলকে হাসফাস করতে দেখে নাবিল নিজেই বললো-
” আমাকে কি কিছু বলতে চান মেহুল?”
এবার মেহুল বলা শুরু করলো-
” আসলে আপনি কি মনে করেন তাই জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছে না। ”
” কি জানতে চান নিরদ্বিধায় জিজ্ঞেসা করুন। বলতে পারলে আমি অবশ্যই বলবো।”
” রাফিনের ‘মা’ আসলে ওনার সাথে কি হয়েছিলো!”
রাফিনের মা’য়ের কথা শুনে নাবিলের চেহারা হঠাৎ করে শক্ত হয়ে গেলো৷ তবুও সে বললো-
” ওর মা ওকে জন্ম দিতে গিয়ে মানে ডেলিভারির সময় মারা যায়। তখন থেকেই ওকে আমি আর মা মিলে সামলাচ্ছি। ”
চলবে….?
