পর্ব : ০৪
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখিকা: #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
সেদিনের পর আজ দুই সপ্তাহ পার হয়ে গিয়েছে। মেহুল এর মধ্যে অনেকবার রাফিনের সাথে দেখা করেছে। রাফিনের প্রতি ওর কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গিয়েছে, ছেলেটার মা নেই এটার জন্য হয়তো ওর জন্য মায়া একটু বেশি কাজ করছে।
আবার রাফিন ছিল বলেই তো মেহুল রাফি’র দেওয়া কষ্ট ভুলে থাকতে পেরেছে। যখন মেহুলের সবচেয়ে বড় কষ্টের শুরু হয়েছিল তখনই রাফিন আর নাবিলের সাথে তার পরিচয় হয়। রাফিনের বাচ্চামি আর ভালোবাসাতেই মেহুল নতুন ভাবে হাসতে শিখেছে । এর মধ্যে সাবিহা জাহান এর সাথে ও সম্পর্ক একটু গভীর হয়েছে। মেহুল ও বাড়িতে যাতায়াত করছে আবার মেহুল কোনো দিন না গেলে সাবিহা জাহান আর রাফিন মেহুলের বাসায় চলে আসে তারা আড্ডা দেয়। মেহুলের এই নতুন সম্পর্ক গুলো ভালোই লাগছে। তার দিন হাসিখুশি কাটছে এখন।
মেহুলের রুমমেটের বিয়ে হয়ে গিয়েছে হঠাৎ তাই সে এই বাসা ছেড়ে দিয়েছে। এখন নতুন রুমমেট আসা অব্দি মেহুল একাই থাকছে এখানে।
দুইদিন আগে সাবিহা জাহানের কাছে মেহুল রাফিনের মা’য়ের কথা জিজ্ঞেসা করেছিল নাবিলের মতো তিনিও প্রথমে মুখটা শক্ত করে ছিলেন যেন এ ব্যাপারে কিছু বলতে চান না কিন্তু পরে কি মনে করে যেন বললেন-
” নাবিলের বিয়ের পর ১ মাস পার না হতেই শুনি ওর বউ রিয়া প্রেগন্যান্ট। আমি প্রথম খুশি হয়েছিলাম কিন্তু ওদের সংসার টা কেমন যেন অগোছালো ছিল। নাবিল বিয়ের আগে যেমন খুশি ছিল বিয়ের পর কেন যেন ওকে আমি হাসতে দেখি নি। এমন কি রিয়া প্রেগন্যান্ট যেনেও ওর মধ্যে কোন হেলদোল ছিল না৷ তারপর ওদের বিয়ের আট মাস না হতেই রিয়ার লেবার পেইন উঠে আর রাফিন হয়। রাফিনের জন্মের সময়ই রিয়া মারা যায়৷ এতো তারাতারি বাচ্চা হওয়াটা অস্বাভাবিক লাগলেও রিয়ার চলে যাওয়ায় সব কিছুর অন্ত হয়ে যায় সেখানেই।”
এসব শুনে মেহুল বুঝেছিল এখানে কোন রহস্য অবশ্যই আছে। যা নাবিল আর রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল৷
আজ মেহুলের মা রুমা বেগম আসবে দুইদিনের জন্য ওর কাছে। তিনি ডাক্তার দেখাবেন তাই মেহুলের কাছে থাকবেন। এ কথা সাবিহা জাহান শুনে আবার মেহুল আর ওর মা কে দাওয়াত দিয়েছেন তাদের বাড়িতে। মেহুল এভাবে মা’কে নিয়ে যাবে না কখনোই ওনাদের ওখানে কিন্তু তারপরও সে মানা করে নি। মুখের উপর মানা করা টা অসভ্যতা হয়ে যায়।
**
দরজার শব্দে মেহুল গিয়ে দরজা খুললো।
রুমা বেগম এসেছেন। তিনি এর আগেও এসেছেন এখানে তাই আজও আসতে কোনো সমস্যা হয় নি।
” আসসালামু আলাইকুম মা। কেমন আছো?”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম৷ ভালো আছি রে মা কিন্তু তোর এ অবস্থা কেন! খাস না নাকি কিছু? ”
” শুরু হলো তো তোমার এ সব কথা। আমি ঠিকই আছি মা। ”
” হ্যা তা তো দেখতেই পাচ্ছি। ব্যাপার না দেখ তোর জন্য কি কি এসেছি। দুইদিনেই দেখিস খায়িয়ে তোকে কি থেকে কি বানাই। ”
মেহুল হাসলো মা’য়ের কথা শুনে। রুমা বেগম এমনই সব সময় ওর খাওয়া নিয়ে ওনার আফসোস। মেহুল দেখলো ব্যাগ ভর্তি খাবার রান্না করে নিয়ে এসেছেন তিনি। মায়েরা এমনই হয়, সন্তানকে অনেকদিন পর কাছে পেলে তারা পারেন না কলিজা কেটে খায়িয়ে দিবেন।
মেহুল মায়ের সাথে ভরপুর কথা বললো। এতোদিন পর মাকে কাছে পেয়ে মেহুল অর্ধরাত অব্দি মায়ের কোলে শুয়ে গল্প করেছে । রুমা বেগম গ্রামের সব কথা মেয়েকে বলেছেন৷ মেহুলের একটা ছোট ভাই আছে তাকে নিয়েই বেশি বলেছেন।
পরেরদিন সকালে মেহুল রুমা বেগম কে নিয়ে হাসপাতালে যায়। ওনার কিছু টেস্ট করিয়ে তারা বাসায় ফিরে আসে। রিপোর্ট কাল দিলে তখন ডাক্তার দেখাতে পারবে।
মা মেয়ে যখন রাফিনদের বাড়ি পার হবে তখনই সাবিহা জাহান রিকশা থেকে নামলেন, ওনি বাজার করতে গিয়েছিলেন৷ মেহুলকে দেখেই তাকে আটকালেন।
” আরে মেহুল না!”
” আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”
” ওয়ালাইকুমুস সালাম। মেহুল ওনি ভাবি নাকি?”
” জ্বি আন্টি আমার আম্মু।
” ভালে আছেন ভাবি ।”
” জ্বি আলহামদুলিল্লাহ্। আপনি!”
রুমা বেগম মেয়ের দিকে জিজ্ঞেসাদৃষ্টিতে তাকালে মেহুল বলে-
” মা তোমাকে বলেছিলাম না একটা আন্টির কথা! ওনিই সেই সাবিহা আন্টি। ”
” ও হ্যা এবার বুঝেছি। জ্বি আপা মেহুল তো আপনার কথা আমাকে ফোনে বলেছে। আপনি নাকি ওকে অনেক আদর করেন। ”
” না ভাবি এতো আদর তো করতে পারি না আপনার মেয়ে তো আসে না আমাদের বাড়িতে এতো তাই আমিই চলে যাই। একা বাড়িতে থাকি বয়সও হয়েছে বুঝেনইতো তাই আপনার মেয়েকেই একটু বিরক্ত করি।”
” সমস্যা নেই আপা। এই শহরে মেয়েটা একা থাকে আমার আরো ভয় করে ওকে নিয়ে কিন্তু আপনি খোঁজ খবর রাখেন মেয়েটার এটা শুনে আমি একটু শান্তি পেয়েছিলাম। ”
” ভাবি ভালো হয়েছে আপনার সাথে দেখা হয়ে গিয়েছে। মেহুলকে আমি বলেছিলাম আপনি আসলে আমার বাড়িতে দাওয়াত আপনাদের। এখন আপনাকে পেয়েছি তাই আপনাকেই সরাসরি বলছি আজ রাতে আমাদের বাসায় খাবার খাবেন আপনি আর মেহুল।”
” আচ্ছা আপা দেখি চেষ্টা করে।”
” না ভাবি চেষ্টা না আমি সব আয়োজন করে আপনাদের অপেক্ষায় থাকবো।”
” আচ্ছা আপা এখন আসি তবে। ”
মেহল চায় নি ওনাদের বাসায় যেতে মা কে নিয়ে কিন্তু এভাবে সাবিহার সাথে দেখা আর তিনি যেভাবে মা কে বললো এবার মনে হচ্ছে না চাইতেও যেতে হবে। প্রথম পরিচয়ে তাদের দুইজনের কথাবার্তা শুনে মেহুলের মনে হচ্ছে তারা যেন কতোদিনের পরিচিত।
***
রাতে মেহুল আর রুমা বেগম গেলেন রাফিনদের বাড়িতে৷
সাবিহা জাহান এলাহি কান্ডে করেছেন। নানা পদ রান্না করেছেন তাদের জন্য। তারা যেতেই সাবিহা আর রুমা বেগম দুইজন বান্ধবীর মতো আড্ডা দেওয়া শুরু করে দিলেন। মেহুল এসেছে কিন্তু রাফিন তার কাছে আসে নি ব্যাপার টা মেহুলের খটকা লাগলো তাই তো সাবিহা কে বললো-
“আন্টি আজ আমি আসলাম আর রাফিন আমার কাছে আসলো না বুঝলাম না তো। ও কি বাসায় নেই?”
” আরে মা ও তো তুমি রাতে আসবে বলে লাফাচ্ছিলো পরে বিকেলে সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা’য়ে ব্যথা পেয়েছে। তাই ঘরে শুয়ে আছে। ”
” আল্লাহ আন্টি আগে বলবেন না। বেশি ব্যথা পেয়েছে নাকি! এখন কেমন আছে?
মেহুলের এতো অস্থিরতা দেখে মুচকি হাসলেন তিনি। বললেন-
” না বেশি ব্যথা পায় নি হাঁটুতে একটু ছুলে গেছে কান্না করেছে অনেক।”
” ইস্ আমি যাই ওর কাছে আন্টি দেখা করে আসি।”
মেহুল উঠে রাফিনের ঘরের দিকে যেতে নিলে সাবিহা পিছন থেকে আবারও বললেন-
” মেহুল ও নাবিলের ঘরে শুয়ে আছে ওখানেই যাও। ”
” জ্বি ঠিক আছে আন্টি।”
মেহুল রাফিনের ঘরে আরেকদিন গিয়েছিল কিন্তু নাবিলের ঘরে কখনো যায় নি। রাফিনের সাথের ঘরই নাবিলের এটা রাফিন তাকে বলেছিল তাই সে চিনে।
নাবিলের রুমের সামনে এসে মেহুল দরজায় নক করলো। নাবিল এ সময় বাসায় থাকে না, সে মূলত সারাদিন বাসায় থাকে আর সন্ধ্যার পরে রেস্টুরেন্টে যায়৷ ঢাকা শহরে রাতেই কাস্টমার বেশি হয়। তাই সে রাতে গিয়ে সারাদিনের হিসাব করে আর অনেক রাত করে বাসায় আসে। তাই মেহুল সিউর এখন নাবিল থাকবে না ঘরে তবুও সে নক করলো যদি বাই চান্স আজ সে বাড়িতেই থাকে।
কিছুক্ষণ বাইরে থেকে যখন দেখলো কোন সারা শব্দ নেই ভিতর থেকে তখন মেহুল ঘরে প্রবেশ করলো।
রাফিন বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছে। হাঁটুতে ছুলে গেছে সেখানে ঔষধ লাগানো।
মেহুল বিছানায় গিয়ে রাফিনের মাথার কাছে বসলো তারপর রাফিনের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। ইস্ বাচ্চা টা ব্যথা পেয়ে কান্না করে ঘুমিয়ে পড়েছে।
নাবিল বাথরুম থেকে ঘরে এসে দেখলো মেহুল রাফিনের চুলে হাত ভোলাচ্ছে। নাবিলের দৃশ্য টা দেখে কি হলো কে জানে তার ভিতর টা নাড়িয়ে দিলো।
অন্যদিকে নাবিলকে দেখে মেহুল ভুত দেখার মতো চমকে গেলো।
“আপনি!”
” জ্বি! ”
” না মানে এ সময় তো আপনি বাসায় থাকেন না তাই আমি ভেবেছিলাম আপনি আজও থাকবেন না। ”
কথাটা বলেই মেহুল বেআক্কেলের মতো হাসতে লাগলো। নাবিল মুচকি হেসে বললো-
” জ্বি আমি এ সময় বাসায় থাকি না। রাফিন পায়ে ব্যথা পেয়েছে আর মা ও বললো আজ আপনারা আসবেন তাই আর বাসায় গেস্ট রেখে বাইরে যাই নি। ”
” ওহ্ ”
” মেহুল”
খুবই নরম ভাবে ডাকলো নাবিল। মেহুল নাবিলের চোখের দিকে তাকালো।
” আসুন বারান্দায় দাড়াই আকাশ টা আজ খুব সুন্দর আর সাথে আমার গাছগুলোও একটু দেখে যান ”
গাছের কথা শুনে মেহুল নাবিলের কথায় সায় জানিয়ে বারান্দার দিকে আগালো। নাবিলের বারান্দায় অনেক ফুলের গাছ আছে। মেহুলের এক ঝলকেই পছন্দ হয়ে গেলো এই বারান্দা টা।
” মাশাআল্লাহ এতো রকমের ফুলের গাছ!”
” হ্যা আমার শখ বাগান করা তাই এ সবগুলো গাছই শখের জিনিস আমার। ”
মুচকি হেঁসে মেহুল ফুল গাছ গুলো ছুঁয়ে দেখতে লাগলো।
” মেহুল্! ”
আবারও সেই মোহনিয়া ডাক। মেহুল উঠে দাড়ালো।
” জ্বি”
” কেমন আছেন মেহুল?”
কথাটায় কি ছিল মেহুল জানে না কিন্তু তার বুকটা কেঁপে উঠলো।
সে আসলে কেমন আছে? সে নিজেই তো জানে না। অনেকদিন কেউ এভাবে জিজ্ঞেস করে না সে কেমন আছে।
” ভালো আছি আমিহ্”
” নিজেকে একটু ভালোবাসুন মেহুল। আপনি ছাড়া আপনার কেউ নেই তাই জীবনে যতোই দুঃখ আসুক নিজেকে ভালো রাখুন। নিজেকে ভালোবাসতে জানলেই আপনি সুখী হতে পারবেন। ”
চলবে….?
