পর্ব : ০৯
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখিকা: #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
আবারও বাসর ঘরে বসে আসে মেহুল। কিন্তু এবার আর ওই রুখাশুখা নয় বরং
ফুলে ফুলে সাজানো বাসর ঘরে। সাবিহা তখন ওকে খায়িয়ে তারপর সুন্দর একটা মেরুন রঙের শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন। সবশেষে তাকে নাবিলের ঘরে নিয়ে এসে বসিয়ে রেখে গিয়েছেন।
মেহুল কে রাফিনের ঘরে বসিয়ে রেখেই কাকে কাকে দিয়ে যেনো সাবিহা এই ঘর টা সাজিয়েছেন৷
নাবিল ফুল দিয়ে আবার একটু বাইরে গিয়েছিলো৷ দুইদিন ছিল না সে তাই তার রেস্টুরেন্টের কি অবস্থা সেটাই দেখতে গিয়েছিলো সে। তারপর সব কাজ শেষ করে বাসায় এসে রাফিনের ঘর থেকে গোসল করে তারপর নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো নাবিল।
আজ আর কোনো মন কষাকষি না করে দরজায় দুটো টোকা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো সে।
মেহুল বিছানায় বসে ছিল নাবিলও গিয়ে তার সামনে বসলো।
” ঠিক আছেন মেহুল? কোন সমস্যা হয় নি তো কোনো কিছুতে!”
” জ্বি ঠিক আছি আমি।”
একটু চুপ থেকে নাবিল আবারও বললো-
“মেহুল আপনার হাত টা একটু দিন তো।”
মেহুল অবাক হলো। অবাকের রেশ ধরেই নিজের হাত টা বাড়িয়ে দিলো নাবিলের সামনে। নাবিল ওর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা বক্স বের করলো৷ মেহুল দেখলো সেখানে অনেক সুন্দর একটা রিং আছে। নাবিল অনেক যত্ন করে রিং টা ওর হাতে পড়িয়ে দিলো। তারপর মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললো –
” পছন্দ হয়েছে মেহুল?”
“হ্যা এটা অনেক সুন্দর। খুব পছন্দ হয়েছে ”
” আসলে বাসর রাত নিয়ে আপনি কেমন সপ্ন দেখেছেন সেটা আমি জানি না৷ তবুও যেটুকু পারা যার করার চেষ্টা করলাম আর সব সময় করবো। আপনার যা’ই দরকার হয় আপনি আমাকে জানাবেন। ”
নাবিলের কথায় মেহুল মাথা নাড়ালো।
” আসলে মেহুল আমাদের বিয়েটা এমন ভাবে হলো আমি জানি আপনার মানিয়ে নিতে সময় লাগবে। আমি আপনাকে যথেষ্ট সময় দিতে রাজি আছি। আপনার কোন কিছুতে আমি কখনো বাঁধা দিবো না পারলে আরো সাহায্য করবো। ”
মেহুল কিছু বললো না নাবিলের কথা শুধু শুনলো। মেহুলকে চুপ থাকতে দেখে নাবিলও আর কথা বাড়ালো না।
” রাত অনেক হয়েছে আপনিও ক্লান্ত অনেক। শুয়ে পরুন। ”
মেহুল পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো৷ মেহুল শুতেই নাবিল বারান্দায় গেলো। সে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের সাথেই কথা বললো।
—
সকালে মেহুলের আগে ঘুৃম ভাঙলো। সে উঠে দেখলো সে নাবিলের একদম কাছাকাছি শুয়ে আছে । নাবিলের জায়গায় চলে এসে সে নাবিলকে জরিয়ে ধরে শুয়েছিল, তার এক পা এখনও নাবিলের শরীরের উপরে আছে। নিজের এসব কান্ড দেখে তো মেহুলের লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেলো।
ইস নাবিল যদি তার আগে সজাগ পেয়ে তাকে এই অবস্থায় দেখতো তাহলে কি লজ্জাতে-ই না তাকে পড়তে হতো। ও তারাতারি নাবিলের থেকে সরে গেলো।
মেহুল উঠে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বাইরে চলে গেলো। সে রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো সাবিহা আগে থেকেই রান্না করছিলেন। তিনি মেহুলকে দেখে খুশি হলেন।
” আরে মেহুল উঠে গিয়েছো দেখছি। ”
” জ্বি মা।”
” এতো তারাতারি উঠতে গেলে কেন। আরো পরে উঠতে। ”
“সমস্যা নেই, দিন আমার কাছে আমি বাজি টা করছি।”
” না তোমাকে এখন আর কিছু করতে হবে না। শুধু কষ্ট করে একটু রাফিন কে উঠিয়ে দেও আর নাবিলকে ও। নাস্তা হয়ে গেছে গরম গরম না খেলে আবার পরে খেতে ভালো লাগবে না।”
মেহুল মাথা নাড়িয়ে রাফিনের কাছে গেলো। ঘরে গিয়ে দেখলো রাফিন ঘুমাচ্ছে। রাফিনকে ডাক দিলো কিন্তু রাফিন উঠলো না। ছেলেটাকে এতো সুন্দর করে ঘুমাতে দেখে মেহুল আর ডাক দিলো না । সে ভাবলো ছেলেটা আরেকটু ঘুমাক তাই সে নাবিল কে ডাক দিতে গেলো।
নাবিল ঘুম থেকে উঠে দেখলো পাশে মেহুল নেই এমনকি ঘরেই ও নেই। সে হামি দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে বসলো। এমন সময়ই মেহুল ঘরে এলো।
মেহুল ঘরে এসে দেখলো নাবিল উঠে গিয়েছে।
” ওহ উঠে পরেছেন দেখছি। তারাতারি ফ্রেশ হয়ে নিন নাস্তা তৈরি হয়ে গেছে।”
” হ্যা যাচ্ছি ”
মেহুল নিজের ফোনের চার্জার টা নেওয়ার জন্য নাবিলের সামনের সাইট টেবিলের দিকে আগালো কিন্তু নিজের শাড়ির সাথে পা বেঁধে ব্যালেন্স হারিয়ে সোজা নাবিলের উপর গিয়ে পড়লো। এতে মেহুলের শ্বাস নাবিলের বুকে আছরে পরতে থাকলো।
মেহুলকে নিজের এতো কাছাকাছি দেখে নাবিলের গলা শুকিয়ে গেলো। মেহুলও লজ্জায় পরে গেলো। সে তারাতারি নাবিলের উপর থেকে উঠে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
নাবিলও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হতে গেলো। এভাবে যদি বার বার মেয়েটা তার কাছে আছে তাহলে সে নিজেকে সামলাবে কিভাবে!
—-
সকালে সবাই একসাথে গল্প করে নাস্তা করলো। আজ রাফিনকে মেহুল খায়িয়ে দিচ্ছিলো তাই রাফিন কোন দুষ্টুমি না করে ভদ্র বাচ্চার মতো খাচ্ছিলো৷
খাওয়া শেষে মেহুল নিজের বাড়িতে মা-বাবা,ভাইয়ের সাথে কথা বলেছে। সাবিহার সাথে দুপুরের রান্নায় সাহায্য করেছে আর বাকি সময় রাফিনের সাথে কাটিয়েছে৷ এ বাড়িতে মেহুলের ভাবনার চেয়েও ভালো সময় কাটছে তার।
নাবিল সারা দিন বাসায়ই ছিল তাই নাবিলের সাথেও টুকটাক কথা হয়েছে।
—
এভাবেই কিছুদিন কেটে গেলো৷ মেহুল এর মধ্যে ভার্সিটি যায় নি৷ কোন ফ্রেন্ড এর সাথে কথাও বলে নি। সে এই নতুন পরিবার টাকে নিজের সম্পূর্ণ সময় দিচ্ছিলো নিজের সংসার টা গুছিয়ে নিচ্ছিলো।
জানুয়ারি মাস চলে এসেছে। রাফিনকে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় চলে এসেছে। তাই সকাল সকাল মেহুল আর নাবিল গেলো রাফিনকে ভর্তি করাতে। রাফিন প্রচুর খুশি এ নিয়ে, তার পড়ালেখা ভালো লাগে আবার মেহুলও তাকে অনেক গল্প বলে স্কুল নিয়ে তাই সে এতো বেশি এক্সাইটেড ।
স্কুল বাসা থেকে কাছেই নাবিল নয়তো মেহুল ওকে প্রতিদিন নিয়ে আসবে৷ ভর্তি হতে হতে এগারোটা বেজে গেছে। মেহুল সকালে বেশি কিছু খায় নি সেটা নাবিলের খেয়ালে ছিল তাই সে বললো-
” মেহুল চলো সামনের ওই ক্যাফে তে কিছুক্ষন বসে হালকা নাস্তা করে তারপর বাসায় ফিরি। ”
এ কয় দিনে নাবিল মেহুলের সম্পর্কও ভালো হয়েছে। নাবিল মেহুলকে তুমি করে বলে এখন। মেহুল অবশ্য আপনিই বলে। ওর নাকি ওটাই ভালো লাগে। নাবিলের কথায় মেহুল মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। ওর ও ক্ষুধা লাগছিল একটু একটু৷
ক্যাফে তে গিয়ে হাল্কা নাস্তা আর গল্প করছিলো মেহুল আর নাবিল। ক্যাফেটা সুন্দর বলে রাফিন দৌড়ে এদিন ওদিক গিয়ে খেলা করছিলো। তাদের খাওয়া হলে নাবিল গেলো বিল দিতে। মেহুল রাফিনকে ডাকতেই সে চলে এলো তার কাছে তারপর তারা যখন বের হয়ে যাবে তখন রাফিন মেহুলের হাত ছেড়ে দৌড়ে কাউন্টারে নাবিলের কাছে যাওয়ার জন্য দৌড় দিলো এতে মেহুল জোর বললো-
” রাফিনন…..!”
মেহুলের মুখ থেকে রাফিন ডাকটা শুনে সামনের টেবিল থেকে রাফি হঠাৎ পিছনে ফিরলো তারপরই সে মেহুলকে দেখে অবাক হয়ে গেলো।
মেহুল আর রাফি দু’জনেই দুইজনকে দেখে অবাক হয়ে তাকালো। বিস্মিত হয়ে রাফি মেহুলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো-
” তুমি এখানে!”
রাফির বিস্মিত হওয়া চেহারা দেখে মেহুল মুচকি হাসি দিয়ে বললো-
” আমাকে দেখে এতো অবাক হচ্ছেন কেন মি: ? ”
” তুমি এখানে কিভাবে! ”
” কেন এই ক্যাফে টা কি আপনার যে আমি এখানে আসতে পারবো না?”
এতোকিছুর পরও মেহুলকে এতো আত্মবিশ্বাসী দেখে রাফি’র মাথা নষ্ট হয়ে গেলো। বিয়ে ভাঙ্গার পরও এতো তেজ।
” বাহ বিয়ে ভাঙ্গার পরও তেজ দেখি কমে নি তোমার।”
“কেন আমার কি নিজের বাড়িতে মুখ লুকিয়ে বসে থাকার কথা ছিল?”
মেহুলের এতো হেঁয়ালি রাফি’র সহ্য হলো না তাই সে এবার তুই-তুকারি শুরু করলো।
” তোর এই অহংকারের জন্যই না তোর বিয়ে ভেঙ্গেছে তারপরও তোর শিক্ষা হয় নাই না? আমি তো ভেবেছিলাম এতো অপনানের পর এই মুখ আর কাউকে দেখানোর সাহস করবি না। ”
মেহুল শব্দ করে হেসে ফেললো এমন কথা শুনে।
” তোর নোংরামির জন্য আমি কেন আমার জীবন নষ্ট করবো রাফি! তুই কু’*
বলে কি আমিও ওটা হবো নাকি! তুই আমার এতোবড় ক্ষতি করার পরও তোকে আমি কিছু বলিনি কেন জানিস! কারণ আমিও যদি কিছু করতাম তাহলে তোর আর আমার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকতো না। তুই যতোই আমাকে ভাঙতে চেষ্টা করিস না কেন আমি ভাঙ্গবো না বরং নতুন করে নিজেকে সাজাবো। ”
” এসব কথা অন্য কাউকে বলিস। নিজেকে সাজাবে হ্যাহ্ তুই ভার্সিটি যাস না লজ্জায় সেটা আমি জানি৷ এখন আমার সামনে কুল সাজচ্ছিস। ”
নাবিল বিল দেওয়ার পর দেখলো মেহুল কারো সাথে কথা বলছে। নাবিল ভাবলো ওর কোন ফ্রেন্ড বুঝি তাই আর তাঁদের কথার মধ্যে না গিয়ে দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল সে। কিন্তু যখন দেখলো ছেলেটা মেহুলকে তুই করে চিল্লিয়ে বাজে কথা বলছে তখন সে এগিয়ে গেলো।
মেহুল রাফির কথার জবাবে কিছু বলবে এর মধ্যেই নাবিল এসে তার পাশে দাঁড়ালো।
” কিছু হয়েছে মেহুল! ”
” এই নমুনা আবার কে। তোর নতুন নাগর নাকি?”
নাবিল এতোক্ষণে রাফি’র দিকে তাকালো আর তাকাতেই চিনতে পারলো। মেহুলের বিয়ে যেই ছবির কারণে ভেঙেছে সেই ছবির ছেলেটাই এখন সামনে দাড়িয়ে আছে। রাফিকে দেখে নাবিলের মুখ শক্ত হয়ে গেলো। গম্ভীর কণ্ঠে সে রাফি কে বললো-
” মুখ সামলিয়ে কথা বলুন মি: । আমার স্ত্রী’র সাথে এভাবে কথা বলার আপনি কে হন ?”
” স্ত্রী? ‘” ” আহ বলে কি! ওই মেহুল বিয়ে ভাঙ্গার শোকে কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি তুই। নতুন নাগর জুটিয়ে ফেলেছিল এর মধ্যে ওফ হ্যা সাথে দেখি একটা বাচ্চা ও আছে৷ কিরে বিবাহিত মাল হাত করেছিস দে… ”
কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে রাফির গালে থাপ্পড় মারলো মেহুল৷ রাফি রাগে কিছু বলবে তার আগে আরেকটা থাপ্পড় দিলো ও।
“তুই আবারও আমাকে থাপ্পড় দিলি ”
কথাটা বলে রাফি মেহুলের দিকে হাত বাড়ালো কিন্তু পারলো না কারণ নাবিল ওর হাত ধরে ফেললো। নাবিল এতো জোরে মুচড়িয়ে হাতটা ধরলো যে রাফি ব্যাথায় কুকরিয়ে উঠলো।
” ম্যানেজার ম্যানেজার….
ক্যাফের স্টাফ রা এতোক্ষণ ওদেরই দেখছিল। নাবিলের ডাকে ম্যানেজার দৌড়ে আসলো।
” জ্বি স্যার ”
” এসব ময়লা-আবর্জনা আপনাদের ক্যাফেতে আসে কিভাবে? একে বের করুন এখনই নয়তো পুলিশকে কল দিতে বাধ্য হবো।
পুলিশের কথা শুনে ম্যানেজার একটু ভয় পেলেন। স্টাফদের ইশারা করলে তারা মিলে রাফিকে বের হয়ে যেতে বললো।
রাফি চিল্লাচিল্লি করতে করতে বের হয়ে গেলো।
মেহুল এতোসব কিছুতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল৷ রাফি বের হয়ে গেলে নাবিল মেহুলের হাত টা শক্ত করে ধরলো। মেহুল মাথা উঠিয়ে নাবিলের দিকে তাকালে নাবিল তাকে চোখের ইশারায় আস্বস্থ করলো তারপর হাত ধরেই ওকে নিয়ে ওখান থেকে বের হয়ে এলো।
চলবে…!
