পর্ব -২
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখনিতে : #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
রাফিকে নিয়ে মেহুল নিজের বাসায় আসলো। রাফি খুবই চঞ্চল ছেলে। রাফিকে সোফায় বসিয়ে মেহুল রান্নাঘরে ঢুকলো। প্যাকেটে কি কি আছে সেটা বের করতে লাগলো। দু’প্যাকেট বিরিয়ানির প্যাকেট আর চিপস,জুস ছিলো সাথে মেহুলকে আরো চমকে দিলো আরেকটা জিনিস,
একটা ব্যথার মলম সাথে একটা চিঠি।
মেহুল চিঠি টা খুললো –
” মিস কাল আমার ছেলের জন্য আপনি পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলেন৷ কোন সাহায্য তো নিতে চান নি তাই একটু জোড় করেই অধিকার ফলিয়ে ঔষধ টা পাঠালাম। ব্যথা পাওয়ার সাথে সাথে মলম না লাগালে সেটার দাগ সারাজীবন থেকে যায় তাই ব্যথা লাগলে সেটার কষ্ট সহ্য না করে মলম লাগান। নিজেকে ভালোবাসুন।”
মেহুল ‘থ’ হয়ে গেলো চিঠিটা পড়ে। লোকটা অনেক গভীর কথা বলে। কথাগুলো লোকটা এমনি বললে ও কীভাবে যেন মেহুলের এখনের পরিস্থিতির সাথে মিলে গেলো।
মেহুল আর কিছু না ভেবে বিরিয়ানি নিয়ে রাফির কাছে গেলো। রাফি বাচ্চা ছেলে ৪-৫ বছর হবে তার৷ বিরিয়ানি ঠিক ভাবে খেতে পারছিল না ছেলেটা তাই মেহুল ওকে অনেক যত্ন নিয়ে খায়িয়ে দিলো। খাওয়া শেষ হলে মেহুল রাফির সাথে খেলতে শুরু করলো।
**
“কিরে নাবিল তুই রাফিনকে কার সাথে যেতে দিলি বল তো। ১২ টা বাজবে এখনও কোন খবর নেই ছেলের। ”
“আহ মা চিন্তা করো না তোহ্। ওনি আসলাম চাচাদের বাসার বড়াটিয়া। আমি খোঁজ খবর নিয়েই ছেলেকে যেতে দিয়েছি। ”
“হ্যা উদ্ধার করেছো তো যার তার সাথে ছেলেকে খেলতে পাঠিয়ে দেও। এজন্যই রাফিনটা এতো বদমাশ হচ্ছে দিন দিন। ”
আরো কথা বলতে বলতে রান্নাঘরের দিকে গেলেন সাবিহা জাহান। রাফির দাদি হন তিনি। এতসব শুনবার সময় নেই নাবিলের তার অনেক কাজ বাকি। নাবিল জানে মেহুল ভালো মেয়ে কালই খোঁজ নিয়েছিলো সে। তাই নিশ্চিন্তমনে কাজ করতে থাকলো ও।
***
মেহুল রাফিনের সাথে এতোটাই ডুবে ছিল যে সকাল থেকে কখন দুপুর হয়ে গেলো কেউ খেয়ালই করলো না৷ যখন ১২ টার উপরে বেজে গেলো তখন মেহুল টাইম খেয়াল করলো।
“হায় আল্লাহ! রাফিন ১২ টার উপরে বেজে গেছে তোমার বাবা তো এতোক্ষণে আমাকে ছেলে পাচারকারী ভেবে নিয়েছে মনে হয়।”
মেহুলের কথা শুনে রাফিন হাসতে লাগলো যেন মজার কোন কথা শুনেছে সে।
“নোপ আন্টি আমার বাবা অনেক ভালো।”
” আচ্ছা এখন চলো বাবা তোমাকে দিয়ে আসি। ”
” তোমার সাথে অনেক মজা লাগছিল আন্টি। বিকালে তুমি আমার সাথে আবার খেলবে তো?”
মন খারাপ করে কথাটা বললো ছেলেটা। মেহুলের নিজেরও এতোক্ষণ ভালো লাগছিল৷ বাচ্চাটার সঙ্গ ছিল বলে রাফি’র কথাও প্রায় ভুলে ছিল সে এতোক্ষণ।
” ঠিক আছে বাবা তুমি এখন বাসায় গিয়ে ভদ্র বাচ্চার মতো বড়দের সব কথা শুনো। বিকালে আবার সামনের ওই মাঠ টায় দেখা করবো তোমার সাথে আর আইসক্রিম খাবো দু’জনে ঠিক আছে?”
হ্যা-বোধক মাথা নাড়ালো রাফিন তার চোখমুখে যেন খুশি উপচে পড়ছে মেহুলের কথা শুনে। মেহুল ওকে নিয়ে ওদের বাসার দিকে রওনা দিলো।
দুইবার কলিংবেল বাজালে সাবিহা এসে দরজা খুললেন। বাইরে অচেনা একটা মেয়ের সাথে নাতি কে দেখে অবাক হলে ওনি। ওনিতো ভেবেছিলেন নাবিলের পরিচিত সেই ব্যাচালার ছেলেগুলোর হাতে বুঝি রাফিনকে আবারও দিয়ে এসেছে তাই তো এতো রাগ ঝাড়ছিলেন তিনি। কিন্তু একটা মেয়েকে দেখে অবাকই হলেন।
” আসসালামু আলাইকুম আন্টি। আমি মেহুল। রাফিন এতোক্ষণ আমার সাথেই ছিল। ”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম। আসো ভিতরে আসো।”
ওদের কথার মাঝে রাফিন ভিতরে চলে গেলো।
” না আন্টি আজ আর না। আমি অনেক দুঃখীত এতক্ষণ রাফিনকে সাথে রেখেছি। আসলে ওর সাথে খেলতে খেলতে সময় কখন চলে গিয়েছে বুঝতে পারি নি। প্লিজ মাফ করে দিয়েন। আজ আসি তবে আন্টি, আসসালামু আলাইকুম। ”
সাবিহা জাহানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মেহুল এক নাগারে কথাগুলো বলে চলে আসলো। মূলত সে পালিয়ে আসলো। একদিনের পরিচয়ে একটা ছেলেকে এতোক্ষণ নিজের কাছে রাখার কারণে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল ওর সাবিহার জাহানের সামনে। না জানি রাফিনের মা ওকে কি ভাবলো। এসব ভেবেই আরো পালালো মেয়েটা।
সাবিহা জাহান এতোক্ষণ রেগে ছিলেন রাফিন কার না কার সাথে আছে ভেবে কিন্তু মেহুলের কথা আর ব্যবহার দেখে ওনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ওনার সব রাগ পরে গেলো।
***
মেহুল দুপুরে গোসল করে নাবিলের দেওয়া মলম টা হাতে লাগালো৷ আসলেই অনেকখানি ছুলে গিয়েছিল, দাগ পড়ে যাচ্ছিলো৷ মেহুল হাতে ফোনটা নিয়ে রাফির আইডিতে ঢুকলো, রাফি পিক গুলো দিয়ে ওকে মেসেঞ্জারে ব্লক করে দিয়েছে ৷ যেখানে ও রাফিকে ব্লক করবে সব কিছু শেষ করবে সেখানে কি না রাফিই এসব করছে।
মেহুল তাচ্ছিল্য হাসলো। জীবনে ও কাকে বিশ্বাস করবে আর। মেহুল ভাববে না আর এসব ঠিক করেছিল কিন্তু সব কিছু তো এতো সহজ না। না চাইতেও ভাবনাগুলো চলে আসে । কতো সুন্দর সময় ছিল তাদের। রাফি কতো ভালোবাসতো ওকে। একদিন ওকে না দেখলে ছেলেটা পাগলের মতো আচরণ করতো।
মেহুল আগে ভার্সিটির হোস্টেলে থাকতো সেখানে রাফি অনেক পাগলামি করেছে তার জন্য। হোস্টেলের বাইরে দাড়িয়ে থাকতো ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু মেহুলকে একটু দেখার জন্য। হোস্টেলের সিনিয়র, জুনিয়ররা সবাই ওদের এক নামে চিনতো৷ ওর রুমমেট রা তো ওকে নিয়ে জেলাস ও হতো। কতোটাই না সোনালী দিন ছিল ওদের। প্রেমের শুরুতে বুঝি সব কিছুই এতো রঙিন-ই হয়! তারপর আস্তে আস্তে সব রং ফিকে হয়ে যায়৷ তাই তো আগের রাফির সাথে এখনকার রাফির কেন মিল নেই। মানুষ আসলেই পরিবর্তনশীল।
মেহুল দুপুরে দুঃখ বিলাস করতে করতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। উঠেছে একবারে মাগরিবের আজান শুনে। সে এতো ঘুমকাতুরে কখনোই ছিল না কিন্তু আজ দুইদিন ধরে ওর শুধু ঘুম পাচ্ছে। মেহুলের মন খারাপ থাকলে ওর খালি ঘুম পায় এটা ছোট সময় থেকেই একটা অভ্যাস ওর। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে ভেবে মেহুল একটু কষ্ট পেলে। দুপুরে রাফিনকে ওয়াদা করেছিল বিকালে দেখা করবে, আইসক্রিম খাবে বলে। কিন্তু প্রমিস টা রাখতে পারলো না। না জানি ছেলেটা মন খারাপ করেছে ওর সাথে। তারপর আবার ভাবলো কাল ছেলেটাকে সারপ্রাইজ দিয়ে সরি বলবে এটা ভেবেই মেহুল আজকের মতো মনকে বুঝ দিলো।
অন্য দিকে রাফিন বিকালে নাবিলের কাছে কান্না করেছে মেহুলের কাছে যাবে বলে। নাবিল বাধ্য হয়ে পরে রাফিনকে নিয়ে বের হয়েছে। মেহুলকে মাঠে খুঁজলো দু’জন না পেয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলো তারপর রাফিনের জোড়াজুড়িতে মেহুলের বাড়ি অব্দি গিয়েছে রাফিনকে নিয়ে নাবিল। কিন্তু মেহুল অসুস্থ ভেবে তাকে আর ডিস্টার্ব করে নি নাবিল। রাফি কান্না করেছে অনেক সে দেখা করবেই মেহুলের সাথে বাধ্য হয়ে নাবিল বকে ছেলেকে ঘরে এনেছে। নাবিল ভাবছে একদিনেই ছেলেটা এতো পাগল হয়ে গেলে মেয়েটার জন্য।
***
পরেনদিন সকালে মেহুল ভার্সিটিতে গেলো। মেহুলকে ক্লাসে ঢুকতে দেখে সিনহা দৌড়ে এসে ওর পাশে বসলো।
“দোস্ত তুই ঠিক আছিস!”
” হ্যা কেন! আমার আবার কি হবে।”
মেহুলকে এতো স্বাভাবিক দেখে অবাক হলো সিনহা। সে ভেবেছিলো মেহুল হয়তো অনেক ভেঙে পড়েছে।
” রাফির ব্যাপার টা আমরা জানি দোস্ত তাই নিজেকে শক্ত দেখানোর নাটক করিস না প্লিজ। ”
“মানে?”
“হ্যা ক্লাসের প্রায় সবাই জানে তোদের ব্রেক-আপ হয়ে গিয়েছে।”
মেহুল কিছুই বুঝতে পারছে না। ওদের ব্যাপার সবাই জানলো কীভাবে। মেহুলকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে সিনহা নিজেই আবার বলা শুরু করলো-
” তুই তো কাল আসিস নি৷ রাফি কাল ওদের ব্যাচের ওই চিপকু মেয়েটা আছে না ফারিয়া! ওর সাথে ডেটে গিয়েছিল। ওরা নাকি লাইব্রেরী তে লিপ কিস্ করছিল তখন ধরা খেয়েছে। তারপরই তো বের হলো তোদের নাকি ব্রেকআপ হয়েগিয়েছে তাই রাফি এখন ফারিয়ার সাথে আছে৷ তখনই আমরা বুঝেছিলাম তুই কেন ভার্সিটি আসছিস না।”
রাফির উপর ঘৃণা আরো বেড়ে গেলো মেহুলের। এতো ভালো জানতো রাফিকে আর সে কিনা এতোটা নিচে নেমে গিয়েছে যে ভার্সিটিতে এসব শুরু করে দিয়েছে। আসলেই কি সে ভালো ছিল নাকি মেহুলকে ভোগ করার জন্য নাটক করেছিল এতোদিন, কে জানে!
মেহুলকে চুপ থাকতে দেখে সিনহা আবার বললো-
” দোস্ত তুই কষ্ট পাস না রাফি কু*ত্তা টার জন্য। ও তোর যোগ্য-ই না। ও একদিন ঠিকই বুঝবে দেখিস।
কি ছেড়ে কি ধরেছে ছিঃ ”
মাথার মধ্যে চাপ নিয়েই ক্লাস শেষ করলো মেহুল। দুইটা ক্লাসই ছিল আজ৷
সব শেষে মেহুল ভার্সিটি থেকে বের হবে এমন সময়ই ওর মনে হলো ভার্সিটির বাগানের জবা ফুলের গাছ থেকে কয়টা জবা ফুল নিয়ে গিয়ে রাফিনকে দিবে সে। রাফিন কাল কথায়-কথায় বলেছিল ওর জবা ফুল অনেক পছন্দ। এটা নিয়ে গিয়ে ছেলেটাকে সারপ্রাইজ দিলে মন্দ হয় না। তাই মেহুল ভার্সিটির পেছনের দিকে বাগানে গেলো। ফুল ছিড়ে যখন ফিরে আসবে তখনই ওর সামনে রাফি আর ফারিয়া এসে দাঁড়ালো।
রাফি শয়তানি হাসি হাসছে মেহুলকে দেখে। ওদের দেখে মেহুলের মাথায় রাগ উঠে গেলো। তবুও সে কোন ঝামেলা না করে নিজেকে সামলিয়ে চুপচাপ তাদের পাশকাটিয়ে চলে আসতে নিলো তখন আবারও রাফি এসে পথ আটকিয়ে দাঁড়ালো।
” কি জান কেমন দিলাম সারপ্রাইজ টা। এখন বুঝো কি রত্ন হারিয়েছো অবহেলা করে।”..
” আরে ওকে কি বলছো রাফি। ওর তো ক্লাসই লো। ও যে তোমার সাথে এতোদিন থাকতে পেরেছে এটাই তো ওর ভাগ্য।”
” বলেছিলাম না আমার কথায় রাজি হও কিন্তু হলে না। তুমি তো ভেবেছিলা তুমি ছাড়া আমার কোন উপায় থাকবে না আমার। দেখেছো তো নিশ্চয়ই ভাত ছিটালে কাকের যে অভাব হয় না! নিজেকে এতো চরিত্রবান বানিয়ে লাভ টা কি হলো! সেই তো ভালোবাসা হারালা।”
এবার আর রাগটা কন্ট্রোল করলো না মেহুল। শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে থাপ্পড় দিলো রাফি’র গালে। ফারিয়া এতে অবাক হয়ে গেলে।
” ইউ….. এতো বড় সাহস তো…
“চুপ ফারিয়া আমাদের মধ্যে আসবে না নাইলে এর ফল ভালো হবে না।”
ফারিয়া কে চুপ করিয়ে আবার রাফির দিকে তাকিয়ে বললো-
” তুই কি ভেবেছিস রাফি তোর এসব কান্ড দেখে কান্না করে মরবো আমি? তোর উপর আসলে করুনা হয় আমার। এতোটা নিচে মানুষ নামতে পারে তোকে না দেখলে জানতাম না।”
” তোর এতো বড় সাহস তুই আমাকে থাপ্পড় দিস। তোকে তো….!
থাপ্পড় খেয়ে রাফিও রেগে গেলো। সে উল্টে মেহুলকে থাপ্পড় মারতে চাইলো কিন্তু পারলো না। মেহুল ওর হাতটা ধরে ফেললো।
” খবরদার রাফি এই সাহস দেখাবি না৷ আমাকে দুর্বল ভাববি না একদম। আমার সাথে এতোদিন রিলেশনে থেকে এতটুকু তে বুঝেই গিয়েছিস আমি রাগ’লে কতোটুকু ভয়ংকর হতে পারি।
হ্যা ঠিকই বলেছিস তুই ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না। তুই ওই ভাড়া করা বস্তুা পঁচা মেয়েদের ঠিকই পাবি চাহিদা পূরণের জন্য কিন্তু ভালোবাসা ওটা আর পাবি না৷ মা** মেয়ে রাই আসবে তোর কাছে ভালো কেউ না, মনে রাখিস আর কি বললি ভালোবাসা হারিয়েছি আমি? ভালোবাসা কাকে বলে সেটাই তো জানিস না তুই। ভালোবাসাতে কোন চাহিদা থাকে না বেঈমান। ভালোবাসার পরীক্ষা দেওয়ার জন্য যদি নিজের শরীর বিলিয়ে দিতে হয় তাহলে এমন ভালোবাসা আমার লাগবে না। তোর মতো চরিত্রহীনের সাথে ফারিয়ার মতো বারো ভা* মেয়েই মানিয়েছে। ”
” তুই তোর লাইফ এভাবেই এনজয় করতে থাক ৷ আমিও তোর মতো বেঈমান কে ছাড়া খুশি খুশি জীবন কাটিয়ে দেখাবো। লজ্জা থাকলে আর কখনো আমার সাথে কথা বলতে আসবি না। ”
মেহুল ওদের রেখেই চলে আসলো। কিন্তু মেহুলের কথা আর থাপ্পড়ে রাফির চোখে জ্বলছিল বদলার আগুন।
চলবে…….?
