পর্ব : ০১
গল্প: #তুমি_এলে_হঠাৎ_বৃষ্টি_হয়ে…
লেখিকা: #মৈথালী_নিথু (#কল্পকথা)
ফোন হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে মেহুল। রাফির সাথে একটা মেয়ের খুবই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি মেসেঞ্জারে রাফি নিজেই পাঠিয়েছে তাকে কিছুক্ষণ আগে। রাফি সম্পর্কে মেহুলের ভালোবাসার মানুষ। দীর্ঘ ৩ বছরের সম্পর্ক তাদের।
রাফির এমন কাজ করার কারণও মেহুল একটু একটু বুঝতে পারছে।
ছবিতে মেয়েটা রাফির ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে। দু’জনেই একসাথে শুয়ে আছে। এমন নোংরা ছবি দেখে মেহুল বুঝে গিয়েছে রাফি কি করছে মেয়েটার সাথে । মেহুলের হাত কাঁপতে লাগলো এসব দেখে আর একটু পরেই ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেলো।
এসব ঘটনার সূত্রপাত হয় আরো ১ সপ্তাহ আগে। এক সপ্তাহ আগে রাফি হঠাৎ করেই মেহুলকে রুমডেটের অফার করে। সেদিন সে অনেক বেশিই অবাক হয়েছিল। যে ছেলেটা রিলেশনের এতো বছরে মেহুলের সাথে খারাপ কোনো আচরণ করে নি হাত ধরা ছাড়া অন্য কিছু করেতে অব্দি চায় নি । যার নজরে ছিল শুধু ভালোবাসা সে কিনা এমন প্রস্তাব মেহুলকে দিলো এটা সে তখন বিশ্বাসই করতে পারে নি। বলতে গেলে মেহুল তখন রাফির কথা পাত্তাই দেয় নি। রাফি মজা করছে ভেবে মাথা থেকে উড়িয়ে দিয়েছিল এসব ব্যাপার কিন্তু এর পর থেকে রাফি প্রতিদিনই কথাটা তুলছিল। নানাভাবে মেহুলকে ইঙ্গিত দিচ্ছিলো রাজি করানোর জন্য। ইমোশনাল কথাবার্তা ও কম বলে নি সে। কিন্তু মেহুল কোনো ভাবেই রাজি হয় নি রাফির এমন নোংরা প্রস্তাবে। মেহুল রাফিকে বারবার বলেছে তুমি আমার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাও। আমরা বিয়ে করে ফেলি। কিন্তু রাফির একটাই কথা-
” দেখো মেহুল তুমি তো জানো আমি ছোট একটা কোম্পানিতে সাইড এমপ্লয়ি হিসেবে কাজ করছি। ভালো জব খুঁজছি সেটা না হওয়ার অব্দি বিয়ে কীভাবে করবো বলো! আর তোমার আমার সাথে সময় কাটাতে কি সমস্যা? আমিই তো অচেনা কেউ তো না। আর চাকরি পেলে তো আমি তোমাকে বিয়ে করবোই। যেটা এক,দুই বছর পরে হবেই সেটা এখন হলে সমস্যা কি বলো! ”
“রাফি প্লিজ বাচ্চামি করো না। দেখো আমি বিয়ে ছাড়া তোমার এসব আবদারে রাজি হবো না। কেন বুঝতে পারছো না তুমি এতো বড় একটা পাপ আমি পারবো না করতে।”
এভাবেই তাদের মধে তর্ক-বিতর্ক হয়েই চলছিল। রাফি পার্মানেন্ট চাকরি ছাড়া বিয়ে করবে না। আর মেহুল বিয়ে ছাড়া কোন কিছুতে আগাবে না।
এই এক সপ্তাহে অনেক ঝামেলা হয়েছে তাদের দুইজন এর মধ্যে। মেহুল রাজি না হওয়ায় রাফি অনেক খারাপ ব্যবহার করেছে মেহুলের সাথে তবুও মেহুল ধৈর্য্য ধরে ছিল।কিন্তু কাল থেকে রাফি মেহুলের কল, মেসেজের রিপ্লাই ও দিচ্ছিলো না। শেষবার শুধু মেসেজে বলেছিলো –
” আমাকে ইগনোর করার ফল তুমি খুব তারাতারি পাবা মেহুল ৷ এমন সারপ্রাইজ দিবো যে জীবনেও ভুলতে পারবে না তুমি। কি হারিয়েছো তখন বুঝবে।”
রাফির মেসেজ দেখে মেহুল কাল থেকে অনেক টেনশনে ছিল। আর এখন রাফির আইডি থেকে পাঠানো ছবি দেখে মেহুল বুঝতে পেরেছে রাফি তাকে কোন সারপ্রাইজের কথা বলেছিল আর কতো বড় সারপ্রাইজ দিয়েছে।
রাফি আরেকটা মেয়ের সাথে ইন্টিমেট হয়েছে শুধু মাত্র মেহুল রাজি না হওয়ায় তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। মেহুল বুঝতে পারছে না কি হলো তার সাথে এটা।
সে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। জীবনে একজনই ছিল যে তাকে বুঝতো, এতোটা ভালোবাসতো আর সেও এমন একটা প্রতারণা করলো যে মেহুলের ভিতর টা ভেঙ্গে গুড়াগুড়া হয়ে যাচ্ছে। রাফির এতোদিনের ভালোবাসা,যত্ন সব কি তাহলে ধোঁকা ছিল! নকল ছিল সব? সত্যিকারের ভালোবাসলে মানুষ এভাবে রং বদলাতে তো পারে না।
মেহুলের এসব কিছু ভেবে মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেলো হঠাৎ। ঠিক ভুল কোন কিছু না ভেবেই সে তারাতারি উঠে ড্রয়ার থেকে ঘুমের ঔষধ বের করে ৫-৬ টা খেয়ে নিলো।
***
বাইরের আওয়াজে ঘুম ছুটে গেলো মেহুলের। সে উঠে সময় দেখলো বিকেল ৪ টা বাজে। কাল রাতে ঘুমের ঔষধ খেয়ে সেই যে ঘুমালো আজ উঠলো। এতো ঘন্টা মরার মতো ঘুমিয়েছে সে। ব্রেইনে একটু জোড় দেওয়াতে কালকের সব কিছু মনে পড়ে গেলো তার। মনটা আবারও বিষাদে ভরে গেলো। ফাঁকা বাসায় একাই ছিল মেহুল৷ তার রুমমেট নেই আপাতত আর তার মা-বাবা গ্রামে থাকে। তাই খালি বাসায় এতো ঘন্টা ঘুমানোতেও কোন সমস্যা হয় নি তার। কেউ এসে খুঁজ ও রাখে নি তার।
” হাহ ফাটা জীবন আমার। খালি বাসায় একা মরে পড়ে থাকলেও খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নাই”
কথাটা বলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মেহুল।
কাল থেকে না খাওয়া সে উঠে বসার শক্তি ও পাচ্ছে না যেন। তবুও উঠে বসলো খুদায় পেট জ্বলছে তার তাই কষ্ট হলেও উঠে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে বাইরে থেকে কিছু খাবার কিনার জন্য বের হলো বাসা থেকে ।
মেহুলের বাসার গলিতেই ভালো হোটেল আছে সে ওখান থেকেই গিয়ে কাচ্চি নিয়ে আসবে ভেবে আগালো। অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থেকে অবশেষে কাচ্চি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো ও।
কিন্তু একটু আগাতেই কোথা থেকে একটা বাচ্চা তার সাইকেল নিয়ে মেহুলের সামনে চলে এলো৷ ফলস্বরূপ মেহুল নিজেকে বাঁচাতে সরতে গিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলো। হাত থেকে পড়ে কাচ্চি ও নষ্ট হয়ে গেলো। মেহুল হাতে সামান্য ব্যথা পেলো। এতোকিছুর পরেও বাচ্চাটার থামার কোন নাম নেই। মেহুল উপরে তাকাতে খেয়াল করলো বাচ্চাটার পিছনে একজন পুরুষ এইদিকে দৌড়ে আসছে। আর চিল্লিয়ে বাচ্চা ছেলেটাকে ডাকছে-
” রাফিন দারাও রাফিন…….”
সে এসে মেহুলের সামনে দাঁড়ালো আর বললো-
” মিস আপনি ঠিক আছেন? এই ছেলেটা যে কি করে না! রাফিনের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাচ্ছি ম্যাম মাফ করবেন প্লিজ।”
কথাটা বলে লোকটা হাত বাড়ালো মেহুলকে উঠতে সাহায্য করার জন্য কিন্তু মেহুল নিজে নিজেই উঠে দাঁড়ালো।
লোকটা দেখলো মেহুলের খাবার নিচে পড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
” আমি আসলেই অনেক লজ্জিত মিস। আমার বাচ্চাটার জন্য আপনি ব্যাথাও পেলেন আবার আপনার খাবারও নষ্ট হলো। আপনি একটু দাড়ান আমি নতুন করে আপনার জন্য কাচ্চি নিয়ে আসছি।”
এতোক্ষণে মেহুল মুখ খুলল-
” নাহ তার আর কোন দরকার নেই ধন্যবাদ। আপনি গিয়ে বাচ্চাকে সামলান। ”
কথাটা বলে মেহুল সোজা বাসায় চলে আসলো। যদি সে পেছনে তাকাতো তাহলে দেখতো কেউ একজন অসহায় চোখে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
এমনিতেই কাল থেকে মেহুল না খাওয়া তাই শরীর দূর্বল লাগছে তার প্রচুর। তার উপর যা ক্ষুধা ছিল তা রাস্তার ঘটনায় সব চলে গিয়েছে। অবশ্য মনের ব্যাথার কাছে পেটের ক্ষুধা কিছুই না।
বাড়িতে এসে বিছানায় বসার সাথে সাথেই কালকের জমানো সব ব্যাথা এক সাথে বের হয়ে এলো। সব কষ্ট একসাথে পানির মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চালালো মেহুল। ঘন্টাখানেক কান্নাকাটি করার পর সেভাবেই আবার ঘুমিয়ে গেলো মেয়েটা।
***
আজ সকাল যেন নতুনত্ব নিয়ে আসলো মেহুলের জীবনে। রাফি বেঈমানটা কে নিয়ে আর ভাববে না ও সেটা ভেবেই নতুন ভাবে দিনের সুচনা করলো মেহুল । সে যতোই বলুক রাফিকে আর ভাব্বে না কিন্তু মন তো আর এসব সান্ত্বনা মানবে না। সেটা তো ঠিকই রাফিকে মনে করবে আর কষ্ট পাবে।
তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে তো দোষ নেই।
মেহুল আজ ভার্সিটি যাবে বলে সকাল সকাল তৈরি হয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। আজও রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় কালকের ওই বাচ্চা টা সামনে চলে আসলো। আজ আর বাচ্চা টা সাইকেল নিয়ে আসে নি বরং হাতে কিসের যেন একটা ব্যাগ নিয়ে আসলো। সে সুন্দর করে মেহুলের সামনে এসে দাড়ালো তারপর মাথা নিচু করে বললো –
” কালকের দুষ্টুমির জন্য সরি আন্টি। আর কখনো এমন করবো না প্রমিজ। মাফ করে দিন আন্টি আর..
হাতে থাকা ব্যাগ টা মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল এটা আপনার জন্য “।
বাচ্চা টা এতো সুন্দর করে ইনোসেন্ট ভাবে বললো যে মেহুলের মন ঠাস করে গলে গেলো। মেহুল ও এবার নিচু হয়ে বসলো।
“তোমার নাম কি বাবু?”
” আমার নাম রাফিন। বাবাই ঢাকে পিকাচু বলে। ”
” ওহো খুব সুন্দর তো। ব্যাগে কি এনেছো ?”
” এটা আপনার জন্য ”
মেহুল হাত বাড়িয়ে ব্যাগ টা নিয়ে দেখলো এতে কাচ্চির দুইটা প্যাকেট আছে আরো কি কি যেন। মেহুল অবাক হলো তারপর মাথায় আসলো কালকের ওই লেকটার কথা। কাল সে নেয় নি বলে আজ বাচ্চাকে দিয়ে পাঠালো ভদ্রলোক। বাহ ভালোই তো।
“আচ্ছা আমি তোমাকে মাফ করে দিবো কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
” কি আন্টি ”
” এই ব্যাগে কাচ্চি আছে এখন আমার সাথে তোমাকে ও এটা খেতে হবে। রাজি? ”
মেহুলের কথায় রাফির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কাচ্চি রাফির ফেভারিট কিন্তু বাবাই শাস্তিস্বরূপ ওকে আজ কাচ্চি কিনে দিলো না। ও সাথে সাথে মাথা নাড়ালো অর্থাৎ ও রাজি৷
“চলো তাহলে আমার সাথে ওই যে ওটা আমার বাসা। ”
“আন্টি এক মিনিট আমি বাবাইকে বলে আসি আপনার সাথে যাবো। ”
কথাটা বলেই রাফিন দৌড়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো। মেহুল রাফিনের যাওয়া দেখে পাশে তাকালো দেখলো রাফিন দুইতলা বিশিষ্ট সুন্দর একটা বাড়ির ভিতরে ছুটে গেলো।
“ওহ্ তারমানে এটাই রাফিনের বাড়ি। বাহ্ সুন্দর তো বাড়িটা। ”
এখনকার ঘটনায় মেহুলের মনটা একটু হালকা হয়ে গেলো৷ আজ আর সে ভার্সিটি যাবে না ঠিক করলো রাফিনের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটাবে ভেবে।
একটু পর রাফিনের সাথে কালকের সেই ভদ্রলোক ও বের হয়ে আসলো বাড়ি থেকে।
“হ্যালো মিস….! ”
“মেহুল।”
“জ্বি মিস মেহুল। কালকের জন্য দুঃখীত। রাফিনকে কাল অনেক বকা দিয়েছি। আশা করি ও আর কখনো এমন দুষ্টুমি করবে না৷
” সমস্যা নেই৷ আমি কিছু মনে করি নি। এ বয়সে তো এমন দুষ্টুমি করবেই বাচ্চারা। এটা নিয়ে আপনি অনেকবার সরি বলে ফেলছেন। আরো বলে আমাকে লজ্জা দিয়েন না প্লিজ।
মেহুলের কথায় লোকটা মুচকি হেসে মাথা চুলকিয়ে বললো-
” জ্বি আচ্ছা।”
“বাবাই আমি যাই আন্টির সাথে?”
“না বাবাই তুমি কেন যাবা! আন্টির সমস্যা হবে তো।”
” না না এমন কিছু না। আমিই বলেছি ওকে আমার সাথে যেতে আমি একা এতোকিছু খেতে পারবো না। ও যদি আমার সাথে যায় তবেই আমি এই ব্যাগ টা গ্রহণ করতে পারবো। নয়তো এই যে ফিরিয়ে নিন।”
ফিরিয়ে দেওয়ার কোন কারণ নেই তাই মেহুলের কথায় লোকটা একটু ভাবলো তারপর বললো-
“আচ্ছা ঠিক আছে নিয়ে যান তাহলে ওকে। কিন্তু ও যদি কোন দুষ্টুমি আবার করে তাহলে আমাকে বলবেন কিন্তু ”
” জ্বি অবশ্যই। ওই যে ওটা আমার বাসা আপনি চিন্তা করবেন না আমি আবার ওকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যাবো।”
“বাই দ্যা ওয়ে! আমি নাবিল ”
“ঠিক আছে নাবিল সাহেন আপনি চিন্তা করবেন না।”
“ইয়ে…….”
তাদের কথা শেষ হলে রাফিন খুশিতে মেহুলকে জরিয়ে ধরলো। তারপর মেহুলের হাত ধরে মেহুলের বাসায় চলে এলো।
বাসায় এসে মেহুল আর রাফিন মজা করে কার্টুন দেখে বিরিয়ানি খেলো। সাথে আরো মজার প্যাকেট ছিল সেগুলোও খেলো। খাওয়ার পর এক সাথে খেলাধুলা করলো দু’জন। এভাবেই মেহুল ঘন্টাখানেক রাফিনের সাথে সময় কাটালো।
মূহুর্তের মধ্যে অচেনা বাচ্চা ছেলেটা যেন মেহুলের কতো আপন হয়ে গেলো।
কারো সাথে সম্পর্ক হওয়া কতোই সহজ না! যেই রাফিকে মেহুল তিন বছর ধরে চিনে সে কতো সহজে ওকে ধোঁয়া দিলো আর খানিক পরিচিত হওয়া বাচ্চা ছেলে রাফিন সে যেন মেহুলের কতো বছরের চেনা কেউ । মেহুল খেয়াল করলো রাফি আর রাফিনের নামেও মিল।
চলবে।
