Saturday, June 6, 2026







চন্দ্রবিন্দু পর্ব-০৩

#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৩_

সকালটা অনেক আগেই নেমে এসেছে শহরের বুক জুড়ে। কিন্তু, এই শহরে এখন আর সকালের সেই শীতলতা, কোমলতা নেই। এই সকালেও গরমের তেজ টের পাওয়া যায়। তাপমাত্রা বাড়ছে ধীরে ধীরে, আর সেই সাথে বাড়ছে শহরের কোলাহল, যানবাহনের গুঞ্জন, আর মানুষের ব্যস্ততা। আরাফ প্রতিদিনের মতো আজও মেয়েকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছে। মেয়েটা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কখনো চুপচাপ বসে থাকে, মাঝে মাঝে হাসে, কখনো প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দেয়, যেন এইটাই দিনের সবচেয়ে আনন্দের সময় তার।

আরাফ আরোহিকে নিয়ে ডাইনিংয়ে আসতেই দেখে স্নেহা টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে। সায়েরা খাতুন রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত। স্নেহা আরোহির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে। তারপর বলে,
–” ভাইয়া, আসো। আমি খাবার দিচ্ছি।”

আরাফের কোলে থাকা অবস্থায় আরোহি জিজ্ঞেস করে,
–” আজ আমাল জন্য কি লান্না কলেছো, পিউমনি?”

আরোহির এমন কথায় হালকা হাসে স্নেহা। মেয়েটার বয়স চার হলেও, এখনো র কে ল উচ্চারণ করে। অবশ্য স্নেহার কাছে খুব কিউট লাগে এমন ভাষা।
–” আজ তোমার জন্য চিকেন আর ভেজিটেবল দিয়ে মজা করে খিচুড়ি রান্না করা হয়েছে, মা!”

আরোহি ঠোঁট ফুলিয়ে বাবার মুখের দিকে তাকায়।
–” পাপা! আমি খিচুলি খাবো না।”

আরাফ একটু হাসে। মেয়ের গালে একটা আলতো চুমু দেয়।
–” না, মা! খিচুড়ি খেতে হবে। এটা খুব হেলদি খাবার। আমি মজা করে আমার মাটাকে খাইয়ে দেবো।”

আরোহি একটু গম্ভীর মুখে থাকে। তারপর বাবার চোখে চোখ পড়তেই মুখে হাসি ফুটে উঠে। আরাফ মেয়েকে নিয়ে চেয়ারে বসে। স্নেহা রান্নাঘর থেকে খিচুড়ি আর ডিম সিদ্ধ নিয়ে আসে।
–” ভাইয়া! তুমি খেয়ে নাও। আমি আরোহিকে খাইয়ে দিচ্ছি।”

–” সমস্যা নেই। আমি ওকে খাইয়ে দিয়ে, খেয়ে নিবো।”

স্নেহা হালকা হাসে। কিছু মনে করে না। কারন, সে জানে, আরাফ সর্বদা মেয়ের সব কাজ একা একা করার চেষ্টা করে। কিন্তু, এইটার কারন তাদের অজানা। আরাফ খেয়াল করে, স্নেহার মুখ আজ যেন কেমন ফ্যাকাশে। চোখে নিচে কালচে দাগ, সাথে চোখ দুটোও লাল হয়ে আছে, চুলগুলোও এলোমেলো করে বাঁধা। আরাফ মেয়েকে খাওয়াতে খাওয়াতে জিজ্ঞেস করে,
–” তোর কি শরীর খারাপ?”

স্নেহা হালকা চমকে তাকায়। তারপর শান্ত গলায় বলে,
–” কই? নাতো ভাইয়া!”

–” তাহলে, চোখের নিচে কালি পড়েছে কেন? রাতে ঘুম হয়নি?”

স্নেহা থেমে যায়। মনে পড়ে গতরাতের কথা। সারারাত নেহালকে নিয়ে ভেবেছে সে। নেহালের করা বে’ই’মা’নির কষ্ট নিয়ে চোখের জল ফেলেছে। এক ফোঁটা চোখও বন্ধ করতে পারেনি। তারপরও নিচু স্বরে বলে,
–” হয়েছে মোটামুটি।”

আরাফ সন্দিগ্ধ চোখে তাকায়।
–” মোটামুটি মানে? তুই কি কিছু লুকাচ্ছিস?”

–” না, ভাইয়া! কি লুকাবো? একটু মাথা ব্যাথা হচ্ছিলো। তাই রাতে খুব একটা ঘুম হয়নি, সেইজন্য হয়তো চেহারা ক্লান্ত লাগছে।”

–” ডাক্তারের কাছে যাবি? চল নিয়ে যাই।”

–” না, ভাইয়া দরকার নেই। মেডিসিন নিয়েছি।”

আরাফ আরোহির মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলে,
–” শরীর বেশি খারাপ লাগলে বলিস। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো তাহলে।”

–” ঠিক আছে!”

আরাফ আবার জিজ্ঞেস করে,
–” আব্বু কোথায়?”

–” হাঁটতে গেছে একটু।”

তারপর আবার নিরাবতা। আরাফ চুপচাপ নিজের খাওয়া শেষ করে। স্নেহা প্লেট গুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। কিন্তু, সেইটা লুকিয়ে মুছে ফেলে। সায়েরা খাতুন আরোহির টিফিন বক্স রেডি করে দেয়। আরাফ নিজে রেডি হয়ে তাড়াতাড়ি মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। স্নেহা তাকিয়ে থাকে আরাফ আর আরোহি চলে যাওয়ার দিকে। পেছন থেকে সায়েরা খাতুনের কন্ঠ শোনা যায়,
–” দাড়িয়ে আছিস কেন? খেয়ে নে।”

স্নেহা ঘুরে তাকায় মায়ের দিকে। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখ দুটো ভারি লাগছে।
–” এখন খেতে ইচ্ছে করছে না, আম্মা! পরে খাবো।”

সায়েরা খাতুন ভ্রু কুচকিয়ে বলে,
–” গতকাল সারাদিন বাসায় আসিসনি। বাইরে কি খেয়েছিস কে জানে। রাতেও খাসনি। কি হয়েছে তোর?”

স্নেহা একটা হালকা হাসি দেয়। কিন্তু, সেই হাসি মুখের কোণেই নিস্তেজ হয়ে ঝরে পড়ে।
–” কিছু হয়নি, আম্মা! ভার্সিটি যাওয়ার আগে খেয়ে যাবো।”

বলেই নিজের রুমের দিকে চলে যায় স্নেহা। সায়েরা খাতুন তাকিয়ে থাকে মেয়ের পিছুপানে। এমন আচরণ স্নেহার মধ্যে কখনো দেখেননি তিনি। মনে মনে একটা অজানা আশংকা ভর করে বুকের ভেতরে, মেয়েটার কি হয়েছে? স্নেহা নিজের রুমে এসে দরজাটা আস্তে টেনে বন্ধ করে দেয়। তারপর সোজা বারান্দায় গিয়ে দাড়ায়।

এইটা তাদের একতলা বিশিষ্ট একটা বাড়ি। বাউন্ডারি ঘেরা। বারান্দা থেকে দেখা যায় ছোট্ট বাগানটা। দুইটা আমগাছ, একটা পেয়ারা গাছ সহ আরও কয়েকটা ফল গাছ আর কয়েকটা ফুলের গাছ আছে। তাদের বাবা আফজাল খান বহু বছর আগে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে এই জমিটুকু কিনে বাড়িটা বানিয়ে ছিলেন। তারপর রংচং মারা হয়েছে অনেকবার। কিন্তু, দেওয়ালের ভেতরে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। আরাফের যখন এক বছর বয়স তখনই এই বাড়িটা তৈরি করা হয়েছিলো। স্নেহার জন্মও এই বাড়িতে। ভাই-বোন দুইজন এক সাথে বেড়ে উঠা। সব স্মৃতি লেগে আছে দেয়ালে দেয়ালে।

স্নেহা একটা গভীর শ্বাস নেয়। মস্তিষ্কে আবারও ভেসে উঠে নেহালের মুখ। তার হাসি, তার প্রতিশ্রুতি আর সেই প্র’তা’র’ণা। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠে স্নেহার। হাত দিয়ে শক্ত করে বারান্দার গিরিল চেপে ধরে স্নেহা। না! এইভাবে চললে সে বাঁচবে না। তার শরীরটা ভারি লাগছে, মাথায় কেমন একটা ধোয়াশা। তবুও নিজেকে গুছিয়ে নিতে হবে। সে তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। শাওয়ার অন করে দেয়। ঠান্ডা পানি শরীর বেয়ে নামে, যেন কিছুটা ভার লাঘব হয়। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘক্ষন দাড়িয়ে থাকে শাওয়ারের নিচে।

গোসল শেষে আয়নার সামনে দাড়ায় স্নেহা। ভেজা চুলের ফাঁক দিয়ে টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে। মুখে কোনো হাসি নেই, তবুও চোখে এক রাশ দৃঢ়তা। দ্রুত নিজেকে তৈরি করে নেয়। সাদা লং টপ, হালকা নীল জিন্স আর গলায় পেচায় লাইট গোল্ডেন রঙের স্কার্ফ। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ডাইনিংয়ে বসে অল্প একটু খেয়ে নেয়। সায়েরা খাতুন তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে। স্নেহা খাওয়া শেষ করে চলে যায়। মায়ের চোখে উদ্বেগ, কিন্তু কিছু বলে না। কেবল তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে যতক্ষণ না সে দরজার বাইরে মিলিয়ে যায়।

বাইরে রোদ এখন তীব্র। রাস্তার গরমে দম বন্ধ হয়ে আসে। রিকশা, বাস, বাইকের হর্নে চারপাশ গমগম করছে। স্নেহা ফুটপাত দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে। স্নেহার চোখে এক রাশ শক্তি। নেহাল তার জীবন থেকে চলে গেছে। তার সাথে প্র’তা’র’না করেছে। কিন্তু, সে ভেঙে পড়বে না। সে নিজেই নিজেকে তৈরি করবে, স্বাভাবিক করবে। তার পদক্ষেপ দৃঢ় হয়। সামনে নতুন পথ, য’ন্ত্র’নার কিন্তু মুক্তিরও।

বিকেলটা নরম সোনালি রোদে ভরে গেছে। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে, শহরের গায়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে গোধুলির কোমল আলো। রাস্তার পাশে বিভিন্ন স্থানে ছেলে মেয়েরা হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে। বিভিন্ন মাঠ, পার্ক থেকে ভেসে আসছে হাসির শব্দ, দৌড়ঝাঁপ, আর খেলার চিৎকারে ভরপুর এক জীবন্ত বিকাল।

সায়েরা খাতুন প্রতিদিনের মতো আজও আরোহিকে নিয়ে পাশের পার্কে এসেছেন। ছোট্ট মেয়েটা মাঠে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করে। আরোহি এই সময়টার জন্য সারাদিন অপেক্ষা করে। সায়েরা খাতুন পার্কে আসা আরও মা বোনদের সাথে গল্প করেন। আরোহির খেলার সাথে, গল্পর করে সায়েরা খাতুনের সময়ও কেটে যায় ভালোই। আজও তেমনই চলছিলো। আরোহি তার বল ধরতে গিয়ে এক ধাক্কায় পড়ে গেলো মাটিতে। ধুলোময় মুখে চোখ মেলে তাকাতেই সামনে দেখতে পায় তার পিউমনির মতো একটা অপরিচিতা মেয়ে। মেয়েটি তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে কোমল স্বরে বললো,
–” আহারে! তোমার লেগেছে, বাবু?”

আরোহি চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সায়েরা খাতুন নাতনিকে পড়ে যেতে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসেন। মেয়েটি ততক্ষণে আরোহিকে দাড় করিয়ে কাপড়ের ধুলো ঝাড়ছে যত্ন করে। আরোহি বলে ওঠে,
–” তুমি কে?”

মেয়েটি হেসে বলে,
–” আমি? আমি জারিফা! তুমি আমাকে আন্টি বলতে পারো।”

সায়েরা খাতুন তাড়াতাড়ি এসে চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করে,
–” দাদুমনি! ব্যাথা পেয়েছো?”

আরোহি মাথা নাড়ে।
–” না, দিদা!”

আরোহি আবার জারিফা নামক মেয়েটির দিকে তাকায়। ছোট্ট গলায় বললো,
–” তুমি ব্যাথা পেয়েছো, আন্টি?”

জারিফা হেসে মাথা নাড়ে।
–” না, বাবু! আমি ঠিক আছি।”

সায়েরা খাতুন আরোহিকে কোলে নিয়ে, ভালো করে জারিফার দিকে তাকায়। খুব সুন্দর শান্ত একটা মুখ। আগে কখনো মেয়েটিকে দেখেননি। সায়েরা খাতুন বলে,
–” নতুন নাকি এই পাড়ায়? আগে তো দেখিনি তোমাকে।”

জারিফা ভদ্রভাবে উত্তর দেয়,
–” জি, আন্টি! আমি জারিফা! আমরা নতুন ভাড়া এসেছি।”

–” ও, তাই নাকি। কোথায় ভাড়া নিয়েছো?”

–” রহিম মাস্টারের বাসায়।”

সায়েরা খাতুন হেসে বললেন,
–” ও, আচ্ছা! রহিম মাস্টারের পাশের বাড়িটা আমাদের। শুনেছিলাম অবশ্য নতুন ভাড়াটিয়া আসছে রহিম মাস্টারের বাসায়। তাহলে তোমরাই।”

–” ঐ বাউন্ডারি দেওয়া একতলা বাড়ি আপনাদের?”

–” হ্যা! ওটাই আমাদের বাড়ি।”

এমন সময় আরোহি বলে ওঠে,
–” দিদা! আমি খেলি?”

–” ব্যাথা লাগছে কোথাও?”

–” না! আলেকটু খেলি?”

সায়েরা খাতুন হালকা হেসে আরোহিকে নামিয়ে দিয়ে বলে,
–” যাও, খেলো। তবে সাবধানে। আবার যেন পড়ে না যাও, দাদুমনি!”

আরোহি ছুটে গেলো অন্য বাচ্চাদের মাঝে। সায়েরা খাতুন ফিরে তাকালেন জারিফার দিকে। মেয়েটি তখনও ভদ্র ভাবে দাড়িয়ে। সায়েরা খাতুন মমতা ভরা কন্ঠে বলে ওঠে,
–” এসো, মা! একটু বসো। গল্প করি।”

জারিফা হালকা হাসে,
–” জি, আন্টি অবশ্যই!”

দুইজনে গিয়ে একটা বেঞ্চে পাশাপাশি বসে। দুরে রোদ ঝলমল করছে, মাঠজুড়ে শিশুদের হাসি আর খেলাধুলার আনন্দ। বাতাসে ছড়িয়ে আছে বিকালের শান্ত ছোঁয়া। জারিফা একটু হাসিমুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
–” আন্টি! বাবুর নাম কি?”

সায়েরা খাতুন কোমল চোখে মাঠে খেলতে থাকা মেয়েটির দিকে তাকালেন। আরোহি তখন একদল বাচ্চার সঙ্গে হাসতে হাসতে বল ধরছে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে তিনি উত্তর দিলেন,
–” আরোহি!”

–” ওহ! নামটা খুব সুন্দর। ওর আম্মু নিশ্চয়ই ব্যস্ত থাকে। তাই আপনাকেই ওকে নিয়ে আসতে হয়?”

এই প্রশ্নের পরই সায়েরা খাতুনের মুখের হাসিটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। চোখের কোণে কিছু স্মৃতি জেগে উঠে, যেগুলো তিনি বছরের পর বছর বুকের গভীরে চাপা দিয়ে রেখেছেন। জারিফা লক্ষ্য করল পরিবর্তনটা। হালকা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
–” কি হলো, আন্টি?”

সায়েরা খাতুন একটুখানি নিঃশ্বাস ফেলে।
–” ওর মা নেই।”

জারিফা হঠাৎ থেমে গেল। চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময়।
–” মানে?”

–” আরোহি হওয়ার সময়ই ওর মা মা’রা যায়।”

বাতাস যেন হঠাৎ থমকে যায়। দূরে খেলা করতে থাকা আরোহির হাসি কানে এলেও, সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা অনুপস্থিতির বেদনা জারিফার বুকের ভেতর কেমন করে উঠে। মেয়েটা এমন হাসিমুখে খেলছে। কেউ ভাবতেও পারবে না, তার জীবনে এমন এক অপূর্ণতা আছে। নরম গলায় জারিফা আবার বললো,
–” তাহলে কি আপনি ওকে রাখেন, আন্টি?”

সায়েরা খাতুন মুখে একটুখানি শান্ত হাসি ফুটিয়ে বললেন,
–” আমি রাখি, আবার রাখিও না।”

জারিফা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায়।
–” মানে?”

–” ওর বাবা, মানে আমার ছেলে, যেভাবে মেয়ের যত্ন নেয়, তাতে আমার বেশি কিছু করার থাকে না। খাওয়ানো থেকে স্কুলে নেওয়া, আবার বাসায় আনা, রাতে ঘুম পাড়ানো, সব নিজের হাতে করে। আমি শুধু ও অফিসে থাকলে একটু দেখি। আমার ছেলের জীবনটাই এই বাচ্চা মেয়েটা।”

জারিফা গভীর মনোযোগে শুনছিলো। কথাগুলোর প্রতিটি শব্দে ছিল এক অদ্ভুত মায়া, এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গন্ধ। কিছুক্ষণ পর নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
–” ওর বাবা আর বিয়ে করেননি?”

সায়েরা খাতুন হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
–” অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ও রাজি হয়নি। বলেছে, যদি বিয়ে করে, তাহলে সে হয়তো একজন বউ পাবে, কিন্তু আরোহির মা পাবে না। মেয়ের প্রতিটা কাজ সে নিজে করে।”

জারিফার বুকের ভেতর হালকা এক কম্পন উঠে। সে চোখ ঘুরিয়ে আবার তাকায় মাঠের দিকে। দূরে ছোট্ট আরোহি হাসিমুখে দৌড়াচ্ছে, চুল উড়ছে বাতাসে, সূর্যের শেষ রশ্মি তার গালে লেগে আছে।

চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জারিফা ধীরে বলে ওঠে,
–” আরোহির বাবার নাম কি, আন্টি?”

–” আরাফ! আরাফ খান!”

সায়েরা খাতুন বলতেই থাকলেন আরাফের কথা, কীভাবে ছেলেটা নিজের জীবনকে মেয়ের চারপাশে গড়ে তুলেছে, কীভাবে একা হয়েও প্রতিদিন মেয়েকে হাসাতে জানে। তার কথায় মিশে আছে এক গর্ব, এক ভালোবাসা, আর এক মায়ের অদ্ভুত তৃপ্তি। জারিফা শুনতে শুনতে হারিয়ে গেল চিন্তায়। তার চোখ তখনও মাঠে, যেখানে আরোহি হাসছে, দৌড়াচ্ছে, সূর্যের শেষ আলোয় তার মুখ ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে, বিকেলটা ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে সন্ধ্যার দিকে, ঠিক যেমন কোনো গল্প গলে যায় নীরব আবেগের ভেতর।

গোধূলির রঙ ম্লান হয়ে এল। মাঠের হাসির শব্দ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। আরোহি তখনও হাসছে, আর সেই হাসির প্রতিধ্বনি জারিফার মনের ভেতর বাজতে থাকল বারবার। একটা ছোট্ট মেয়ে, যার মা নেই। আর এক বাবা, যে নিজের জীবন দিয়ে তাকে আগলে রেখেছে। নিজের অবচেতন মনেই জারিফার এই আরাফ নামক মানুষটিকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। একজন বাবা হিসেবে কতোটা উচ্চতায় মানুষটি অবস্থান করছে। কি সুন্দর নিজের বাচ্চাকে আগলিয়ে রেখেছে।

রাত হয়ে গেছে। আরাফ বসে আছে নিজের বিছানায়, ল্যাপটপের পর্দায় চোখ রেখে কাজ করছে মনোযোগ দিয়ে। রাত যতই গভীর হচ্ছে, ততই আশেপাশের নীরবতা যেন আরও ঘনীভূত হয়ে উঠছে। হঠাৎ দরজা ঠেলে ঢুকে আসে আরোহি। বিছানায় উঠে এসে বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়। আরাফ ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে সরিয়ে রাখে। মেয়েকে কোলে তুলে নেয়, পেটের ওপর বসায়। মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে ভালোবাসার কোমলতা জেগে ওঠে। আরোহি হেসে বলে ওঠে,
–” জানো পাপা! আজ আমাল একটা নতুন আন্টি হয়েছে।”

–” নতুন আন্টি?”

আরোহি উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে,
–” আমি আজ আন্টিল সাথে ধাক্কা খেয়ে পলে গেছিলাম।”

আরাফ চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
–” কি বলো? কোথাও ব্যাথা পেয়েছো?

আরোহি মাথা নাড়ে। চোখ বড় বড় করে বলে,
–” না, পাপা! আমি ব্যাথা পাইনি। জানো, আন্টি আমাকে অনেক অনেক আদল কলেছে।”

আরাফ হেসে ফেলে।
–” তাই নাকি? অনেক আদর করেছে তোমায়?”

আরোহি গালে হাত রেখে বললো,
–” হ্যা! আন্টিল নাম জালিফা!”

আরাফ একটু ভ্রু কুচকিয়ে বলে,
–” জালিফা?”

আরোহি হাত নাড়িয়ে বলে ওঠে,
–” না না না! জালিফা!”

আরাফ একটু জোরেই হাসে। তারপর বললো,
–” জারিফা?”

–” হ্যা! আল আন্টি লহিল দাদুদেল বাসায় থাকে।”

আরাফের মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
–” আচ্ছা! বুঝেছি, মা! তাহলে, তোমার নতুন আন্টিকে খুব পছন্দ হয়েছে, বুঝি?”

আরোহি চওড়া হাসিতে মাথা নাড়ে,
–” হ্যা, পাপা! আন্টি অনেক কিউট!”

আরাফ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু থামে। চোখের ভেতর আনন্দের এক রেশ খেলে যায়। হয়তো অবচেতনেই মনে পড়ে যায়, ছোট্ট মেয়েটা যার মাকে কখনো দেখেনি, তার জীবনে আজ এক নতুন মুখ এসেছে, এক অচেনা স্পর্শ, এক কোমল আদর। আর তাতেই তার মেয়েটা কতো খুশি। মেয়েকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় আরাফ। নরম কণ্ঠে বলে,
–” অনেক হলো আন্টির গল্প। এখন খাবার খেতে হবে। চলেন, মাই প্রিন্সেস!”

আরোহি হাসতে হাসতে বাবার গলায় ঝুলে পড়ে।
বাবা-মেয়ের হাসির ধ্বনি ভেসে যায় ঘরের ভেতর।
বাইরে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়, চাঁদ উঠেছে, পূর্ণ, নিঃশব্দ, আর একদম সাদা। যেন তাদের এই নিঃশব্দ রাতের একমাত্র সাক্ষী।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ