Saturday, June 6, 2026







চন্দ্রবিন্দু পর্ব-০২

#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_২_

রোদের তীব্র তেজের ধরনী উত্তপ্ত। তবুও দুপুরের শহর এখনো ব্যস্ত নিজের মতো। স্কুলের সামনে সারি সারি গাড়ি, রিকশা, মোটরবাইক, মিলে এক পরিচিত বিশৃঙ্খলা। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও আরাফ শান্ত ভাবে দাড়িয়ে আছে। হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে। স্কুল ছুটি হওয়ার সময় হয়ে গেছে। এখন শুধু অপেক্ষা তার রাজকন্যা, আরোহির জন্য।

মেয়েকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে তারপর আবার অফিসে যাওয়া লাগবে আরাফের। একটা বড় কোম্পানির সিনিয়র পোস্টে জব করে সে। আরাফের বসও তাকে খুব পছন্দ করে। কারন, আরাফ কাজের ব্যাপারে অত্যন্ত দায়িত্বশীল। আরাফের কাজের জন্য অফিসের অনেক উন্নতি হয়েছে। সাথে আরাফের পারসোনাল লাইফ নিয়েও অনেকটা অবগত তার বস। সব কিছু মিলাইয়া বস আরাফকে অনেক পছন্দ করে। তাই আরাফ সহজেই নিজের প্রয়োজনে অফিস থেকে বাহিরে আসতে পারে।

স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। স্কুল গেটের সামনে প্রচুর অভিভাবক দাড়িয়ে। সবাই নিজের বাচ্চাদের নিয়ে যেতে এসেছে। বাইরে ভিড়ের মধ্যেও আরাফের চোখ স্কুলের গেটের ভেতরের রাস্তায় নিবদ্ধ। অনেক স্টুডেন্ট বের হচ্ছে। সেই সবের মাঝে আরাফ নিজের কাঙ্ক্ষিত মুখটি খুঁজছে। অবশেষে সে দেখতে পায় নিজের জীবনের সব থেকে মূল্যবান মুখটি। এক ঝলকেই সে চিনে ফেলে নিজের জীবন আলো করা মুখটি। আরোহির কাঁধে ব্যাগ, চোখে আনন্দ, চুল গুলো হালকা এলোমেলো। আরোহি বাবাকে দেখেই ছুটে আসে।

–” পাপা!”
আরোহির কন্ঠে উচ্ছ্বাসের ছোয়া। আরাফ হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত মেলে ধরে, মেয়েকে বুকে টেনে নেয়।তারপর গালে চুমু দিয়ে, হালকা হেসে বলে ওঠে,
–” আজকে আমার মা কেমন কাটালো স্কুলে?”

আরোহিও বাবার গালে চুমু খেয়ে বললো,
–” ভালো! কিন্তু, টিফিনে যে চিকেন বল ভেজে দিয়েছিলে, সেটা একদম গোল ছিলো না।”

হাসিতে ভরে উঠে আরাফের মুখ।
–” আচ্ছা! আগামীকাল থেকে গোল করে দেওয়া হবে, ঠিক আছে?”

কথাটা বলে আরোহিকে কোলে করে নিয়ে বাইকের কাছে চলে আসে আরাফ। আরোহি হালকা হেসে বলে,
–” ঠিক আছে! কিন্তু পাপা, আমি এখন আইসক্রিম খাবো।”

আরাফের ঠোঁটে মায়া মিশ্রিত হাসি ফুটে ওঠে।
–” অবশ্যই, মা! সামনেই পার্লার থেকে খাওয়াবো।”

আরোহি খুশি হয়ে বাবার গালে চুমু একে দেয়। আরাফের মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস সে হয়তো ঠিক এই মুহুর্তে ধরে রেখেছে, একটা নিষ্পাপ শিশুর ভালোবাসা। আরোহির মাথায় ছোট্ট হেলমেট পরিয়ে দিয়ে, নিজের হেলমেট পরে নেয়। মেয়েকে সামনে বসিয়ে বাইক চালু করে আরাফ। রাস্তা পেরিয়ে কিছুদুর গিয়ে আইসক্রিম পার্লারে বাইক থামায়। গ্লাস দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই শীতল হাওয়া ছুঁয়ে যায় তাদের মুখ। আরোহিকে নিয়ে টেবিলে বসে। একজন ওয়েটার এসে বলে,
–” স্যার! কি দিবো আপনাদের?”

আরোহি উচ্ছ্বসিত চোখে বাবার দিকে তাকায়।
–” চকলেট! আমি চকলেট আইসক্রিম খাবো, পাপা!”

আরাফ একটু হেসে ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে বলে,
–” একটা বড় কাপ চকলেট আইসক্রিম।”

ওয়েটার চলে যায়। আইসক্রিম এনে দেয়। আরোহি চামচ হাতে নিয়ে আইসক্রিম মুখে দেয়। তার মুখে প্রশান্তির হাসি। চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে,
–” ইয়াম্মি!”

আরোহি তাকিয়ে থাকে মেয়ের হাসিতে। তার ভেতরটা যেন ঠান্ডা হয়ে যায়। তার রাজকন্যার এই হাসিটা যেন সব সময় এভাবেই থাকে। জীবনের কোনো খারাপ ছায়া যেন আরোহির মুখে না পড়ে। খাওয়া শেষ হলে বাইক নিয়ে আবার রওনা দেয় বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বাসার সামনে আসতেই আরাফ আরোহিকে নামিয়ে নেয়। আরোহি হেসে বলে ওঠে,
–” আমরা এসে গেছি, পাপা!”

আরাফও একটু হাসে৷ নিজের রাজকন্যাকে কোলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। বাসায় ঢুকেই আরাফ প্রথমেই মেয়েকে গোসল করিয়ে দেয়। ফেনায় ভরা বাথটাবের পানিতে মেয়েটি খিলখিল করে হাসে। তার হাসির শব্দে ঘরটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠে। গোসল শেষে আরাফ নরম তোয়ালে দিয়ে মেয়ের চুল মুছিয়ে দেয়। তারপর মেয়েকে নিয়ে খাবার টেবিলে চলে আসে। রান্নাঘর থেকে মেয়ের খাবার নিয়ে এসে নিজে হাতে খাইয়ে দেয় মেয়েকে। খাওয়া শেষ হলে আরোহিকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে টিভি অন করে দিয়ে আস্তে করে বলে ওঠে,
–” মা! তুমি এখন একটু খেলা করো, টিভি দেখো। কিন্তু, একটু পর দিদার কাছে যেয়ে ঘুমিয়ে যাবে। ওকে?”

আরোহি টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই বলে,
–” ওকে, পাপা!”

আরাফ মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। টেবিলের এক কোণে বসে এতো সময় বাবা মেয়ের সব কাজ কর্ম দেখছেন সায়েরা খাতুন। তার মুখে স্নিগ্ধ হাসি। আরাফ ঘর থেকে শার্ট বদলিয়ে আসে। আরোহি ততক্ষণে টিভির সামনে বসে প্রিয় কার্টুনে মগ্ন। আরাফ মায়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
–” আম্মা! একটু পর আরোহিকে ঘুমিয়ে দিও।”

সায়েরা খাতুন হালকা মাথা নাড়েন।
–” ঠিক আছে, বাবা! তুই খেয়ে যা একটু।”

–” আম্মা! রোজই এমন বলো। আমি অফিসে গিয়ে খেয়ে নিবো। তুমি শুধু আমার মেয়ের দিকে খেয়াল রেখো।”

–” আচ্ছা, বাবা! সাবধানে যাস।”

আরাফ আরেকবার মেয়ের কাছে গিয়ে, মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। এক মুহুর্তের জন্য থেমে আবার মেয়ের দিকে তাকায় সে। টিভি আর রুম লাইটের আলোয় মেয়ের মুখটা ঝলমল করছে। হাসতে হাসতে পর্দার রঙিন জগতে হারিয়ে গেছে সে। আরাফ নিঃশব্দে বেরিয়ে যায়।

সায়েরা খাতুন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আরোহির পাশে বসে। মেয়েটি তার দিদার কোলে মাথা রাখে, চোখ এখনে টিভির পর্দায় তার। সায়েরা খাতুন আরোহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। হালকা হাসে সায়েরা খাতুন। চোখে ভাসে তার নিজের ছেলেবেলা, তারপর বিয়ে, আরাফের জন্ম, আরাফের শৈশব, স্নেহার শৈশব। আরাফ একটা সময় ছোট্ট হাতে স্কুলের ব্যাগ ধরে এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতো, আজ সেই ছেলেই নিজের মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে আসে। জীবন যেন এক চক্রের মতো ঘুরে আবার ফিরে এসেছে সেই একই জায়গায়, শুধু প্রজন্মটা বদলে গেছে।

আরোহির চোখ ধীরে ধীরে বুজে আসছে। সায়েরা খাতুন আরোহির কপালে একটা চুমু দেয়। এই ছোট্ট প্রানটাই যেন এখন পুরো বাড়ির প্রান। এই শিশুটিই তাে সংসারের আলো, তার ছেলের জীবনের অর্থ। এই ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়েই তার আদরের ছেলে বেঁচে আছে।

সন্ধ্যা নেমেছে শহরে। আকাশে নরম নীলচে অন্ধকার, নিচে রঙিন আলোর বন্যা। শহরের রাস্তায় রাস্তায় রঙিন আলো গেঁথে গেছে। একদিকে অফিস ছুটির তাড়াহুড়ো, অন্যদিকে পার্কে বসা তরুন তরুনীদের হাসির শব্দ। রাস্তার পাশের ফুচকা, ভেলপুরির দোকানগুলোয় এখন জমজমাট ভিড়। গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল মিশেলে শহরটা যেন এক ব্যস্ত ছবির মতো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যা যেন শহরের এক নতুন রুপ নিয়ে আসে, যেখানে ক্লান্তি আর উচ্ছ্বাস মিশে থাকে একসাথে।

ঠিক এই ব্যাস্ত সময়েই এক বিশাল অ্যাপার্টমেন্টের সামনে দাড়িয়ে আছে রাহুল। চোখের সামনে ঝলমল করা বিল্ডিংয়ের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে ভেতরে ঢুকে সে। নিরাপত্তাকর্মী মাথা নেড়ে হাসে।
–” স্যার! অনেকদিন পর দেখলাম আপনাকে।”

রাহুল ঠোঁটের কোণে ভদ্র হাসি টেনে বলে,
–” হ্যা! একটু ব্যাস্ত থাকি।”

তারপর লিফটে উঠে যায় রাহুল। লিফটের ভেতর নিঃশব্দ। কাচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে রাহুলের মনে পড়ে যায় ছোট বেলার দিন গুলো। পাঁচ তলায় এসে লিফট থামে। কাঙ্ক্ষিত দরজার সামনে এসে দাড়ায় সে। হাত বাড়িয়ে কলিং বেল চাপার আগেই পকেটে ফোন কল বেজে উঠে। ফোন বের করতেই শুভ্রর নাম।কল রিসিভ করে রাহুল। সে কিছু বলার আগেই শুভ্রর কন্ঠ ভেসে আসে,
–” কি রে রাহুল! কই ম’রে’ছিস তুই?”

রাহুল নিঃশব্দে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
–” আম্মুর কাছে এসেছি।”

ফোনের ওপাশে হালকা নিরবতা। শুভ্র জিজ্ঞেস করে,
–” ও! আন্টি কেমন আছেন?”

–” এখনো দেখা হয়নি। ফ্লাটে ঢুকিনি এখনো। শিওর, হুদায় ডাকছে। জানে, আমার এসব ভালো লাগে না। তাও ডাকবে।”

শুভ্র হালকা রাগী স্বরে বলে,
–” এইসব কি বলছিস তুই? তুই একটা মাত্র সন্তান আন্টির। আন্টি তোকে মিস করে বলেই ডাকে। তোকে একবার দেখতে চায়, এইটুকুই তো। এমন ভাবে বলিস না। আন্টির সাথে ভালো করে সময় কাটিয়ে আয়।”

রাহুল ঠোঁটের কোণে সামান্য তিক্ত হাসি টানে।
–” ভালোবাসার নামে শ্বাসরোধ লাগে, শুভ্র!”

ওপাশ থেকে চুপচাপ। তারপর শুভ্র আস্তে বললো,
–” আমি তোর সম্পূর্ণটা হয়তো বুঝবো না, রাহুল! কিন্তু, আমি সবটা দেখেছি। যাই হোক, তুই শান্ত ভাবে সময় কাটিয়ে আয়।”

–” আসছি একটু পর।”

–” ওকে!”

কল কেটে যায়। রাহুল ফোনটা পকেটে রেখে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেয়। তারপর কলিং বেল বাজায়। বেল বাজার কয়েক সেকেন্ডের মাঝে দরজা খুলে যায়। দরজায় দাড়িয়ে আছে রিমা ইয়াসমিন। বয়সের ছাপ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। পরিপাটি কটে শাড়ি পরা, ঠোঁটে কোমল হাসি। চোখের কোণে লুকানো অপেক্ষার ছাপ স্পষ্ট। দুই জনের চোখে চোখ পড়তেই মুহুর্তের জন্য সময় থেমে যায়। রিমি ইয়াসমিনের চোখ ভিজে আসে। তার সেই ছোট্ট রাহুল। যে একসময় তার আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছিলো, আজ সেই ছেলে এক পরিপূর্ণ যুবক। লম্বা, ফর্সা, পরিনত।

রিমা ইয়াসমিনের চোখ ছলছল করছে। তার মতো একটা শক্ত মনের নারীও, এই সন্তানের সামনে আসলে ভে’ঙে পড়তে চায়। প্রায় দুই মাস পর ছেলের সাথে দেখা। কতোদিন কল করেছে, রাহুল আসেই না। রাহুলের ফ্লাটে গিয়েছে দুইদিন পায়নি তাকে। কিন্তু, আজ এসেছে তার ছেলে। রাহুল আসার জন্য রাজি হতেই অফিস থেকে সাথে সাথে চলে এসেছিলেন তিনি। রিমা ইয়াসমিন এগিয়ে এসে ছেলের মুখে হাত রাখেন। আঙুল কেঁপে উঠে তার। ধীরে ছেলের মাথা টেনে নিয়ে কপালে চুমু দেয়। রাহুল কিছু বলে না। শুধু চোখ নামিয়ে রাখে। ভেতরটা যেন কাঁপছে, কিন্তু মুখে কোনো প্রকাশ নেই। মায়ের ভালোবাসা যেন তাকে একইসাথে শান্ত আর অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

রিমা ইয়াসমিন ছেলেকে সোফায় এনে বসায়। আলোকিত ঘর জুড়ে ছড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ এক আভিজাত্য। রিমা ইয়াসমিন এই ফ্লাটে একাই থাকে, সাথে দুইজন সার্ভেন্ট। ফ্লাটটা রিমা ইয়াসমিনের বাবার দেওয়া। কিন্তু, এই আলিশান সৌন্দর্যের মাঝেও রিমার ভেতরটা অনেকদিন ধরেই অনাবৃত, ক্লান্ত এক শূন্যতায় ভরা। রিমা ইয়াসমিন সোফায় বসে ছেলের মুখের দিকে তাকায়। রাহুল একটু নিঃশব্দে বসে থাকে। তারপর সংক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে,
–” আম্মু! আমাকে এখন যেতে হবে।”

রিমা ইয়াসমিন হালকা হেসে বলে ওঠে,
–” অবশ্যই যাবে। কিন্তু, আজ এখানে ডিনার করে যাও। আমি নিজের হাতে তোমার জন্য রান্না করেছি।”

রাহুল ধীরে মাথা নাড়ে।
–” আমি খাবো না। আমাকে যাওয়া লাগবে।”

রিমা ইয়াসমিনের চোখে একরাশ ব্যাথা ফুটে উঠে। ঠোঁটের কোণে হালকা তিক্ততা জমে।
–” কোথায় যাবে? ক্লাবে? ড্রিংকস করবে? স্মোকিং করবে, তাই তো?”

রাহুল নীরব। শুধু ঠোঁট শক্ত করে বসে থাকে। তার চোখের গভীরে যেন কোনো পুরনো ক্ষতের ছায়া নড়ে উঠে। রিমা ইয়াসমিন আবার বলে ওঠে, কন্ঠে ঝরছে অভিমান আর আক্ষেপের মিশ্র সুর,
–” তোমার বাবাকে আমি বলেছিলাম, ছেলেটাকে আমার কাছে রাখো। আমি ঠিকঠাক করে বড় করবো। কিন্তু, তোমার বাবা শুনলো না আমার কথা। কি হলো তাতে? পারলো নিজের কাছে ধরে রাখতে? উল্টো তোমাকে এমন বেপরোয়া বানিয়ে দিলো।”

রাহুল ঠোঁটের কোণে একটা তিক্ত হাসি টানে।
–” তোমার কাছে থাকলে কি আমি খুব ভালো মানুষ হয়ে যেতাম, আম্মু? আর তাছাড়া, তোমার কাছে নিয়ে আসলে বুঝি আমি তোমার কাছে থাকতাম?”

–” কি বলতে চাচ্ছো তুমি?”

রাহুল গভীর দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকায়। মুখে অদ্ভুত অস্থিরতা।
–” আমি তোমাদের মাঝে কখনোই ভাগ হয়ে থাকতে চাইনি, আম্মু! তোমরা যখন আলাদা হয়ে গেলে, আমিও আমার মতো করে আলাদা হয়ে গেলাম। তখন থেকেই নিজের মতো করে একটা পৃথিবী গড়ে নিয়েছি। যেখানে না তুমি আছো, আর না বাবা আছে।”

রিমা ইয়াসমিন স্তব্ধ হয়ে যায়।
–” রাহুল!”

রাহুলের কন্ঠ নিচু। কিন্তু, প্রত্যেকটা শব্দ যেন ছু’রির মতো কে’টে যায় নিরবতা ভেদ করে।
–” যখন বাবা-মাকে এক সাথে পাবো না, তখন একজনের কাছে কখনোই থাকতাম না। আর কারোর কাছে থাকিওনি। তাই নিজের মতো করে নিজের জীবন সাজিয়ে নিয়েছি। নিজের মতো করে নিজেকে গড়ে নিয়েছি। নিজের নিয়মে বেঁচে আছি। হয়তো তোমাদের ভালো লাগে না, কিন্তু এটাই আমার স্বস্তি।”

রিমা ইয়াসমিন চুপ করে যায়। তার মুখে ব্যাথার ছাপ, চোখের কোণে কাপে জলরাশি। রাহুল নিজের মতো করে বলতে থাকে,
–” আমি তোমাদের কাউকে দোষ দেই না। আবার, নির্দোষও ভাবতে পারি না। তোমরা চাইলেই পারতে আমার দিকে তাকিয়ে এক সাথে থাকতে। কিন্তু, তোমরা ভাবলে নিজেদের কথা, নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য। আমি তখন অনেক চেষ্টা করেছিলাম তোমাদের বুঝাতে। ব্যর্থ হয়েছিলাম। শেষমেশ নিজেকে বুঝানো শুরু করলাম। সেখানে সফল হয়েছি। নিজের সাথে একটা চুক্তি করেছিলাম, তোমাদের থেকে দুরে থাকবো। সেটাই রক্ষা করছি।”

রিমা ইয়াসমিন চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলায়। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। রাহুল ব্যাথাতুর হেসে বললো,
–” অহংকার আর অভিমান, এই দুইটা জিনিস আমার পরিবারটাকে ভে’ঙে দিলো, আম্মু! আমি আজও সেই ভা’ঙা টুকরোগুলোর মাঝে বেঁচে আছি।”

ঘরে দীর্ঘ নিরবতা। রাহুল উঠে দাড়ায়।
–” আমাকে যেতে হবে, আম্মু! নিজের খেয়াল রেখো।”

রিমা ইয়াসমিন তাকে থামিয়ে দেয়। কন্ঠ কেঁপে ওঠে,
–” রাহুল! আমি নিজের হাতে রান্না করেছি, বাবা!”

রাহুল তাকায় মায়ের চোখে। সেখানে এক নিঃশব্দ আকুতি, এক অসহায় ভালোবাসা।
–” তুমি অফিস যাওনি আজ?”

রিমা ইয়াসমিন ধীরে উত্তর দেয়,
–” গিয়েছিলাম। অফিস থেকেই তোমাকে কল করেছিলাম। তুমি যখন বললে আসবে, তখন বাসায় চলে এলাম। রান্না করলাম।”

রাহুল কোনো কথা বলে না। শুধু চোখ নামিয়ে রাখে। রিমা এগিয়ে এসে তার সামনে দাড়ায়।
–” আমি জানি, এই সময় তুমি ডিনার করো না। কিন্তু, আজ খেয়ে যাও, বাবা!”

দীর্ঘ নিরবতার পর রাহুলের মুখ থেকে আসে একটা ছোট্ট শব্দ,
–” ওকে!”

রিমা ইয়াসমিনের মুখে তখন এক দীপ্তি ফুটে উঠে। যেন হাতে চাঁদ পেয়েছেন। চুপচাপ চোখ মুছে তাড়াতাড়ি রান্না ঘরের দিকে ছুটে যান। সার্ভেন্টদের সহায়তায় ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাতে শুরু করে। রাহুল নিঃশব্দে জানালার পাশে এসে দাড়ায়। বাইরে শহরের আলো ঝলমল করছে। গাড়ির হেডলাইট, উচু বিল্ডিংয়ের জানালার ঝিকিমিকি, রাস্তায় চলাচল মানুষ। সব কিছুই চকচকে তবুও মলিন।

এই আলো আর অন্ধকারের মাঝখানেই দাড়িয়ে আছে সে। একজন পূত্র, যে তার নিজের ঘরেও অতিথির মতো আজও। একজন মা, যে তার সন্তানের সামনে দাড়িয়ে থেকেও ছুঁতে পারে না পুরোপুরি। রাহুল ঘুরে তাকায়। দেখতে পায় তা মায়ের নিঃশব্দ আনন্দ। রাহুল জানালায় হেলান দিয়ে ফিসফিস করে নিজের কাছেই বলে,
–” তুমি কি জানো, আম্মু? ভালোবাসা যদি ঠিকমতো ভাগ না হয়, তবে সেইটা কাউকে বাঁচিয়ে রাখে না। কেবল পোড়ায়।”

রাতের নিস্তব্ধতায় শহর তার মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে। আরোহি বিছানার উপর ছোট্ট ডেস্ক সেট করে সেখানে পড়ছে। পাশে স্নেহা বসে আছে। বিছানার উপর বই, খাতা, পেনসিল, সব ছড়িয়ে আছে। আরাফ নিজের রুমে, ল্যাপটপ স্ক্রিনে চোখ গুঁজে অফিসের ফাইল সামলাচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তি জমে আছে, কিন্তু অফিসের দায়িত্ব থেমে থাকে না। দুপুরে মেয়েকে বেশ সময় দেওয়া লাগে। যার জন্য অফিস থেকে ফিরতে দেরিও হয়ে যায়, পাশাপাশি বাসায় এসেও কাজ করা লাগে। আরোহি পেন্সিল রেখে বলে,
–” পিউমনি! আল ইচ্ছে কলছে না লিখতে।”

স্নেহা হালকা স্বরে বলে ওঠে,
–” আরেকটু আছে মা! শেষ করো। এই দেখো এই পৃষ্ঠা শেষ হলেই আজকের হোমওয়ার্ক শেষ।”

আরোহি ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
–” না, পিউমনি! হাত ব্যাথা কলছে। আমি আল লিখবো না।”

স্নেহা একটু নিঃশ্বাস ফেলে ভাইঝির দিকে তাকায়। আজ তার নিজের ভেতরেই ঝর বয়ে যাচ্ছে। মনটা সকাল থেকেই তো ঠিক নেই। সারাদিন মাথার ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে নেহালের মুখ। আজ সারাদিন ভার্সিটি যায়নি সে, বাসায়ও আসেনি, একা একা ঘুরেছে। প্রথমে এক রেস্টুরেন্টে বসে ছিলো ঘন্টাখানেক, তারপর পার্কে গিয়ে বসেছিলো। সারাদিন খাওয়াও হয়নি তার। চোখ থেকে নোনাজল গড়িয়ে পড়েছে বারবার। এতো সময়ে হয়তো নেহালের বিয়ে হয়ে গেছে। আজ থেকেই তার জীবনের শুরু হচ্ছে নতুনত্ব। স্নেহার বুকে মোচড় দিয়ে উঠছে। স্নেহা আবার তাকায় আরোহির দিকে। আরোহি পেনসিল দিয়ে আঁকিবুঁকি করছে। আরোহিকে পড়াতে অনেক ধৈর্য্যের প্রয়োজন হয়। স্নেহার অবশ্য সেই ধৈর্য্য আছে। কিন্তু, আজ সেই ধৈর্য্য কাজ করছে না। স্নেহা একটা দীর্ঘশ্বার ফেলে বললো,
–” মা! আরেকটু আছে, করো।”

–” না! আল কলবো না।”

কথাটা বলেই দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় আরোহি। স্নেহা ডাকতে গিয়েও ডাকে না। যে মন ভে’ঙে চুরমার হয়ে আছে, তার আর কাকে থামানোর ক্ষমতা থাকে? ঘরের লাইট বন্ধ করে স্নেহা শুয়ে পড়ে বিছানায়। অন্ধকারের ভেতর নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠে।চোখের সামনে আবার নেহালের মুখ ভেসে উঠে। তার হাসি, তার গলার সুর, এক সাথে পার্কে সময় কাটানো, সব কিছুই জীবন্ত। সেই মানুষটা আজ অন্যকারো। এই মুহুর্তের জন্য স্নেহার মনে হয়, বুকের ভেতর কেউ সবটুকু আলো ছিনিয়ে নিয়েছে।

স্নেহার চোখের কোণে জমে থাকা নোনাপানি গড়িয়ে পড়ে বালিশে। বালিশে মুখ গুজে হুহু করে কান্না করে উঠে সে। বুকের ভেতর কেউ যেন অজস্র ছু’রি চালাচ্ছে, আর তার প্রতিটা শব্দে নেহালের মুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে অন্ধকারের ভেতর।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ