Saturday, June 6, 2026







চন্দ্রবিন্দু পর্ব-০৪

#_চন্দ্রবিন্দু_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৪_

সকাল আটটা।
রাহুলের চোখ বন্ধ। সারারাত নিজের জগতে বিচরন করে, ভোর চারটায় এসে শুয়েছিল সে। এখনো গভীর ঘুমে নিমগ্ন। হঠাৎ, কলিং বেলের আওয়াজে কেঁপে ওঠে নীরবতা। রাহুল কুঁকড়ে উঠে। চোখ কচলাতে কচলাতে মাথা তুলে দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়ির দিকে তাকায়, ৮টা বাজে। মাথার ভেতর বিরক্তির ঢেউ খেলে যায়। এই সময়ে কে আসলো?

বেল আবার বাজে। রাহুল বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। এলোমেলো চুল, চোখে ঘুম, গায়ে পাতলা টি-শার্ট আর থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরে দরজার দিকে এগোয়।
দরজা খুলতেই চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। সামনে দাঁড়িয়ে এক অচেনা মেয়ে। মেয়েটির মুখে এক ধরনের অপ্রস্তুত বিভ্রান্তি, কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে, চোখে হালকা ভ’য়ভরা অনিশ্চয়তা। রাহুল ভ্রু কুচকায়। গলায় রুক্ষ ঘুমন্ত স্বর,
–” এখানে কি চায়?”

মেয়েটি এক মুহূর্ত ইতস্তত করে বলে,
–” আমি, আমি স্নেহা! তৃধাকে পড়াতে এসেছি।”

রাহুলের কপালে ভাঁজ পড়ে।
–” তৃধা?”

–” হ্যাঁ! আমি ওর নতুন টিউটর। আজ থেকেই শুরু করার কথা।”

–” তৃধা তো পাশের ফ্ল্যাটে থাকে।”

স্নেহার মুখ লাল হয়ে ওঠে। ভুল বুঝতে পেরে কিছুটা অপ্রস্তুতভাবে বলে,
–” ওহ! আমি খুবই দুঃখিত। বুঝতে পারিনি।”

রাহুল মাথা নাড়ে।
–” ইট’স ওকে!”

স্নেহা তাড়াতাড়ি পাশের দরজার দিকে এগোয়। কলিং বেল টিপে দেয়। পেছন ঘুরে তাকাতেই দেখে রাহুল এখনো দরজায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
অজান্তে বুকের ভেতর এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে, কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ পায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাশের দরজা খুলে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে এক ভদ্র, পরিপাটি মহিলা। মুখে উষ্ণ হাসি। স্নেহা কিছু বলার আগেই রাহুল পেছন থেকে বলে ওঠে,
–” কেয়া ভাবি! তৃধার টিউটর আসার কথা ছিল?”

মিসেস কেয়া হেসে বলে,
–” হ্যাঁ, রাহুল! আজই প্রথম দিন, কনফার্ম করেছিলাম গতকাল।”

রাহুল সামান্য হাসে।
–” এই মেয়েটিই টিউটর। ভুল করে আমার ডোরবেল বাজিয়েছে।”

মিসেস কেয়া স্নেহার দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ গলায় বলেন,
–” তুমি স্নেহা?”

–” জি, আমি।”

–” ওহ, ঠিক আছে। সরি রাহুল, ও বুঝতে পারেনি নিশ্চয়ই। তুমি কিছু মনে কোরো না ভাই।”

রাহুল হেসে বলে,
–” না, ভাবি! কোনো সমস্যা নেই।”

মিসেস কেয়া স্নেহাকে বললেন,
–” এসো, স্নেহা! ভেতরে এসো।”

স্নেহা এক মুহূর্তের জন্য আবার পিছনে তাকায়। রাহুলের চোখ এখনো তার দিকেই। স্নেহা তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে যায়। রাহুল কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে ফেলে।
ঘরের আলো আবার অন্ধকারে ডুবে যায়। সে ফিরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। রাহুলের ঠোঁটে এক অচেনা, অবচেতন হাসি খেলে যায়।

বিকেল গড়িয়ে এসেছে। হালকা সোনালি রোদ শহরে ছায়া ফেলেছে। আরোহি আজও প্রতিদিনের মতো সায়েরা খাতুনের হাত ধরে বেরিয়েছে খেলতে। তাদের দেখা মেলে গেটের কাছে জারিফার সঙ্গে। জারিফা আরোহিকে দেখেই হেসে উঠে, সেই হাসিতে যেন এক অদ্ভুত মায়া লুকিয়ে থাকে। আরোহিও উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠে,
–” জালিফা আন্টি!”

এই ভুল উচ্চারণে রাগ হয় না জারিফার, বরং হাসি চেপে রাখতে পারে না। সে এগিয়ে এসে আরোহিকে কোলে তুলে নেয়। সায়েরা খাতুন মৃদু হেসে বলেন,
–” কেমন আছো, মা?”

জারিফা ভদ্র কণ্ঠে জবাব দেয়,
–” জি আন্টি, ভালো। আপনি ভালো আছেন তো?”

–” এইতো আছি ভালো।”

আরোহিকে কোলে নিয়েই পার্কে আসে জারিফা।
পার্কে ঢুকে তারা তিনজন নিজেদের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আরোহি খেলার দোলায় মেতে ওঠে, কখনো দৌড়ায়, কখনো বল ছোঁড়ে, আবার কখনো ঘাসে বসে ফুল কুড়িয়ে হাসে। পাশে বেঞ্চে বসে সায়েরা খাতুন আর জারিফা গল্পে মগ্ন। কথা বলতে বলতে সায়েরা খাতুনের মনে হয়, মেয়েটা সত্যিই কত মিষ্টি! মুখে শান্তির ছায়া, কথাবার্তায় পরিমিত কোমলতা, যেন অচেনা হয়েও আপন মনে হয়।

একসময় জারিফা নিজেই আরোহির সঙ্গে খেলায় নেমে পড়ে। বল ছোড়াছুড়ি, লুকোচুরি, হাসি আর কোলাহলে মেতে ওঠে চারপাশ। সায়েরা খাতুন দূর থেকে চেয়ে থাকেন, চোখে অদ্ভুত তৃপ্তি। মা-মরা মেয়েটি আজ যেন প্রাণ খুলে হাসছে। জারিফার বুকেও এক মায়া ভর করে। আরোহির নিষ্পাপ মুখে চোখ রাখলেই তার মনটা কেমন নরম হয়ে আসে।

জারিফার খুব আকারে দেখতে ইচ্ছে করে, আরাফ নামক ব্যাক্তিটিকে। সায়েরা খাতুন গল্পের মধ্যে আরাফের কথা টানেন। কীভাবে তিনি নিজের মেয়েকে নিয়েই বাঁচেন, কেমন করে প্রতিদিন ছোট ছোট বিষয়ে আরোহির যত্ন নেন। জারিফা মন দিয়ে শোনে, নিঃশব্দে এক অচেনা আকর্ষণ জমে তার মনে।
বিকালের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। পার্কের বাতাসে শিশিরের গন্ধ। আরোহি এখনো খেলে, জারিফা মৃদু হেসে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

রাত হয়েছে।
ডাইনিং টেবিলের উষ্ণ আলোয় বসে আছে আরাফ ও তার পরিবার। আরাফ মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছে। অন্য পাশে বসে খাবার খাচ্ছে, স্নেহা, আফজাল খান আর সায়েরা খাতুন। আরাফ ধীরে ধীরে আরোহিকে খাইয়ে দিচ্ছিলো। হঠাৎ সে মুখ তুলে বললো,
–” আজ তো তোর টিউশনির প্রথম দিন ছিল, না?”

স্নেহা মাথা নিচু করে নরম গলায় বলে ওঠে,
–” জি, ভাইয়া!”

আরাফ সামান্য থেমে তাকায় বোনের মুখের দিকে।
–” কিন্তু তোর কি দরকার ছিল আবার টিউশনি করার? তোর যদি কিছু প্রয়োজন হয়, আমাকে বললেই তো হয়। আমি কি দিই না?”

স্নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
–” ভাইয়া! আমি টাকার জন্য টিউশনি করছি না। শখ করে করছি। আর তাছাড়া, টিউশনি করলে চাকরির পরীক্ষার জন্য সুবিধা হয়। বেসিকটাও ঠিক থাকে।”

আরাফ মৃদু মাথা নাড়ে।
–” তা ঠিকই বলেছিস। শখের কাজ বললে তো কিছু বলার নেই। কিন্তু সকাল সকাল গেলে তোর জন্য প্রেশার হয়ে যাবে।”

–” না ভাইয়া, আজ প্রথম দিন ছিলো তাই সকালে গিয়েছিলাম। কাল থেকে বিকেলে করাবো।”

–” ঠিক আছে!”
বললো আরাফ, আরোহির মুখ মুছতে মুছতে। আরোহি খাওয়া শেষ করে টিভির সামনে গিয়ে বসে। ঘরে টেলিভিশনের মৃদু আলো ঝলমল করছে। স্নেহা তখনও প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু হাত চলছে না। মনে হচ্ছে খাবার গলায় নামছে না আর। সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যই টিউশনি নিয়েছে। নিজেকে ভুলিয়ে রাখার এক নিঃশব্দ চেষ্টা। নেহালের মুখ, তার কণ্ঠ, তার প্র’তা’র’ণা, সব কিছু যেন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ আফজাল খানের কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
–” স্নেহা!”

স্নেহার চেতনা ফিরে আসে।
–” জি, আব্বু!”

–” খাচ্ছো না কেন?”

–” খাচ্ছি, আব্বু!”

সায়েরা খাতুন নীরবে মেয়ের প্লেটে আরও এক টুকরো মাংস তুলে দেন। স্নেহা কিছু না বলে ধীরে ধীরে খাওয়া শুরু করে। চারজনেই নিঃশব্দে খাবার শেষ করে। এরপর আরাফ আরোহিকে কোলে নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। একে একে সায়েরা খাতুন ও আফজাল খানও নিজেদের রুমে ঢুকে পড়লেন। সবশেষে স্নেহা নিজের ঘরে এলো। ঘরটা আধো অন্ধকার, কিন্তু শহরের আলো জানালা পেরিয়ে এসে ঘরটাকে হালকা আলোয় ভরিয়ে তুলেছে।

স্নেহা বিছানায় শুয়ে পড়ে। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের বাতাস ঢুকে পড়ছে। নেহালের মুখ, সেই পুরনো দিনগুলো, ভালোবাসার মিষ্টি প্রতিশ্রুতি আর বি’শ্বা’সঘা’তক’তার তীব্র দহন, সব মিলে ভেতরটা ভারী হয়ে উঠে। চোখের কোণে একফোঁটা জল জমে উঠে। সেই জল চুপচাপ গড়িয়ে পড়ল বালিশে, কোনো শব্দ না করে, কোনো অভিযোগ না রেখে।

রাতের আলো নিঃশব্দে তার মুখে পড়ে থাকে। আর শহরের কোলাহলের মধ্যেও একা স্নেহা বুঝতে পারে, নীরবতা কখনও কখনও চিৎকারের চেয়েও বেশি তীব্র।

রাত গভীর।
শহরের বুক চিরে নিয়ন আলোয় ঝলমল করছে একটা বার। কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরে তাকালে মনে হয়, যেন আলো-ছায়ার খেলার এক ভেতরের জগৎ, যেখানে সময়, নিয়ম, বা বাস্তবতা সবই ম্লান। ভেতরে তীব্র সঙ্গীত বাজছে। স্টেজে নাচছে তরুণ-তরুণীরা, চারপাশে ছড়িয়ে আছে মদ, ধোঁয়া, আর হাসির কোলাহল। বড়লোকের ছেলেমেয়েরা এখানে এসে প্রতিদিনের একঘেয়েমি ভুলে যায়, নেশায় ডুবে যায় নিজের মতো করে।

এক কোণে বসে আছে রাহুল। তার চারপাশে শুভ্র, রিহান, আকাশ আর অঙ্কন। টেবিলের উপর রাখা কয়েক বোতল ওয়াইন, বরফে, সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, ফ্রেন্স ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, লেবুর টুকরো, মিনারেল ওয়াটার, সব মিলিয়ে যেন অগোছালো এক উৎসবের আয়োজন। শুভ্র এক চুমুক নিয়ে হেসে বলে,
–” দোস্ত! একবার ট্যুর দেওয়া দরকার।”

অঙ্কন সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেয়,
–” গেলেই তো হয়।”

রিহান প্রশ্ন করে,
–” কোথায় যাবি?”

আকাশ উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে ওঠে,
–” সুইজারল্যান্ড চল, ভাই!”

শুভ্র এবার রাহুলের দিকে তাকায়,
–” রাহুল, তুই বল কিছু।”

রাহুল চুপচাপ। ওর চোখ স্থির হয়ে আছে হাতে ধরা ওয়াইনের গ্লাসে। গ্লাসের ভেতরের লালচে তরলটায় যেন সে নিজের মুখ, নিজের অস্থিরতাকেই খুঁজছে।
ওদের কথাগুলো যেন দূর থেকে ভেসে আসছে, একটা ঝাপসা আওয়াজ মাত্র। শুভ্র হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে,
–” এই, রাহুল!”

রাহুল চমকে ওঠে। গ্লাসটা টেবিলে রাখে।
–” হ্যাঁ, বল।”

শুভ্র কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
–” কি হয়েছে তোর?”

রাহুল চারপাশে তাকায়। চারজন বন্ধুর চোখে একই প্রশ্ন, অবাক আর উদ্বেগের মিশেল। সে হাসার চেষ্টা করে বলে,
–” কিছু হয়নি তো।”

রিহান ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে,
–” আসার পর থেকেই দেখতেছি তুই প্রচণ্ড অন্য মনস্ক। কোনো সমস্যা? শরীর খারাপ নাকি?”

রাহুল মাথা নাড়ে,
–” না, আমি ঠিক আছি। তোরা কিছু বলছিলি, বল।”

শুভ্র বলে,
–” আকাশ বলছিল সুইজারল্যান্ড ট্যুরে যাওয়ার কথা।”

রাহুল এক মুহূর্ত চুপ থেকে নিচু গলায় বলে,
–” আমি আপাততো কোথাও যাচ্ছি না।”

আকাশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
–” কেন?”

রাহুল গ্লাসটা সরিয়ে রাখে।
–” কোনো কারণ নেই। তোরা থাক, আমি আজ গেলাম। একটু ঘুমাতে হবে।”

ওদের কারো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রাহুল উঠে দরজার দিকে হাঁটা দেয়। চারজন বন্ধু চুপচাপ ওর পেছনের দিকে তাকিয়ে থাকে, বিস্মিত, হয়তো একটু উদ্বিগ্নও। বারের বাইরে ঠান্ডা হাওয়া লাগতেই রাহুলের গা কেঁপে ওঠে। বাইরের নিস্তব্ধতা আর ভেতরের কোলাহলের পার্থক্যটা যেন বুকের ভেতর তীব্রভাবে ধা’ক্কা মারে।

আজ সারাদিন ধরে সে এক অদ্ভুত অস্থিরতার মধ্যে আছে। কোনো কিছুতে মন বসছে না, কথায় আগ্রহ নেই, বারবার শুধু মনে পড়ছে সকালে দেখা মেয়েটির মুখ। স্নেহা। কি অদ্ভুত এক কোমলতা ওর চেহারায়।
রাহুল অনেক মেয়েকে দেখেছে জীবনে, বন্ধুদের আড্ডায়, ভার্সিটিতে, পার্টিতে, বারএ। কিন্তু কেউ কখনো এমনভাবে ওর ভেতর ঢুকে যায়নি। সেই মায়াবী চোখদুটি, যেন নরম কোনো আলো ছুঁয়ে যায় বুকের ভেতর। সেই চোখের দৃষ্টিতেই এক মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিল রাহুলের সমস্ত তন্দ্রা।

গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে রাহুলের মনে হয়, সেই দৃষ্টিটা এখনও তাকিয়ে আছে তার দিকেই, নীরবে, অজান্তে। রাহুল গাড়িতে উঠে বসে। রিয়ারভিউ মিররে নিজের মুখ দেখে হালকা থেমে যায়। চোখের কোণে যেন সেই চাহনি আবার ফিরে আসে। ঠোঁটের কোণে এক মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, অবচেতনের হাসি। সে নিজেই অবাক হয়। এই মেয়ে, যাকে সে মাত্র একবার দেখেছে, সেই কেন এখন রাহুলের নিঃসঙ্গ রাতের একমাত্র আলো?

গাড়ি ধীরে ধীরে অন্ধকার রাস্তায় গড়িয়ে যায়। পিছনে পড়ে থাকে বারের উজ্জ্বল আলো, হাসির শব্দ, আর ধোঁয়ায় মিশে যাওয়া কোলাহল। শহরের আলো ক্রমে ঝাপসা হয়ে যায়। আর রাহুলের ভেতরে জমে ওঠে এক অনির্বচনীয় কৌতূহল, এক মেয়ের জন্য। যাকে সে এখনো চেনে না, তবুও যার মুখ ভুলে থাকা অসম্ভব।

রাত বেশ গভীর। শহরের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছে, যেন আকাশও আজ ক্লান্ত। দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক, আবার নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতার মাঝেই বারান্দায় বসে আছে আরাফ। চারপাশ অন্ধকার, শুধু টেবিলের উপর দুটি মোমবাতির আলো নরম কাঁপনে জ্বলছে। আলোয় ছায়া পড়ে তার মুখে, এক ক্লান্ত পুরুষের মুখ, যার ভেতরে বয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দ ঝড়।

আরাফের হাতে ধরা একটা ফটো ফ্রেম। ছবিটিতে এক নারীর মুখ, চোখে মায়া, ঠোঁটে শান্তির হাসি। ছবির দিকে তাকিয়ে যেন সময় থেমে গেছে। আরাফ ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
–” হ্যাপি বার্থডে, মিরা! শুভ জন্মদিন, বউ!”

কণ্ঠটা কেঁপে আসে। এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে আরাফের গাল বেয়ে। মোমের আলোয় সেই ফোঁটা যেন ঝলমল করে ওঠে এক ক্ষণিক তারার মতো।
–” জানো, মিরা! আমি আমাদের মেয়েকে ফুলের মতো করে বড় করছি। ওর মুখের আদলটা না, একদম তোমার মতো। যখন হাসে, আমার মনে হয় তোমাকেই দেখছি। ওর খিলখিল হাসিতে আমার সব ক্লান্তি হারিয়ে যায়। আমার রাজকন্যাকে আমি আগলে রাখি, একটুও যেন কষ্ট না পায়।”

আরাফের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কণ্ঠে গাঢ় আবেগ জমে।
–” আমি কখনো বিয়ের কথা ভাবিনি, মিরা! পারিনি। কারণ তোমার জায়গায় কাউকে বসাতে পারবো না। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিয়ে করলে তো বউ পাবো, কিন্তু আমার মেয়ের মা আর পাবো না। ওর জন্য সেটা অন্যায় হবে। যদি কখনও কেউ ওর প্রতি বিরক্ত হয়, একটা কথা বলে ফেলে, আমার মেয়েটা সহ্য করতে পারবে না। ওর ছোট্ট মাথায় চাপ পড়বে। তাই সব কাজ আমি নিজে করি। আমার মা আর বোনকে পর্যন্ত কিছু করতে দিই না। আমার মেয়ের যত্ন আমিই নিই। যেন ও বুঝতে না পারে, ওর মা নেই।”

আরাফের গলা ভারী হয়ে আসে। চোখ দিয়ে অবারিত জল গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সে থামে না। যেন প্রতিটি ফোঁটায় একটা করে স্মৃতি ঝরে পড়ে, একটা করে প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা, হারানোর বেদনা। সে ফিসফিস করে বলে,
–” মিরা! আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সব সময় ওকে এইভাবে আগলে রাখবো। এটাই তোমার জন্মদিনে আমার উপহার। আমাদের মেয়েকে আমি কখনো দুঃখে ভরতে দেবো না। এখন ঘুমাচ্ছে বিছানায়, এলোমেলো হয়ে, ছোট্ট হাতটা ছড়িয়ে। আমি এখনই গিয়ে ওকে বুকে টেনে নেবো। যেন আমার শরীরের গন্ধে ও মায়ের গন্ধ অনুভব করতে পারে। যেন ওর মনে কোনো অভাব না থাকে। আমি তোমাকে অনেক ধন্যবাদ জানায়, আমাকে অন্তত এই প্রান ভোমরাটা দিয়ে গেছো। আমার জীবনের একমাত্র অবলম্বন আমার তোমার ভালোবাসার চিহ্ন, আমাদের সন্তান, আমাদের মেয়ে।”

আরাফ নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চোখ মুছে ফটোফ্রেমের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আস্তে করে ঠোঁট ছোঁয়ায় ছবির ওপরে। যেন এটাই তার চিরকালের প্রার্থনা। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সে। ঘরে ফিরে আসে। ফটোটা আলমারির ভেতরে রেখে দেয় যত্নে। তারপর বিছানার দিকে তাকায়। সেখানে ঘুমিয়ে আছে তার সমগ্র পৃথিবী, তার বী’র্য থেকে তৈরি প্রাণ, তার মিরার শেষ স্মৃতি, তাদের মেয়ে আরোহি।

এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে সে, তারপর নরম পায়ে গিয়ে মেয়েটার পাশে শুয়ে পড়ে। আলতো করে টেনে নেয় তাকে বুকে। আরোহি ঘুমের ঘোরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে, মুখ লেগে যায় আরাফের বুকে। হয়তো স্বপ্নে সে মাকে অনুভব করছে। আরাফের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠে। মেয়েকে আগলিয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে যায় সে।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ