#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_২
#জান্নাত_সুলতানা
-“মাহদি।”
এই নাম শুনে দিয়া চমকিত। থমকিত। ভীষণ আশ্চর্য সে। এই নামে একমাত্র তাকে একজন মানুষ ডাকে। এটা নিয়ে সত্যি সে আশ্চর্য হয়। বাড়িতে কাজিন দল কখনোই তাকে এই নামে ডাকে না। শুধু মাত্র একজন। আর সেই একজন মাত্র মানুষ টি আভিরাজ ভাই। দিয়ার পা তখন ও স্থির। যা দেখে পেছন থেকে আবারও আভিরাজ ভাই বলে উঠলো,
-“কথা কানে যায় না?”
গম্ভীর স্বর দিয়া একটু চমকে উঠলো। এতো বছর পর আভিরাজ ভাই কে দেখবে সে। খুশিতে না-কি ছয় বছর আগের ঘটনা মনে পরে তার নার্ভাস লাগছে সে সেটাও বুঝতে পারে না। কাঁধের ব্যাগ টা চেপে ধরে সে চোখ দু’টো খিঁচে দাঁড়িয়ে রইলো। তখনই শুনতে পেলো নাফিজা আসছে ওকে ডাকতে ডাকতে। মেয়ে টার ওর পেছনেই ছিলো হঠাৎ হাওয়া হয়ে আবার কোত্থেকে উদয় হলো কে জানে। দিয়া আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল। আভিরাজ ভাই দাঁড়িয়ে আছে। নিজের কক্ষের সামনে। শার্টের বাটন ওপরের দিকে খোলা আছে। দিয়া মুখের দিকে তাকানোর সাহস পেলো না। মাথা টা নিচু করে সে বলে উঠলো,
-“জি ভাইয়া।”
আভিরাজ দিয়ার কথা অগ্রাহ্য করে নাফিজার দিকে তাকিয়ে বললো,
-“আম্মু কে বল আমার জন্য একটা কফি দিতে।”
আভিরাজ ভাই আগে থেকেই কফি খায়। নিশ্চয়ই এটার জন্যই দিয়া কে ডেকে ছিলো। দিয়ার ভীষণ খারাপ লাগলো। সে কি সব ভেবে নার্ভাস হচ্ছে। নাফিজা যেতেই আভিরাজ ও দরজা বন্ধ করে রুমে চলে গেলো। দিয়া তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজেও রুমের দিকে এগিয়ে এলো। বিকেল থেকে ফ্রেন্ড’দের সাথে প্রচুর ঘুরাঘুরি হয়েছে। শরীর টা এখন কেমন একটা লাগছে। গরমে ঘেমে চিটচিটে শরীর নিয়ে সে আগে ওয়াশ রুম গেলো। তখন বাইরে থেকে নাফিজা ডাকলো। বললো,
-“আপু খাবার খেতো চলে এসো। সবাই নিচে আছে।”
-“তুই যা। আমি পরে আসছি।”
নাফিজা আচ্ছা বলে বিদায় নিলো। দিয়া গোসল দিয়ে যখন বেরুল তখন রাত সাড়ে সাত টা। ওর শরীর ক্লান্ত লাগছে। বিছানায় একটু গড়াগড়ি করে খেতে যাবে ভাবলো। এরপর বিছানায় আয়েশ করে শুয়ে পড়লো।
——
ইশতিয়াক চৌধুরী বাড়ি ফিরেছেন। নিজের ছেলের চেয়ে ও বেশি তিনি আভিরাজ কে স্নেহ করেন। আভিরাজ ও নিজের চাচা কে বেশ সম্মান করে। দু’জন দু’জন কে দেখে আশ্চর্য তো হয়েছে তবে কেউ তা প্রকাশ করলো না। কেননা আভিরাজ চলতি মাসে বাড়ি আসবে তিনি এটা জানতেন। তবে আজই চলে আসবে সেটা ভাবে নি। ভাতিজার সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়ে করে তিনি নিজের কক্ষে গেলো। লিভিং রুমে মেলা বসেছে। এগারো জন সদস্যের মধ্যে দিয়া মিসিং। আভিরাজ চক্ষুদ্বয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো। কোথাও নেই মেয়ে টা। সবাই ওর সঙ্গে কথা বলছে আগ্রহ দেখাচ্ছে। মা কাকিরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে রান্না ঘর থেকে ওর সঙ্গে কথা বলছে। আর এই মেয়ের ছায়াও দূর দূর পর্যন্ত নেই।
নীলয়ের হাতে একটা পুতুল। আভিরাজ দেখলো ও কখন থেকে এটা নাড়াচাড়া করতে করতে আভিরাজ কে দেখছে। পুতুল টা লাল শাড়ী পরে বঁধু সাজে আছে। নীলয় আলভি কে জিজ্ঞেস করলো,
-“ভাই ও এভাবে সেজেছে কেনো?”
-“নতুন বউ সাজে এভাবে।”
নীলয়ের প্রশ্নে নাফিজা ওর হাত থেকে পুতুল টা টেনে নিয়ে উত্তর দিলো। কারণ পুতুল টা নাফিজার। অনেক পুরনো পুতুল। ও যখন গিফট বক্স রাখার জন্য নিজের তালা দেওয়া ওয়ারড্রবের ড্রয়ার খুলে ছিলো সেখান থেকেই নীলয় পুতুল টা তুলে নিয়ে চলে এসছে। নাফিজার ছোট বেলার পুতুল এটা। তাই সুযোগ পেতে ও সেটা ছিনিয়ে নিলো।
নীলয় বয়স সাত হলে-ও ওর মধ্যে এখানো যেনো দুই বছরের একটা শিশুর মন-মানসিকতা রয়েছে। জটিলতা কিংবা অন্য সকল বাচ্চাদের মতো তত এক্টিভ নয়। ওকে আদুরে আদুরে সবাই এমন বানিয়ে রেখেছে হয়তো। যতক্ষণ অবুঝ থাকা যায় হয়তো ততক্ষণে পৃথিবী সুন্দর। বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নয়তো সুখশান্তি সব হারিয়ে যায় বাস্তবতার ভীড়ে। নীলয় আলভির কোল বসে আছে। নীলয় বায়না করে আলভি কে বললো,
-“তাহলে আমাদের বাড়িতে একটা নতুন বউ এনে দাও ভাইয়া।”
আলভি সহ সবাই থতমত খেয়ে গেলো। রাশেদুজ্জামান চৌধুরী বসে সোফায়। উনার এদিকে তেমন খেয়াল নেই। উনার হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে অনুমান করা যাচ্ছে, তিনি নিজের ফোনে কারোর সঙ্গে হয়তো বার্তা আদান-প্রদান করছেন। আভিরাজ, আলভি থতমত খেলেও নাফিজা আর ফাহাদ সাথে সাথে হেঁসে ফেললো। ফাহাদ নীলয়ের মাথা টোকা দিলো। হাসতে হাসতে বলে উঠলো,
-“তাহলে তোকে বিয়ে করাতে হবে।”
ফাহাদ নাফিজা দু’জনেই কুটিকুটি করে হাসছে। নীলয় ওদের ওপর অসন্তুষ্ট হলো। বিরক্ত হয়ে সে আলভির কোল থেকে ওঠে গেলো। সিঙ্গেল সোফায় বসে থাকা আভিরাজের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
-“বিয়ে করলেই নতুন বউ দেখতে পারবো? ভাইয়া তুমি তাহলে আমাকে নতুন বউয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দাও।”
নীলয়ের কথার টোন এমন যেনো সে এখানে কারোর কথা তার বিশ্বাস হচ্ছে না। তাই আভিরাজ ভাই কে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হচ্ছে। এপর্যায়ে এসে আভিরাজের গম্ভীর মুখে একটু হাসির ঝিলিক দেখা মিললো। সে নীলয় কে নিজের কোলে তুলে বসালো। মাথায় নীলয়ের লম্বা চুল। সোজা হালকা লালচে চুল চোখের ভ্রু পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। আভিরাজ সেই সিল্কি চুল গুলো নেড়ে দিলো আঙুল চালিয়ে। আশ্বাস দিয়ে বললো,
-“আচ্ছা বড়ো হয়ে যাও। তারপর নতুন বউ এনে দেবো ভাইয়া।”
-“কত বড়ো হতে হবে?”
নীলয় বেশ চিন্তার স্বরে জানতে চাইলো। আভিরাজ, আলভি ফাহাদ কে দেখিয়ে বললো,
-“আলভি, ফাহাদ।”
-“তুমি বড়ো না?”
ছোটদের একটু আধটু কৌতূহল থাকে বেশি। আভিরাজ একটু বিপাকে পড়ে গেলো। তারপরও নিজে কে সামলে জবাব দিলো,
-“হ্ উম হুম।”
-“তাহলে তুমি এখন একটা নতুন বউ এনে দাও আমাকে।”
সিঁড়ি বেয়ে তখন লিভিং রুমে এসে উপস্থিত হলো দিয়া। আভিরাজের দৃষ্টি সদ্য শাওয়ার নেওয়া যুবতী দিয়ার দিকে গেলো। সুতির থ্রি-পিস পরে আছে। কোমরের ছাড়িয়ে যাওয়া চুল খোলাই আছে। মাথায় টানা ঘোমটা। চুল হয়তোবা ভেজা। মুখ থেকে স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে। আভিরাজের চোখ জোড়া শান্ত শীতল হয়ে এলো। গভীর সমুদ্র যেনো। দিয়া এসে দাঁড়ালো নাফিজার সাথে।
নীলয়ের কথায় পরিবেশ কেমন থমথমে হয়ে এলো। নওরিন জাহান ছেলের কথা শুনে একটু তো আশ্চর্য হয়েছে। মাইমুনা, মরিয়ম এবং আভিরাজের মা আরিনা বেগম সবাই ঠোঁট টিপ হাসতে লাগলো আভিরাজের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে। আভিরাজ মায়ের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। নওরিন জাহান ছেলে কে কিছু টা গম্ভীর স্বরে ডেকে বললো,
-“নীল খেতে এসো। তোমার হোমওয়ার্ক করা বাকি এখনো।”
নীলয় যাবে না। জেদ ধরে বসে রইলো। সে এখনই নতুন বউ দেখতে চায়। সবাই বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিতে পারে না। আভিরাজ না পেরে তখন নীলয় কে বললো,
-“আচ্ছা তোকে নতুন বউ দেখাবো। আগে খেতে আয়।”
নীলয় আভিরাজের কথায় বিশ্বাস করলো। সেই বিশ্বাস নিয়ে খেতে গেলে। আভিরাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আলভি আভিরাজ কে অস্থির হয়ে বলে উঠলো,
-“এখন তুমি বউ কোথায় পাবা? মিথ্যা বললে তোমার ও সাথে আর জীবনেও কথা বলবে না।”
-“ডোন্ট প্যানিক। সত্যি সত্যি বউ দেখাবো।”
রাশেদুজ্জামান চৌধুরী ছেলের দিকে আঁড়চোখে চাইলো। এরপর ওঠে ডাইনিং টেবিলের দিকে গেলো। একে একে সবাই যেতে লাগলো। খাবার খাওয়ার সময় হয়েছে এখন।
নাফিজা দিয়ে এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে তখন। নাফিজা দিয়া কে খোঁচা মারলো। জিজ্ঞেস করলো,
-“আপু ভাইয়া কী বিয়ে করে ফেলছে?”
-“আমি তোর ভাইয়ের মনের ভেতর ঢুকে বসে নেই।”
দিয়া ভ্রু কুঁচকে কথা টা বলেই নিজেও ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে গেলো। নাফিজা দিয়ার কথায় ভেবে দেখলো সত্যি তো আপু এই প্রশ্নের উত্তর জানবে না। কেননা সে যেখানে দিয়া আপু তো সেখানেই।
সে নিজে নিজেই বললো,
-“হ্যাঁ,তা তো ঠিক আছে আপু। কিন্তু আমার মনে হয় না ভাইয়া বড়ো মা’কে না জানিয়ে বিয়ে করবে।”
নাফিজা বলতে বলতে পেছনে আসে। দিয়া আর কিছু বললো না। সে গিয়ে নীলয়ের পাশের চেয়ারটায় বসে গেলো।
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
