#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১৭[অন্তিম পর্ব]
#জান্নাত_সুলতানা
দিয়া মাত্র দুপুরে খাবার খেয়ে রুমে এসছে। তখনই শুনতে পেলো ফোন টা বাজছে। যেটা আভিরাজ ভাই তাকে বিয়ের দিন রাতে দিয়েছে। দিয়া ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফোন দেখলো। নম্বর টা সেইভ করা দেখে সে আতংকে উঠলো। তিরতির করে কাঁপতে থাকে হাত। “আভিরাজ” লেখা টা জ্বলজ্বল করছে স্ক্রিনে। দিয়া আস্তে করে সবুজ বাটন ক্লিক করে কল রিসিভ করে। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে অনেক্ক্ষণ পর বললো,
-“হ্যালো!”
-“কী করা হচ্ছে, বউজান?”
“বউজান” বিয়ের তিনদিন পর আভিরাজ ভাই তাকে এমন সুন্দর একটা নাম দিলো। দিয়া হতভম্ব হয়ে কিছু বলতে ভুলে গেলো। শরীর দিয়ে তার শিহরণ বয়ে যায়। আভিরাজ ভাই যে উলটো পালটা নামে ডাকা শুরু করেছে সেই কবেই। তবুও দিয়া এতো সহজে সব ডাক হজম করে নিতে পারছে না। কিন্তু সমস্যা নেই করে নিতে শিখে যাচ্ছে সে৷ এমন ভালোবাসার মানুষ সে মোটেও হাত ছাড়া করতে চায় না৷ কিন্তু তার অনুভূতি সম্পর্কে ও তো তাকে জানতে হবে। দিয়া দম আঁটকে আসে। প্রথমত সে খাবার খাওয়ার পরপরই কথা বলতে পারে না। শ্বাস আঁটকে আসে। দ্বিতীয়ত এখন আভিরাজ ভাইয়ের ব্যবহার সে অভ্যস্ত হতে পারেনি। দিয়া লম্বা শ্বাস টানে। ফিসফিস করে জানায়,
-“মাত্র খেয়ে এসছি।”
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। কিন্তু আভিরাজ ভাই কিছু বলবে এতটুকু সময়ে সেই সময় টা পাওয়া গেলো না। দিয়া আবারও বলে উঠলো,
-“আপনি খেয়েছেন?”
-“না। একটা মিটিং ছিলো। শেষ করে এসে তোকে কল দিলাম।”
-“তিনটি বেজে গিয়েছে। খেয়ে ফেলুন। আমি খেয়েছি।”
-“মাহদি!”
আভিরাজ হঠাৎ করে নাম ধরে ডাকলো। দিয়া হকচকিয়ে গেলো। কেমন অস্থির শোনাচ্ছে কণ্ঠে। দিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলো,
-“কী হয়েছে আপনার?”
-“তোকে দেখতে ইচ্ছে করছে, জান।”
আভিরাজ ফিসফিস করে উত্তর দিলো। দিয়া স্বস্তি পায়। এরপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,
-“মাত্র কিছুক্ষণ আগে দেখা হয়েছে আমাদের।”
-“ভিডিও কল দিচ্ছি। চুপচাপ কল ধর।”
-“ধরলাম না। হুঁ।”
দিয়া নাকচ করে। আভিরাজ গুরুগম্ভীর ভাবে ওপাশ থেকে সাবধান করে,
-“মাহদি, রাগাস না আমায়।”
-“রাগালে কী করবেন?”
-“শাস্তি দেবো।”
-“কাকে?”
দিয়া ভয় না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো। কিছু টা অস্থিরতা। কী শাস্তি দিতে পারে আভিরাজ ভাই? দিয়ার ভাবনার মাঝেই আভিরাজ বলে উঠলো,
-“মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরী কে।”
-“মজা করেন?”
-“অফকোর্স নট।”
-“কল দিচ্ছি না আমি। ঘুম পাচ্ছে আমার।”
বলতে বলতে দিয়া কল কেটে দিলো। আভিরাজ ভাই কে কিছু বলার সুযোগ দেয়া হলো না। দিয়া কল কেটে দিয়ে বিছানায় বসলো। এখন সে একটু ঘুমবে। এরপর সন্ধ্যায় উঠবে।
——
আভিরাজ ভাই বাড়ি ফিরলো রাত করে। চোখ-মুখ লাল। দিয়া দেখে ভয় পেলো। দ্রুত রুমে নিয়ে এসে ঔষধ দিলো আগে। খাবার কী দিবে ভাবতে ভাবতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে এক বাটি সেদ্ধ নুডলস নিয়ে হাজির হলো। আভিরাজ ভাই তা দেখা মাত্র অস্থির হলেন। নিজের জ্বর ভুলে দ্রুত ঔষধ লাগিয়ে দিলো হাতে। কিন্তু একটা টুঁশব্দ করলো না পুরুষ। কিভাবে যে দাঁতে দাঁত চেপে হজম করলো এটা। অথচ দিয়ার এখনো মনে পড়ে আভিরাজ ভাই বিদেশ থেকে ফিরার পরদিন সে জুশের গ্লাস ভেঙে পা কেটে ফেলেছিলো আভিরাজ ভাই তখন তাকে কোলে করে রুমে নিয়ে এসছিলো। ঔষধ লাগিয়ে দিয়েছিলো। যদিও তখন কটুকথা বলেছিলো তাকে। তবুও আজ সেটাও বললো না। দিয়ার আনা খাবার টুকু আভিরাজ তৃপ্তি করে খেলো। দিয়া কে নিয়ে বিছানায় শুয়ে লাইট অফ করলো। দিয়া নীরবতা কাটি এক সময় বলে উঠলো,
-“কী হয়েছে আপনার?”
-“কিছু না।”
আভিরাজ শান্ত স্বরে জানালো। দিয়া তেতে উঠল। নাটক হচ্ছে। কথা বলে না আবার বলে কিছু হয়নি। দিয়া ধমকে ওঠে। কঠিন গলায় বললো,
-“তাহলে কথা বলেন না কেনো?”
-“আমি কথা না বললে তোর কী প্রবলেম?”
আভিরাজ রসাত্মক স্বর। দিয় থতমত খেলো। আভিরাজ ওর দিকে চেপে এলো। দিয়া চমকে উঠল। জ্বরে কী মানুষ টার বোধবুদ্ধি সব গেলো? আরও ঘনিষ্ঠ হতেই দিয়ার শরীর জুড়ে শিহরণ বয়ে গেলো। আমতা আমতা করে বলে,
-“আমি জানি না।”
-“কী জানিস না?”
আভিরাজ জানতে চাইলো। দিয়া আবারও এক উত্তর দিলো,
-“জানি না।”
-“আমি বলবো?”
আভিরাজ দুষ্ট হেঁসে বললো। দিয়া আভিরাজের চোখের দিকে তাকালো। চোখে একরাশ কৌতূহল নিয়ে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলো,
-“ভালোবাসেন আমায়?”
-“তোর প্রমাণ লাগবে?”
আভিরাজ সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলো। দিয়া দুই দিকে মাথা নেড়ে বললো,
-“হ্যাঁ।”
-“ওকে।”
আভিরাজ কাঁধ উঁচিয়ে বললো। আভিরাজ ভাই ওর থেকে সরে এলো। শার্ট টা মাথার ওপর দিয়ে এক টানে খুলে নিলো। দিয়ার গলা শুঁকিয়ে আসে। মেয়ে টা অস্বস্তি লজ্জায় হাতপা মোচড়াতেই আভিরাজ গম্ভীর স্বরে সতর্ক করলো,
-“নড়বে না।”
দিয়া চুপ রইলো। সে ভয় পেলো আভিরাজ ভাই কী করবে? কিভাবে প্রমাণ করবে? আভিরাজ ওর ভাবনার মাঝেই লাইট অফ করে দিয়ার খুব কাছাকাছি আসতেই দিয়া বুঝে গেলো আভিরাজ ভাই কী করতে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে সে নিজের স্বস্তি জানান দিলো। আর দীর্ঘসময় সে আভিরাজের উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে রইলো। যা সংশয় ছিলো নিজের অনুভূতি নিয়ে পুরুষ টার আদুরে হাতের স্পর্শ পেয়ে নিমেষেই সব উবে গেলো। পুরনো অনুভূতির সব অস্বস্তি দূর করে দিয়ে নতুন এক ভয়ংকর ভালোবাসার অনুভূতির সাথে পরিচয় করাল তাকে মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরী। মধ্যে রাতে আভিরাজ দিয়ার দেহ আগলে ফিসফিস করে বললো,
-“মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরী তোকে ভালোবাসে না। এইটুকু সন্দেহ তোর মধ্যে আমি কখনো আসতে দেবো না, জান।”
দিয়া চোখ বন্ধ করে। চোখে মেয়েটার ঘুম রাজ্যের। সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেলো। প্রেমিক পুরুষ বাকিটা রাত ও নিজের প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে কাটাল। তার বিশ্বাস হয়না এমন ছোট তুলতুলে মানুষ টার তার হয়েছে। পুরো সাত বছর সে এমন সুন্দর সুন্দর দিনের জন্যই কতকিছু না করেছে। ভাবলেই বুক কাপে।
—–
-“তোর ব্রেকফাস্ট।”
সকালে সকাল ঘুম ভেঙে দিয়া যেনো সারপ্রাইজড হলো। আভিরাজ ভাই ওর জন্য নাশতা নিয়ে এসছে রুমে। দিয়া খেতে বসলো। খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ করে মনে পড়লো আভিরাজ ভাই খেয়েছে? দোনোমোনো করে জিজ্ঞেস করলো,
-“আপনি খেয়েছেন।”
-“আমি অফিস যাওয়ার সময় খেয়ে নেবো।”
-“আচ্ছা।”
দিয়া খেতে মনোযোগ দিলো। আভিরাজ ভাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। দিয়ার খাওয়া শেষ প্রায়। আভিরাজ ওর জন্য ড্রেস নিয়ে এলো।
-“এপ্লিকেশন শুরু হলে আমি করে দেবো।”
দিয়া মাথা নাড়ে আর ওয়াশরুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলো আভিরাজ ভাই স্যুট বুট পরে একদম রেডি অফিস যাওয়ার জন্য দিয়া আসতেই তিনি আলতো করে মেয়ে টাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-“খুব মিস করব।”
-“আমিও।”
দিয়া কথাটা মুখ ফসকে বলে দিয়ে বুঝতে পারলো সে কী বোকামি করেছে। এই পুরুষ তাকে আজ সারাদিন জ্বালাতন করবে৷ আভিরাজ মিটমিট করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। আর দিয়া ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পরলো। শুতে গিয়ে শরীর জানান দিলো গতরাতে আভিরাজ ভাইয়ের করা পাগলামি। ঠিক তখনই দিয়া লজ্জায় মুখ ঢেকে ঘুমিয়ে গেলো।
—-
পাঁচ বছর পর,
আজকে নাফিজার সাথে আলভির এনগেজমেন্ট। নাফিজা এখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আলভি নিজেদের কোম্পানি জয়েন করার পর সেটা আরও ভালো হয়েছে। নাফিজার জন্য সে এতো বছর অপেক্ষা করেছে এটা সত্যি একটা দারুণ প্রমাণ। ছোট আব্বু যেমন বলেছিলেন তেমন কথা রেখেছেন। ফাহাদ এখন নিজের পড়াশোনা নিজে চালাতে পারে। মূলত সবাই নিজেদের যায়গা থেকে নিজেরা সুখী এবং সফল।
-“ম্মমমা।”
আদোও আদোও কণ্ঠে দিয়ার ভাবনায় বিচ্ছেদ ঘটে। সে নিচু হয়ে মেয়ে কে কোলে তুলে। মেয়ের কপালে চুমু দেয়।
-“তোমাকে প্রিন্সেস লাগছে মা।”
-“আমার মেয়ে প্রিন্সেস। সো প্রিন্সেসই লাগবে, ইট’স নরমাল।”
দিয়া ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে চাইলো। মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছে। দিয়ার চোখ জুড়িয়ে আসে। বাপবেটি কালো রঙের ড্রেসআপ করেছে আজ। মেয়ে কালো প্রিন্সেস ফ্রক। আর বাপ? কালো স্যুটে সে-তো আরও জোয়ান। দিয়া এক দৃষ্টিতে মানুষ টার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সত্যি আজ পাঁচ বছরে একটা দিন ও এমন আসে নি যে দিয়ার সন্দেহ হতে পারে আভিরাজ ভাই ওকে ভালোবাসে না। বরং আশ্চর্য হয় সে এটা ভেবে যে একজন পুরুষ ঠিক কতোটা ভালোবাসতে পারে তার ভালোবাসার মানুষ টাকে৷ দিয়া বলেছিলো প্রমাণের কথা। আর আভিরাজ ভাই প্রমাণ করে দিয়েছে সত্যি সত্যি সে দিয়া কে ভালোবাসে। দিয়া আভিরাজ ভাই কে প্রায় বিরক্ত করে এটা বলে তিনি কী ওকে সত্যি ভালোবাসে? আভিরাজ ভাই তখনই বিরক্ত না হয়ে প্রতিবারের মতো একটাই উত্তর দেয়,
-“আমার আত্মার আত্মীয়া তুই। তোকে ছেড়ে দেওয়া মানেই শরীর থেকে আত্মা বের করে দেওয়া। আর মানুষের আত্মাহীন দেহ মূলহীন।”
আর এভাবে চলতে চলতে পাঁচ বছর চলে গেলো। দিয়ার তো এখনো মনে হয় যেনো সেদিন না আভিরাজ ভাই বিয়ে করলো ওকে। কিন্তু সময়? সে তো ঠিকই চলছে। সময় গুলো সুখের বলেই হয়তো সে টের পাচ্ছে না। আর সে চায় এভাবেই অন্তত কাল চলুক।
~সমাপ্ত।
