#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_১৫
#জান্নাত_সুলতানা
-“শুধু লিটল গার্ল শুনে এতো লজ্জা? আর যখন, জান প্রাণ, সোনা, ময়না, সুইটহার্ট, বেবি গার্ল, বেইবি, গিলা-কলিজা। আরও কতশত নামে ডাকবে তখন কী করবি তুই?”
দিয়া ভিডিও কলে নিজের ফ্রেন্ড’দের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে লজ্জায় বারবার মনোযোগ হারাচ্ছে। দিয়ার লজ্জা মিশ্রিত মুখের দিকে তাকিয়ে ওর দুই ফ্রেন্ড কিছুক্ষণ ওকা খোঁচাখুঁচি করে লজ্জার কারণ বের করে নিয়ে সেই থেকে হাসাহাসি করছে। দিয়া ওদের থেকে বাঁচতে ফোন কেটে দিলো।
-“লিটল গার্ল? কী বলে গেলো আভিরাজ ভাই? মাথা ঠিক আছে তো?”
দিয়া তখনও সেই এক সম্বোধন বিড়বিড় করে যাচ্ছে। আর এভাবে কখন যে চোখে ঘুম নেমে এলো সে টেরই পেলো না। আর যখন ঘুম ভাঙে তখন দরজার বাইরে থেকে তার ভাই এবং মায়ের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিলো। দিয়া ঘুমঘুম চোখে দরজা খুললো। বাইরে মা এবং ভাইয়ের চিন্তিত ফ্যাকাসে চেহারা দেখে দিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“কী হয়েছে?”
-“হয় নি তো। হবে।”
আলভি ঝটপট উত্তর দিলো। দিয়া ভ্রু কুঁচকে নিলো। সে বুঝতে পারছে না এতো রাতে আবার কী হবে? তাই সে ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখেই জানতে চাইলো,
-“কী হবে?”
-“শোনো দিয়া ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো।”
আলভি কিছু বলার আগেই দিয়ার মা বলে। দিয়া ভাবলো ডিনারের জন্য ডাকতে এসছে। তাই সে বলতে লাগলো,
-“আম্মু রাত বারোটা। এতো রাতে কেনো নিচে যাবো? আমি ডিনার করবো না।”
-“মোটেও ডিনারের জন্য ডাকতে আসিনি আমরা তোমাকে।”
মা খুব শান্ত স্বরে বললো। দিয়া মায়ের কথায় অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে,
-“তাহলে কেনো এসছো?”
-“ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো। সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।”
-“ভাইয়া, তুমি অন্তত ভণিতা করো না।”
দিয়া মায়ের থেকে উত্তর পাবে না জেনে হাল ছেড়ে দিলো এবং ভাই কে সুপারিশ করলো। আলভি ওকে ঠেলে ওয়াশরুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললো,
-“তুই ফ্রেশ হয়ে আয়। তারপর বলছি।,”
-“এখন নয় কেনো?”
আলভি এটার উত্তর না দিয়ে বাইরে থেকে ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দিলো। দিয়া তাই কৌতূহল নিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। আলভি তখন বিছানায় বসে আছে। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। দিয়া অবাক হয়। এতো রাতে কিসের শপিং? আগে তো কিছু বলেনি ভাই তাকে। সে সন্দিহান কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“এটায় কী আছে ভাইয়া?”
-“দোপাট্টা।”
আলভি নিশ্চিত করে। দিয়া অবাক হয়ে শুধায়,
-“এটা দিয়ে আমি কী করবো?”
এরপর একটু থেমে দোপাট্টা টা হাতে নিতে নিতে বলে,
-“আচ্ছা তুমি যেহেতু দিয়েছো আমি এটাকে যত্ন করে রাখবো।”
-“এটা আমি দেই নি বোনু।”
আলভি ঠোঁট কামড়ে ধরে অস্থির কণ্ঠে বলে। দিয়া কিছু না বোঝার মতোই ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,
-“মানে?”
-“এটা তোর বিয়ের। আভিরাজ ভাই বিয়ের সময় এটা পরার জন্য দিয়েছে।”
আলভি খুব শান্ত আর স্বাভাবিক ভাবে জানালো। দিয়া চমকে উঠলো। মাথার ভেতর ভনভন করতে লাগলো এক ঝাঁক মৌমাছির দল। তার হাত ঢিলে হয়ে আসে। দোপাট্টা টা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার আগেই সে ওটা সামলে নেয়। আর বিস্ময় নিয়ে আওড়াল,
-“বিয়ে?”
-“হ্যাঁ।”
আলভি মাথা নেড়ে বোনের সন্দেহ কে নিশ্চিত করে। দিয়া এবার একটু শান্ত করতে চায় নিজে কে। জিজ্ঞেস করে,
-“এতো রাতে?”
-“হুম।”
আলভি ওর মাথায় দোপাট্টা পরিয়ে দিতে চায়। দিয়া রাগে, দুঃখে ভাইয়ের হাত সরিয়ে দেয়।
-“আমি এখনো বিয়ে করার জন্য প্রস্তুত না।”
-“একবার শোন আ,,,
-“প্লিজ ভাইয়া।”
দিয়া অসহায় কণ্ঠে আবদার করলো। আলভি এবার পুরোপুরি নিজে কে অসহায় মনে করলো। তবে তার বিশ্বাস ছিলো বোন কখনোই ঠকবে না। সে দিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠলো,
-“বাট আই অ্যাম সরি বোনু।”
-“ভাইয়া।”
-“বোনু আমি তোকে কখনো কোনো কিছুতে জোর করে তোর ওপর কিছু চাপিয়ে দেইনি।”
আলভি শান্ত স্বরে বললো। দিয়া অবাক হয়। ভাইয়ের হাত ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-“তাহলে বিয়ের জন্য কেনো জোর করছো?”
-“রিজন টা তুই নিশ্চয়ই এক সময় বুঝবি।”
আলভি এরপর বেরিয়ে গেলো। ঠিক তখনই বাইরে কয়েক জোড়া পদধ্বনি শোনা গেলো। নীলয় নাফিজা। আর সাথে মেঝো আম্মু এবং ছোট আম্মু এলো। এসেই দিয়া কে তারা দোপাট্টা মাথায় দিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিলো। তার ঠিক কয়েক মিনিট পর-ই আলভি সহ একজন হুজুর আর ওর বাবা এবং আভিরাজের বাবা উপস্থিত হলো। খুব দ্রুত এবং সাধারণ ভাবেই বিয়ে টা সম্পূর্ণ হলে। কনে গায়ে তখন একটা পুরনো থ্রি-পিস এবং মাথায় লাল টকটকে একটা দোপাট্টা। কী অদ্ভুত নিয়তি তার। সে থম মেরে গেলো। ঘোরে থেকে, দিয়ার কাছে এটা স্বপ্নের মতো লাগলো। তবে সে স্বেচ্ছায় এই স্বপ্ন কে বরণ করে নিলো। এবং ইচ্ছে করে স্বপ্ন টা ভেঙে দিলো না। ভাইয়ের ওপর তার বিশ্বাস ছিলো।
——
সবাই যেতেই দিয়া দোপাট্টা খুলে ফেললো। এবং ওয়াশরুম চলে গেলো। নাফিজা ওকে নিচে নিতে এলে দিয়া গেলো না। ওয়াশরুম থেকে এসেই দিয়া হতভম্ব হয়ে গেলো। আভিরাজ ভাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। বুকের ওপর হাত ভাজ করে গম্ভীর চেহারায় স্নিগ্ধতা ছুঁয়ে আছে। গায়ের সাদা একটা পাঞ্জাবি। বলাবাহুল্য তিনি হয়তো গোসল দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। চুলটা তখন ও হালকা ভেজা। কিছু ভেজা চুল কপালের একপাশে পায়ে ঝুঁকে পড়ে ছিলো। দিয়া বিস্ময় চোখে তাকিয়ে রইলো। তবে হঠাৎ করে তার শরীরে ওড়না নেই এটা মনে পড়তেই হকচকিয়ে দ্রুত নিজের ওড়না চেয়ার থেকে তুলে নিজের গায়ে জড়ালো। এরপর ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
-“আপনি?”
-“হ্যাঁ।”
-“আবার কেনো এসছেন?”
আভিরাজের শান্ত স্বরের পরিবর্তে দিয়া রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো। আভিরাজ এবার দরজা ছেড়ে কক্ষে প্রবেশ করলো। আর দিয়া কে আবারও মনে করিয়ে দিলো,
-“তুই সন্ধ্যা রাতের কথা ভুলে গিয়েছিস। সেটা মনে করিয়ে দেই।”
দিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই আভিরাজ ওকে কোলে তুলে নিলো। দিয়া চমকে উঠলো। শরীর জুড়ে শিহরণ বয়ে গেলো। মৃদু কম্পন শরীর কাঁপতে থাকে। মনে পড়ে আভিরাজ ভাই সন্ধ্যায় বলে গিয়েছিল এরপর সে যখনই আসবে তাকে … বাকিটা লজ্জায় মনে করতে চাইলো না দিয়া। তারমানে আভিরাজ ভাই বিয়ে টা এই রাতবিরেত করেছে। শুধুমাত্র সন্ধ্যার ঘটনা কেন্দ্র করে? নিজের কথা বাস্তবায়িত করতে একদম কার্পণ্য করেনি এই পুরুষ।
দিয়ার ভাবনার মাঝেই ওর হাত আভিরাজের কাঁধ থেকে প্রায় ছুটে যাচ্ছিলো। ও চমকে ওঠে আবারও আঁকড়ে ধরে। আর আভিরাজ তখনই রুম থেকে বেরিয়ে আসার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় এবং গম্ভীর স্বরে বলে,
-“বলেছিলাম তো। এখন করে ও দেখালাম।”
-“এটা কোনো কারণ হতে পারে না। এমন একটা ডিসিশন এতো খামখেয়ালি ভাবে নেওয়া উচিৎ হয় নি আপনার।”
দিয়া কঠিন ঝাঁজালো স্বরে বলে উঠলো। সে ভাবতে পারছে না আভিরাজ ভাই এর কী হয়েছে। তিনি হঠাৎ করে কেনো এতোটা পরিবর্তন? দিয়া এসবই ভাবছিলো আভিরাজ তখন ওর কথার বিপরীতে গমগমে গলায় বলে উঠলো,
-“মোটেও আমি তোকে হালকা করে নিচ্ছি না। তুই তোর মতো ভেবে নিলে তো আমার কিছু করার নেই। এনিওয়ে চল, এখন আমরা অন্য কিছুতে ফোকাস করি, জান,।”
দিয়া হকচকিয়ে গেলো আভিরাজের কথা শুনে। মনে পড়ে বান্ধবীর বলা কথা। কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হয় যেনো। গরমে হাসফাস করতে থাকে দিয়া। তার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। সে এই মানুষ টার স্বামী রূপ টা কিভাবে মেনে নিবে? কতটা ভয়ংকর হতে যাচ্ছে তার নতুন জীবন? আভিরাজ ওকে কোলে নিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটছে। দিয়া দৃষ্টি নত করে রেখেছে। আভিরাজ ওর মুখের দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো, -“তোর কোনো আইডিয়াই নেই,
তুই মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরীর লাইফে কতটা ইম্পর্ট্যান্ট। তুই কোনো র্যান্ডম ডিসিশন না,
তুই সেই কিশোর বয়সে অজান্তে নেওয়া এক প্রাপ্তবয়সের পারফেক্ট ডিসিশন, লাভ।”
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
