#আত্মার_আত্মীয়া
#সূচনা_পর্ব
#জান্নাত_সুলতানা
-“আমাকে বিয়ে করবেন, আভিরাজ ভাই?”
দিয়া যখন প্রশ্ন করলো আভিরাজ আঁড়চোখে চাইলো মেয়ে টার দিকে। দৃষ্টি যেনো কোনো বাজপাখির ন্যায়, যা দিয়া কে এক পলকে অবলোকন করে নিলো সম্পূর্ণ টা। পরপরই নিজের কালো রঙের বাইকের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-“তোর বিয়ের বয়স হয়েছে?”
দিয়ার বয়স তেরো। পুরো নাম মাহদিয়া চৌধুরী দিয়া। চৌধুরী বাড়ির বড়ো মেয়ে। সবাই তাকে দিয়া বলেই ডাকে। গায়ের রঙ ফরসা বলা চলে না। লাল সুন্দর বলে যদি কিছু হয়ে থাকে দিয়ার গায়ের রঙ তেমনই। মুখের গড়ন চমৎকার। চোখজোড়া টানা গভীর আর বিস্ময়ভরা অপেক্ষায়। আভিরাজ ভাইয়ের দিকে সেই চক্ষুদ্বয় দৃষ্টি স্থির রেখে তাকিয়ে। তাতে মিশে আছে যেনো বিশ্বাস, আর একরাশ নির্ভরতা। তার চোখ যেনো কথা বলছে।
গালদুটো হালকা গোলাপি নয় আবার গোলাপি আভা দিচ্ছে যেনো। শীতের সকালের মিষ্টি রোদ্দুরের আলো তার ত্বকে এসে পড়েছে। তার ঠোঁটজোড়ায় এক চিলতে ভাঁজ। না ঠিক হাসি, না ঠিক বিষাদ। একটা অদ্ভুত মায়া। যা কোনো স্পষ্ট ভাষায় বোঝানো যায় না।
চুলগুলো খোঁপা করে বাঁধা। কয়েকটা এলোমেলো গোঁফদার চুল কপালের পাশে এসে পড়ে আছে। যা তাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। চোখের নিচে হালকা ছায়া। শুধু গভীর অনুভবের ইঙ্গিত। গায়ে ফ্রক। জিন্স প্যান্ট। আর ফ্রকের ওপর জড়িয়ে রাখা গায়ে শাল। আর দিয়ার সামনের যুবক হচ্ছে মাহমুদুল আভিরাজ চৌধুরী। উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত আট ইঞ্চি হবে। গায়ের রঙ টা নিদিষ্ট করে বলা যায় না। ফরসা নয় আবার শ্যামলা পুরুষ বলা যায়। চেহারায় একধরনের প্রশান্ত সৌন্দর্য মিশে আছে। তীক্ষ্ণ গড়নের মুখে পরিপাটি চাপদাড়ির রেখা। যেনো প্রতিটি রেখায় পরিণত বয়সের ছাপ। দাড়ি ক্লিন শেইভ না, বরং ট্রিম করা দাড়ি আছে। গভীর চোখ জোড়া একরাশ নীরব। চোখজোড়া বড় না হলেও বেশ স্পষ্ট ও সংযত।
ভ্রু ঘন এবং সুশ্রীভাবে গঠিত, চোখের এক্সপ্রেশনকে আরও শার্প করে তোলে। যেনো গুরুগম্ভীর স্বভাবের এই যুবক খুব বেশি কথা না বলেও সে তার উপস্থিতি টের পাইয়ে দিতে পারে।
নাক সোজা ও মাঝারি আকারের ঠিক যেনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা নিখুঁত এক রেখা।
চুলগুলো বেশি বড়ো নয় আবার ছোটও নয়। মাথাভরতি ঘন চুল পরিপাটি। ঠিক যেনো সময়ের চুলচেরা হিসেব রাখা মানুষ। পুরো চেহারায় এমন এক ভারসাম্য। যা একাধারে শহুরে রুচির পরিচায়ক আবার মাটির কাছাকাছিও শান্ত, দৃঢ় আর ধীরস্থির। মুখের গঠনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যা মুখকে আরও ম্যাচিউর এবং আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
শহুরে স্মার্ট যুবক। যিনি দেখতে শান্ত গম্ভীর গোছের একজন যুবক। আভিরাজ আরও কিছু বলার অপেক্ষা কিংবা উত্তর দেওয়ার আগেই দিয়া চলে গেলো সেখান থেকে। আভিরাজ গম্ভীর হয়ে বাড়ির সদর দরজা টার দিকে চাইলো। সেখানে ফিসফাস আর কিছু ছায়ামূর্তি দেখে সে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো গোপনে। এদের আর কাজ নেই। সারাক্ষণ খেলা নিয়ে ব্যাস্ত। এই সাতসকালে কারা খেলে? ওরা খেলতে পারে। আভিরাজ এক সময় গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠলো,
-“ফাহাদ।”
কয়েক সেকেন্ড। দ্বিতীয় বার ডাকার আগেই সদর দরজার পেছন থেকে বেরিয়ে একজন ছেলে দৌড়ে এলো। বয়স বাড়ো তেরো হবে। এসেই দাঁড়াল ভদ্রতার সহিত। আভিরাজ আদেশের স্বরে বলে উঠলো,
-“যা গাছের পানি দে।”
স্কুল, কলেজ বন্ধ। ডিসেম্বরের প্রায় শেষ। যা ক’দিন ছুটি আছে সেটাই এনজয় করছে বাড়ির সকল ছোট বড়ো কাজিন দল মিলে। তাই তো গত রাতে দুই টা বেজে যাওয়ার ফলে আর খেলা সম্পূর্ণ করতে পারে নি। সেই অসম্পূর্ণ খেলাই সকাল সকাল শুরু করেছে। তারউপর বাড়িতে উৎসব উৎসব একটা আমেজও বিরাজমান, কেননা আভিরাজ ভাই আজ সন্ধ্যার ফ্লাইটে লন্ডন চলে যাবে। অথচ এই পুরুষ আজকের দিনেও কি সব কাজটাজ নিয়ে পড়ে আছে। ফাহাদ বিরক্ত হতে গিয়ে ও হলো না। কিন্তু কেনো? নিশ্চয়ই ছয় ভাইবোনের মধ্যে আভিরাজ সবার চোখের মনি বলেই।
ছয় বছর আগের এই স্মৃতি গুলো যেনো আজও জীবন্ত এক চিত্র হয়ে আভিরাজের কল্পনায় ভেসে উঠছে। আপনজনের অপেক্ষায় এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে সেই চাঞ্চল্যকর মুহুর্তগুলো এখন শুধুই স্মৃতির পাতায়। মা কে রেখে পাড়ি জমিয়ে ছিলো সেই যৌবনের প্রথম দিকে যখন তার বয়স ছিল উনিশ। সেই সময়ে মা ই ছিল তার একমাত্র বন্ধু, বাড়িত নিজের সবটা মন খুলে মা’কে বলা দেওয়া জীবনের প্রথম বেস্ট ফ্রেন্ড যদি বলা হয় তাহলে মা ই তার জীবনের প্রথম বেস্ট ফ্রেন্ড৷ আজ সে পঁচিশ বছরের যুবক। এতগুলো বছরের একটা দিনও বাদ যায় নি যে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলে নি সে।
এয়ারপোর্টে আভিরাজের বাবা আর আলভি সাথে ফাহাদ। আলভি সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই আর বয়সে এক বছরের ছোট কিন্তু দু’জনের বন্ডিং ভালো। ফাহাদ এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। আভিরাজ তার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে৷ আভিরাজের বাবা চাচা চারজন। আভিরাজের বাবা মেঝো, নাম রাশেদুজ্জামান চৌধুরী। আলভির বাবা বড়ো, নাম ইশতিয়াক চৌধুরী। এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলের নাম ইশতিয়াক চৌধুরী আলভি, মেয়ের নাম মাহদিয়া চৌধুরী দিয়া। সেজো চাচা, ফাহমিদুল চৌধুরী। যিনি গত হয়েছেন নিজের বিবাহের এক বছর পরেই। স্ত্রী মাইমুনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। উনার এক মাত্র ছেলে নাম ফাহাদ। ছোট চাচা ইসমাইল চৌধুরী। এক মেয়ে এক ছেলে নাফিজা আর নীলয়। নাফিজার বয়স বারো বছর। তারই ছোট ভাই নীলয়। বয়স মাত্র সাত বছর। দিয়া আর ফাহাদ প্রায় সেম সেম বয়সের। সবাই একসঙ্গে এখনো তারা সম্মিলিত পরিবার। এলাকার যৌথ পরিবারগুলোর মধ্যে চোখে পড়ার মতো তাদের এই যৌথ পরিবার। সবার বন্ডিং আর একে-অপরের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় বাড়ির সকলের প্রাণ যেনো এক সুতোয় বাঁধা। আভিরাজের জন্মের পর তার বাবা মা দ্বিতীয় সন্তান নেন নি। কারণ ছিলো না সন্তান না নেওয়ার কোনো। তবে আভিরাজের মা আর সন্তান নেয় নি। নিজের এবং জায়েদের সন্তানদের আর নিজের সন্তান কে কখনোই তিনি পার্থক্য করে দেখেন না। উনার এই ভালোবাসা আর সরলতার জন্যই হয়তো চৌধুরী পরিবারের এখনো যৌথ। এইচএসসি পর্যন্ত আভিরাজ বাড়িতেই ছিলো। বাড়ির বড়ো ছেলে হওয়ার সুবাধে সে অন্যান। আভিরাজের চাঞ্চল্যে আর সকল ভাই-বোন কে নিয়ে এক সময় পুরো চৌধুরী বাড়ি মাতিয়ে রাখতো সে৷ আচমকা যেনো পরিবেশটা বদলে গিয়ে ছিলো। ছয় বছর আগে। আভিরাজের হঠাৎ করে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া। বাড়ির সকলের সাথে দূরত্ব বেড়েছিল, তবে মনের দূরত্ব বাড়ে নি। এটা বরং আরও গভীর, গাঢ় হয়েছে। আলভি, ফাহাদ আভিরাজ কে দেখেই দৌড়ে এসে জরিয়ে ধরলো।
ছয় বছর পূর্বের আভিরাজের সাথে বর্তমান আভিরাজের আকাশ পাতাল পার্থক্য। ছয় ফুট লম্বা এখন লোকচক্ষুে তার দৈহিক সৌন্দর্য এবং ব্যাক্তিত্ব যেকোনো মেয়ে তাকে এক দেখাতেই প্রেমে পরতে বাধ্য৷ গায়ের রঙ টা এখন অনেক পরিবর্তন। ফরসা বলা যায়। বাড়িতে যেনো হৈ-হুল্লোড়ে মেতে আছে। হবে নাই বা কেনো! বাড়ির বড়ো ছেলে এতো বছর পর বাড়ি ফিরেছে। রান্নাঘরে হরেকরকম রান্নার ধুম পরেছে মা চাচিদের। হঠাৎ দোতলা বাড়িটার সদর দরজায় আভিরাজ কে দেখে সবার মধ্যে হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো। আভিরাজের মা দৌড়ে এসে জরিয়ে ধরলেন ছেলেকে। আবেগাপ্লুত হয়ে মাকে জরিয়ে ধরলো আভিরাজ।
মমতাময়ী মাকে সেই ছয় বছর আগে ছুঁয়েছিল আজ এত বছর পর মায়ের ছোঁয়া পেলো আভিরাজ। মা চাচিদের সালাম দিয়ে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে বসলো আভিরাজ। মূলত সবাই মিলে তাকে জোর করে সোফায় বসিয়ে একের পর এক এটা-সেটা দিতে ব্যস্ত হলো। সবাই মিলে খোশগল্পে মগ্ন হলো।
নীলয় বাড়ির সবার ছোট সদস্য। তাই সে এক সময় বেশ আবেগাপ্লুত এবং উৎসাহ নিয়ে তোতলানো স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-“ভাইয়া, আমার জন্য তুমি কিছু নিয়ে আসো নি?”
আভিরাজ যখনই উঠতে যাবে মা চাচিরা উঠতে দিচ্ছে না তাকে। পরে সব করা যাবে। আগে খাওয়াদাওয়া এবং রেস্ট হবে। আভিরাজ তবুও ফাহাদের দিকে তাকিয়ে বললো,
-“বড়ো লাগেজ টা দে তো।”
লাগেজ তিন টা। কালো দু’টো আর একটা গোলাপি। ফাহাদ আভিরাজের আদেশ অনুযায়ী তাই করলো।
লাগেজ খুলে আভিরাজ খেতে খেতে সবার জন্য আনা গিফট বিলি করতে লাগলো।
আভিরাজের ছোট চাচা ইসমাইল চৌধুরী বাড়িতে এসে থমকে গেলেন। তিনি বাইরে ছিলো। আভিরাজ জরিয়ে ধরেন ইসমাইল চৌধুরী কে। নিজের প্রথম সন্তানের সাধ তিনি এই ভাতিজা কে দিয়েই পেয়েছেন। বড়ো চাচা ইশতিয়াক চৌধুরী বাড়ি নেই। নিজেদের ব্যাবসায়িক কাজে শহরের বাইরে আছেন। বাড়িতে এই মানুষ এবং আরও একটি মানুষ ছাড়া সবাই উপস্থিতি।
আভিরাজ হঠাৎ খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
-“দিয়া কোথায় আম্মু?”
আমেনা দিয়ার মায়ের দিকে তাকালো। দিয়ার মা নিজের বড়ো বোন সমতুল্য জায়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আভিরাজ কে উত্তর করলেন,
-“ওর এক ফ্রেন্ড এসে নিয়ে গেলো আব্বা। পরীক্ষা শেষ হয়েছে তো গত পরশুদিন।”
আভিরাজের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে কিছুই ঠাহর করা গেলো না। সে কোনো কথা না বলে দুই টা লাগেজ নিয়ে উঠতে গেলে আলভি এগিয়ে আসে৷
আভিরাজ কালো লাগেজ টা আলভির দিকে এগিয়ে দেয়৷ নিজে গোলাপি লাগেজ সযত্নে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে৷ সবেমাত্র বাড়িতে প্রবেশ করেছে দিয়া। জিন্স প্যান্ট আর ফতুয়া পরনে গলায় প্যাচানো একটা জর্জেট ওড়না। বাড়ির পরিবেশ আর সবাই কে এভাবে এক জোট হয়ে লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে। সে সবার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সিঁড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করলো। একজন লম্বা বলিষ্ঠ সুঠাম দেহের একজন পুরুষ হাতে লাগেজ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। শুধু পিছন টা দেখা যাচ্ছে। প্রস্থ পিঠ। পেছন দিকে শার্ট টা শরীরের সঙ্গে যেনো টানটান হয়ে মিশে আছে। সাদা শার্ট ইন করে পরা। দিয়া কে দেখে নাফিজা এগিয়ে গেলো। দিয়া ওর হাতে রেপিং পেপারে মোড়ানো গিফট বক্স দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
-“কী হয়েছে বাড়িতে? সবার হাতে কী?”
নাফিজা সাথে সাথে খুশিতে আটখানা হয়ে উচ্ছ্বসিত নিয়ে বলে উঠলো,
-“আরেহ আপু আভিরাজ ভাইয়া এসছে। তুমি তো ছিলে না সবার জন্য গিফট এনেছে। তুমি যাও তোমাকেও দিবে।”
দিয়ার মা এরমধ্যে এগিয়ে এলো। গম্ভীর স্বরে বললো,
-“যা বাইরের পোশাক ছেড়ে খেতে আয়। শতবার ডাকতে পারবো না আমি।”
দিয়া মায়ের কথায় মুখ ভোঁতা করে মাথা নেড়ে সিঁড়ির দিকে গেলো। ওর পেছন পেছন নীলয়, নাফিজা, ফাহাদ গেলো। আভিরাজের মা মুচকি হাসলো তা দেখে। সবগুলো গিয়ে নিশ্চয়ই এখন আড্ডায় বসবে।
#চলবে….
