#আত্মার_আত্মীয়া
#পর্ব_৩
#জান্নাত_সুলতানা
-“এটা নতুন বউ?”
-“হাঁ।”
-“কিন্তু এটা দ,,,”
-“বললেই কিন্তু তুই খেলায় হেরে যাবি।”
নীলয়ের বিস্ময় চোখ জোড়া সাথে সাথে অস্থির হয়ে উঠলো আভিরাজের কথা শুনে। সে মিনমিন করে বললো,
-“আচ্ছা কাউ কে বলবো না।”
-“আর যদি বলিস?”
পাশ থেকে ফাহাদ বলে উঠলো। নীলয় ফাহাদের দিকে গোলগোল চোখে তাকিয়ে জবাব দিলো,
-“তাহলে আমার বিয়ে হবে না।”
ফাহাদ হেঁসে ফেললো। আভিরাজ দুইটা চকলেট দু’জন কে দিয়ে বললো,
-“যা এখন।”
আভিরাজ ওদের শাঁসালো না। কোনো হুমকিধামকি দিলো না। তবুও তার বিশ্বাস তার ভাইয়ের তার সাথে বেইমানি করবেন না। কেননা তারা তাদের বড়ো ভাই কে ভালোবাসে। সম্মান করে। অসম্মান হয় এমন কোনো কাজ করবেই না, করতে পারে না।
—–
রাতে নাফিজা চুপিচুপি নীলয় কে ফাঁকি দিয়ে দিয়ার ঘরে এলো। গিফট বক্স নিয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় ওঠে বসলো। দিয়া ওয়াশ রুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসছিলো মাত্র। নাফিজা কে দেখে ভ্রু কুঁচকে নিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রাতের ব্যবহিত ময়েশ্চারাইজার হাতে বসলো এসে নাফিজার পাশে। জিজ্ঞেস করলো,
-“তোর এখানে কী এতো রাতে?”
-“আপু প্লিজ এটা খুলেই চলে যাবো। তুমি বের করে দিয়ো না।”
-“ঘরে খুল।”
-“নীলয় দেখলে নিয়ে যাবে।”
নাফিজা বক্স খুলতে শুরু করেছে। দিয়া নিজে ও হাতে পায়ে কিছু একটা লাগাচ্ছে যদিও। তবে দৃষ্টি ওদিকে ঠিকই আছে। একটা ঘড়ি, একটা পারফিউম কিছু চকলেট আর একটা পেন আছে। নাফিজা এগুলো পেয়ে ভীষণ খুশি। কেননা বিদেশি একটা ঘড়ির শখ ওর অনেক আগে থেকে ছিলো। সে ঘড়ি সাথে সাথে হাতে পরে নিলো। পারফিউম নিজের গায়ে একটু স্প্রে করলো সাথে দিয়ার গায়ে ও একবার স্প্রে করে দিলো। দিয়ার এমনিতেই মনমেজাজ খারাপ ছিলো। সবাই কে গিফট দিয়েছে আভিরাজ ভাই। অথচ ওকে কিছুই দিলো না। দিয়ার মন তাই খারাপ হলো স্বাভাবিক ভাবে। তাই নাফিজা ওর গায়ে পারফিউম স্প্রে করার সাথে সাথে দিলো এক ধমক। নাফিজা থতমত খেয়ে গেলো। দিয়া নিজে কে সামলে জবাব দিলো,
-“এটার স্মেল খুব বাজে।”
নাফিজা তাই মানলো। সবার যে সব ভালো লাগবে তেমন টা নয়। ওর কাছে পারফিউমের স্মেল দারুণ পছন্দ হয়েছে। ও সব গুছিয়ে নিয়ে কিছু সময়ের মধ্যে বিদায় নিলো। দিয়া দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে বসলো। আধশোয়া হয়ে ইচ্ছেমতো বকে নিলো আভিরাজ ভাই কে। সবার সাথে ঠিকঠাক। শুধু দিয়ার বেলায় এই পুরুষ কিপটের গোডাউন। তার এ-সব ভাবতে ভাবতে ঘুম জড়িয়ে এলো চোখে। বালিশে মাথা রেখে বিড়বিড় করে বললো,
-“আপনি কিপটে আভিরাজ ভাই। আপনার বউয়ের পোড়া কপাল। আহ, বেচারি। আমার তো এখনই আপনার বউয়ের জন্য মায়া হচ্ছে।”
দিয়ার রুমের ছোট খোলা ব্যালকনিতে আবছা ছায়া দেখা গেলো। যার লম্বা একটা মানব ছায়া দিয়ার শরীর ছুঁয়ে গেলো। তবে শুধুমাত্র ছায়া। যা দিয়া দেখতে পেলো না। না অনুভব করতে পারলো। আর নাই কল্পনা করা যায় এমন দৃশ্য।
——–
রান্না ঘরে চার জা মিলে রাতের খাবার-দাবার সব গুছিয়ে রাখছে। যদিও আমেনা বেগম বসে আছে। তিনি বসে বসে জায়েদের সাথে বিশেষ কোনো বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছে। বাড়ির সব ছোট বড়ো সদস্য যে যার রুমে চলে গিয়েছে। আমেনা বেগম কিছু ভাবতে ভাবতে এক সময় সবাই কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
-“আচ্ছা সেঝো আভি কে আগে বিয়ে করিয়ে নেবো? না-কি দিয়া কে বিয়ে দেবো আগে?”
দিয়ার মা আর ফাহাদের মা নাফিজার মা সবাই একে-অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো। দিয়া তো সবেমাত্র এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। নিশ্চয়ই এখন দিয়া কে বিয়ে দেওয়ার কথা বাপ চাচা কেউ মেনে নিবে না। ফাহাদের মা বললো,
-“এতো তাড়াতাড়ি দিয়া কে বিয়ে দিয়ে দিলে বাড়ি টা খালি হয়ে যাবে বড়ো আপা।”
আমেনা বেগম এমনিতেই মানুষ টা সহজ সরল হলেও বেশ বুঝদার আছে। সেইজন্যই বোধহয় তাদের জায়েদের মধ্যে ঝগড়া ঝামেলা হয় না। তিনি আর কিছু বলার আগেই সেখানে আলভি উপস্থিত হলো। সে কফি নিতে এসছে। আভিরাজ এবং তার নিজের জন্য। আমেনা বেগম তাই চুপ করে গেলো। তবে মনে হচ্ছে যা শোনার আলভি শুনেই নিয়েছে।
—–
গিটারের তারে আঙুল দিয়ে টুংটাং শব্দ আভিরাজ ইংলিশ গান ধরলো। আলভি পাশে বসে আছে। ছাঁদে ঝিরিঝিরি বাতাস এবং গরম ধোঁয়া ওঠা কফি সাথে আভিরাজের স্লো ভয়সে ইংলিশ গান বেশ চমৎকার লাগছে তার। আভিরাজের গান এক সময় শেষ হলো। আলভি বললো,
-“অসাধারণ হয়েছে ভাই। আচ্ছা, তুমি শুনেছো বড়ো মায়ের কথা?”
-“কী কথা?”
-“বিয়ের কথা।”
বাড়িতে মেয়ে বলতে দিয়া আর নাফিজা। বিয়ের উপযোগী তো দিয়া, আর তো কেউ নেই। আভিরাজ যুবকের রাগ তরতর করে বেড়ে গেলো। রাগী চোখ জোড়া দেখা গেলো না অন্ধকারে। তবে রাগী কণ্ঠ ভেসে এলো,
-“ছেলে দেখা হয়ে গেছে না-কি?”
-“ছেলে দেখবে কী করতে? মেয়ে দেখতে হবে।”
আভিরাজের টনক নড়ে উঠলো যেনো। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু ভাবলো। আলভি আবার বললো,
-“বড়ো মাকে বলতে শুনেছি। তোমার বিয়ে জন্য কথাবার্তা চলছে।”
আভিরাজের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। সে নিজের গিটার হাতে ওঠে দাঁড়ালো। আলভি কে উদ্দেশ্য করে বললো,
-“রাত অনেক হয়েছে। ঘুমতে যা। আমিও যাচ্ছি।”
আলভি মজা উড়ালো। সে ভেবেই নিলো একপ্রকার আভিরাজ লজ্জা পেয়ে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে হয়তো। সেইজন্যই চলে যাচ্ছে। তাই চিন্তিত মুখে আভিরাজের পেছনে আসতে আসতে রসাত্মক স্বরে বলে উঠলো,
-“আচ্ছা ভাই, বিয়ের কথা হলে সবাই লজ্জা পায় কেনো?”
-“কানের নিচে একটা দেবো না আলুর বাচ্চা।”
-“আরেহ রেগো যাচ্ছো কেনো? যাকগে সে-সব ছাড়ো। তোমার বাইকের কথা ভুলে গিয়েছো তুমি?”
-“ইট’স ইম্পসিবল। সব কিছু ঠিক আছে তো?”
-“সব ঠিকঠাক। ফাহাদ ব্যাটা দুই দিন পর পরই এটা কে বের করে। কাল বলবো বের করতে?”
-“বল। তোর টার কী খবর? চাকায় না প্রবলেম ছিলো। ঠিক হয়েছে এখন?”
-“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।”
আভিরাজ আলভির কাঁধে হাত রেখে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হাস্যরত মুখে বলে উঠলো,
-“ওকে, লেট্’স গো ফর আ লং ড্রাইভ টোমোররাও।”
-“ডান।”
আলভি হাসি মুখে বললো। আভিরাজ নিজের রুমের দিকে গেলো তো আলভি নিজের রুমে। আভিরাজ দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের রুম থেকে একটা রুম পরে রুমের দরজা টার দিকে তাকালো। এক মিনিট এরপর নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।
—–
গভীর রাত। ঘুম নেই আভিরাজ নামক যুবকের চোখে। রাত এভাবে কাটে এই যুবকের। সে নিজের স্টাডি টেবিলে বসে আছে সামনে একটা ল্যাম্প যেটার সুইচ টিপে সে অন অফ করছে বারবার। প্রতিবারই ক্যাচ ক্যাচ শব্দ হচ্ছে। তবুও যুবকের ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটছে না। তবে আচমকাই কিছু মনে পড়ায় সে চেয়ার থেকে ওঠে গেলো। আলমারির সামনে রাখা গোলাপি রঙের লাগেজ টা নিয়ে এসে বিছানায় রাখলো। নিজেও বসলো সেখানে। এটা খুলে এক বক্স চকলেট নিয়ে নিলো শুধু। বিভিন্ন রকমের চকলেট একপাশে একজোড়া হাই-হিল শিফনের একটা শাড়ী সফট ল্যাভেন্ডার বা হালকা পার্পল রঙ। যাতে হালকা গোলাপি আভা রয়েছে। অর্গানজার মতো হালকা ও ঝলমলে ফ্যাব্রিক শাড়িতে। সেটার পাশ ঘেঁষে রয়েছে দুই টা জুয়েলারি বক্স। একটা কাপল টি-শার্ট সেট। একটা কাপল ঘড়ির বক্স। লেডিস্ ব্যাগ। একটা মোবাইল। আরও বিভিন্ন কসমেটিক। আভিরাজ সব গুলো এক পলক দেখে আবার লাগেজ টা আগের স্থানে রেখে দিলো।
চকলেট বক্স টা হাতে নিয়ে সেটা উলটে পালটে দেখতে দেখতে স্লো ভয়সে বলে উঠলো,
-“আমি নিজেকে তোকে দিলাম, তুই দেখলি শুধু দেওয়া। মূল্যটা বুঝলি না।”
#চলবে…….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
