#Hello_Senior
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_5.
নীশ ফোনটা টেবিলে রেখে আবারও ধীরে কফির কাপে চুমুক দিল। গরম ধোঁয়া আবারও তার ঠোঁটে লাগতেই সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল, যেন ধোঁয়ার ভেতরের অন্ধকারের ছায়া নেচে বেড়াচ্ছে তার ভেতরে। ঠোঁটে বাঁকা এক হাসি রেখে সে বিড়বিড় করে বলল,
“রোদ, তুমি মরবে না।”
ঠিক তখনই ক্যান্টিনের বাইরে হালকা তুষার ঝরতে শুরু করল। কাচের জানালায় সাদা কণা জমে গেল। চারপাশের ফিসফিসানি, হাসি আর কথার শব্দ। কিন্তু সবই নীশের কানে যেন নিস্তব্ধ হয়ে রইল। সে হঠাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। কোটটা কাঁধে তুলে নিল এবং ধীর পায়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে পড়ল। তার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোল্ড করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে তার ফোন আবার কাঁপল। স্ক্রিনে এবার ভেসে উঠল এক অচেনা নাম—“ড. ক্রুজ।”
নীশ কলটা রিসিভ করল। অপর প্রান্ত থেকে ভারী গলায় শোনা গেল,
“মিস্টার রোজারিও! আপনার অর্ডার করা স্পেশাল কেমিক্যাল এসে গেছে। কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত এটা ব্যবহার করবেন? এর প্রভাব কিন্তু ভয়ঙ্কর।”
নীশ এক মুহূর্ত চুপ রইল, তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,
“ডক্টর, ভয়ঙ্কর জিনিসই তো কাজে লাগে। আমি ঠিক সময়ে আপনার সাথে কনট্যাক্ট করব।”
সে ফোনটা কেটে পকেটে রাখল। ঠোঁটে আবারও সেই হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
•
রোদের শ্বাস এলোমেলো। ডাক্তার নার্ভাস হয়ে বারবার যন্ত্রপাতির দিকে তাকাচ্ছেন। স্যালাইনের ফোঁটা ধীরে ধীরে পড়ছে, কিন্তু হার্ট রেট আবার নামতে শুরু করেছে। ডাক্তার আস্তে করে বললেন,
“এইভাবে চলতে থাকলে, হয়তো রোদকে বাঁচানো যাবেনা।”
ঠিক তখনই রুমের দরজা ধীরে খুলে গেল। বাইরে থেকে নরম আলো এসে ভেতরে পড়ল। নীশ ঢুকল। তার চোখে কোনো উৎকণ্ঠা নেই, বরং অদ্ভুত শীতলতা।
সে ডাক্তারকে হাত ইশারা করে সরে দাঁড়াতে বলল।
“আমি বলেছিলাম, ও মরবে না।”
রোদের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে টেবিল থেকে একটা সাদা গ্লাভস তুলে নিল। ডাক্তার থমকে গিয়ে বললেন,
“আপনি কী করছেন?”
নীশ শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“আমার নিজের পদ্ধতি আছে।”
রোদের নিস্তেজ শরীরের দিকে এক পা এগিয়ে এসে সে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“লড়ো, রোদ। তুমি যদি সত্যিই নীশ রোজারিওর কাছে টিকে থাকতে চাও, এখনই প্রমাণ দাও।”
ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেবল যন্ত্রপাতির বীপিং শব্দ আর বাইরে তুষার পড়ার ক্ষীণ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। নীশ সাদা গ্লাভসটা তার হাতের ওপর টেনে নিল। ডাক্তার এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখে অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তা। রুমের সব আলো যেন একটা মূহুর্তের জন্য ম্লান হয়ে গেল। নীশ ধীরে টেবিলের ওপর রাখা ছোট সিলিন্ডারটা উল্টে দেখে নিল। ভেতর থেকে খুব সূক্ষ্ম কণার মতো সাদা পাউডার ভেসে উঠছিল। সিলিন্ডারের পাশেই রাখা ছিল ছোট ন্যাক্সাস ডিভাইস প্রজেক্টরের মতো একটি বক্স, যার ওপর জটলা-মত তার জড়িয়ে ছিল। নীশ ডিভাইসটাকে রোদের বুকের ওপর সঠিকভাবে সেট করল। ডিভাইসের বোতামগুলো আলোতে ঝলমল করছিল। ডাক্তার এগিয়ে এসে চিন্তিত গলায় বলল,
“এটা কোনো স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট না, মিস্টার রোজারিও– এটা এক্সপেরিমেন্টাল। এর সাইড-ইফেক্ট অজানা।”
নীশ কেবল হালকা হাসি দিল। “অজানা”—এই শব্দটা তার কাছে সবসময়ই আমন্ত্রণস্বরূপ। সে ছোট কাঁচের তরলটায় পাউডার মিশিয়ে ডিভাইসে ঢালল। তরলটা মিলে গেলেই ডিভাইস থেকে হালকা নীলচে আলো ঝলমল করতে শুরু করল। ডিভাইসের স্ক্রিনে অদ্ভুত জ্যামিতিক প্যাটার্ন ঘুরে উঠল লতাকাঁটা সিমেট্রি, যেন কোনো কৃত্রিম হৃদয়ের হার-কারিগরী।
নীশ মাথা সামান্য নামিয়ে বলল,
“আমি এটাকে ‘ফ্ল্যাশ’ বলি। আলোর একটি সিস্টেম যা কোষের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক নেটওয়ার্ককে দ্রুত রি-সিংক্রোনাইজ করে। এটা হার্টকে ‘জাগিয়ে’ তোলার চেষ্টা করে এক ধাক্কায়।”
ডাক্তার কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
“এটা সফল না হলে…”
নীশ হাত উঠিয়ে তাকে থামাল।
“ তাহলে রোদের বাঁচার অন্য কোনো আশা নেই।”
নীশ ডিভাইসের রিলেগ ইয়-র হুইলটা টানল। প্রথমত, এক ক্ষুদ্র গোলাকার আলো রোদের বুকের ওপর ঝলমল করল। আলোটা ধীরে ধীরে রোদের দেহে মিশতে লাগল—যেন তীব্র শীতল কুয়াশার ভেতর এক ক্ষণিকের সূর্যদয়। ডিভাইস থেকে বেপরোয়া টোন সুবিত্তের মতো উচ্চ-লো-ফ্রিকোয়েন্সি ভিতরে ভেসে উঠল। রোদের মাথার নিচে ঠান্ডা বাষ্প গরম হল। তার স্পন্দন যেন ধীরে ধীরে নরমাল হতে শুরু করল।
ডাক্তার ভয়ানকভাবে মেশিনের রিডিং দেখল। রোদের হার্ট রেট শূন্যে ঠেকানো। নীশ ডিভাইসটির ওপর পুরোপুরি ফোকাস রাখল। সে নিজে বুজে নিয়েছিল যে, এই টেকনিক যদি কাজ করে, তাহলে রোদের মস্তিষ্ক আবার সচল হবে। কিন্তু যদি না হয়, ফলাফল ভয়ানক হবে। হঠাৎ স্ক্রিনে মৃদু লাইন নড়তে শুরু করল একটি অ্যামবিগুয়াস ব্লিপ। ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“ওহ! ব্লিপটা দেখা যাচ্ছে।”
নীশ ধীরে বলল,
“আরো একটু।”
সে ডিভাইসের শক্তি একটু বাড়াল। আলো দ্রুত গাঢ় হলো। রোদের মুখ থেকে অস্পষ্ট শব্দ বের হলো, যেন কোনো প্রাণী ঘুম থেকে ছিটকে উঠছে। তার দেহ হঠাৎ কাঁপতে লাগল। হাতের আঙ্গুলগুলো অল্প নড়ে উঠল। ডাক্তার রোদের হাত ধরে বলল,
“হোল্ড অন!”
মেশিনের স্ক্রিনে একেবারে সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট হার্টবিটের লাইন ভেসে উঠল। প্রথমে খুব দুর্বল, তারপর ধীর ধীরে দ্রুত হতে লাগল। রোদের ফুসফুসে আন্ডারলাইং চাপ পড়ল। সে একটু জোরে শ্বাস নিতে শুধু করল। নীশ সবকিছু একবার চেক করে হালকা গলায় বলল,
“লড়ো, রোদ। দেখাও তুমি কতক্ষণ টিকে থাকতে পারো।”
হার্টরেডটা আস্তে আস্তে শূন্য থেকে ত্রিশ, পঞ্চাশ, করে বেড়ে গেল। রোদের চোখের পাতা নড়ে উঠল। তার ঠোঁট ফ্যাকাশে থেকে একটু রক্তিম হল।
ডাক্তার অবাক হয়ে বলল,
“ওটা কাজ করল।”
নীশ কেবল শান্তভাবে হেসে উঠল। তারপর সে ডিভাইসটা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিল। আলো নির্বীজ হয়ে কমে গিয়ে নিস্তবিদ্ধ হলো। ডাক্তার দ্রুত স্ট্যাবিলাইজেশনের কাজ শুরু করলেন। নীশ রোদের দিকে তাকিয়ে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি বলেছিলাম, ও মরবে না।”
রোদের আঙুল কাঁপল সামান্য। চোখের পাতায় আলোড়ন হলো। ধীরে ধীরে তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করল। ডাক্তার তৎক্ষণাৎ তার কাছে এগিয়ে গেলেন, মনিটরের ডেটা দেখে দ্রুত শ্বাস ফেলে বললেন,
“পালস ফিরছে। ওর কনশাসনেস রিটার্ন করছে।”
রোদের ঠোঁট আবারও কেঁপে উঠল। ভেতর থেকে ভাঙাচোরা গলায় খুব ক্ষীণ স্বর বের হলো তার।
নীশ তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে শান্ত চোখে তাকিয়ে ছিল। কোনো আবেগ না দেখালেও, চোখের গভীরে তীব্র এক ঝড় জমে উঠছিল তার। সে হালকা ঝুঁকে গিয়ে রোদের কানে খুব আস্তে বলল,
“স্বাগতম ফিরে আসার জন্য, রোদ।”
রোদের চোখ আধখোলা হলো। আলো ভেদ করতে চেষ্টা করল সে। এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি নীশের ছায়ামূর্তি চিনতে পারল। বুক ওঠানামা করছিল ভারী শ্বাসে।
ডাক্তার গম্ভীর স্বরে বললেন,
“এখন ওকে রেস্ট দিতে হবে। রিকভারি টাইম খুব ক্রিটিক্যাল।”
নীশ মাথা নেড়ে সরে দাঁড়াল, কিন্তু চোখের কোণ রোদের উপর থেকে একবারের জন্যও সরল না।
রোদের চোখ আধখোলা জ্ঞান আর ঘোরের মাঝখানে কাঁপছিল। হঠাৎ তার ঠোঁট ফিসফিস করে উঠল,
“অন্ধকার, কেউ ডাকছে আমাকে? চেনা কন্ঠ। কে তুমি?”
ডাক্তার বিস্মিত হয়ে নোট করলেন,
“হ্যালুসিনেশন হতে পারে। ওর মস্তিষ্কে শক এখনও কাটেনি।”
কিন্তু নীশ একদম স্থির রইল। চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু হালকা তাচ্ছিল্যের ছাপ। সে ধীরে রোদের কানে ফিসফিস করে বলল,
“ওসব কণ্ঠকে পাত্তা দিও না। তুমি এখন আমার নিয়ন্ত্রণে।”
রোদের শরীর কেঁপে উঠল, যেন মনের গভীর থেকে অজানা এক ভয়ের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। তার চোখ মুহূর্তের জন্য বড় হয়ে উঠল। নিস্তব্ধ কক্ষে শুধু মনিটরের বিট আর তার ভাঙাচোরা শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
ডাক্তার আবারও তাকে দ্রুত চেক করতে করতে বললেন,
“হার্টরেট বেড়ে যাচ্ছে। ওর মস্তিষ্ক কোনো শক্তিশালী ইমেজ প্রসেস করছে।”
নীশ ঠান্ডা হাসি দিল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,
“ভয় পেও না, রোদ। তোমার জন্য অন্ধকারকে আমি নিজের হাতে বশ করেছি।”
রোদের চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে আর কিছু বলতে পারল না, শুধু দুর্বলভাবে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
ডাক্তার স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন,
“ও আবার স্লিপ মোডে যাচ্ছে। এটিই ওর জন্য সবচেয়ে ভালো।”
নীশ ধীরে ধীরে পেছনে সরে গেল। রোদের শরীর গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল, কিন্তু তার ঘুমের ভেতরে এক অদ্ভুত যাত্রা শুরু হলো। সে দেখতে পেল, চারদিক শুধু কুয়াশা। কোথাও আলো নেই, কেবল দূরে দূরে ভেসে বেড়াচ্ছে কালচে ছায়া। ছায়াগুলো ফিসফিস করে তাকে ডাকছে,
“ফিরে এসো, ফিরে এসো আমাদের কাছে।”
রোদ ভয়ে এক পা পিছু হটল। কুয়াশার ভেতর হঠাৎ লালচে আলো ঝলকে উঠল। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো এক ছায়ামূর্তি। মুখ দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু কণ্ঠটা অদ্ভুতভাবে রোদের পরিচিত।
“তুমি আমার। যত দূরেই পালাও, আমি তোমাকে খুঁজে নেব।”
রোদের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে দম নিতে চাইলো, কিন্তু কুয়াশা যেন ফুসফুসে ঢুকে তাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ চারদিকের আঁধার ভেদ করে এক টুকরো নীল আলো নেমে এলো। আলোটা যেন একটা ঢাল হয়ে রোদের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। ছায়ামূর্তিগুলো চিৎকার করে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। রোদ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। নীল আলোর ভেতর থেকে ভেসে এলো নীশের কণ্ঠ,
“তুমি যেখানেই যাও, রোদ। মনে রেখো, আমি আছি। তোমাকে বাঁচাতে হোক বা ধ্বংস করতে আমি থাকব।”
রোদের চোখে জল ভেসে উঠল। সে চিৎকার করে বলতে চাইলো, কিন্তু কণ্ঠ বের হলো না। ঠিক তখনই বাস্তবে তার শরীর কেঁপে উঠল। মনিটরের সাউন্ড হঠাৎ তীব্র হয়ে বেজে উঠল। ডাক্তার আতঙ্কিত স্বরে বললেন,
“ও আবার কোনো ইনটার্নাল শকে চলে যাচ্ছে। এই অবস্থাটা অস্বাভাবিক…”
নীশ শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রোদের মুখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা অদ্ভুত হাসি খেলে গেল।
ডাক্তার তাড়াহুড়ো করে নার্সকে নির্দেশ দিলেন,
“সিডেটিভ দিন। ওকে আর একটাও শক সহ্য করতে দেওয়া যাবে না।”
নার্স ইনজেকশন রেডি ডাক্তারের হাতে দিল। ইনজেকশনের সূচ ঢুকতেই রোদের শরীর সামান্য কেঁপে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখের পাতাগুলো ভারী হয়ে এলো। শ্বাস ধীরে ধীরে মসৃণ হতে লাগল।
ডাক্তার স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন,
“এখন অন্তত কয়েক ঘণ্টা স্থিতিশীল থাকবে। ঘুমটাই ওর জন্য সেরা ওষুধ।”
রোদ ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল। তার মুখের কোণে শান্তির ছাপ ফুটে উঠল, যদিও তার বুকের ভেতর কোথাও অদৃশ্য ঝড় এখনও বয়ে চলেছে। নীশ পাশে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। রুমের আলোয় তার মুখে অদ্ভুত ছায়া খেলা করছিল। সে আবারও ধীরে ধীরে রোদের কানে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“ঘুমাও, রোদ। তোমার স্বপ্ন আমি লিখে দেবো। আর সেখানে তুমি শুধু আমাকে তোমার মৃত্যু হিসাবে দেখবে।”
ডাক্তার চমকে তাকালেন। কিন্তু নীশ তখনই ভ্রু সামান্য তুলল, যেন কিছুই হয়নি। সে শান্ত, শীতল ভঙ্গিতে ঘরের কোণায় গিয়ে দাঁড়াল। ঘরটা আবারও নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। শুধু মনিটরের বিট আর রোদের ধীর শ্বাসের শব্দ ভেসে আসছিল।
•
রাত অনেক গভীর। রাতের নীরবতার ভেতর শুধু যন্ত্রের শব্দ। রোদের রুমে ভেতরে মৃদু আলো জ্বলছিল। সে ঘুমে অচেতন, নিঃশ্বাস ধীরে ওঠানামা করছে। চারপাশে শান্ত পরিবেশ। নীশ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকার শহরটাকে দেখছিল। মস্কোর রাত অপরাধ আর গোপন রহস্যের আঁধারে ঢাকা। তার চোখ দুটো নিস্তেজ, অথচ তাতে অদ্ভুত এক তৃপ্তি মিশে আছে।
হঠাৎ দরজায় হালকা শব্দ হলো। ডাক্তার ফাইল হাতে ভেতরে ঢুকে এলেন। নীশের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন,
“পেশেন্ট সেফ আছে। কিন্তু আমি কিছু বুঝতে পারছি না। ইনজেকশনের পরও ওর ব্রেইন ওয়েভে অস্বাভাবিক প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে, যেন কেউ ভেতর থেকে ওর মস্তিষ্কে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে।”
নীশ হালকা হাসল। গাঢ় চোখে ডাক্তারকে দেখে বলল,
“ওটা নিয়ে ভাববেন না। আমি যেমন চাই, ঠিক তেমনই হচ্ছে।”
ডাক্তার বিভ্রান্ত হয়ে কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু নীশের দৃষ্টি এত ঠান্ডা আর ভারী ছিল যে তিনি থেমে গেলেন। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে ফাইল রেখে ধীরে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেলেন।
ঘরে আবারও নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নীশ ধীরে ধীরে রোদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার কপালে আলতো হাত রাখল। রোদের নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। ঘুমের ঘোরের ভেতরে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। নীশ মৃদু হেসে পিছনে সরে গেল। জানালার বাইরে কালো আকাশে এক টুকরো চাঁদ ভেসে উঠল। আলো এসে পড়ল রোদের ঘুমন্ত মুখে। ধীরে ধীরে রোদের ঘুম ভাঙতে লাগল। রোদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নার্স তাড়াহুড়ো করে ডাক্তারের কাছে গিয়ে বলল,
“পেশেন্টের ঘুম ভেঙেছে।”
ডাক্তার দ্রুত ছুটে এলেন। তিনি মনিটরের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ, ভিটাল সাইনস স্টেবল হচ্ছে। পেশেন্ট কনশাসনেস রিটার্ন করছে।”
রোদের চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেল। সারাদিন পর চোখ খোলাতে আলোয় অভ্যস্ত হতে তার সময় লাগল। সে শুকনো ঠোঁট স্পষ্টভাবে বলল,
“আমি কোথায়?”
নার্স মৃদু হেসে তার হাত ধরে দিল,
“শান্ত থাকুন। আপনি এখন নীশ রোজারিওর বাড়িতে আছেন। আর আপনি এখন পুরোপুরি সেফ।”
ডাক্তার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন,
“অলৌকিক রিকভারি। এমনটা আমি সত্যিই আশা করিনি।”
নীশ এক কোণে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। তার চোখ শুধু রোদের দিকে স্থির। রোদের দৃষ্টি কাঁপতে কাঁপতে নীশের দিকে গেল। মুহূর্তের জন্য তার চোখে ভয়ের ছাপ ভেসে উঠল। তার শ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠল। বুকের ওঠানামা আরও দ্রুত হলো। সে কষ্ট করে ঠোঁট নেড়ে আবারও বলল,
“আমি… কোথায় আছি? এতো অন্ধকার, কে আমাকে টানছিল?”
নার্স দ্রুত তার কপালে হাত রেখে নরম গলায় বলল,
“আপনি সেফ আছেন, ভয় নেই।”
কিন্তু রোদের চোখ ভয় ভরে উঠল। সে কেঁপে উঠে বলল,
“আমি ওদের দেখেছি। কিছু ছায়া ফিসফিস করছিল।”
ডাক্তার তার পাশে এগিয়ে এসে দৃঢ় স্বরে বললেন,
“ওগুলো আপনার মস্তিষ্কের শক রেসপন্স। স্বপ্নের মতো। এখন সব ঠিক আছে।”
রোদের বুক ওঠানামা থামছিল না। সে বারবার নীশকে লক্ষ্য করছিল। নীশ ধীরে সামনে এগিয়ে এল। রোদ তার দিকে তাকাল। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে কেঁপে ওঠা কন্ঠে বলল,
“ আমার কেন মনে হচ্ছে, আমি এখনও স্বপ্নে আটকে আছি?”
নীশ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেললো। ডাক্তার আর নার্স বিস্মিত হয়ে দুজনের দিকে তাকালেন। তারা কিছু একটা বলতে চেয়েও থেমে গেলেন। নীশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ডাক্তারদের দিকে তাকাল। সে ঠান্ডা, অথচ ভদ্র গলায় বলল,
“আপনারা এখন যান। আমার রোদের সাথে একটু একটা আছে।”
নার্স আর ডাক্তার ফাইল গুছিয়ে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। রোদের নিঃশ্বাস আরও দ্রুত হচ্ছিল। তার চোখে ভয়ের সঙ্গে অচেনা এক অস্বস্তি জমে আছে। নীশ ধীরে ধীরে তার বিছানার পাশে এগিয়ে গেল।
রোদের ঠোঁট কাঁপছিল। সে ধীরে বলল,
“কাল রাতে আমার সাথে…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নীশ খুব ঠান্ডা, কিন্তু ধারালো কণ্ঠে বলে উঠল,
“সব তোমার নিজের ইচ্ছা আর সম্মতিতেই হয়েছে। আর আজ তোমার এই অবস্থা, এটা আমার জন্যই। আই থিংক তুমি এখন বুঝতে পারছো, যে তুমি নীশ রোজারিওর জন্য পারফেক্ট না। যেই মেয়ে নীশ রোজারিওর সামান্য স্পর্শ সহ্য করতে পারে না, সেই মেয়ে সারাটা জীবন নীশ রোজারিওকে সহ্য করবে, এইটা ইম্পসিবল। আমার মনে হয়, আজকের পর তুমি নীশ রোজারিওকে লাইফ পার্টনার হিসাবে চাওয়া অফ করে দিবে।”
রোদের চোখে পানি চলে এল। তার হাত কাঁপছে, বুক ভারী হয়ে উঠছে। সে ধীরে উঠে বসতে চাইল, কিন্তু ব্যথায় পেরে উঠল না। শেষমেষ শুয়ে থেকেই সে বলল,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি নীশ।”
নীশ এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সে রোদের খুব কাছে এসে নীচু হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ভালোবাসা? তুমি জানো তো, নীশ রোজারিওকে ভালোবাসা মানে আগুনের সঙ্গে বসবাস। আগুন যেমন আলোর উৎস, তেমনই ধ্বংসেরও।”
রোদের চোখে জল গড়িয়ে পড়ল। সে নীশের মুখের
দিকে তাকিয়ে রইল। নীশও কিছুক্ষণের জন্য নিঃশব্দ হয়ে গেল। সে হাত বাড়াল রোদের দিকে। কিন্তু তার হাত রোদের কপালের কাছে থেমে গেল। সে রোদকে স্পর্শ করল না। রোদের চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগল। সে হঠাৎ একটু জোরে কেঁদে উঠল।
নীশ তার কান্না দেখে ধীরে বলল,
“রোদ! নীশ রোজারিও ভালোবাসা বোঝে না। সে বোঝে ডমিনেট করা। সে মানুষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভালোবাসে। সে চায় একটা মানুষকে পুরোপুরি নিজের বানাতে। নীশ রোজারিও, কন্ট্রোল করতে ভালোবাসে। তার জীবনের এসব ইমোশন, আবেগ, কামিটমেন্টের কোনো স্থান নেই। নীশ রোজারিও সব বুঝলেও, কারো ফিলিংস বুঝেনা।”
রোদ চুপ করে রইল। নীশ আবারও ধীরে ধীরে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়ো। আমি নার্সকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
সে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই রোদ চোখ মুছে বলল,
“তোমার প্রজেক্টের কাজ শেষ?”
নীশ পেছন ঘুরে না তাকিয়েই ধীর স্বরে বলল,
“হুম!”
রোদের নিচুস্বরে বলল,
“কাল আমি ল্যাবে যেতে চাই।”
নীশ চোখের কোন দিয়ে হালকা রোদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই অবস্থায়?”
“হ্যাঁ! আমি এখন একদম সুস্থ। কাল তোমার প্রজেক্ট অন করা হবে। আমি সেই মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে চাই।”
নীশ সামান্য হাসল। সে পেছন ফিরে তাকিয়ে রোদের দিকে চোখ রেখে মনে মনে ভাবল,
“ও সত্যিই অদ্ভুত। এত কিছু হওয়া সত্ত্বেও আমাকে ছাড়বে না।”
নীশ চলে গেল। দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরটি আবারও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রোদের বুক আবারও ভারী হয়ে উঠল। সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার কান্নার শব্দ ভেতরের সব আবেগকে ছেড়ে দিয়ে বাইরে বের হচ্ছিল। তার হাতগুলো কাঁপছিল, ঠোঁট কেঁপে উঠছিল। প্রতিটি শ্বাস যেন তার ভেতরের যন্ত্রণা আরও বাড়াচ্ছিল। রোদ অনুভব করল, নীশ চলে গেলেও তার উপস্থিতি ঘরেই যেন ঝাপসা হয়ে ভেসে আছে।
•
নতুন দিনের শুরু হলো। মস্কোর আজকের সকালটা শান্ত। রাস্তাঘাট ফাঁকা, কুয়াশার লেপে থাকা শহরের আকাশ একটু ঝাপসা। সূর্যের প্রথম কিরণ ধীরে ধীরে বিল্ডিংয়ের কাঁচে পড়ছে। রাস্তায় মানুষজন কম। শুধু দূরে থেকে গাড়ির হালকা শব্দ ভেসে আসছে।
নীশ ল্যাবে ব্যস্ত। আজ তার রোবট প্রজেক্ট অন করার দিন। সে একদিকে কম্পিউটার স্ক্রিন পরীক্ষা করছে, অন্যদিকে রোবটের সংযোগ ও কন্ট্রোল মডিউল চেক করছে। তার চোখে এক অদ্ভুত আগুন। সে ধীরে ধীরে প্রতিটি যন্ত্র পরীক্ষা করছে, যেন কোনো ত্রুটি না থাকে।
প্রফেসর আলেকজান্ডার আর রোশান দাঁড়িয়ে আছে। আলেকজান্ডার নীশের ব্যস্ততা দেখছে, আর রোশান রোদের অপেক্ষায় ল্যাবের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ল্যাবের দরজায় রোদ প্রবেশ করল। সে ঠিকমতো হাঁটতে পারছিল না বলে, একজন নার্স তাকে ধরে নিয়ে এলো। রোদের পুরো শরীর শীতের কাপড়ে ঢাকা। আজ সে তার মুখটা ছাড়া সম্পূর্ণ শরীর সে ঢেকে রেখেছে। শরীর এখনও দুর্বল, কিন্তু মন চঞ্চল। সে ধীরে ধীরে ল্যাবের মধ্যে প্রবেশ করল।
প্রফেসর আলেকজান্ডার এবং রোশান ল্যাবের দরজার দিকে তাকাল। রোশান রোদকে দেখে হঠাৎ দৌড়ে তার কাছে গিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“তোমার এখন কি অবস্থা, মুনহার্ট? জ্বর কমেছে? কাল থেকে তোমার খোঁজ না পেয়ে, আমার কি অবস্থা হয়েছিল, তুমি জানো?”
রোদ ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ! আমি এখন একদম ঠিক আছি।”
প্রফেসর আলেকজান্ডার সামান্য মাথা নেড়ে বললেন,
“ভালো, তবে সাবধানে থাকা দরকার। তুমি এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নও।”
রোদ নীরবভাবে শুধু মাথা নেড়ে যন্ত্রপাতির দিকে এগোতে লাগল। রোশান তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে তার দিকে চোখ রেখে বলল,
“তোমার এখনো রেস্টের প্রয়োজন রোদ। চলো বসবে তুমি।”
রোশান রোদের সামনে একটি চেয়ার টেনে দিল।
“চলো, বসো মুনহার্ট।”
রোদ ধীরে ধীরে বসল। বসার সময় তার শরীরের প্রতিটি অংশে ব্যথা টনটন করে উঠল। কিন্তু রোদ তা পাত্তা দিল না। চেয়ারে বসে সে নিজের শরীরকে শক্ত করে ধরে রেখে মনে মনে বলল,
“ব্যথা থাকবে, কিন্তু কেউ দেখবে না।”
রোশান এবং প্রফেসর আলেকজান্ডার চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারা বুঝতে পারছিল, রোদ শারীরিকভাবে দুর্বল।
নীশ ল্যাবের কাজ করতে করতে একপলক রোদের দিকে চোখ রাখল। রোদও তাকাল নীশের দিকে। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই নীশ চোখ সরিয়ে নিল।
রোশান রোদকে ভালো করে পরখ করতে লাগল। সে দেখতে পেল রোদের চোখে মুখে লুকানো ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু রোদ তার ব্যথাকে লুকানোর চেষ্টা করছে।
রোশান আবারও বলল,
“ তুমি সত্যি ঠিক আছো, রোদ?”
রোদ থতমত খেয়ে বলল,
“হ্যাঁ!
রোশান এক মুহূর্ত থেমে রইল। তার চোখে সন্দেহ আর উদ্বেগ। তার মনে প্রশ্ন জাগল, “রোদ সত্যিই ঠিক আছে কিনা।”
নিশ তাদের দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
“এইটা কাজে জায়গা।”
কেউ আর কোনো কথা বলল না। ল্যাবের মধ্যে আবারও নীরবতা নেমে এলো। নীশ তার বানানো রোবটের সামনে দাঁড়াল। সে ধীরে ধীরে রোবটের পাওয়ার সুইচে হাত রাখল। সুইচ অন করার সঙ্গে সঙ্গে রোবটের ধাতব দেহ থেকে আলো ছড়াতে শুরু করল। নিশের হাত স্ক্রিনের টাচপ্যানেল স্পর্শ করতেই রোবটের চোখের লেন্স উজ্জ্বল নীল আলো ছড়িয়ে দিতে লাগল। বোরট চোখ খুলে মুগ্ধ চেহারায় প্রথমবারের মতো নীশের দিকে তাকাল। রোবটটির কণ্ঠযন্ত্র প্রথম শব্দ উচ্চারণ করল,
“হ্যালো সিনিয়র!”
নীশ মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। রোবটের প্রাণীভিত্তিক আচরণ, সজীব দৃষ্টি আর স্বতঃস্ফূর্ত স্বরে কথা বলা—সবকিছুই তাকে বিস্ময়ে ফেলল। রোবটটি নীশের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছিল, যেন সে নিজেই বোঝাতে চাইছে, এই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি তার স্রষ্টা।
পেছনে দাঁড়ানো প্রফেসর আলেকজান্ডার, রোদ আর রোশান চোখ বড় করে অবাক হয়ে দেখছিল, যেন জীবন্ত কোনও বৈজ্ঞানিক মিরাকল তাদের সামনে ফুটে উঠেছে। তিনজনই অবাক হয়ে এক মিনিটের মতো স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। কেউ কিছু বলার আগে, রোবটের হালকা মেকানিক্যাল নড়াচড়া আর মানুষের মতো আচরণই তাদেরকে চমকে দিল। নীশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাতে থাকা ফাইলটি বন্ধ করে হেসে বলল,
“অ্যাভান্তি! ফ্রম টুডে, ইয়োর নেম ইজ অ্যাভান্তি।” (আভান্তি! আজকে থেকে তোমার নাম আভান্তি।)
রোবটটি উত্তর দিল,
“অ্যাভান্তি নেম অ্যাকসেপ্টেড, সিনিয়র।” (আভান্তি নাম গ্রহণ করা হলো, সিনিয়র।)
প্রফেসর আলেকজান্ডার, রোদ আর রোশান একসাথে হালকা হেসে ফেলল। রোবটের মানুষের মতো স্বাভাবিক আচরণ আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া তাদেরকে আরও বিস্মিত করল। হঠাৎ ল্যাবের নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ রোশানের ফোনটা বেজে উঠল। প্রফেসর আলেকজান্ডার আর নীশ একসাথে বিরক্তি প্রকাশ করে রোশানের দিকে তাকাল। রোশান তাড়াহুড়ো করে ল্যাবকোটের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনের ওপর জ্বলজ্বল করে লেখা—“ইমরানা”। রোশান এক মুহূর্ত থেমে প্রফেসরের দিকে তাকাল। তার চাহনিতে অনিচ্ছা আর লজ্জা স্পষ্ট। সে “সরি! প্রফেসর,” বলে দ্রুত ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেল। নীশ আর প্রফেসর আলেকজান্ডার একে অপরের দিকে তাকাল। ল্যাবে আবারও নীরবতা ফিরে এলো, কিন্তু আভান্তির চোখগুলো এখনও আলো ছড়াচ্ছিল, যেন সে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
আলেকজান্ডার নীশের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আমি সত্যিই অবাক। তোমার এই উদ্ভাবনী দক্ষতা আর সৃজনশীলতা দেখে মনে হচ্ছে তুমি শুধু একজন গবেষকই নও, তুমি একজন শিল্পীও। আভান্তির আচরণ, তার মানুষের মতো প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই নিখুঁত। তুমি সত্যিই একটি অসাধারণ কাজ করেছ, নীশ।”
নীশ আলতো হেসে বলল,
“ধন্যবাদ, প্রফেসর। তবে আসল কাজটি তো আভান্তি করছে।”
আলেকজান্ডার হালকা হেসে বলল,
“না, নীশ। তুমি তার স্রষ্টা। তুমি তার মধ্যে প্রাণ দিয়েছে। তার প্রতিটি ছোট ছোট আচরণ, প্রতিটি স্বতঃস্ফূর্ততা—সবকিছু তোমার হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়েছে। এটা শুধুমাত্র বিজ্ঞান নয়, এটি শিল্প।”
নীশ হালকা গম্ভীরভাবে হেসে বলল,
“আমি চেষ্টা করেছি, প্রফেসর। আভান্তি আমার প্রয়াসের ফল।”
নিশ আভান্তির দিকে তাকাল। সে হাতের মাধ্যমে হালকা নির্দেশ দিল,
“ওয়েভ যোর হ্যান্ড, অ্যাভান্তি।” (হাত নাড়ো, আভান্তি।)
আভান্তি প্রথমবারের মতো ধীরে ধীরে তার ধাতব হাত উপরে তুলল। হাতটা যান্ত্রিকভাবে হলেও মানুষের মতো নরম ভঙ্গিতে নড়ল। নীশের ঠোঁটে হাসি ফুটল। নীশ ধীরভাবে বলল,
“গুড! নাও ট্রাই টু মিমিক আ স্মাইল।” (ভালো! এবার চেষ্টা কর একটি হাসি অনুকরণ করতে।)
আভান্তি তার লিপ মেকানিজম ব্যবহার করে ধীরে ধীরে মুখে ভাঁজ তৈরি করল। চোখের কোণে হালকা উজ্জ্বলতা আর কপালে ছোট ছোট ধাতব রেখা দেখে মনে হলো সে যেন সত্যিই হাসছে।
প্রফেসর আলেকজান্ডার আর রোদ চমকে তাকাল। আভান্তির আচরণ এতটাই মানবসদৃশ যে, তারা অবাক হয়ে হেসে ফেলল।
নীশ আভান্তির দিকে হাত দিয়ে বলল,
“অলরাইট, নাও ফলো মাই মোশন।” (ঠিক আছে, এবার আমার অঙ্গভঙ্গি অনুসরণ কর।)
নীশ ধীরে ধীরে হাত উঁচু করল। আভান্তি তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি খেয়াল করে ঠিক একইভাবে হাত তুলল। রোবটের প্রতিটি ছোট ছোট নড়াচড়ায় মানুষি ছোঁয়া স্পষ্ট। সে নীশকে অনুকরণ করতে শুরু করল।
রোদ হালকা স্বরে বলল,
“ওয়াও! দিস ইজ রিয়ালি ইনক্রেডিবল।” (ওয়াও! এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।)
আভান্তি তখন নীরবভাবে নীশের দিকে তাকাল। সে ধীরে বলল,
“আই অ্যাম রেডি, সিনিয়র। অ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু লার্ন।” (আমি প্রস্তুত, সিনিয়র। আমি আরও শিখতে চাই।)
চলবে..?
