#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
#সারপ্রাইজ_পর্ব
১৪.
(কপি করা নিষেধ)
৫ই আগস্ট, ২০১৯
ইদুল আযহার ছুটিতে রিদি বাড়িতে এসেছে। রাহা এবার বাবার বাড়িতে ঈদ করবে৷ রিদিদের একটা লাল গরু কিনেছে। গরু কেনার আগে জাবেদ সাহেব মেয়েদের বেশ কিছু ছবি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কোন গরুটা ভাল লেগেছে? দুই মেয়ে সম্মতি দিল লাল গরুটার জন্য । তিনি বড় লাল গরুটাই কিনলেন। আজ জাবেদ সাহেবের মনে খুশি জোয়ার আটকানোর সাধ্য কার? বহু বছর পর দুই মেয়ে, নাতী নাতনিকে নিয়ে একসাথে ঈদ করবেন। গরু নিয়ে বাসায় আসার পর সবাইকে হাটের গল্প শোনাচ্ছিলেন। রায়হান গরুর লাথি খেয়ে গোবরে মাখামাখি করে এসেছে।
রায়হান এবং জাবেদ সাহেব হাত মুখ ধুয়ে গোসল সেরে আসলে সবাই মিলে গ্যারেজে গরু দেখতে গেল। নুহাশ গরুর পিঠে চড়ে বসল। এই গরুটা ভীষণ শান্ত। শিং ও তেমন নেই। রিদির গরুর জন্য মায়া হল।
রাতে বাসায় আসার পর রায়হান এবং জাবেদ সাহেব দুজনই আলোচনায় বসেছে। আগামীকাল রিদিকে দেখতে আসবে। রায়হানের মন মত একজন পাত্র আছে তা শ্বশুরকে জানাচ্ছে। জাবেদ সাহেব শুধু মাথা নাড়লেন।
রিদি দূর থেকে দেখতে পেল বাবার সম্মতি। আর বিয়েটা আটকানো যাবে না মনে হয়। পাত্রের বাবার সাথে নাকি জাবেদ সাহেবের দেখা হয়েছে আজ হাটে যাবার আগে। জাবেদ সাহেব এর বেশ পরিচিত এবং বন্ধুসম মানুষ। আমিনাকে ডেকে বললেন আগামী কালকের জন্য তৈরি থাকতে।
রিদির মনে হলো সব চাপা কান্না উগড়ে বের হয়ে আসছে। আটকাতে না পেরে নিশব্দে কেঁদে দিল। কাঁদতে কাঁদতে দ্বীপকে ফোন দিল। শেষ কথা হয়েছিল রোজার ঈদে। দ্বীপ নিজ থেকে ফোন দিয়েছিল। এরপর গত দুই মাস আর কথা হয় নি। বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পরও রিসিভ হলো না। কিছুক্ষণ পর দ্বীপ কল করতেই রিদি সালাম- দোয়া না দিয়েই বলে উঠল , ‘ কাল পাত্র পক্ষ আসবে আমাকে দেখতে। ‘
দ্বীপ রিদির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘আলহামদুলিল্লাহ। অভিনন্দন। ‘
রিদি ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ তুমি কখন আসবে?’
দ্বীপের গলায় বিদ্রুপের সুর,’ আমি আসব কথা ছিল কি? যদি আসি কী হিসেবে পরিচিত করাবে?’
‘ তোমার বাসা থেকে প্রস্তাব পাঠাও। এখন তো তুমি স্যাটেল। ‘
‘ আমি সরকারি চাকরিজীবী নই। ফুটবলার। তোমার বাসার লোক মেনে নেবে না। আমার মনে হয় কি রিদি এসব বাদ দাও। আগামীকাল পাত্র পক্ষ আসবে, মন ভালো করে একটা ঘুম দাও। সকালে দেখতে ফ্রেশ লাগবে। ‘
রিদির অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছে। দ্বীপ এসব কি বলে? এতদিন তার মনে এই ছিল ? ভেতরটা হু হু করে উঠল। হয়ত রিদি থেকে বেটার অপশন আছে দ্বীপের কাছে। ওড়নায় চোখের পানি মুছে দ্বীপকে শক্ত স্বরে বলল, ‘ আমার জন্য দোয়া করবে যেন স্বামীর ঘরে সুখের কমতি না হয়। তুমিও ভাল থেকো। তোমাকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হয়। রাখি। ‘
___
রিদিদের বাড়ি ভর্তি অতিথি। অতিথিদের ভিড় দেখে মনে হচ্ছে আজই রিদির বিয়ে। রিদিকে রাহা এবং সীমা মিলে সাজিয়ে দিল । ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসা হাসির আওয়াজ আর চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ রিদির কানে বিষের মতো বাজছিল। কাঁচের আয়নায় তাকিয়ে নিজের অপছন্দের সাজ দেখল আজ । এই রিদি বড্ড অচেনা। তাকে বেশ অপূর্ব দেখাচ্ছে এই কথা যেমন সত্যি আবার সেই রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জ্যান্ত লাশটাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। চোখ দুটো যাতে ফোলা না দেখায়, সেজন্য রাহা অনেকক্ষণ বরফ ঘষে দিয়েছে। কাঁদার জন্য বার বার বারণ করছে। আয়নায় ভেসে উঠেছে রিদির ভালবাসা এবং ইচ্ছের মরণ, কত সুন্দর সাজগোছ অপরিচিত কারো অপেক্ষায়। ভেতরের কান্নাটা জমে এখন পাথর হয়ে গেছে।
জাবেদ সাহেবের নির্দেশ দিলেন রিদিকে ড্রইং রুমে নিয়ে আসতে । ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াতেই রিদির মনে হলো, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাকে এক অনন্ত অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপের শেষ কথাগুলো তিরের মতো বুকে বিঁধছে। যে মানুষটার জন্য এত এত অপেক্ষা , সে এত সহজে তাকে পর করে দিল? জাবেদ সাহেব নিজের পাশে বসালেন মেয়েকে। তিনি লক্ষ্য করলেন মেয়ের হাত দুটো কাঁপছে। মেয়েকে আগলে নিলেন।
সবার চোখ গিয়ে পড়ল রিদির ওপর। পাত্রের মা অত্যন্ত স্নেহমাখা চোখে রিদির দিকে চাইলেন। রিদিকে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে থুতনী তুলে বললেন, ’ মা শা আল্লাহ! ভাই সাহেব মেয়ে তো মাটির পুতুল।’
জাবেদ সাহেব গর্বিত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। রায়হানকে বললেন, ‘ রায়হান, পাত্র কোথায়? ওকে ভেতরে আসতে বলো।’
রায়হান মুচকি হেসে বলল, ‘জি আব্বু, ওর গাড়িতে একটু সমস্যা হয়েছিল। … এই তো এসে গেছে।’
ঠিক তখনই দরজার পর্দা ঠেলে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল একজন সুঠামদেহী তরুণ। পরনে সাদা রঙের একটা চমৎকার পাঞ্জাবি, চুলগুলো চেনা কায়দায় আঁচড়ানো।
তার পায়ের আওয়াজে রিদি এক পলকের জন্য মাথা তুলে তাকাল, আর পরক্ষণেই তার পুরো পৃথিবী থমকে গেল। রিদির বুকের ভেতরটা এক তীব্র ঝাঁকুনি খেল। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল চেনা অবয়ব দেখে । সালাম দিয়ে পাত্র এগিয়ে যেতেই জাবেদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। কোলাকুলি করলেন। রিদি মাথা নামিয়ে ফেলল। এখন কি তার অভিমান করা অনুচিত হবে?
বসার ঘরে একটা মৃদু চমক ঘটে গেল পাত্র আসার পর পর। সবার মাঝেই উৎকন্ঠা। এখানে রিদির মামা, চাচা, খালুরা উপস্থিত আছেন। তারা কেউই পাত্র হিসেবে জিহানকে আশা করেনি। রিদির চাচা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। পাত্রের কপালে আঘাত দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘ আপনার কপাল কাটল কীভাবে?’
দ্বীপ মুচকি হেসে বলল, ‘ রাস্তায় আসার সময় সামান্য একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে।’
সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেলেন। রায়হান এবং জাবেদ সাহেব প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স এনে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিল। দ্বীপ জাবেদ সাহেবের যত্ন দেখে বিস্মিত। মানুষটাকে বেশ রূঢ় ভাবত অথচ উনি খুবই অমায়িক। মিজান সাহেব ছেলের পাশে বসে এটা সেটা প্রশ্ন করছেন।
সকলের উদ্বিগ্নতা দেখে দ্বীপ বলল, ‘ দুশ্চিন্তা করবেন না কেউ, আমি এখন ঠিক আছি।’
দ্বীপের দিকে রায়হান শরবত এগিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে ধীর আওয়াজে বলল, ‘ শুভকাজে পা দেয়ার আগেই মারামারি করে এলে?’
দ্বীপ ফিসফিস করে বলল, ‘ না করে উপায় কি? কাজটা আপনার চাচা শ্বশুরের। রানা অবধি খবর গেলো কী করে আমি আজ এই বাসায় পাত্রী দেখতে আসছি? ‘
‘ উনি তো তোমাকে দেখে এমন অবাক হওয়ার ভান করল যেন কিছুই জানেনা।’
‘ বেঁচে ফিরলাম কিভাবে তাই ভাবছে। ‘
‘ আসলে ফিরলে কী করে?’
রায়হান সব প্রশ্ন এখনই করে ফেলছে। মনে হয় জীবনে আর সুযোগ পাবে না। দু চোখের পলক ঝাপটে দ্বীপ ইশারা দিল পরে সব জানাবে৷ দ্বীপ শান্ত হয়ে বসে আছে। টুকটাক এটা সেটার উত্তর দিচ্ছে সবার। সেই মুহুর্তে দ্বীপের ফোনে কল এলো। দ্বীপ বারান্দা থেকে কথা বলে সোফায় বসতেই মিজান সাহেব প্রশ্ন করলেন কার সাথে এত সিরিয়াস হয়ে কথা বলছিল? দ্বীপ উত্তরে শুধু জানাল, ‘ আব্বু এমপি সাহেব ফোন দিয়েছেন। শহরে এসেছি জানতে পেরে দেখা করতে বললেন।’
জাবেদ সাহেব প্রশ্ন করে বসলেন, ‘ রাজনীতিতে নাম লেখালে নাকি?’
দ্বীপ হেসে রিদির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো,’ না আংকেল, আব্বু চায় না আমি রাজনীতি করি।এছাড়া একজনকে কথা দিয়েছি দূরে থাকব রাজনীতি থেকে।’
রিদি এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। জাবেদ সাহেবের ঠোঁটের হাসিই বলে দিচ্ছে দ্বীপের উত্তরে তার মন প্রসন্ন হলো। এখনো বোবা হয়ে বসে আছে রিদি। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে শুধু মাথা কাত করে ধীর আওয়াজে উত্তর দিচ্ছে। মনে হলো সে কোনো স্বপ্ন দেখছে।
গত রাতে দ্বীপের বিদ্রুপ ভরা কণ্ঠ, ‘ কী হিসেবে পরিচয় করাবে?’ রিদির মনে তীব্র অভিমান এর জন্ম দিয়েছে। সব যে একটা নিখুঁত অভিনয় ছিল, তা এখন পরিষ্কার। রায়হান, রাহা ঠিক আছে কিন্তু বাবাও এই সারপ্রাইজের অংশীদার! সবার মুখের চওড়া হাসিই বলে দিচ্ছে, দ্বীপ রিদির হাত চাওয়ার জন্য কত বড় আয়োজন করে তারপর এসেছে। তবে কী এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলল!
দ্বীপ জাবেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনীত স্বরে বলল, ‘ আঙ্কেল, আমি কি রিদির সাথে আলাদা করে দুটো কথা বলতে পারি? আপনি যদি অনুমতি দেন।’
জাবেদ সাহেব সানন্দে মাথা নাড়লেন, ‘ হ্যাঁ অবশ্যই যাও । ‘
রিদির বারান্দায় ওদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিদি নিজের আবেগ ধরে রেখেছে। দ্বীপের দিকে না তাকিয়ে গ্রিলের বাইরে তাকিয়ে আছে। হয়ত ভেতরে ভেতরে তীব্র অভিমানে গুমড়ে যাচ্ছে। দ্বীপ দুবার ডাকল, ‘ রিদি।’
তাকালো না রিদি। পুনরায় ডাকল, ‘ এ্যই রিধিমা।’
আটকে রাখা চোখের জল এক ফোঁটা, দু ফোঁটা করে বেরিয়ে আসছে। দ্বীপ দুপা এগিয়ে এসে পকেট থেকে টিস্যু বের করে রিদির চোখের জল মুছে দিতে চাইলে রিদি ঝামটা মেরে সরিয়ে দিল। দ্বীপ আহত গলায় বলল, ‘ কাল রাতে কে যেন খুব বড় বড় কথা বলছিল, স্বামীর ঘরে যেন সুখের কমতি না হয় তাই তার জন্য দোয়া করতে । এখন স্বামীর ঘরের সুখ দিতে তো নিজেই চলে এলাম, তবুও চোখে পানি কেন?’
রিদি কথা বলছে না। মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। দ্বীপ বলেই যাচ্ছে , ‘ তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম রিদি। তোমার বাবার সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতা অর্জন না করে আসতে চাইনি। আমি সম্পর্কে দূরত্ব এনেছি শুধু এই একটা কারণে। খেলায় ফোকাস করতে পারছিলাম না তোমার চিন্তায় । মেডিকেল, ইউনিভার্সিটি কোথাও যখন তোমার হলো না আমি নিজেই মানসিক ভাবে দূর্বল হতে শুরু করলাম। ওই সময়টাতে দুজন মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট দিয়েছে। আম্মু আর রায়হান ভাই। তোমার উপর আসা ঝড় রায়হান ভাই সামলে নেবেন কথা দিয়েছিলেন। আমি জানিনা আল্লাহর কী রহমত, তুমি কোনো পাগলামি করো নি। অন্য কোনো মেয়ে হলে সম্পর্কের এই দূরত্বে হয়ত সুইসাইড বা কান্নাকাটির মত পাগলামি করত। আমি তোমাকে নতুন ভাবে চিনলাম। আমার সেই ছোট্ট রিদি কিভাবে নিজের আবেগ সামলে নেয় তা দেখলাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যেভাবেই হোক আমাকে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হবে। হয়ত সরকারি চাকরি হবে না কিন্তু যা পারি তাও তো একেবারে ফেলনা নয় তাই না? চেষ্টা করেছি। জানিনা কতটুকু পেরেছি।’
দ্বীপ থেমে গেল। নিজের ইমোশন নিয়ন্ত্রণ করছে। আজকের দিনটায় পৌঁছাতে গত পাঁচটা বছর অপেক্ষা করেছে। ইমোশনটুকু গিলে নিয়ে দ্বীপ বলল,
‘ রাগ ধরে রেখো না, আমি নিতে পারি না। আপনজনের অভিমান, শত্রুর দেয়া জখমের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক ।’
রিদির অভিমান পাহাড়সম। দ্বীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,’ আচ্ছা জোর করব না, তবে একটা কথা না বলে থাকতে পারছিনা।’
রিদি তাকাল। দ্বীপ প্রত্যুত্তরে বলল, ‘ মারামারি করে আজ জীবনের সেরা ম্যাচ খেলে এসেছি রানার সাথে ।’
রিদি ক্রোধান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে। দ্বীপ নিজ থেকেই মারামারির কথা টা স্বীকার করেছে, নতুবা পরে শুনলে দ্বীপের উপর চড়াও হবে।
দ্বীপ অধৈর্য্য হয়ে বলল, ‘ মিস রিধিমা ক্ষমা মহৎ গুণ।এভাবে তাকাবেন না ভয় লাগে। মানুষকে ক্ষমা করতে শিখুন। দেখছেন না ক্ষমার অভাবে একজন ফুটবল প্লেয়ার মুখ গোমড়া করে অসহায়ের মতো আপনার দরবারে হাত পেতেছে। আরও কিছুক্ষণ সময় এভাবে কাটালে সে হাত পা ছড়িয়ে নিচে কাঁদতে বসে যাবে। ‘
রিদি দাঁত খিঁচে দ্বীপের দিকে তাকাতেই দ্বীপ নিজের দু কান ধরে বোকার মত হেসে বলল, ‘ আর এমন করব না। দুঃখিত।’
রিদি হেসে ঠোঁট চেপে হেসে বারান্দা থেকে শোবার ঘরে চলে এলো। দ্বীপ পিছু নিতে নিতে বলল, ‘ কী হলো কথা বলা শেষ হয় নি তো। আরেকটু থাকি…।
রিদি শোবার ঘর থেকে ডাইনিং এর উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে । আর দ্বীপ পেছনে আসতে আসতে রিদিকে বলছে,
‘ মানুষ নাকি প্রেমিকাকে সারপ্রাইজ দেয়। সেই সারপ্রাইজ পেয়ে প্রেমিকা খুশিতে জড়িয়ে ধরে। আর আমার বেলায় ঘেটে সব ‘ ঘ’ হয়ে গিয়েছে। সারপ্রাইজ সর্বনাশ হয়েছে। গণ্ডমূর্খ আসলে আমি। আব্বু মাঝে মাঝে অথর্ব এই কারণে বলে। ‘
রিদি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দ্বীপের দিকে তাকাল। দ্বীপ ঠোঁট উলটে মিনতির চোখে তাকাল। রিদি আমলেই নিলো না দ্বীপকে। পরবর্তীতে দ্বীপ নিজেকে সামলে ড্রইং রুমে চলে এলো। যতক্ষন রিদিদের বাসায় ছিল ততক্ষন উঁকি দিয়ে রিদিকে খুঁজেছে দ্বীপের দুচোখ। রিদি ডাইনিং এ কথা বলছিল সবার সাথে দ্বীপ পর্দার আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখছিল। সীমা রাহাকে প্রশ্ন করল, ‘ আপু এই ফুটবলার দেখি রিদি থেকে চোখই ফেরাচ্ছে না। উঁকি দিয়ে দেখছে। ‘
রাহা হেসে বলল, ‘ বাংলাদেশের মানুষ এই ফুটবলারের ভক্ত আর এই ফুটবলার রিদির অন্ধভক্ত। ‘
সীমা পরবর্তী প্রশ্ন করার আগেই রাহা হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে শব্দহীন ঠোঁট আওড়াল যাতে কেউ না শুনে , ‘ পাঁচ বছর ধরে। ‘
সীমার গালে হাত। পাঁচ বছর আগে রিদির বয়সই বা কত ছিল!
রাহেলা রিদিকে চেইন পরিয়ে দিল। দ্বীপ হিরার আংটি পরিয়ে দিল। জাবেদ সাহেব হবু মেয়ের জামাইকে ঘড়ি উপহার দিলেন। বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য করা হলো আগামী পরশুদিন। কারণ এরপর দিন ঈদ। জাবেদ সাহেবের ইচ্ছে এবারের ঈদ টা মেয়ের জামাইদের সাথে করবেন। মিজান সাহেব আর নিষেধ করতে পারলেন না। কারণ এই সময়টাতে আত্মীয় স্বজনরা গ্রামেত বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে বেড়াতে আসবেন। সোনায় সোহাগা। একটা সুন্দর গেট টুগেদারও হয়ে যাবে। ঈদের পর দ্বীপের ম্যাচ আছে সে ব্যস্ত হয়ে যাবে।
__
জাবেদ সাহেব রাতে খাবারের টেবিলে বললেন, ‘ আমি আজ দ্বীপের ব্যবহারে সন্তুষ্ট। ‘ দ্বীপ আজ অবলীলায় একটি স্বীকারোক্তি দিল যা জাবেদ সাহেবকে মুগ্ধ করেছে। তিনি সবাইকে খুলে বললেন ঘটনা,
দ্বীপ যখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাসায় চলে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহুর্তে পিছিয়ে এসে বলল, ‘ আংকেল একটা স্বীকারোক্তি ছিল। আপনি অভয় দিলে বলতে পারি।’
জাবেদ সাহেব সম্মতি দিতেই বলল, ‘ পাঁচ বছর আগে একবার আপনার সাথে বেয়াদবি করে ছিলাম। ‘
জাবেদ সাহেব হেসে ফেললেন। তিনি জানেন দ্বীপ কি বলবে তাই নিজ থেকেই বললেন, ‘সেদিন রাস্তায় বাইক থেকে নেমে তর্ক করা ছেলেটা তুমি, তাই তো? ‘
দ্বীপ মাথা নাড়ল। জাবেদ সাহেব দ্বীপের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘ তুমি তোমার জায়গায় একদম ঠিক ছিলে। আমি ভুল ছিলাম।’
রিদি বাবার মুখে দ্বীপের প্রশংসা শুনে ঠোঁটের কোণে হাসিটা চওড়া করল।
জাবেদ সাহেব খেতে খেতে ছোট ভাইকে বললেন, ‘ শোন টুটুল, রানার সাথে মেলামেশা কম করিস। নতুন জামাই সুবিধার না যতদূর জানি। কিছুক্ষন আগে এমপি সাহেব আমাকে ফোন দিয়েছিলেন ব্যবসার ব্যাপারে কথা বলতে। আমাদের নতুন শো রুম ওপেনিং এ দাওয়াত দিয়েছিলাম। তখন উনিই জামাইয়ের ব্যাপারে যা বলার বলল। উনি শুনেছেন আমার মেয়ের সাথে বিয়ে। অভিনন্দন জানিয়েছেন। আরও কিছু খবর কানে এসেছে রানাকে নাকি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাবধানে থাকিস। ‘
টুটুল চুপ করে আছে। রানার উপর রাগ হচ্ছে। শুধু মুখে বড় বড় কথা কাজের বেলায় জিরো। ভাইয়ের কথায় শুধু মাথা নাড়ল।
__
সখিনা বানুকে মেয়েদের বাড়িতে নেয়া হয় নি এই নিয়ে তিনি ভীষণ অভিমান করেছেন।। নেয়া হয় নি বললে ভুল হবে নিতে চেয়েছিলেন রাহেলা, মিজান সাহেব রাজি হন নি। একে তো বয়স হয়েছে, তার উপর যেসব উল্টাপাল্টা কথা বলে কোন সময় অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়তে হয় বলা যায় না। এই যেমন এখন রিদনের পেছনে লেগেছে। রিদন ফোনে কথা বলছিল প্রমির সাথে। ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে বাসার সবাই জানে। দ্বীপের বিয়ের পরই রিদনের বিয়েটা সেরে ফেলবেন মিজান সাহেব। এরপর তার ইচ্ছে মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে আল্লাহর ঘর দেখে আসবেন।
সাজিনা দাদীকে সামলাতে পারছেনা। দ্বীপ বাইরে। এমনি বুড়ি দুই পা আগাতে পারে না লাঠি নিয়ে কিন্তু এখন সে রীতিমতো দৌঁড়াচ্ছে রিদনকে। এর কারণ হল, কিছুক্ষন আগে রিদন এবং প্রমির আলাপচারিতা শুনেছে। রিদন ভেবেছে বুড়ি কানে কম শুনে সব বলা যাবে। সেই হিসেবে প্রমিকে বলেছে, ‘ এই বজ্জাত বুড়িটার জন্য আমাদের বাসায় আমার কোনো রুম নাই। তুমি আসলে একে জল্লাদ তফুরার বাড়ি পাঠিয়ে দিব। সারাদিন আম্মুকে জ্বালায়।’
প্রমি উত্তরে বলল, ‘ তুমি এভাবে দাদীকে বলছ যে, তিনি যদি বুঝতে পারেন তোমার পিঠের ছাল তুলবে।’
রিদন ঠোঁট মোচড় দিয়ে বলল, ‘ ভাগ্যিস আম্মু এরে মাফ করে দিছে। নতুবা ঘুমের মধ্যে এর মোটা চুলের গোছা কেটে দিতাম। জানো আম্মুর চুল গুলো অনেক সুন্দর ছিল। এর জল্লাদ মেয়ে তফুরা ছোট থাকতে আম্মুর চুলে কাঁঠালের আঠা লাগিয়ে দিয়েছিল। এরপর বাধ্য হয়ে সেই চুল কেটে ফেলতে হয়েছিল। এই বুড়ি তখন মেয়েরে শাসন করে নাই।’
আরো অনেক কথাই প্রমির সাথে হচ্ছিল। কথা শেষে ফোন রাখতেই সখিনা বানু লাঠি দিয়ে দুই বাড়ি দিলেন। রিদন চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ বুড়ি জাতে মাতাল তালে ঠিক। খবরদার আমারে মারলে আমি তোমার তোমার চুল কাইট্টা দিমু ঘুমের মধ্যে। ‘
সারাঘরে নাতির পিছে ছুটে ক্লান্ত হয়ে মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে। তফুরার কথা মনে পড়ে এই কথা বলে কেঁদেই যাচ্ছে । দ্বীপের বিয়ের কথা শুনে তফুরা এমনিতে রেগে ছিল। তবে রাগের বাহানায় আসেনি। মায়ের অবস্থা করুন দেখে মিজান সাহেব ফোন দিতেই তফুরা ছুটে এলো। এই সুযোগ, এই বিয়েতে অশান্তি করার। অঞ্জু এবং তফুরার স্বামী এখন অবধি এই খবর জানে না। জানলে হয়ত এই বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক চুকে যাবে।
তফুরা আসতে আসতে রাত হলো। এসেই মাকে শান্ত করে খাইয়ে দিলো। ভাইয়ের সাথে বিয়ের ব্যাপারে কোনো কথা হলো না। শুধু ভাইকে বলল যে, ‘ যেহেতু জিহানের সাথে অঞ্জুর বিয়ে হচ্ছে না আমি চাই জিহানের নামে যে দিঘী আব্বা লিখে দিছে ওখানের কিছু অংশ অঞ্জুর নামে লিখে দিক জিহান ৷ আমি এত বছর সেই আশায় ছিলাম। আব্বা তো আমাকে মারা যাওয়ার সময় কথা দিয়েছিল জিহান আর অঞ্জুর বিয়ে দিবে। এ কথা আম্মাও জানে। আপনি আব্বার সাথে বেঈমানী করছেন বড় ভাইজান। ‘
মিজান সাহেব থতমত খেয়ে বললেন, ‘ আব্বা এরকম কথা কোনোদিনও বলে নাই। আর আম্মার কি সেন্স আছে যে এখন ওসব কথা মনে রাখবে? আমার ছেলে আমি যেখানে খুশি বিয়ে করাব। এছাড়া আমিও এমন কথা আব্বাকে দিই নাই। ভুল কথা বলে এখন বিপদে ফেলতে চাচ্ছিস কেন?’
‘ আপনি আমাকে ঠকাইছেন । আমি মাফ করমু না আপনারে।’
মিজান সাহেবের রাগ উঠে যাওয়ার উপক্রম। ঠিক তখনই দ্বীপ বাসায় ঢুকল। ফুফুকে দেখে সালাম দিল। দ্বীপকে জড়িয়ে ধরে গুনগুনিয়ে নাটুকে কান্না শুরু করল তফুরা। সাজিনা এবং রিদনের দিকে তাকাতেই ওরা বুঝাল পরিস্থিতি স্বাভাবিক নেই। ফুফুকে এটা সেটা বুঝ দিয়ে শান্ত করল দ্বীপ। এগুলো নিয়ে আগামীকাল কথা বলবে জানাল।
ফ্রেশ হয়ে নিজের কামরায় এসে ফোন দিল অন্তরতমাকে। ফোন রিসিভ হলো ঠিকই ওপাশ থেকে কথা আসছে না। তালতলা রোডের বাড়িটা অনেক আগেই মিজান সাহেব ছেড়ে দিয়েছেন। এখন যে ফ্ল্যাট টাতে থাকে ওটা সাহাবুদ্দিন রোডে। দ্বীপের টাকায় কেনা। গাড়ি কিনেছে গতমাসে। শোরুম থেকে গতকাল রাতে আনা হয়েছে । নিজেও চড়ে নি এখন পর্যন্ত। একটা গোপন ইচ্ছে আছে। ওটা পূর্ণ করতে চায়। বারান্দায় বিন ব্যাগটাতে বসে বিল্ডিংয়ের পাশে অবস্থিত পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে। চারদিকের আলোর ছটা পুকুরে পড়েছে। ফোনের অপর পাশে থাকা রমনীকে প্রশ্ন করল, ‘ এখনও অভিমান পুষে রাখবে? আমি তো নিজের অপারগতা স্বীকার করলাম। ‘
রিদি ও পাশ থেকে উত্তরে বলল, ‘ আমি হারিয়ে গেলেই কেউ আমার মর্ম বুঝতে পারত। এতগুলো দিন আমার মনের মাঝে কী চলেছে সেটা সে জানতেও চাইল না। এখন এসে সরি বলে আমার কষ্ট গুলোকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। সরি বললেই কি সব অপরাধ শেষ? ‘
‘ সরি বলা ছাড়া আর কি কিছু বলা যায়?’
‘ আমার কিছুই লাগবে না। না সরি লাগবে আর না কারো সাথে যোগাযোগ। আমি কাউকে বেঁধেও রাখিনি। চলে যাক সে।’
সচরাচর অভিমান করে না এই মেয়ে। এতগুলো মাসের জমে থাকা অভিমানের মেঘ আজ তার শব্দে উপছে পড়ছে। রিদির মৌনতা ভাঙতে না পেরে দ্বীপের মনের সবটুকু আলো এক নিমিষেই নিভে গেল। এক বুক হাহাকার চেপে করুণ স্বরে বলে উঠল,
‘ রিদি… আমার তুমি ছাড়া যাওয়ার জায়গা নেই।’
চলবে…
