Friday, June 5, 2026







হৃদিতে রিদি পর্ব-০৫

#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৫.
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষেধ)

দাদীকে ঔষধ দিয়ে বাবার সাথে দাদীর স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করছিল দ্বীপ। ঔষধে অনিয়ম করেন দাদী। মা ও মাঝে মাঝে কাজের চাপে ভুলে যান। বাবাকে দাদীর সব ঔষধ প্রেসক্রিপশন সহ বুঝিয়ে দিচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর হাতের ফোন দেখছে । কোনো মেসেজ আসে কিনা। হয়তো দ্বীপ অহেতুক আশা নিয়ে বসে আছে। অকস্মাৎ ফোন এল। পরিচিত নম্বর। বসা থেকে উঠার জন্য শক্তি পাচ্ছে না। যদি না করে দেয়? পরক্ষণে মনে হল, এত ভেঙে পড়ার মত কিছু নেই। না করে দিলে নাহয় না করে দিবে, হয়ত কিছুদিন মন খারাপ থাকবে ; এর চেয়ে বেশি কিছু তো নয় । ফোন রিসিভ করল নিজের রুমে এসে। ও পাশ থেকে জানাল এখন দেখা করতে। তৈরি হতে পাঁচ মিনিট সময় নিল।

তিন বান্ধবীকে রেস্টুরেন্টে একসাথে দেখতে পেল। মিরা এবং প্রমা চলে যেতে চাইলে দ্বীপ বারণ করল। একই টেবিলে বসতে বলল। এদের মাঝে সবচেয়ে রোগা এবং বিমর্ষ দেখাচ্ছে রিদিকে। কেমন যেন প্রাণহীন। প্রশ্ন করল, ‘ কি হয়েছে, চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন?’

মিরা জবাবে বলল, ‘ ভাইয়া জ্বর ওর। গতকাল রাতে সেন্সলেস হয়ে পড়ে গিয়েছে। আজ কলেজেও আসেনি। প্রাইভেটে আংকেল দিয়ে গেল।’

ভ্রু কুচকে গেল দ্বীপের,
‘ হঠাৎ জ্বর কেন আসল?’

মিরা এবং প্রমা ওদের রেখে দুই টেবিল পেছনে চলে গেল। রিদি চুপ করে বসে আছে। দ্বীপ চিন্তিত। রিদি বিষন্ন গলায় বলল, ‘ আমি পারব না এই সম্পর্কে জড়াতে। হ্যাঁ বলব নাকি না বলব, এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমার জ্বর উঠে গিয়েছে। এরপর ভবিষ্যতে না জানি কি হবে। এত দুশ্চিন্তা করতে গিয়ে পরীক্ষাই দিতে পারব না। ‘

দ্বীপ চুপ থেকে বলল, ‘ ঠিক আছে। বাসায় যাও। শরীরের যা অবস্থা আজ প্রাইভেট পড়ার প্রয়োজন নেই। ‘

রিদি নড়ল না। আগের জায়গায় বসে আছে। দ্বীপ ওয়েটার ডেকে কিছু খাবার তিনজনের জন্য পার্সেল করে দিতে বলল। মিরা প্রমা না করেছে তবুও শুনেনি। তিনজনই লজ্জায় পড়ে গেল। এরপর তিনজনকে চলে যেতে বলল। ওরা চলে গেল কিন্তু দ্বীপ আগের জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছে।

রিদিকে বাসায় পৌঁছে দিল মিরা। রাস্তায় আজ মিরা নিজেও রিদিকে সাহস দিল। বুঝাল মন যা চায় তাই করতে। বাসায় এসে হালকা কিছু খেল। টেবিলের উপর খাবারের পার্সেল টা রাখল। আমিনা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পেয়েছে। জানাল মিরা কিনে দিয়েছে। পাশের বাসার একজন এসেছে আমিনার সাথে গল্প করতে। তার ছোট দুটো বাচ্চা আছে। ওরা ছুটে চলে আসে রিদির রুমে। নুভা আর নুহাশের খেলনা এই রুমেই থাকে। রিদির আজ ভালো লাগছে না। মাকে বলল, ‘ আম্মু আমি দরজা লাগিয়ে ঘুমাচ্ছি ডেকো না। ঘুম ভাঙলে দরজা খুলব।’

আমিনা বুঝতে পারলেন রিদি হয়ত বাচ্চাদের সাথে খেলতে চাচ্ছে না। শরীর ভালো না মেয়েটার। রিদি অপরাধবোধ নিয়ে বিছানায় মাথা এলিয়ে দিল। আসার সময় জিহানের চেহারা দেখেছিল। ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে একবার অনুরোধ করত। কিন্তু দ্বীপ দ্বিতীয় কোনো শব্দ উচ্চারণ করে নি। আচ্ছা রিদি কি কোনো ভাবে জিহানকে কষ্ট দিলো? রিদির মনে এসব প্রশ্ন উঠানামা করতেই আনমনে দ্বীপকে ফোন দিল পরিস্থিতি বুঝার জন্য। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হল। রিদি জিজ্ঞেস করল, ‘ কি করছেন?’

দ্বীপ উত্তর দিল, ‘ আগের জায়গায় বসে আছি।’

রিদি চমকে গিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ আগের জায়গা মানে? ওই রেস্টুরেন্টে? ‘

‘ হুম।’

‘ কেনো? আমরা আসার পর প্রায় দেড় ঘন্টা পার হয়েছে। আপনি একই জায়গায় কেন বসে আছেন?’

‘ কি করব? মাথা কাজ করছে না। বাসায় গেলে আব্বু আম্মু প্রশ্ন করবে। বন্ধুদের সাথে দেখা করলে চেহারা দেখে উলটা পালটা কিছু ভাবতে পারে৷ এখান থেকে বের হয়ে কোথায় যাব বুঝতে পারছিনা। তাই চুপচাপ এখানেই বসে আছি। কেউ প্রশ্ন করার মত নেই।’

‘ কি হয়েছে আপনার চেহারার?’

‘ রিদি তুমি বুঝো না নাকি বুঝতে চাইছ না, কোনটা? আট দশ টা প্রেম করার অভিজ্ঞতা আমার নেই। তুমিই প্রথম আমার জীবনে। এভাবে প্রত্যাখ্যাত হব জানলে কখনো আগাতাম না। যদিও আমি জানিনা আমার অপরাধ কি? তবুও আমি নিরব ভূমিকা পালন করছি। হয়ত কিছুদিন পর ভুলে যাব। যাই হোক, ফোন দিয়েছ কেন? শরীর ভাল আছে এখন?’

রিদি চুপচাপ থেকে কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বলল, ‘ প্রথম শর্ত আব্বু আম্মুকে রাজি করানোর সব দায়িত্ব আপনার, দ্বিতীয় শর্ত আমি মেডিকেলে পড়তে চাই, তৃতীয় এবং শেষ শর্ত আমাকে সারাজীবন ভালবাসতে হবে, কোনোভাবে ধোঁকা দেয়া যাবে না। আমি একশো বার ভুল করব। কিন্তু আপনাকে হাজার বার সরি বলতে হবে। আমি কোনো রিস্ক নিতে পারব না, সব আপনাকে নিতে হবে। মাঝে মাঝে আমি সিদ্ধানহীনতায় ভুগে উলটা পালটা সিদ্ধান্ত নিই।সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। রাজি?’

দুপাশ নিরব। দ্বীপ ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মনে মনে ভাবছে এই মেয়ে মোটেও ছোট নয়। নিজেরটা ঠিক বুঝে। ঠোঁটের কোণে যে হাসিটা ফুটেছে তা যদি রিদি একবার দেখত বিদায় অনুষ্ঠানের দিন যেভাবে প্রেমে পড়েছিল আজ আরেকবার প্রেমে পড়ত। প্রানবন্ত হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিল, ‘ শরীর ভাল হলে ফোন দিও। দেখা করব। বিশ্রাম নাও সব ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে। দুশ্চিন্তা সব আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। এপ্রিলে পরীক্ষা কিভাবে ভালো করবে সেটা ভাব। পরীক্ষা খারাপ করে আমার সব পরিশ্রমে জল ঢেলে দিও না। তোমার আব্বু আম্মুকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার। ‘

রিদি ফোন কেটে দিল৷ মনে হল বুকের উপর থেকে পাথর সরে গেল। আজ একটা আরামের ঘুম দিল। রাতে ঘুম থেকে উঠে পেট ভরে ভাত খেল। আমিনা আজ অনেক খুশি। মেয়েটাকে সুস্থ লাগছে। জাবেদ সাহেব মেয়ের পছন্দের বিস্কুট, চিপ্স,চানাচুর এনে রাখলেন বাসায়। রাত জেগে পড়বে আজ। বাসার শিক্ষককে আমিনা আজ আসতে বারণ করে দিয়েছিলেন। পড়ার টেবিলে রিদির পছন্দের খাবার রেখে শুতে গেলেন আমিনা। রিদি মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। প্রায় ঘন্টা খানেক পড়ার পর ফোন হাতে নিল। আজ আমিনা মেয়ের কাছে ফোন রেখে গিয়েছেন। রিদি জানিয়েছে ফোনে ‘ কোয়ান্টাম তত্ত্ব ‘ পড়বে। রাত যখন গভীর রিদি ফেসবুকে ঢুকে মেসেজ দিল দ্বীপকে। মেসেজের উত্তর না পেয়ে মনে পড়ল দ্বীপ তো বারোটার মাঝেই ঘুমিয়ে যায়। পড়ায় মনোযোগ দিল, মাঝে মাঝে বন্ধুদের দু একটা মেসেজ দিচ্ছে।

ঠিক আধঘন্টা পর দ্বীপ রিপ্লাই দিল, ‘ বাহ! এ তো দেখি আমার চাঁদ। আজ সে ফোন কোথায় পেল?’

রিদি তখন ‘লা শাতেলিয়ার নীতি’ পড়ছিল। মেসেজের এমন রিপ্লাই দেখে লজ্জা পেয়ে হেসে উঠল। গম্ভীরমুখো, সিরিয়াস সিরিয়াস কথা বলা মানুষ টা এমন সম্বোধন করতে পারে ভেবে ভীষণ অবাক হল।রিপ্লাই দিতেও লজ্জা লাগছিল। দ্বীপ যদি আজ লাজুক রিদির লাজে রাঙা গাল দুটো দেখত নির্ঘাত বলত,

‘ এই গাল দেখার জন্য হলেও প্রতিদিন তোমাকে মায়া জড়ানো সম্বোধন করব।’

কানের গোড়ায় কলম রেখে রিপ্লাই করল রিদি, ‘ পড়া আছে, তাই আম্মুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি। অসুস্থ বলে মাফ পেয়েছি। ‘

‘ নাহ যতটা বোকা ভেবেছিলাম, ততটা বোকা না ম্যাডাম । ঠিক আছে পড়েন। বিরক্ত করব না।’

‘ এই না, আমি পড়তে পড়তে কথা বলব। আপনি থাকেন। ‘

‘ পরে বলবে না তো আমি বিরক্ত করেছি?’

‘ নাহ বলব না। ‘

‘ জ্বর আছে? খেয়েছ কিছু?’

‘ রাতে আজ এক প্লেট ভাত খেয়েছি। এখন আপনার কিনে দেয়া বার্গার খাচ্ছি। আম্মু গরম করে দিয়েছে।’

‘ গুড, বেশি করে খাও। অসুস্থ হলে তো পড়তে পারবে না। ‘

টুকটাক কথা বলতে বলতে প্রায় ভোর। রিদি বিদায় জানাতে ভুলে গিয়েছে। পড়ার টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়ল। সকাল সাতটায় এসে আমিনা তুলে দিলেন। কোনো রকম তৈরি হয়ে বের হয়ে গেল। প্রাইভেটের সামনে এসে অদ্ভুত একটা জিনিস দেখল। দ্বীপ রাস্তার বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চমকে উঠল রিদি। ফোনে মেসেজ এল দ্বীপের, ‘ তোমাকে দেখতে এলাম। আজ দশ মিনিট লেট করেছ। কাল থেকে এত রাত জেগে পড়ার প্রয়োজন নেই।’

রিদি হাত দিয়ে ইশারা দিল। দ্বীপ সরাসরি ফোন দিল। বলল, ‘ আমি প্রতিদিন আসব কোনো না কোনো প্রাইভেটে। সব প্রাইভেটের সময় তো জানি। একবার দেখে চলে যাব। তুমি কথা বলবে না। সাথে ফ্রেন্ডরা সন্দেহ করবে। অন্যদিকে কলেজে যাওয়া যাবে না। সবাই আমাকে চেনে।’
__

কলেজ গেট দিয়ে লাফাতে লাফাতে ঢুকছে। প্রেমে পড়লে মন উড়ু উড়ু থাকে। মিরা আর প্রমা রিদির এমন লাফালাফি দেখে হাসছে। রিদি আশপাশে তাকিয়ে যত সহপাঠী, সিনিয়র এবং জুনিয়র ছেলে দেখছে সবাইকে দেখে নাক ছিটকাচ্ছে। আপাতত তার কাছে দ্বীপের মত সুন্দর পুরুষ আর একটিও নেই। আনমনে হাঁটতে গিয়ে গর্তে পা পড়েছে। মিরা ধমকে বলল, ‘ পাগলামী করছিস কেন, সাবধানে হাঁটতে পারিস না? এমন লাফাচ্ছিস কেন? ‘

রিদি হেসে ফিসফিস করে বলে, ‘ নতুন নতুন প্রেম করছি, একটু সেলিব্রেট করতে দে।’

তৎক্ষনাৎ একটা বাইক পাশ দিয়ে শাঁ করে গেল। রিদি গর্তে পা পড়ার ফলেও এত ব্যাথা পায় নি যতটা ব্যাথা বাইকের সাথে লেগে পেয়েছে। পা ধরে নিচে বসে পড়ল। আশপাশের সবাই ছুটে আসল। প্রমা চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘ মানুষজন দেখে বাইক চালাতে পারে না এরা , এটা কলেজের রাস্তা ভুলে যায় বদমাশগুলো। ‘

প্রমার গালি শুনে বুম বুম আওয়াজ করে বাইক টা পুনরায় একই জায়গায় এসে থামল। হেলমেট টা খুলতেই আশেপাশের মানুষ জন দূরে সরে গেল। মেয়ে তিনটা ভ্রু কুচকে ফেলল। কোথায় তাদের সাহায্য করবে তা না উলটো দূরে সরে গিয়েছে। রিদির সামনে নিচু হয়ে বসল ছেলেটা । প্রশ্ন করল, ‘ বেশি ব্যাথা পেয়েছ?’

মিরা বলল, ‘ ব্যাথা দিয়ে জিজ্ঞেস করছেন ব্যাথা পেয়েছে কিনা, এটা কেমন আচরণ? ‘

মিরার দিকে ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘ ব্যাথা কি তুমি পেয়েছ?’

মিরা ঢোক গিলল। রিদি এতক্ষণ চুপ ছিল৷ প্রমা এবং মিরাকে বলল তাকে তুলতে। তারা লক্ষ্য করল কিছু সময়ের মাঝেই বখাটে বাইকারের আশেপাশে অনেক গুলো ছেলে উপস্থিত হয়েছে। তিনটে মেয়ে মানুষ আশপাশের সবাই দূরে সরে গিয়েছে, এবার ভয় লাগাটা স্বাভাবিক। ছেলেটা এগিয়ে আসল রিদির দিকে। শীতল চাহনীতে বলল, ‘ তুমি জাবেদ কাকার মেয়ে রিদি না?’

রিদি চমকে উঠল। পুনরায় লোকটা তার পাশে থাকা ছেলেগুলোর মাঝে একজনের উদ্দেশ্যে বলল, ‘ মাহির যা তো আপুকে সি এন জি ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যা। কি হয়েছে দেখ? ‘

ছেলেটার দিকে এক হাজার টাকার দুটো নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ আর লাগলে ফোন দিস। বিকাশে পাঠিয়ে দিব।’

পুনরায় চলে গেল। মিরা একটা বিচ্ছিরি গালি দিল ওই ছেলে না শোনা মত। প্রমা আর রিদি শুনল। রিদি তখনও প্রমার কাঁধে ভর করে দাঁড়িয়ে ছিল। মাহির ছেলে টা এসে রিদিকে বলল, ‘ আপু আপনি দাঁড়ান, সি এন জি ডাকছি। ‘

মেয়ে তিনটা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ধামড়া, ইয়া বড় এক ছেলে তাদের আপু ডাকছে। রিদি প্রতিবাদ করে বলল, ‘ আমি যাব না। ‘

মাহির বলল,’ প্লিজ আপু চলুন। আপনি না গেলে ভাই রেগে যাবে।’
রিদিও ক্ষেপে বলল,’ আমার পা, যাব কি যাব না সিদ্ধান্ত আমার। আপনার ভাই বলার কে?’

‘ উনি কলেজের ভিপি, রানা ভাই। আপনি ভাইকে চেনেন না?’

‘ ভিপি কি? ভাইস প্রিন্সিপাল? এত কম বয়সে? ভাইস প্রিন্সিপাল এত ছ্যাঁচড়া হয়? বাইক নিয়ে বখাটেদের মত ঘুরে? এত গুলা চ্যালা চামুন্ডা পালে?’

থতমত খেয়ে গেল সবাই। মিরা আর প্রমা হা করে আছে। রিদি সচরাচর এভাবে তর্ক করে না আজ একেবারে মুখের উপর বলে দিল কত গুলো কথা! রিদি পা ঠেলে সামনে খানিকটা আগাল। রিকশা ডেকে নিজেই রিকশায় উঠে গেল। আজ ভেতর টা রাগে ভরে গেল রিদির। রিদি ঠিক চিনেছে এই ছেলেকে। ভিপি বলতে যে কলেজের পাতি নেতা সেটাও বুঝেছে। ইচ্ছে করে কথা গুলো শোনালো যাতে ওই ছেলে পর্যন্ত যায়। যতদূর বুঝতে পারছে চাচা এই ছেলেটার কথাই সেদিন তার বাবাকে বলেছিলেন,

‘ রুস্তম ভাইয়ের ছেলে রানা রিদিদের কলেজের ভিপি। ক্ষমতা আছে হাতে। কলেজ থেকে বের হলেই হয়ত ভালো কোনো রাজনৈতিক পদে চলে যাবে। ইলেকশন ও করতে পারে। রিদির জন্য দেখতে পারেন। পাত্র হিসেবে খারাপ না। রুস্তম ভাই প্রস্তাব দিয়েছেন।’

আজকে রানা যেহেতু তার নাম নিয়েছে তার মানে পারিবারিক ভাবে তারা রিদির ব্যাপারে আলোচনা করে।

এই ঘটনার পর রিদি বিশ্রাম নিয়েছে বাসায় বেশ কিছুদিন। প্রাইভেটে ও যায় নি কয়েকদিন। দ্বীপকে জানিয়েছে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। বাসায় ও জানায়নি কিভাবে ব্যাথা পেয়েছে। বাসায় জানালে জাবেদ সাহেব কলেজ গিয়ে ঝামেলা করবে নতুবা পরিচয় করিয়ে দিবে ওই ছেলের সাথে আরও ভালোভাবে। এসব ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে রিদি।

এদিকে দ্বীপ আগে থেকে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেল রিদির বাবা সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে৷ আগে যদিও একান্তে দেখা করার নাম নিত এখন প্রাইভেটে দূর থেকে দেখা, এক প্রাইভেট থেকে অন্য প্রাইভেটে যেতে ফোনে কথা বলা, কখনো যদি রিদি তার মায়ের কাছ থেকে ফোন নিয়ে আসতে পারে, তখন টুকটাক মেসেজ চালাচালি হয়। এইত প্রেম নিরব, সুন্দর। যদিও রস কষহীন প্রেম, কোনো রোমান্টিকতা নেই ; কোনো অতিরিক্ত কিছু নেই, তবুও সুন্দর কারণ দুজনই এমন অনুভূতিতে নতুন। রিদি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবে দ্বীপের সমবয়সী ছেলের যেখানে এক ডজন বান্ধবী থাকার কথা সেখানে দ্বীপের কেন কোনো বান্ধবী নেই? কোনো অতিরিক্ত চাহিদা নেই? তার কি কখনো আগ্রহ জাগে নি? নাকি সে খারাপ, মুখোশ আছে এই ভাল মানুষীর আড়ালে। হাজার ও প্রশ্ন মনে। দ্বীপকে এই প্রশ্নগুলো কৌশলে করবে।

সুস্থ হয়ে সতর্ক হয়ে কলেজে যায়। রানাকে দেখলে আড়াল হয়ে যায়। চোখাচোখি হলে যদি উলটা পালটা প্রশ্ন করে তখন ঝামেলা। সে চায়না কলেজে কেউ জানুক রিদি এবং রানা আত্মীয়। এই কয়দিনে এত টুকু বুঝেছে কলেজের মেয়েরা রানার সাহচার্য বেশ পছন্দ করে। রিদিদের ক্লাসের শান্তা, অতসী তো পারে না রানা ভাইয়ের কোলে চেপে বসতে। আরেকদল ছেলে আছে, পারলে রানা ভাইকে মাথায় তুলে নাচবে। এসব দেখে অতিষ্ট তিন বান্ধবী।

___

সকালে আজ দ্বীপ আসেনি প্রাইভেটের সামনে। সম্পর্কে জড়ানোর পর থেকে প্রতিদিন রুটিন করে প্রাইভেটে এসে রিদিকে দেখে যায়। বিকেলের প্রাইভেটেও আসে যেদিন সকালে আসে না সেদিন। আজ কোনো প্রাইভেটেই দ্বীপ নেই। ফোন দিল ফোন বন্ধ। মেসেজ দিল, উত্তর নেই। সম্পর্কের আজ দুইমাস। গত দুইমাসে এমন টা কখনো হয় নি। আজই প্রথম। রিদি বাসায় ফিরে নিজের আইডি থেকে মেসেজ দিয়েও অফ লাইন পেল। আজ রাতে অনুরোধ করে মা থেকে ফোন রাখল। সারা রাত নির্ঘুম কাটল। দ্বীপ এলো না অনলাইনে।

সকালে প্রাইভেটের সামনে গিয়ে দেখে দ্বীপ দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু এসব সিনেমাতে হয়। রাস্তার মানুষ বাজে মেয়ে ভাববে। দ্বীপ ফোন দিল। রিদি রিসিভ করেই চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ আপনার সমস্যা কি? ‘
‘ আগে তুমি সম্বোধন কর এরপর বলছি, নতুবা বলব না।’
রিদির রাগ কমেনি। একই জোশ নিয়ে সম্বোধন পালটে বলল, ‘ তোমার সমস্যা কি? কোথায় ছিলে গতকাল?’
‘ তোমার মুখে তুমি শুনতে কি যে ভাল লাগছে, তোমাকে আমার বউ বউ লাগছে।’
‘ আবার দুষ্টুমি করছ? গতকাল সারাদিন, সারা রাত এত দুশ্চিন্তায় কেন রেখেছ?’
‘ তুমি আমার জন্য দুশ্চিন্তাও করো? ‘
‘ মজা করবে না’
‘ আচ্ছা আচ্ছা, আসলে গতকাল ফুটবল খেলতে গিয়ে আঙুল ভেঙে ফেলেছি ৷ ব্যান্ডেজ করা ছিল। হাঁটতে পারছিলাম না। রাতে ব্যাথায় জ্বর চলে এসেছিল। হুঁশ ও ছিল না, ফোনে চার্জ ও ছিল না।

‘ ইয়া আল্লাহ! তুমি ফুটবল ও খেল? এখন কেন এসেছ এই ব্যাথা নিয়ে? কিভাবে এসেছ, বাসা থেকে আসতে দিল কি করে?’

‘ আস্তে! একসাথে এত প্রশ্ন কেউ করে? সবাই ঘুমে দরজায় তালা লাগিয়ে এসেছি। তোমাকে না দেখে শান্তি পাচ্ছিলাম না। তাই চলে এলাম। দেখা শেষ, চলে যাব এখন। পায়ে সামান্য ব্যাথা করছে তবে ওই ব্যাথাও হালকা হয়ে গিয়েছে তোমাকে দেখে। আরেকটা কথা, আমি ফুটবল খেলি এবং সবাই তো বলে ক্লাবের ওয়ান অফ দ্য বেস্ট গোল কিপার।’

‘ স্যার আসছে। বাসায় যাও বাকি কথা পরে বলছি।’

দ্বীপ বাসায় আসল অনেক কষ্টে। বাসায় এসে দেখে সবাই ঘুম থেকে জেগে গিয়েছে। রাহেলা খানম ছেলেকে বকে বকে বললেন, ‘ পায়ের কি অবস্থা বের হয়েছ কেন?’
মায়ের মন, কিছু কি আর লুকানো যায়? প্রশ্ন করে বসলেন, ‘মেয়েটা কে?’
দ্বীপ কিঞ্চিৎ হেসে ফেলল লজ্জা পেয়ে। রাহেলা খানম বিস্মিত ছেলেকে লজ্জা পেতে দেখে। এই ছেলে প্রেমেও পড়ে? তফুরার মেয়েটা কত সুন্দর। এই বাসায় আসলে আগে পিছে ঘুরে। ফিরেও তাকায় না ওই মেয়ের দিকে। অথচ বাইরের মেয়ে মন জয় করে ফেলল? যার জন্য পায়ে ব্যাথা নিয়ে বের হয়ে গেল এই ভোর সকালে?

মাকে চিন্তিত দেখে দ্বীপ বলল, ‘ দুশ্চিন্তা করবেন না আম্মু, সময় হোক সব বলব।’

রাহেলা খানম খুশি হলেন নাকি বেজার হলেন বুঝা গেল না তবুও আশ্বস্ত করলেন। বললেন এবার যেন কিছু একটা করে । বয়স তো কম হয় নি, পঁচিশের ঘরে পা দিয়েছে। চাকরি ছাড়া তো মেয়ে বিয়ে দিবে না কেউ? দ্বীপ জানাল, সে চাকরি করবেনা। ব্যবসা করবে নতুবা ফুটবলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিবে। রাহেলা বেগমের দীর্ঘ শ্বাস। কি পেল ছেলে ফুটবলের মাঝে?

___

বাসায় এসে রিদি ফোন দিল। আজ বাসায় কেউ নেই। আমিনাও নেই। তার ভাইয়ের বাসায় গিয়েছে। দ্বীপ ফোন রিসিভ করতেই রিদি বলল,

– তুমি সুস্থ আছ? পা ঠিক আছে?

ও পাশ থেকে প্রতি উত্তর ,

– আছে ভাল। আফসোস টুর্নামেন্ট টা খেলতে পারব না।

– এই খেলা না খেললে কি হয়? ফুটবল খেলতে কাউকে দেখলেই আমি গালি দিই। গতবার কলেজের মাঠে এক বেয়াদপ, অসভ্য লোক ফুটবল মেরে আমার কোমড় ভেঙে দিয়েছে। ইচ্ছেমত বদদোয়া দিয়েছি যেন ওর পা ভেঙ্গে যায়। জীবনেও খেলতে না পারে।’

দ্বীপ শুকনো ঢোক গিলে প্রশ্ন করল, ‘ কখনকার ঘটনা এটা?’

‘ আরো ছয়-সাত মাস আগে। একদিন ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম, স্কুল মাঠের রাস্তা ধরে গেট দিয়ে বের হব সেই মুহুর্তে বল এসে কোমড়ে লাগল। পনেরো দিন বেড রেস্টে ছিলাম। বেয়াদপ, অসভ্য ফুটবলার। সামনে পেলে আমি লাঠি পেটা করতাম ওকে। ‘

‘ সামনে তো প্রতিদিনই পাও। তবে রিদি আর বদদোয়া দিও না। বদদোয়া লেগে যায়। কিছু আঘাত দূর্ঘটনার,ইচ্ছাকৃত নয়। তোমার কোমড় ভেঙ্গে দেয়া সেই বেয়াদব,অসভ্য গোল কিপারটাই আমি।’

রিদি চমকে গিয়ে মুখে হাত দিল। হায় হায় করে মাথায় হাত দিল। কি করল সে? কেন বদদোয়া দিল৷ তার বদদোয়ায় আজ মানুষটার এই অবস্থা। বুক ভেঙে কান্না আসছে। বলতে বলতে হাউ মাউ করে কেঁদে দিল। দ্বীপ সামলাতে ব্যর্থ হল। রিদি অনুরোধ করে বলল ফুটবল ছেড়ে দিতে। যে বদদোয়া দিয়েছে পা ভেঙ্গে গেলে তো আরো বড় বিপদ হবে।

চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ