#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
৪.
রাহেলা খানমের মন ভার আজ। তার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা হল প্রতিদিনের রান্না নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানিয়ে ফ্রিজের সামনে বসবে। এরপর কোন তরকারির সাথে কোন তরকারি, মাছ না মুরগী, আলু না কুমড়া সব মিলিয়ে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবে আজকে কি রান্না হবে। রান্না চুলায় চড়ানোর আগে সে স্বামীর কাছে গিয়ে স্বামীর পছন্দ শুনবে তিনি আজ কি খেতে চান? যদি স্বামীর পছন্দ আর তার আজকের পরিকল্পনা মিলে যায়, সে খুশি মনে তরকারির আরও একটা পদ রান্না করবে। আর যদি না মিলে ছেলে মেয়েদের কান্না করতে করতে বলবে, ‘ আমার জীবনে সুখ নাই, তোমাদের বাবা আমাকে বুঝল না। আমি এত বছর শুধু খেটেই গেলাম।’
ভদ্রলোক মিজান সাহেব অথচ এসবের কিছুই জানেন না। তিনি যদি এসব কিছু জানতেন তবে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বনবাসে চলে যেতেন। এমনিতেই তার কিছু ইচ্ছে আছে, যুবক বয়সে বন্ধুদের সাথে সুন্দরবন ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে কুমিরের খপ্পরে পড়েছিলেন। সেই কুমির তাকে কামড় দেয় নি, কি করুন চোখে তাকিয়ে ছিল। কারণ মা কুমিরের বাচ্চা টা মারা গিয়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ কথা বাসায় এসে যখন রাহেলা খানমকে বললেন, রাহেলা বলেছেন কুমির নাকি মিজান সাহেবের মাঝে কুমিরের মরে যাওয়া বাচ্চাটাকে দেখেছে তাই খায় নি। অতি আবেগী মিজান সাহেব এই কারণে কুমিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কুমিরের বাচ্চা পালবেন। এই কথা রাহেলা বলেছেন,
‘ তুমি তো একটা মরা কুমির কিন্তু তোমার ঘরে যে জ্যান্ত কুমির আছে, তাকে সামলানোর ব্যবস্থা কর৷ সামনে তুফান আসতেছে।আপাতত সে এখনও ঘুমন্ত, তাই কিছু টের পাচ্ছ না ।’
রাহেলার এই কথার মারপ্যাচ তিনি ধরতে পারলেন না। তিনি কিছু টাকা জমিয়েছেন। সেই টাকা দিয়ে অষ্ট্রেলিয়া যাবেন এবং সেখান থেকে কিছু ” ফ্রেশি বা অষ্ট্রেলিয়ান ফ্রেশ ওয়াটার ক্রোকোডাইল ” নিয়ে আসবেন। তিনি শুনেছেন এই প্রজাতি মানুষ খায়না। পোকামাকড় এবং ফ্লাংটন খেয়ে বেঁচে থাকে। আপাতত সেই চিন্তা বাদ দিয়ে হাতের টাকা গুলো আরেকবার গুনলেন। না ঠিকঠাক আছে। বড় ছেলেকে ডাক দিলেন,
‘ জিহান ব্যাংকে গিয়ে টাকা গুলো রেখে আসো। একসাথে এত টাকা বাসায় রাখা রিস্ক। সাথে রিদনকে নিয়ে যাও।’
বাবার কথা শুনে শোয়া থেকে উঠেছে দ্বীপ। সারা রাত না ঘুমিয়ে জেগে থাকার ফল। কিসের জন্য প্রতীক্ষা সে নিজেও জানে না। মিজান সাহেব মেয়ের বিয়ের জন্য গ্রামের কিছু জায়গা বিক্রি করেছিলেন। সেই জায়গার টাকা আজ পেলেন। এত টাকা বাড়িতে রাখা অনিরাপদ। তাই ছেলেদের ব্যাংকে পাঠাচ্ছেন।
চোখ ঢলতে ঢলতে কোনো রকম হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে যাবে এর আগেই রাহেলা ছেলেকে ডাকলেন। নাস্তা খাইয়ে দিতে দিতে বললেন,
‘ না খেয়ে যাওয়া ঠিক না বাবা। তোমার কি শরীর টা বেশি খারাপ? গত কয়েকদিন ধরে দেখছি রুম থেকে বের হচ্ছ না। পিসির সামনে বসে থাক। ‘
‘ আম্মু তেমন কিছু না। ‘
পাউরুটিতে দু কামড় দিয়ে বের হয়ে গেল। শীতের প্রকোপ বাড়ছে। চিনচিনে বাতাস। চারদিক কুয়াশায় ঘেরা। জানুয়ারির শীতে কাবু হয়ে গেছে শহরটা।রিকশায় উঠেই আশপাশে তাকাচ্ছে। চারদিকে কত মেয়ে, এদের মাঝেই হয়ত পরিচিত মানুষটা আছে।
যে পরিচিতা, তবুও অপরিচিতা।
রিদন এসেছে গতকাল চট্টগ্রাম থেকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে রিদন। ভাইকে অন্যমনস্ক দেখে দুইবার ডাকল। তৃতীয় বার ডাকতেই দ্বীপের হুঁশ ফিরল। রিদন মন খারাপের কারণ জানতে চাইলে এড়িয়ে গেল। ব্যাংকের কাজ শেষ করে রিদনকে বাসায় পাঠিয়ে দিল। কলেজের মাঠে গ্যালারিতে এসে চুপ করে বসে রইল বেশ কিছুক্ষন। ঠান্ডায় বসা যাচ্ছে না। গলার মাফলার টাও আসার সময় নিয়ে আসেনি তাড়াহুড়োর মাঝে। আজকে মাঠ নিরব। একপাশে কিছু স্টুডেন্ট বসে আছে, অন্য পাশে দু একটা জুটি । ঘড়িতে দুপুর একটা বাজে। তবুও মনে হচ্ছে এখন ভোর। সূর্য নিচে নামতে নামতে তেরো ডিগ্রিতে নেমেছে।
ইন্টার প্রথম বর্ষের ছুটি হওয়ার কথা। বেশ কিছুক্ষন বসে থাকার পর যখন দেখল কেউ আসছে না, ফুচকা ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে সামনে আগাল। পরিচিত মুখ দেখে ফুচকাওয়ালা সালাম দিয়ে বলল,
‘ মামা ভালো আছেন?’
‘ জি মামা আলহামদুলিল্লাহ, আপনি ভাল আছেন?’
‘ আছি মামা, আল্লায় ভাল রাখছেন। আপনারে তো কলেজে দেহাই যায় না অহন।’
‘ মামা ক্লাস নাই, কাম কাজ ও নাই আইসা কি করমু। তাই আসি না।’
ফুচকা ওয়ালা হাসে। দ্বীপ কিছু একটা ভেবে জিজ্ঞেস করল, ‘ মামা আজকে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস নাই?’
‘ না মামা, আইজকা মনে হয় ফার্স্ট ইয়ারের কেলাস বন্ধ। কাউরে তো দেখলাম না।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্বীপ বাসার পথে পা বাড়াল। পথে দুজন বন্ধুর সাথে দেখা হল। আড্ডা দিতে বলল। দ্বীপের শরীর খারাপ হওয়াতে বাসায় চলে এল আড্ডা না দিয়ে । রাতের মধ্যে জ্বর চলে এল। হঠাৎ করে এত জ্বর আসাতে বাসার লোকজন ঘাবড়ে গেল। কলেজ মাঠে এমন কনকনে শীতে বসে থাকায় ঠান্ডা লেগে গিয়েছে। জিহবায় রুচি নেই বললেই চলে। রাহেলা খানম এটা সেটা বানিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন, কোনো লাভ হয়নি।
রাত বারোটায় শোয়া থেকে উঠে আরেক আকাজ করেছে । জ্বর উঠলে শীত লাগে, তার লাগছে গরম। সবাই যখন ঘুমে, তখন ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করেছে। এমন হিম শীতল আবহাওয়ায় কেউ গোসল করে?
মাথাটা অনেকটাই হালকা লাগল। বিছানায় শুয়ে ফোনটা হাতে নিল দ্বীপ। ফেসবুকে ঢুকতে ইদানীং ইচ্ছে করে না। তবুও ঢুকল। হঠাৎ চোখ গেল মেসেজে। খুশিতে শোয়া থেকে উঠে বসল। বিভার আইডি থেকে মেসেজ এসেছে,
‘ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া, ভাল আছেন? আজ রাতে আম্মু বাসায় নেই। নানা বাড়ি গিয়েছে। বাসায় শুধু আমি আর আব্বু। আব্বু ঘুমে। তাই ফোনটা আমার কাছে। ‘
পর পর দুটো মেসেজ। আরো একটাতে লিখা, ‘ আপনি অনলাইনে নেই? আমি আরো ভাবলাম কথা বলব। ‘
বিলম্ব না করেই দ্বীপ টাইপ করল, ‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম। শরীর একটু অসুস্থ তো, তাই দেরি হয়ে গেল অনলাইনে আসতে । তোমার কি খবর।কেমন আছ?’
সাথে সাথে রিপ্লাই, ‘ জি ভাল। কি হয়েছে আপনার?’
‘ জ্বর। ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। ‘
‘ নিজের প্রতি যত্ন নিবেন।’
জিহান কিছু একটা ভেবে লিখল, ‘ বিভা…’
‘ জি বলুন’
‘ দেখা করবে আমার সাথে?’
এই মেসেজ দেখে রিদি শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠে বসে গেল। ফোনেই তো ভাল ছিল। দেখা করতে হবে কেন? কেন যে এই লোককে মেসেজ দিল। ‘ না, দেখা করা যাবে না’ এটা টাইপ করতে গিয়েও করল না। ‘ আব্বু দেখলে খবর আছে’ এটাও সেন্ড করল না। মিনিট পাচেক অতিক্রম করে টাইপ করল, ‘ সরি ভাইয়া, সমস্যা হবে দেখা করলে। আমরা এভাবেই কথা বলি?’
ও পাশ থেকে রিপ্লাই আসল, ‘ আমি ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতে পারিনা। সরাসরি বলছি আমার মনে হয় আমি তোমাকে পছন্দ করা শুরু করেছি। পছন্দ বললে ভুল হবে ভালোবেসে ফেলেছি। শুধু মেসেজে কথা বলে কারো প্রতি অনুভূতি জাগতে পারে এই ব্যাপারটা নিজের সাথে না ঘটলে বুঝতে পারতাম না। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে চাচ্ছি আমি। তাই দেখা করা প্রয়োজন। ‘
ফোন হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল রিদির। মুখে হাত দিয়ে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল, ইয়া আল্লাহ! শুকনো ঢোক গিলল। ফোনটাকে বালিশের তলে লুকিয়ে ডাইনিং এ চলে গেল পানি পান করতে। বুকে ধুকপুক করছে। নিজেকে গালাগাল করছে। নতুন আপদ ডেকে আনার অপরাধে। কোন ভূতে পেয়েছে যে আজ রাতে মেসেজ দিয়েছে। পানি পান করে পুনরায় রুমে ফিরে এল। মেসেজের উত্তর না দেয়াটা অভদ্রতা। তাই রিদি কাঁপা হাতে ফোন হাতে নিয়ে লিখল,
‘ ভাইয়া আমি সম্পর্কে জড়াতে চাচ্ছিনা, আপনি তো বাসার অবস্থা জানেন সব। আম্মু শুনলে আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবে। আর আব্বুর ধমক শুনলেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাব। আমরা না হয় বন্ধু থাকি ?’
দ্বীপের শক্তপোক্ত উত্তর, ‘ তবে বন্ধুত্ব থাকার ও প্রয়োজন নেই। আমি অকারণে তোমার সাথে কথা বলতে চাইছিনা। একবার যেখানে অনুভূতি জন্মেছে, সেখানে সম্পর্কবিহীন যোগাযোগ থাকাই অমঙ্গলজনক। এই প্রথম কোনো মেয়ের সাথে এতদিন কথা বললাম। আমার স্কুল কলেজ সহপাঠীদের সাথেও এত কথা বলিনি। এনিওয়ে ব্লক তুমি করবে নাকি আমি?’
‘ একদম নাহ, ব্লক কেন করবেন? আমি মাঝে মাঝে আপনাকে মেসেজ দিব।’
‘ সম্পর্কে জড়ালে জড়াবে নতুবা না। না জড়ালে কথা কিসের?
‘ এভাবে কি সম্পর্কে জড়ানো যায়? আপনার আমাকে ভালো লেগেছে মানলাম। আমার ও তো আপনাকে ভালো লাগতে হবে। আমি আপনার সম্পর্কে কিছুই জানিনা।’
‘ কি জানতে চাও বল? সব বলছি। আমি তোমার তুষারের মত ফেক না।’
‘ আমার তুষার কি? ও আমার বন্ধু ছিল। বার বার একই কথা বলেন কেন? ‘
‘ আচ্ছা বাদ দাও। আমার পরিচয় দিই। আমার নাম তুমি জানো। বাসায় বাবা,মা, দাদী, ছোট ভাই এবং ছোট বোন আছে। আগামী মাসে ছোট বোনের বিয়ে। বাবা রিটায়ার্ড করেছেন সরকারি চাকরি থেকে। এই তো। আর আমার সম্পর্কে জানতে চাইলে বলব আপাতত বেকার। আব্বু টাকা দিলে বিজনেস শুরু করব।’
‘ আচ্ছা, সুন্দর পরিবার। কিন্তু আপনাকে তো মানুষ হিসেবে চিনি না।’
‘ দেখা কর। ভালো না লাগলে না করে দিও। আমি ছ্যাচড়া না যে তোমার পিছু নিব।’
‘ আচ্ছা কবে করবেন।’
‘ তুমি জানিয়ে দিও।’
ফযরের আজান দিচ্ছে। রিদি ফোন রেখে ওযূ করে নামাজে দাঁড়াল। বুঝতে পারছে না তার সাথে কি হতে যাচ্ছে?
তিনদিন অতিক্রম হল। এই তিনদিনে না রিদির মন স্থির ছিল, না দ্বীপের। দ্বীপ অপেক্ষা করে আছে রিদির মতামতের জন্য। সম্পর্কে ধীরে বুঝে-শুনে আগানো বুদ্ধিমানের কাজ। তাড়াহুড়ো শয়তানের লক্ষন।
আমিনা পরদিনই ফোন নিয়ে গেলেন মেয়ের কাছ থেকে। আজ বিকেলের প্রাইভেট টা নেই। স্যার ঢাকা গিয়েছেন। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছেনা। দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় খেলল। মিরা আসেনি। প্রমাকে সব খুলে বলল। জানাল দ্বীপের কথা। প্রমা একটু ভীতু গোছের। তাই ওকে রাজি করিয়ে ফেলল আজ দ্বীপের সাথে দেখা করবে বলে। ব্যাগ থেকে ফোন নম্বর টুকে আনা কাগজ টা বের করল। শীতকালে দিন ছোট। ফোন করল দ্বীপকে। ঘুমের মাঝে দ্বীপ ফোন রিসিভ করল। মেয়েলী গলা শুনে বলল,
‘ কে?’
রিদি বলল, ‘ দ্বীপ ভাইয়া বলছেন?’
‘ জি আপনি কে?’
‘ ভাইয়া আমি বিভা।’
ছটফটিয়ে উঠল। প্রশ্ন করল, ‘ কি হল বিভা? কোনো সমস্যা হয়েছে?’
রিদি প্রমার কানে কানে বলল, ‘ গলার স্বর তো সুন্দর।’
প্রমা রিদির মাথায় গাট্টা মেরে বলল, ‘ কথা শেষ কর’
রিদি ফোনে মনোযোগ দিয়ে বলল,’ না সমস্যা হয় নি। দেখা করতে পারবেন।’
দ্বীপের ঠোঁটের কোণে উজ্জ্বল হাসি। উত্তর দিল,’ অবশ্যই পারব। কখন?’
‘ এখন।’
‘ এখন তো তোমার প্রাইভেট। ‘
‘ আজ নেই। এই সুযোগ তাই ফোন দিলাম।’
‘ কোথায় আসবো?’
‘ কলেজের পাশে নতুন মার্কেট হচ্ছে যে ওই মাঠে।ওইদিকটাতে পরিচিত কেউ এখন যাবে না।’
‘ আমি এখনই বের হচ্ছি। অপেক্ষা কর। ‘
দ্বীপ গায়ে কোনো রকম সুয়েটার পরে বেরিয়ে গেল। প্রথম সাক্ষাৎ, তাকে দেখতে সুদর্শন লাগা উচিত ছিল। কিন্তু না, সে পুরোনো ডেনিম প্যান্ট এবং নেভি ব্লু হুডি পরে বের হয়ে গেল। মাঠের সামনে এসে রিকশা থেকে নেমে দেখল দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রিদি দ্বীপকে আসতে দেখে প্রমার হাত চেপে ধরল। প্রমা দাঁত খিচে বলল, ‘ রিদু, বিদায় অনুষ্ঠান এর দিন তো উনাকে আরো ছোট লাগছিল। আজকে এত বড় বড় লাগছে কেন?’
রিদি কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ‘ আমি প্রেম করমু না, আমি বাসায় যামু।’
প্রমা ধমকে বলল, ‘ থাপ্পড় দিব। তাহলে উনাকে ডেকে আনছিস কেন? আমাকেও ফাসাচ্ছিস। মিরা শুনলে চিবিয়ে খাবে। চিনিস না, জানিস না অথচ প্রেম করবি। উনি কি বলে শুন, এরপর বাসায় গিয়ে সিদ্ধান্ত নিস।’
দ্বীপ সামনে এসে নিজ থেকে সালাম দিল। প্রমাও সালাম দিল। রিদি চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রমা নিজ থেকেই বলল, ‘ আমি রিদির ফ্রেন্ড, প্রমা।’
দ্বীপ ভ্রু কুচকে ফেলল। রিদির মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রিদি বলল, ‘ আমার নাম রিধিমা জাবেদ। বাসার সবাই রিদি ডাকে।
দ্বীপ মুখ গম্ভীর করে বলল, ‘ মিথ্যা বলা আমি পছন্দ করি না। ‘
রিদি ভীত চোখে বলল, ‘ সরি।’
প্রমা বলল, ‘ ভাইয়া আপনারা কথা বলুন। আমি একটু শপিং মল থেকে ঘুরে আসি।’
প্রমা চলে যেতেই রিদি একা হয়ে গেল। দ্বীপ নিজেও নার্ভাস। তবে মুখ দেখে দৃশ্যমান রাগটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। রিদির দিকে একটা চকলেট আর গোলাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ কি উপহার দিতে হয় জানিনা। প্রথম সাক্ষাতে উপহার দিব না এটাও কেমন যেন দেখায়। তাই ফুল আর চকলেট আনলাম। এই দুই জিনিস মেয়েরা পছন্দ করে শুনলাম। মন চাইলে নিজের কাছে রেখো নাহয় ফেলে দিও।’
রিদি কিঞ্চিৎ হাসল। একটা কথাও বলেনি। দ্বীপ ও চুপচাপ । রিদির মনে অপরাধবোধ। দ্বীপের মনে অভিমান। রিদি নিজের নামটা না লুকালেও পারত। রিদি বলল, ‘ ভাইয়া আমার সময় লাগবে কিছুদিন।’
‘ চারদিন সময় দিলাম। পরবর্তী শনিবার আমাকে জানাবে তুমি সম্পর্কে জড়াবে কি, জড়াবে না?
রিদি মাথা কাত করল। দ্বীপের মনে হল, কথা বলার মত কিছু নেই। এদিকে সন্ধ্যাও হয়ে আসছে। রিদিদের বাসায় যাওয়া প্রয়োজন। ওদের রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে নিজেও বাসার দিকে রওয়ানা হল। রিদি ফুল টা প্রমাকে দিয়ে দিল। চকলেট দুজন মিলে রিকশায় ভাগ করে খেয়ে নিল। বাসায় ঢুকে নামাজ পড়ে আজ সোজা পড়ার টেবিলে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। চোখের সামনে দ্বীপের চেহারা ভেসে উঠছে। আজ কিছুতেই পড়তে বসতে পারছে না। সারা রাত ছটফট করল। রাতে কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাইভেটে গেল,ক্লাস করল। এভাবে টানা তিনদিন পার করল। মন নেই কোনো কাজে। শুক্রবার রাতে অল্প ভাত খেয়ে উঠে গেল। আমিনা ইসলাম চিন্তায় অস্থির। এই তিন দিন মেয়ের কি হল! জাবেদ সাহেব স্ত্রীকে বকাবকি করছেন, মেয়েকে পড়ার জন্য এত চাপ দেয় বলে। ডাইনিং রুম পেরিয়ে বেডরুমে ঢুকার সময়ে মাথাঘুরে পড়ে গেল। পড়ার আওয়াজ এত জোরে হল যে জাবেদ সাহেব ছুটে আসলেন তার বেড রুম থেকে। পাশে ফ্রিজ ছিল। কেঁপে উঠল। ফ্রিজের সাথে খুব জোরে বাড়ি খেয়ে পড়েছে রিদি। তাই এত জোরে আওয়াজ হয়েছে। জাবেদ সাহেব মেয়েকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়ালেন। আমিনা ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের মুখে পানি ছিটাতে থাকলেন। প্রায় দশ মিনিট পর রিদি চোখ খুলল। গায়ে জ্বর, প্রচন্ড উত্তাপ। ডাক্তারকে ফোন দিয়ে পরিস্থিতি জানিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলেন জাবেদ সাহেব। রিদির শরীর ছেড়ে দিয়েছে আগামীকালকের দুশ্চিন্তায়।
পরদিন কলেজ যেতে দেন নি আমিনা ইসলাম। প্রাইভেটে যাওয়া জরুরি বলে জাবেদ সাহেব নিজে প্রাইভেটে পৌঁছে দিলেন। বাকি গুলোতে মিরা এবং প্রমা নিয়ে যাবে জানাল। রিদি আজ নিজে থেকে পুরো পরিস্থিতি মিরাকে জানাল। মিরার মাথায় হাত। প্রমা বলল, ‘ নিজেকে আগে বুঝ দে, তুই কি চাস? আন্টি আংকেল কি মেনে নিবেন?’
রিদি নিজেও জানে না বাবা মা মেনে নিবে কিনা। গত ছয় মাস আগে রাস্তায় এক ছেলে বিরক্ত করত। সেটা জেনে গিয়ে বাবা ওই ছেলেকে আলাদা ডেকেছিলেন। এরপরের ঘটনা আর কিছু রিদি জানেনা। রাতে ফোন মা দিবে না। দ্বীপের সাথে কথাও বলা যাবে না। রিদি মিরাদের জানাল সে আজই দ্বীপের সাথে দেখা করবে। যা হওয়ার হবে। মনে যা আসে তাই করবে। এভাবে পড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে, শরীর অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। এপ্রিল থেকে প্রি-টেস্ট পরীক্ষা। প্রস্তুতি নিতে হবে ভালোভাবে। এ প্লাস মিস করা যাবে না। বাবার মনে আর দুঃখ দিতে চায় না। দ্বীপের নাম্বারটা ডায়াল লিস্টেই পেল। বাটন চেপে দ্বীপকে ফোন দিল।
চলবে…
