#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
সূচনা.
( রাতের তিনটা, ফ্যানের উপর ঝুলতে থাকা বাদুড় টা ছুটে এসে তোমার ঘাড়ের সবটুকু রক্ত টেনে নিবে। পাশ ফিরে দেখবে তোমার পাশে একটা বিড়াল ঘুমাচ্ছে। কপি করে দেখো শুধু, সারা রাত এই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে যাবে ; আমার পাশে কে শুলো রে? আমি আসছি… সাবধান )
অফিস থেকে মিটিং শেষ করেই রওয়ানা হয়েছে ঢাকার পথে। লম্বা যাত্রা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা। ড্রাইভার বার বার পেছনে তাকিয়ে স্যারের ভাবমূর্তি বোঝার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ আগে দেখল চোখ পাকিয়ে সামনের গ্লাসে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন ড্রাইভারের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করছে। আর এখন কপালে হাত রেখে চোখ বুজে রেখেছে। ড্রাইভিং এ কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছে না মাসুদ।
– সামনে তাকিয়ে সাবধানে চালাও।
মালিকের এত ভারী, শীতল ধমকের স্বর তার ভেতরের জল টুকু বাষ্প করে দিয়েছে। শুকনো ঢোক গিলল মাসুদ। মালিক তার দিকে পুলিশি নজরে তাকাচ্ছে কেন? কি অপরাধ করেছে তা বুঝতে পারছে না।
– মাসুদ, গাড়ি থামাও কোনো হোটেলে। নেমে ফ্রেশ হয়ে নাও।
আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেল। এভাবে আর কিছুক্ষন গাড়ি চালালে দম আটকে মরে যেত। মালিককে গাড়িতে রেখেই মাসুদ ভেতরে গেল। মালিক জানালেন তিনি নামবেন না। হোটেলে ওয়াশরুমে গিয়ে অফিসের দারোয়ানকে ফোন দিয়ে খোঁজ নিতে বলল আজ তাপমাত্রা এত গরম কেন? ফলাফল হল কেউই জানেনা। ব্যক্তিগত কারণ। নিরাশ হল মাসুদ। ব্যক্তিগত কারণে যদি রেগে থাকে তবে আজ সেই রাগ তোলার মাধ্যম হল মাসুদ। দোয়া কলমা পরে পুনরায় এসে গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রাখল।
ফোন বেজে চলেছে মাসুদের। গাড়ি চালানোর সময় ফোন রিসিভ করলে বকা খাবে৷ তাই ভয়ে ধরছে না।
– ফোন তোলো।
অনুমতি পেয়ে মাসুদ কল রিসিভ করল। দেখতে পেল স্ক্রিনে লিখা শাহমীর স্যার । স্টিয়ারিং এ হাত রেখেই পেছনের মালিকের উদ্দেশ্যে বলল,
– স্যার, শাহমীর স্যার ফোন দিয়েছে।
– বলো আমাকে নিয়ে ঢাকা যাচ্ছ।
ড্রাইভার এক টানে গড়গড় করে ফোনে ততটুকুই বলল যতটুকু তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওই পাশের মানুষ টা ফোন কেটে দিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। এই জঘন্য রাগের জন্যই এত এত ঝামেলা হয় তার জীবনে।
শাহমীর রিদন, গাড়িতে বসা ভদ্রলোকের ছোট ভাই। গাড়িতে যিনি বসে আছেন তার নাম শাহদ্বীপ জিহান। বলা নেই কওয়া নেই ধুপ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। এত রাগ কি ভালো? নিশ্চয়ই খালি হাতে যাবে না। গতকাল যেভাবে উকিলকে ধমকে বকে কথা বলেছে, আজকে কাগজটা হাতে নিয়েই যাচ্ছে। রিদন বাসায় ফোন দিয়ে মাকে বলল,
– আম্মু, আশা বোধ হয় শেষ। ভাই পেপার নিয়ে ঢাকা যাচ্ছে।
ও পাশ থেকে চেঁচিয়ে বলছে,
– বলদ কোথাকার, আটকা ওরে। দরকার হইলে ডানা লাগা দুইটা।
রাহেলা খানম উত্তেজিত হয়ে গেলে ভারসাম্যহীন কথাবার্তা বলেন। পাশের রুমে ছুটে গেলেন স্বামীর কাছে। মিজান সাহেব পেপার পড়ছিলেন মনোযোগ দিয়ে। ছুটে গিয়ে রাহেলা বললেন,
– সব আশা শেষ। তোমার বড় ছেলে কাগজ পত্র নিয়ে ঢাকা যাচ্ছে। ওরে আটকাও ফোন দিয়ে। সব নষ্টের মূল ওর জেদ। না আটকাতে পারলে আমাকে বলো, আমি যাব।
পেপার সরিয়ে ভ্রু কুচকে মিজান সাহেব বললেন,
– তুমি কি করে আটকাবে?
– দেখি একটা ব্যবস্থা করব। আমাকে নেয়ার মত কেউ নেই, ভাবছি শানকে নিয়ে রওয়ানা হব।
মা যেমন ছেলেও তেমন। মিজান সাহেব বিড়বিড় করে আওড়ালেন। শান হচ্ছে তার বড় মেয়ের আট বছরের থ্রিতে পড়ুয়া ছেলে। সেই শান নাকি নানীকে নিয়ে ঢাকা যাবে। মিজান সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন,
– জীবনে ঢাকা গিয়েছ? তুমি ঢাকা চেনো?
– চেনার কি আছে? রিকশা নিয়ে বাস স্টেশনে যাব। সেখান থেকে বাস নিয়ে ঢাকা চলে যাব। এত ভাবলে হয় নাকি?
– বাস স্টেশন কোথায়?
– তুমি আমাকে এতটাই অজ্ঞ ভাবো?
– বাস ভাড়া কত?
– ব্যাগে টাকা নিয়ে যাব। যত হয় দিয়ে দিব।
– বাস থামবে কোথায়?
রাহেলা খানম উত্তেজিত হয়ে বললেন,
– আমার বাপের বাড়ি।
– হ্যাঁ এটাই বুঝাতে চাইছিলাম এতক্ষণ, ঢাকা তোমার বাপের বাড়ি নয় যে শান কে হাতে নিয়ে রওয়ানা হবে। চুপ করে জায়নামাজে বসে দোয়া কর যেন তোমার অথর্ব ছেলের সংসারটা বেঁচে যায়।
– অথর্ব বললে কেন আমার ছেলেকে?
– যে ছেলে এমন বউয়ের সাথে গ্যাঞ্জাম করে সে আর যাই হোক থর্ব নয়।
– থর্ব কি?
– জানিনা শব্দের সাথে মিলিয়ে বলে দিলাম। এত ভুল ধরবে না। তোমার ছেলেটা তোমার মত হয়েছে। কথায় কথায় ভুল ধরে কিন্তু আসলে সে একটা গাধা, বড় ধরনের গাধা। অনেকটাই তোমার বাপের বাড়ির লোকের মত। তোমার বড় ভাই ও এরকম গাধা কিসিমের লোক।
রাহেলা বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। এই লোকের সাথে কথা বললেই তার ঠিকুজি গুষ্টি উদ্ধার করে। আসলে সে নিজেই একটা বলদ। আকাইম্মা বলদ। অসুস্থ বলে কিছু বলা যায় না। এছাড়া মা, খালারা বলত স্বামীর মনে কষ্ট না দিতে। নতুবা মুখের উপর বলে দিত,
– তুমি হচ্ছ একটা বলদ। তোমার বড় ছেলেটা তো তোমার ক্ষেতের মূলা। তাই ওটাও বলদ।
বড় মেয়ে সাজিনার রুমে এসেছে। সাজিনা ছেলের স্কুল বন্ধ দেয়াতে বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। এসেই শুনে বাড়ির পরিবেশ অত্যন্ত গরম, গ্রীষ্ম কালীন তাপমাত্রা বহমান। বড় ভাই গত তিন দিন বাড়ি আসে নি। বাইরে ছুটোছুটি করেছে উকিলের সাথে। রিদন কিছুক্ষন আগে ফোন দিয়ে একটা অপ্রিয় খবর দিল। শুনেই মনটা বেজার হল। এই বংশে যা কখনও ঘটেনি এবার তা ঘটতে যাচ্ছে।
রাহেলা খানম প্যান প্যান করতে করতে বললেন,
– সাজিনা তোর বাপ একটা বলদ। তোর ভাই হচ্ছে সেই বলদের খেতের মূলা।
সাজিনা কাপড় ভাঁজ করা বাদ দিয়ে বলল,
– আম্মু এজন্যই আব্বু তোমার কথার ভুল ধরে। বলদের ক্ষেতের মূলা কি জিনিস? বাংলা ব্যাকরণবিদেরা তোমার বাক্য বিন্যাস শুনলে এতক্ষণে আত্মহত্যা করত।
– তোরা সব এক গোয়ালের গরু। আমার ভুল ধরিস শুধু। এদিকে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে দুশ্চিন্তায় ।
– কারণ বলো।
– জিহান ঢাকা যাচ্ছে ডিভোর্স পেপার নিয়ে। বিয়েটা বোধ হয় এবার ভেঙেই যাবে রে।
এতটুকু বলে কেঁদে উঠলেন রাহেলা । সাজিনার খুব মন খারাপ হল। মায়ের পাশে বসে বলল,
– আমি ভাইকে ফোন দিয়ে দেখব?
তখনই মিজান সাহেব সাজিনার রুমে আসলেন। স্ত্রীকে কঠিন কথা শোনানোর পর তার মন খারাপ হয়েছে। যত যাই হোক স্ত্রী সম্মান করার জিনিস, আদর করার জিনিস। তাকে কঠোরতা দেখানো অন্যায়। তিনি রুমে ঢুকতে স্ত্রী কন্যার আলাপচারিতা শুনে বললেন,
– না ফোন দেয়ার প্রয়োজন নেই। রিজিকে আল্লাহ যা রেখেছেন তাই হবে। তুমি আমি আটকানোরই বা কে আর ভাঙারই বা কে? অপেক্ষা কর। দেখি ওদের ভাগ্য কি বলে।
কাজের মহিলা আজিমন ছুটে এল। জানাল মিজান সাহেবের বোন তফুরা এসেছে তার মেয়ে অঞ্জনাকে নিয়ে। সাজিনা মায়ের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করল রাহেলা মাথায় কপাল চাপড়ে বলছে,
– সব আমার কপালের দোষ। অঞ্জুরে যদি জিহান বিয়ে করে আমি মরুভূমিতে চলে যাব।
সাজিনা মায়ের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,
– বাংলাদেশে মরুভূমি নাই, আর বিদেশ যেতে চাইলেও পারবেনা। তোমার ভিসা নাই।
রাহেলা এবার কান্না করতে করতে বললেন,
– আহ হারে, আহ হারে কি করলাম জীবনে। আমার একটা পাসপোর্ট নাই, ভিসা নাই। যদি থাকত আজকে মরুভূমি দেখতে পারতাম।
মিজান সাহেব মনে মনে ভাবলেন, ‘ আম্মা চলে গেলে কি হবে, তার রিপ্লেসমেন্ট রেখে গেছেন। আল্লাহ আমার ঘরটাকে পাগলা গারদ হওয়া থেকে বাঁচাও।’
___
আগষ্ট , ২০১৪ সাল
ক্লাস শেষ করে তিন বান্ধবী বের হয়েছে। সরকারি কলেজের সাথেই বয়ে’জ স্কুলের লাগোয়া মাঠ। কলেজের মাঠ ও বিশাল কিন্তু স্কুলের মাঠ এর তুলনায় ভীষণ ছোট। স্কুলের মাঠটাতে অনায়াসে দশটা হেলিকপ্টার ল্যান্ড করা ডাল ভাত। তাহলে বুঝে নিন কতটা বিরাট এবং বিস্তৃত। স্কুল এবং কলেজ উভয়ের শিক্ষার্থীরা এই মাঠ ব্যবহার করে।
ডিপার্টমেন্ট থেকে কলেজ গেট পর্যন্ত হেঁটে যেতে দশ মিনিট লাগে। হাঁটতে হাঁটতে তিন জনই মাঠের পাশ দিয়ে বের হচ্ছে। রিধিমা, মিরা আর প্রমা তিন বান্ধবী। সেই স্কুল থেকে বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের বয়স প্রায় বছর সাতেক তো হবে। রিধিমার প্রতিদিন মন খারাপ থাকে তাকে একা ক্লাস করতে হয় বলে। ইন্টারের বিজ্ঞান বিভাগে দুটো শাখা। ‘ক’ শাখায় মিরা এবং প্রমা, ‘খ’ শাখায় রিধিমা একা। এসএসসি তে গোল্ডেন মিস করাতে কলেজে সিরিয়াল সবার পেছনে ছিল। তাই ‘খ’ শাখায় ভর্তি হতে হয়েছে। আজকে দুই শাখায় কোন কোন স্যার কি পড়িয়েছে সেগুলো নিয়ে গল্প করছিল তিন বান্ধবী। ঠিক তখনই একটা ফুটবল এসে রিধিমা-র কোমড়ে লাগল। কোমড় ধরে বসে গেল। মাঠের মধ্যে ছেলেদের খেলতে দেখলে এমনিতেই আতঙ্ক কাজ করে, সেখানে আজ এত বড় দূর্ঘটনা। প্রতিদিন এখানে ছোট খাট টুর্নামেন্ট থাকে। মাঠের কয়েক জন খেলোয়াড় উল্লাস করছে, আর কয়েকজন ছুটে এসেছে রিধিমাদের কাছে। সম্ভবত গোল ঠেকানো হয়েছে বলে উল্লাস করছে। গোল ঠেকিয়ে বলটা রিদিমার দিকেই মারতে হল কেন? মিরা চেঁচিয়ে উঠল,
– আপনারা চোখে দেখেন না? এভাবে কিভাবে খেলেন? মানুষ মে রে ফেলবেন তো!
একজন বলে উঠল,
– সরি সরি, আসলে দূর্ভাগ্যবশত লেগে গিয়েছে। সব সময় তো সাবধানে খেলি। আজ হঠাৎ আমাদের গোল কিপার গোল ঠেকানোর জন্যই…
প্রমা হাত থামিয়ে বলল,
– থামুন আপনাদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
ভিড় জমে গেল চারদিকে, কলেজ চত্বরে মাঝে মাঝে রিকশা ঢুকে। একটা রিকশা ডাক দিল খেলোয়াড়দের একজন। তিনজন উঠতে পারবে না বলে প্রমা আর রিদিমা উঠল। মেয়েটা ব্যাথায় কথা বলতে পারছেনা। হাসপাতালে নেয়া উচিত। ফুটবলের যা ওজন কোমড় তো মনে হয় শেষ। মিরা পেছনে আরেকটা রিকশা নিয়ে রওয়ানা হল।
হাসপাতালে এসে এক্সরে করাল, আর্জেন্ট রিপোর্ট নিলো। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে পনেরো দিনের বিশ্রাম দিল। আঘাত লেগেছে কোমড়ের হাড়ে। রিধিমাকে বাসায় দিয়ে প্রমা এবং মিরা চলে গেল। রিধিমা-র মা কান্নাকাটি করে এক অবস্থা। তার বাবা অবশ্য শক্তপোক্ত মানুষ ৷ মেয়েকে সাহস দিচ্ছেন। প্রয়োজনে বাসায় ডাক্তার নিয়ে আসছেন।
প্রাইভেট, ক্লাস সব বন্ধ৷ খাওয়া, ঘুম আর শুয়ে শুয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। সেই সাথে প্রতিদিন গোল কিপারকে বদদোয়া দিতে থাকে জীবনেও যেন গোল দিতে না পারে। পা টা যেন ভেঙ্গে যায়। প্রমা, মিরা এসে এসে নোট দিয়ে যায়, গল্প করে। পরীক্ষার রুটিন দিয়ে গিয়েছে।
পনেরো দিন পর মোটামুটি সুস্থ হল। আজ থেকে কলেজ যাবে। যেতেই হবে পরীক্ষা শুরু। মিরা যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে রিধিমাকে তুলে নিল। কলেজ জীবনের প্রথম পরীক্ষা। একা একা দিতে হচ্ছে। সামনের রোলমেট ছেলে, পেছনের রোলমেট মেয়ে। দুজনের মাঝে একজনের সাথেও সম্পর্ক ভালো নয়। ছেলেটা খাতা ঢেকে লিখে, হিংসুক গোছের। আর মেয়েটা কিছু পারে না, রিধিমা-র খাতা দেখতে চায়। মেয়েটা অল্প হলেও তো পড়ে আসতে পারত? কিন্তু না বাংলাও দেখতে হবে। পরীক্ষা শেষে রিধিমা তার পেছনের রোলমেটকে বলল,
– জেসি, কাল থেকে আমরা ভাগ করে পড়ে আসব। তুমি কারক, ণত্ববিধান, ষত্ববিধান,ধ্বনি এসব পড়বে। আর বাকিগুলো মেসেজ করে দিব। আমি আমার গুলো পড়ে আসব৷ ‘
রিধিমা নিজেই সব পড়বে কিন্তু এই মেয়েও কিছু পড়ুক। পরীক্ষার হলে খাতা ধরে টানাটানি করে ব্যাপারটা অত্যন্ত বিরক্তিজনক।
পরীক্ষা শেষে তিন বান্ধবী বের হচ্ছিল গেট দিয়ে। মিরা বলল,
– আজকে বিকেলে আমি প্রাইভেটে যাব না। সিয়াম আসবে। দেখা করব।’
সিয়াম, মিরার স্বামী। ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার পর অনুষ্ঠান হবে। প্রমা হাহুতাশ করে বলে,
– আহারে আমাদের একটা সিয়াম হল না রে রিদি।’
বান্ধবী ও পরিবারের লোকজন আদর করে রিদি ডাকে। রিদি বলে উঠল ,
– তোর তো একটা আকাশ হইছিল।’
আকাশের কথা বলায় তিন বান্ধবী হেসে কুটকুটি। ক্লাস টেনে থাকতে প্রমাকে আকাশ নামের এক ছেলে পছন্দ করত। একদিন ফুল দিয়ে প্রপোজ করতে এসেছিল প্রাইভেটে। সেই ফুল গরু খেয়ে ফেলেছে। সেই দুঃখে লজ্জায় আকাশ তিনদিন প্রমার সামনে আসে নি৷ কিন্তু দুই মাস তাদের সম্পর্ক ছিল। পরে প্রমা তার ভাই প্রীতমের উত্তম মধ্যম খেয়ে সেখান থেকে নিজেকে আলাদা করল। এখন অবশ্য সম্পর্কে মনোযোগ কম। ইন্টারের পরই তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে।তাই নতুন সম্পর্কে জড়ানো মানেই ঝামেলা।
গেটে আজ প্রচুর ভিড়। বড় সিনিয়র আপুরা কি সুন্দর শাড়ি পরেছে, আর ভাইয়ারা কালো সাদা ফরমাল গেট আপ ৷ মিরা ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল,
‘ কিরে আজ কী অনুষ্ঠান কলেজে? সব দেখি জামাই বউ সেজে আসছে।’
প্রমা, আর রিধিমা কাঁধ উঁচিয়ে এক পাশে অপেক্ষা করছে। ভিড় কমলে গেটের সামনে যাবে। রিদি বলল,
– ছেলে গুলোকে কী স্মার্ট লাগছে। আমি তো প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।
মিরা মাথায় ধুম করে একটা লাগিয়ে বলল,
– এত প্রেমে কিভাবে পড়িস তুই? বাসায় চল। আন্টি শুনলে ঝাটা নিয়ে দৌঁড়াবে। ভাঙ্গা কোমড় আরও ভেঙ্গে দিবে। মুখ খুলছিস কেন? মুখ বাঁধ।
বান্ধবীর বকা খেয়ে রিদি মুখে নিকাব বাঁধল। রিধিমা-র মা, আমিনা রক্ষনশীল পরিবারের মেয়ে। রিধিমাকে কড়া শাসনে রাখে। রিধিমার বড় বোন আছে, নাম রাহা। বিয়ে হয়ে গিয়েছে। রিদিমাই ছোট তাই নজরদারি করতে বেশ সুবিধা হয়। ভিড়ের মাঝে একজনের দিকে রিধিমার চোখ আটকে গেল। মিরাকে বলল,
– মিরা? এই ভাইয়াটা সুন্দর। ‘
প্রমা মিরা দুজনই প্রশ্ন করল, ‘ কোনটা? ‘
– লম্বা করে, সাদা শার্ট, কাল প্যান্ট, কালো টাই…’
মিরা বলে উঠল, ‘ আশ্চর্য! এরা সব দেখতে এক রকম। এভাবে বললে বুঝব কিভাবে?’
রিদি বলল, ‘ আরেহ, ওই যে হাত তুলে হেসে কথা বলছেন উনি।’
প্রমা উঁকি মেরে বলল, ‘ হ্যাঁ আসলে সুন্দর।’
মিরা ধমক দিল। হাত ধরে টেনে বের করে আনল দুটোকে। এখানে বেশিক্ষন থাকলে রিদির এক ডজন প্রেমিক পুরুষ বের হবে। এক সপ্তাহ এই আশিকদের গল্প শোনাবে৷ আন্টি শুনলে ওর কলেজ আসাই বন্ধ করে দিবেন । বাসায় গিয়ে আবার পড়তে বসতে হবে। আগামীকালকেও পরীক্ষা আছে।
রিদি বাসায় এসে বাধ্য বাচ্চার মত পড়তে বসেছে। প্রমা ফেসবুক আইডি খুলে দিয়েছে৷ লুকিয়ে সেটা ব্যবহার করে৷ কলেজে নতুন অনেক ছেলে বন্ধু হয়েছে। তাসিন, অনি, অভি, জিসান। তবে সবাই ফেসবুকে৷ সামনে কারো সাথেই কথা হয় না। রাতে পড়ার ফাঁকে প্রায় সবার সাথে কথা বলে, মা আসলে ফোন লুকিয়ে ফেলে। এভাবে মা মেয়ের লুকোচুরি চলে।
___
পরীক্ষা শেষ হল আজ। কয়েকদিন কলেজ বন্ধ। প্রাইভেট চলবে আগামী পরশু থেকে। রাতে ঘুমানোর সময় ফোন হাতে নিতেই দেখল অনেক গুলো ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট। যেহেতু লুকিয়ে আইডি খোলা। তাই আইডির নাম নীলমনি বিভা। ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করতেই একটা আইডি থেকে লাইক স্টিকার দিয়ে মেসেজ এসেছে। মেসেজ দেখে রিদির মেজাজ খারাপ হয়েছে। হাই, হ্যালো বা সালাম টাইপ করেও তো লিখা যায়। অসভ্যের মত স্টিকার পাঠাতে হবে কেন?
রিদি ঝগড়ার টোনে টাইপ করল, ‘স্টিকার পাঠালেন কেন?’
বিপরীত আইডি থেকে মেসেজ আসল,
– কেন পাঠালে কি সমস্যা?’
– অবশ্যই সমস্যা, এসব আমি পছন্দ করি না।
– সরি। অন্য বন্ধুকে পাঠাতে গিয়ে আপনাকে পাঠিয়েছি।
রিদি একগুচ্ছ বকল। সব ছেলেই এমন।মেয়ে দেখলে গুতায়। ধরা পড়লে সরি। যাই হোক তুষারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে রিদির ঘুম চলে আসল। তুষারের সাথে পরিচয়টা ফেসবুকে। রিদিকে পছন্দ করে। আজ প্রায় দুইমাস কথা হয় তাদের মধ্যে। রিদি অবশ্য এখনও নিজের পছন্দ অপছন্দ ওভাবে ব্যক্ত করেনি। কিন্তু তুষারকে তার ভালো লাগে। তুষারের লাইফে একটা গোল আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ে। বাবা নেই। নিজে কষ্ট করে পড়াশোনা করে মা বোনের খেয়াল রাখে। তুষার অনলাইনে এসেই মেসেজ দিল। টুক টুক প্রেমময় কথা বলছে আর অন্যদিকে রিদি মিটমিটিয়ে হাসছে। জুতার আওয়াজ শুনে ফোন লুকিয়ে ফেলল। ঘুমানোর ভান করে শুয়ে থাকল। আমিনা চলে যেতেই ফোন হাতে নিয়ে রাত কাটিয়ে দিল। রিদির নিরব সম্পর্কের কথা বান্ধবীরা কেউই জানে না। আগামী পরশু তুষারের জন্মদিন। সেদিন সে নোয়াখালী আসবে বলেছে সরাসরি দেখা করতে ঢাকা থেকে।
সকালে ঘুম থেকে উঠতে অনেক কষ্ট। পর পর দুই রাত জেগে আজ প্রাইভেটে যেতে কষ্ট হচ্ছে রিদির। প্রাইভেটে এসে বান্ধবীর সাথে গল্প করতে করতে রাতে ঝগড়াটে ছেলের কথা বলল। মিরা বলল,
‘ দেখি ফোন দে। ‘
রিদির ফোনে ছেলেটার মেসেজ দেখল। প্রোফাইল এর ছবিটা দেখে ভ্রু কুচকে ফেলল। নাম টা তো সুন্দর! পুরোনো পোস্ট চেক করতে গিয়ে পরিচিত ছবি দেখে মুখে হাত দিল। হালকা স্বরে আৎকে উঠার শব্দ। আচমকা ওর রিয়েকশন দেখে প্রমা আর রিদি ঘাবড়ে গেল। মুখে অন্ধকার এনে বলল,
‘ আরে রিদি এটা তো সেই ভাইয়া টা, যাকে তুই ফরমাল গেট আপে দেখে সুন্দর বলেছিলি সেদিন। উনাদের স্নাতকোত্তর এর বিদায় অনুষ্ঠান ছিল যে।’
প্রমা আর রিদি মুখে হাত দিয়ে একসাথে বলে উঠল,
‘ ইয়া আল্লাহ! ‘
চলবে…
