#প্রেমচিত্র
লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৭
ভাড়াটিয়া ভদ্রলোকের সাথে তুশির প্রায়শই দেখা হয়। ভদ্রলোক কিছুটা ক্যাবলাকান্ত। সব সময় কেমন ভয়ে ভয়ে থাকে। তুশির প্রচুর হাসি পায় লোকটাকে দেখলে। এই তো গত দিনের কথা। তুশি কাপড় উঠাতে ছাদে গিয়েছে। লোকটা তখন খালি গায়ে কাপড় নাড়তে ছাদে এসেছে। তুশিকে খেয়াল করেনি। তুশি ও প্রথমে খেয়াল করেনি। পরমুহূর্তে খেয়ালে আসতেই ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। ভদ্রলোক তুশিকে দেখে চিৎকার করে রুমে ঢুকে শব্দ করে দরজা দিলো। তুশি তো হাসতে হাসতে শেষ।
তুশি মনে হয় পার্থ হারানোর পর এই প্রথম মন খুলে হাসলো। এই হাসিতে কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই। ভদ্রলোকের নাম তেহজিব সারোয়ার। ভদ্রলোকের সাথে তুশির পর দিন বিকালেও আবার দেখা হলো।
ভদ্রলোক একঝাঁক অস্বস্তি নিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
-“আপনি গতকাল ওভাবে হাসলেন কেনো?
ভদ্রলোকের কন্ঠে সংশয়, কিছুটা ভীতি। তুশি ঠোঁট টিপে হাসলো।বলল,“আমার মুখ আমি হেসেছি সমস্যা?”
তেহজিব লোকটা নেতিয়ে গেলো। তুশি তখনো মুখ চেপে হাসছে। ভদ্রলোক এদিক ওদিক একবার তাকিয়ে আবারও তুশির দিকে তাকিয়ে উৎকন্ঠা হয়ে বলল,“আমি যাই”
কথাটা বলেই দাঁড়ালো না এক মুহুর্ত। ব্যস্ত পায়ে সিঁড়ি মারিয়ে উপরে উঠে গেলো। তুশি একা একাই হাসলো কতক্ষণ। তুশি হাসতে হাসতে বাড়িতে প্রবেশ করলো। চাঁদনী আপা বাড়িতেই আছে এখনো। হুট করে চাঁদনী আপা তুশিকে ডেকে পাঠালো! তুশি দশ মিনিট পরে চাঁদনী আপার রুমে গেলো। চাঁদনী আপা তখন সবে অনয় ভাইয়ের সাথে কথা শেষ করেছে। চাঁদনী আপা হুট করে তুশিকে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত কথা বলল। তুশি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো চাঁদনী আপা মুখের দিকে! চাঁদনী আপা লাজুক হেসে মাথা নাড়ালো।
-“আপা অয়ন ভাইকে জানিয়েছিস?”
-“মাত্রই জানালাম। ও আসতে পারবে না এখনই, কিছুদিন পর ছুটির চেষ্টা করবে”
চাঁদনী আপার চোখ মুখে জেনো খুশি উপচে পরছে! তুশি চাঁদনী আপাকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে, এরপর পেটের কাছে কান নিয়ে নিজে নিজেই কিছু কথা বলল। চাঁদনী আপা হাসতে হাসতে শেষ।
–
তুশি প্রি টেস্টের আগে কলেজে গেলো এডমিট কার্ড আনতে। রিক্তার সাথে টুকটাক কথা বলছে তুশি। যদিও রিক্তাই বেশি কথা বলছে। এডমিট কার্ড নিয়ে তুশি রিক্তাকে নিয়ে ক্যান্টিনে বসে গল্প করলো কিছুক্ষণ। ক্যাম্পাসে আসতেই সায়ন ডেকে এক পাশে নিলো তুশিকে। তুশি বিরক্ত হলেও গেলো।
-“কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো, তাড়া আছে আমার”
সায়ন ইতস্তত করে বলল,“তুশি আমি তোমায় ভীষণ পছন্দ করি। তুমি কি আমার প্রেমিকা হবে?”
তুশি সোজাসাপটা বলল,
“আমার ব্যাপারে এলাকার সবাই জানে তুমি জানো না?”
-“তুশি আমি সব জানি। আমার কোনো সমস্যা নেই। তোমায় আমি কলেজের প্রথম দিন থেকে ভীষণ পছন্দ করি। তোমার অতীত নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, আর পার্থ ভাই আসবে কি না সন্দেহ। আসলে এতো দিনে তো চলেই আসতো। আদেও বেঁচে আছি কি না কে জানে”
তুশি প্রচন্ড রেগে থাপ্পড় বসালো সায়নের গালে। সায়ন অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। তুশি রাগে কাঁপছে। রিক্তা ছুটে এসেছে। তুশি সায়নের কলার চেপে বলল,
-“পার্থকে নিয়ে আমি একটা সিঙ্গেল ওয়ার্ড শুনতে চাই না। আমি পার্থর প্রেমিকা ছিলাম, আছি। পার্থ ফিরবে, অবশ্যই ফিরবে। তোমাকে যেনো আমার আশেপাশে আর না দেখি”
তুশি কলার ছেড়ে হনহন করে বের হয়ে গেলো কলেজ ক্যাম্পাস থেকে, রিক্তাও ছুটলো পিছনে। তুশি রাস্তায় এসেও রাগে কাঁপছে। রিক্তা বললো,
-“এই তুশি শান্ত হ! মাথা ঠান্ডা কর। কিছু হয়নি”
-“কিছু হয়নি? সায়ন ছেলেটাকে মন চাচ্ছে থাপ্পর মেরে বাজে কথা বলা ছুটিয়ে দেই। আমার পার্থকে নিয়ে কথা বলে? আমার পার্থ? ওর সাহস কতো!”
তুশি বেশ সময় নিয়ে শান্ত হলো। বাড়ি ফিরে প্রথমে গোসল সারলো। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ! হুটহাট বৃষ্টি নামে। তুশি সারাটা দুপুর শুয়ে কাটালো। তুশির মা তাহেরা খাতুন মেয়েকে বলে কয়ে খাওয়াতে পারলেন না। মহিলা মেয়ের এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারেন না। তুশি গাছ পাগল মেয়ে! প্রচুর গাছ পছন্দ করে। ছাঁদে তার লাগানো কত রকমের গাছ আছে। তিশি মন ভালো করতে বিকালের রোদ পরতেই বের হলো। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে নার্সারিতে আসলো। তুশিদের বাড়ি থেকে নার্সারিতে আসতে মিনিট দশেক লাগে। তুশি নার্সারি থেকে কতগুলো গোলাপ, বেলি, নয়নতারা সহ কয়েক রকম ফুল নিলো। রিকশা ঠিক করে সেগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলো তখন প্রায় সন্ধ্যে। আসার পথেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আবির্ভাব হয়েছে, এখন তা ঝুম বৃষ্টিতে পরিনত হয়েছে। রিকশা থেকে নামতে গেলেও তুশি ভিজে একাকার হবে।
তেহজিব নামক ভদ্রলোক তখনই রিকশা থেকে নেমে দৌড়ে গেইটের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভদ্রলোকের পরনে অফিসের পোশাক, আয়রন করা শার্ট, প্যান্ট, কাঁধে অফিস ব্যাগ। তুশির বুঝতে বাকি রইলো না অফিস থেকে আসছে পরশ। তুশি তাকে ডাক দিয়ে বলল,
-“এই যে ক্যাবলাকান্ত আমায় সাহায্য করুন। গাছগুলো নিয়ে একটু সিঁড়ি ঘরে রাখুন।”
তেহজিব ছোট ছোট চোখে কিছুক্ষণ তুশিকে পর্যবেক্ষণ করে চশমা খুলে পেকেটে রেখে, গাছগুলো নিয়ে সিঁড়ি ঘরে রাখলো। তুশি ভাড়া মিটিয়ে সিঁড়ি ঘরে আসলো। তেহজিব বোকাবোকা চোখে তাকিয়ে আছে। অর্ধভেজা হয়ে গিয়েছে লোকটা। তুশি চোখ তুলে তাকিয়ে চমকালো, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো অপলক! এই চোখজোড়া তার ভীষণ চেনা। তুশি ঘোরে এগিয়ে গেলো দু’পা। আনমনে হাত উঠিয়ে ছুঁয়ে দিতে চাইলো ভদ্রলোকের চোখ জোড়া।
ভদ্রলোক ছিটকে সরে এসে ভীতু গলায় বলল,
-“কি করছেন আপনি?”
তুশির চেতনা ফিরতেই থমকালো। এই লোকটাকে সে পার্থর সাথে গুলাচ্ছে? মোটেও এই ক্যাবলাকান্ত পার্থ হতে পারে না। আচরণ, চলা ফেরা, কথা বার্তা সব কিছু আলাদা এমনকি চোখের মনির রঙও! কীভাবে পার্থ হয় এই লোক? পার্থর চোখের মনিটা হালকা ধূসর রঙের কিন্তু এই লোকের ব্রাউন। একদমই মিল নেই। তুশি নিজেকে খুব বকলো।
নিজেকে স্বাভাবিক করে শুধালো,“গাছ গুলো উপরে নিতে সাহায্য করতে পারবেন?”
তেহজিব মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি প্রকাশ করলো। তুশি নিজে দুটো নিয়ে হাঁটা ধরলো। ভদ্রলোক পেছনে পেছনে আসছে। বৃষ্টি ততক্ষণে কিছুটা কমেছে। ছাদের সিঁড়ি ঘরে গাছগুলো রেখে তুশি নামতে নামতে বলল,
-“মিস্টার ক্যাবলাকান্ত গাছগুলো দেখে রাখবেন।”
ভদ্রলোক মাথা নাড়ালো। তুশি বাড়িতে এসে ফ্রেশ হয়ে না খেয়েই শুয়ে পরলো। বাইরে তখনো বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে ঝড়ো হাওয়া। তুশি লাইট বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে। নির্বিকার ভঙ্গিতে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে আছে। পার্থর স্মৃতিচারণ করছে মেয়েটা।
-“কতটা অপেক্ষা করলে আপনায় পাবো পার্থ? আমায় আর কত অপেক্ষা করাবেন?”
–
মাস দুই পরের কথা। তুশির টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিছুদিন আগেই। চাঁদনী আপা এ বাড়িতেই থাকছেন। তুশি আগের ন্যায় শান্ত। ছাদে বেশ কয়েকটা গাছ লাগিয়েছে। কিছু গাছে ফুলও হয়েছে। তুশি নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সারাটা দিন এই ওই করে। চাঁদনী আপার দেখাশোনাও সেই করে। তুশি তুমুল ব্যস্ত, মাস চার পরেই এইচএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার আগেই সিলেবাস কম্পিলিট করতে হবে। অথচ তার ঢের বাকি! হঠাৎই শামসুল মির্জা টিউটর ঠিক করলেন তুশির জন্য, অথচ তুশি বলেওনি। তুশিকে পড়াতে আসলো পরদিন রাত আটটায়। তুশি নতুন স্যারকে দেখে থতমত খেলো কিছুটা। যেই লোককে সে হেয় করতো সেই কি এখন থেকে তার স্যার?
তুশি তবুও বই খুলে বসলো। তেহজিব আইসিটি বই বের করে লজিক গেটের কতগুলো অংক দেখিয়ে দিলো। তুশিও মন দিয়ে বুঝলো। পড়াশোনায় তুশির মোটেও গ্যাপ দিতে চাইছে না। তুশি পড়া শেষে বলল,
-“এই ক্যাবলাকান্ত স্যার আপনি আমায় পড়াতে রাজি হলেন কেনো?”
চলবে
