#প্রেমচিত্র
লেখিকা:#ইশা_আহমেদ
#পর্ব_৬
পার্থ তুশিকে আশ্বাস দিলেও কাজের বেলায় লবডঙ্কা। আগের ন্যায় ঘুরছে ফিরছে আর সিগারেট গিলছে। যদিও বা আগের তুলনায় পার্থ সিগারেট কম খায়। তুশির দিন কাল কাটছে তুমুল ব্যস্ততায় আর সাথে পার্থের প্রেমময় যত্ন তো আছেই। কলেজ ফাঁকি দিয়ে দু’জন হুটহাট ঘুরতে চলে যায়। এ যেনো তুশির স্বভাবে পরিণত হয়েছে। তুশি যথা সম্ভব চেষ্টা করছে বখাটে লোকটাকে সভ্য করতে। তুশি এটুকু বুঝেছে পার্থকে শুধরানো এতোটা সহজ হবে না। আজও কলেজের নাম করে পার্থর সাথে ঘুরে এসেছে তুশি। মনটা বড্ড ফুরফুরে। এই তুশি কি জানতো বাড়িতে তার জন্য ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে?
বাড়িতে পা রাখতেই কেমন গুমোট ভাব ঠেকলো তুশির নিকট। তুশি পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টা করলো। দরজা খুলেছে ইরফান। তুশি নিজের ঘরের দিকেই যাচ্ছিলো মা তাকে থামিয়ে দিলেন। তুশিকে ড্রয়িং রুমে ডাকা হলো। তুশি এবার কিছুটা চিন্তিত হলো। শামসুল মির্জাও উপস্থিত, বড় চাচি, ছোট চাচি, দাদি সবাই আছে। শামসুল সাহেব এগিয়ে এসে মেয়েকে চড় মারলেন। তুশি ছিটকে ফ্লোরে পরলো। এক দফা মার খেলো তুশি মায়ের হাতে। সাথে আছে ছোটচাচির কটুক্তি, কটুকথা। বাড়িতে সবাই জানলো তুশি বখাটে পার্থর সাথে প্রেমে জড়িয়েছে। বড় আপাও তুশিকে ফোন করে কথা শুনালো। ব্যাথাময় শরীর টেনে তুশি নিজের ঘরে দরজা আটকালো। ফোনটা তুশির কাছেই আছে। বোধ হয় নিতে ভুলে গিয়েছে। তুশি কোনো মতে পার্থকে মেসেজ করলো। পার্থ তখন লাইনে নেই। ফোনটা লুকাতে চাইলো তুশি। তার আগেই তুশির মা মেয়েকে থাপ্পড় মেরে নিয়ে গেলেন ফোনটা। তুশি দরজা আটকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
রাত তখন গভীর! তুশি নিষ্প্রান, নির্বিকার হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। চোখ জোড়া ফ্যানের দিকে নিবদ্ধ। হঠাৎই বেলকনি থেকে শব্দ পেলো। তুশি কান দিলো না। তখনও সে নির্বিকার। শব্দ জোরালো হলো। তুশি ধীর পায়ে এগিয়ে থাই খুললো। চোখের সামনে প্রিয় পুরুষকে দেখে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। পার্থ অস্থির কন্ঠে গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো। তুশি নিজের অনুভূতির খেই হারালো। ঝাপটে ধরলো মানুষটাকে। পার্থ কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না। আশপাশ দেখে তুশিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো।
পার্থ সে রাত তুশির কাছে ছিলো বোধ হয় ঘন্টাখানেক। যাওয়ার আগে তুশিকে কথা দিয়ে গিয়েছে পার্থ তার কাছে আবারও খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। তুশির মন মানতে চাইনি। যেতে দিতে চাইনি পার্থকে। তুশি এও বলেছিলো পার্থ যেনো নিয়ে যায় তুশিকে। পার্থ রাজি হয়নি। বলেছিলে,
‘আমি যখন তোমার যোগ্য হবো তখন নিজেই নিয়ে যাবো, তোমার তখন বলার প্রয়োজন হবে না বোকাফুল। আমার জন্য অপেক্ষা করো’
তুশি করুন চোখে তাকিয়ে বলেছিলো,“নিয়ে যান না আমায়”
-“আমি সময় মতো ঠিক তোমায় নিয়ে যাবো বোকাফুল”
সেদিনের পর এক মাস পেরিয়েছে। তুশির কাছে ফোন নেই। পার্থরও কোনো খোঁজ নেই। পার্থ এই এলাকার ছেলে না। যতটুকু ব্যবহার আর কাজ কারবারে মনে হয় বখাটে। তিন, চার বছর ধরে এই এলাকাতেই তার বসবাস। তুশি বাড়ি থেকে বের হয় না, হয় না বলতে তাকে হতে দেওয়া হয় না। কলেজের পরীক্ষা গুলো মা সাথে করে নিয়ে গেছেন। তুশি এখন চুপচাপ থাকে। ঘরের ভেতরে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। চাঁদনী আপা অবশ্য মাঝে এসেছিলেন। অনেক কথা বলেও গেলেন।
–
ছয় মাস পরের কথা। তুশিকে এখন কেউ মানা করে না বাড়ি থেকে বের হতে বা কিছু করতে। তুশি এখন আগের ন্যায় স্বাধীন ভাবে চলতে পারে। কিন্তু কেনো? সেই কথা কেউ কি জানে? হ্যাঁ জানে বোধ হয়। পার্থ এলাকা ছেড়েছে মাস ছয় আগে। কেউ জানে না ছেলেটা কোথায়? কীভাবে আছে! তুশি অনেক বার গিয়েছিলো পার্থর সাঙ্গপাঙ্গের কাছে। তারাও কিছু বলতে পারে না। হুট করে নাকি গায়েব। মুনসি কাজীও খবর জানেন না। তুশির হৃদয় পুড়ে। কখনো কখনো ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দূর দূরান্তে তাকিয়ে থাকে, আবার কখনো বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রাস্তায়। নির্বিকার সেই দৃষ্টি। চাঁদনী এ বাড়িতে খুব বেশি আসে না। বোনের নিরবতা তাকে কষ্ট দেয়।
আজ তুশির কলেজ নেই। সরকারি ছুটি। তুশির আজ সকাল সকাল ঘুম ভেঙেছে। উঠেই মেয়েটা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সকাল থেকে। মাইশা এসে টেনে নিয়ে ছাদে আসলো। ছোট চাচী চিলেকোঠার রুমটা পরিষ্কার করছেন। তিনি নাকি ভাড়াটিয়া পেয়েছেন। ছোট চাচী তুশিকে বললেন,
-“অ্যাই্ তুশি আয় তো একটু সাহায্য কর। বিকালে নতুন ভাড়াটিয়া আসবে। তারে তো এমন নোংরা ঘর দেওয়া যায় না।”
-“চাচী এখানে বাচ্চারা এসে খেলতো, ভাড়া না দিলে হতো না?”
ছোট চাচী তুশির কথায় পাত্তা না দিশে বললেন,
-“একটু সাহায্য কর দেখছিস না, খেটে মরছি”
তুশি অল্প একটু সাহায্য করলো। তার মাঝেই ইরফান এসে ডেকে নিয়ে গেলো। ছোট চাচী অবশ্য ইরফানকেও মনে মনে দু’কথা শোনালেন। তুশিদের ছাদের চিলেকোঠা নয় অবশ্য বড় একটি রুম আর সাথে বিশাল বারান্দা, ওয়াশরুম, রান্নাঘর সবই আছে। এতোদিন এটা চিলেকোঠা হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। এখন থেকে ভাড়াটে থাকবে। তুশি নিচে এসে জানলো আজ চাঁদনী আপা আসবে সাথে অয়ন ভাই ও। অয়ন ভাই এসেছে ছুটিতে। তুশি তবুও বের হলো না। সেই যে রুমে ঢুকলো আর বের হওয়ার নাম নেই। তুশি বারান্দার মেঝেতে বসে রইলো এক ধ্যানে। তখন বিকাল প্রায়। দুপুরে খায়ওনি মেয়েটা। বাড়ির উঠোনে দেখা মিললো এক অপরিচিত পুরুষের। হাতে একটা জামাকাপড়ের ব্যাগ। তুশি তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলো না। ঘরে এসে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পরলো।
বিকালে চাঁদনী আপা সবাইকে ডেকে ছাদে আনলো। তুশিকে জোরজবরদস্তি করে এনেছে চাঁদনী আপা। তুশিকে একা রেখে চাঁদনী বাকি সবাইকে ডাকতে যায়। তুশি ছাঁদের কোণা ঘেঁষে আজও দাঁড়িয়ে পরে। হঠাৎ পুরুষালি কন্ঠস্বর কানে আসতেই চমকে উঠলো তুশি। পিছু ফিরতেই অপরিচিত পুরুষকে দেখে থমকালো মেয়েটা। ভদ্রলোকের গলাটা কেমন পরিচিত লাগছিলো। ভদ্রলোক ফোনে কথা বলছেন। ছাদের রুম থেকে বের হলেন। তুশি ধারণা করলো লোকটা নতুন ভাড়াটিয়া। তুশির লোকটাকে কিছুটা চেনা মনে হলেও বুঝে উঠতে পারলো না কোথায় দেখেছে। ভদ্রলোক একবার তাকালেন তুশির দিকে। ক্লিন শেভ করা, চোখে চশমা, বোকাবোকা চাহুনির লোকটার দিকে তুশি দ্বিতীয় বার তাকালো না।
চাঁদনী ছাদে এসে অপরিচিত লোক দেখে জিজ্ঞেস করলো,“আপনি কে? কার বাসায় এসেছেন?”
ভদ্রলোক ইতস্তত করে জবাব দিলেন,“আমি ওই রুমে ভাড়ায় এসেছি। আজই উঠেছি”
চাঁদনী ভ্রু কুঁচকে তাকালেও ভদ্রলোককে দেখে কিছু বলল না। কথা বলার মাঝেও কেমন কেঁপে উঠছিলো। চাঁদনী পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে আসলো। তুশি দূর থেকেই শুনছিলো সবটা। তুশির খুব হাসি পেলো লোকটার কাজ, কথা বলার ভঙ্গি দেখে। ফোনে হয়তো কাউকে কিছু বলছে আর মিনিটে মিনিটে কেঁপে উঠছে। সে বিকালে তুশির উদাসীন মনটা কিছুটা হলেও ভালো হলো। তবে মনের এক কোণে বিষাদ থেকেই যায়।
সন্ধ্যে হওয়ায় যখন সবাই নিচে নামছিলো জাওয়াদ তুশিকে ডেকে বললেন,“তুশি তুই এমন চুপচাপ থাকিস কেনো? আগের মতো কিছু করিস না কেনো?”
তুশি নিঃশব্দে হেসে বলল,
“জাওয়াদ ভাই মন মরে গেলে কি কারো কিছু করতে ইচ্ছে হয়?”
জাওয়াদ ভাই মাথা নাড়ালেন। তুশি গম্ভীর কন্ঠে বলল,,“আমারও মন মরে গিয়েছে, পার্থর সাথে সাথে হারিয়ে গিয়েছে আমার চঞ্চলতা”
তুশি দাঁড়ালো না। নিচে নেমে গেলো। নামার আগে দেখলো। নতুন ভাড়াটিয়ার রুমে কি সব জিনিস পত্র উঠাচ্ছে কারা যেনো। তুশি সেদিকে খেয়াল দিলো না সোজা বাড়িতে আসলো।
চলবে…
