#প্রেমচিত্র-[৫]
লেকনীতে-ইশা আহমেদ
তুশি থেমে থেমে বলল,“একা কই রিক্তা আছে তোহ!”
পার্থ এবার নিজের রাগ আয়ত্তে আনতে পারলো না। তুশির বাহু চেপে রূক্ষ কন্ঠে শুধাল,
“এই মেয়েটা তোমাকে বাঁচাতো? ও নিজেই তো তোমার সাথে ভোগের বস্তুতে পরিনত হত। আমি না আসলে আজ কি হতো, বলো?
তুশি উত্তর দিতে পারলো না। আসলেই তো আজ পার্থ তাদের না বাঁচালে তারা কি কাল মুখ দেখাতে পারতো কাউকে? তুশি কেঁদে ফেললো। পার্থ বোধ হয় কিছুটা নরম হলো। রিকশা ডেকে দু’জনকে উঠিয়ে দিলো রিকশায়। তুশি সারাটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে গেলো।
বাড়িতে ফিরেও তুশি স্বাভাবিক হতে পারছিলো না। সেই জঘন্য সময়টার কথা মনে পরছিলো। যখন কিছুটা স্বাভাবিক হলো তখন মাথায় আসলো পার্থর কথা। বখাটে লোকটার ছোঁয়া পেয়েছে আজ। হোক তা থাপ্পড়। পেয়েছে তো। এটাই অনেক। পার্থের অস্থিরতা কি প্রমাণ করে? পার্থ কি তাকে পছন্দ করে? তুশি নিজেই নিজের মাথায় মেরে মনে মনে বললো,
-“ইশশ্ তুশি তুই ও না। একটু বেশিই ভেবে ফেলিস। তোকে কি না ওই বখাটে বাউণ্ডুলে লোকটা ভালোবাসবে! আদেও সম্ভব?”
–
সে ঘটনার পর তুশি বাড়ি থেকে বের হলো গুনে গুনে চার দিন পর। কলেজ, কোচিং কোনটাতেই তাকে দেখা যায়নি। তুশির কিছু কথা কানে এসেছিলো। পার্থ নাকি আরেক দফা পিটিয়েছে ছেলে তিনটাকে। চাঁদনী আপা প্রায়শই এ বাড়িতে আসে। অয়ন ভাই গিয়েছে অনেক দিন। চাঁদনী আপা খুব সুখে আছে। তুশি আজ বের হয়েছে চাঁদনী আপার শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। মা জোর করে পাঠিয়েছে। চাঁদনী আপা হাঁসের মাংস খুব ভালোবাসে। এই বিকালে তুশিকে ঘুম থেকে তুলে পাঠালেন। তুশি অনিচ্ছা শর্তেও এসেছে। এ পথেই কোচিং এ যাবে তুশি। তুশি চাঁদনী আপাকে দেখে বিস্তর হাসলো। চাঁদনী আপার মুখে একটা আলাদা গ্লো চলে এসেছে। তুশির বড্ড সুখ সুখ অনুভূত হয় চাঁদনী আপার জন্য। তুশি মিনিট বিশেক কাটিয়ে কোচিং-এ চলে আসে। রিক্তা তুশিকে চার দিন পর সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় দেখেও হাজারটা প্রশ্ন করে।
তুশি জবাব দিতে দিতে অতিষ্ঠ। কোচিং শেষ হয় সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ। তুশি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় চোখ আশেপাশে দিয়ে হাঁটছে। পার্থকেই খুঁজছে তুশি। পার্থকে পেলো ফাঁকা গলির সামনে। এই রাস্তাটা কিছুটা নির্জন। তুশি চটপট পায়ে এগিয়ে আসে পার্থর কাছে। পার্থ তখন সিগারেটে সুখ টান দিতে ব্যস্ত।
-“শুনুন!”
পার্থ তাকালো। তুশি উত্তরের অপেক্ষা না করে বলল,“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সেদিনের জন্য”
পার্থ তবুও জবাব দিলো না। তুশি যাওয়ার আগে এক বুক সাহস নিয়ে বলল,
“আমি আপনায় খুব পছন্দ করি বেপরোয়া লোক”
তুশি দাঁড়ায়নি এক মুহুর্তও! দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করেছে। তুশি পেছনে ফিরলে দেখতে পেতো এক জোড়া উচ্ছ্বসিত চোখকে। যে চোখ সহজে হাসে না। বোকাফুল সামনে এলেই হাসে, তবুও লুকিয়েই হাসে! তুশি কিছু দূর গিয়েই বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। মেয়েটা বড্ড সাহস নিয়ে বলে এসেছে পছন্দ করার কথা। তুশি জানে না আদেও পার্থ তাকে পছন্দ করে কি না। তবুও বলেছে নিজের মনের কথা, এটাই অনেক। বাড়িতে ফিরে তুশি চরম বিষ্মিত হলো। মা ডেকে তুশিকে বললেন ছেলের কথা। ছোট চাচির কোন আত্নীয়ের ছেলের কাছ থেকে প্রস্তাব এসেছে তুশির জন্য। সবাই না কি রাজি! কেউ কি তুশির মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না? তুশির মন ভাঙলো! ওই মানুষটার মনের খবর জানার আগেই কি তুশি অন্য কারো হয়ে যাবে? না না জীবনেও না! তুশি যে করেই হোক পার্থর সামনে গিয়ে তার মনের কথা জানতে চাইবে।
তুশি বিধ্বস্ত মন নিয়ে রুমে ফিরলো। সে রাত তুশির কাঁদতে কাঁদতেই পার হলো। কিছুক্ষণ পর পর তুশি হেচকি তুলে কেঁদেছে। পরদিন খুব সকালে তুশি উঠে কলেজের জন্য তৈরি হলো। সকালের নাস্তাও করলো না। কলেজ পথেই পার্থর সাথে দেখা। বাইকে হেলান দিয়ে প্রতিদিনের ন্যায় সিগারেটে সুখ টান দিতে ব্যস্ত। তুশি হনহন পায়ে এগিয়ে গেলো। ছোঁ মেরে পার্থর হাতের সিগারেট টেনে দূরে ছুঁড়ে মারলো। পার্থ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মেয়েটা করছে কি ভেবে পেলো না। তুশির বিধ্বস্ত চেহারা দেখে পার্থ বোধ হয় কিছুটা চমকালো। তুশির পরনে অফ হোয়াইট আর নীলের মিশ্রনের সেলোয়ার-কামিজ। মাথায় নীল হিজাব, কাঁধে ব্যাগ। হিজাব কেমন এলোমেলো হয়ে আছে।
তুশি পার্থকে ভাঙা গলায় বলল,“আমায় দূরে কোথাও নিয়ে চলুন। কিছু কথা আছে”
পার্থ প্রশ্ন ছাড়াই বাইকে উঠে স্টার্ট দিলো। তুশিও পেছনে চড়ে বসলো। তুশিকে পার্থ হেলমেট পরিয়ে দিয়েছে। তুশিকে চেনার উপায় নেই। এলাকা ছেড়ে কিছুদূর যেতেই তুশি হেলমেট খুললো। পার্থর কাঁধে মাথা ঠেকালো। পার্থ শহর ছেড়ে কিছুটা দূরে এসে বাইক থামালো। তুশি বাইক থেকে নেমে রাস্তার পাশে ঢালু ঘাসে বসে পরে। পার্থ আরেকটা সিগারেট জ্বালায়। তুশি কেশে উঠে। পার্থ দূরে ছুঁড়ে মারে জ্বলন্ত সিগারেট। এই প্রথম বোধ হয় পার্থ কারো জন্য সিগারেট ফেলেছে। পার্থ এবার বিরক্ত হলো। মেয়েটা এমন কেনো করছে বুঝে উঠতে পারছে না।
-“তুশি আমার এতো অযথা সময় নেই। কি বলবে বলো!”
-“আপনি আমার কথায় কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এখানে কেনো আনলেন পার্থ? আপনি কি আমায় পছন্দ করেন?”
তুশির এমন প্রশ্নে চমকালো পার্থ। পার্থ আগের ন্যায় গম্ভীর কন্ঠে শুধাল,“তুমি কি বলবে তাই বলো।”
-“আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না কেনো পার্থ? আচ্ছা থাক সমস্যা নেই বলতে হবে না।”
তুশি থামলো। তাকালো পার্থের চোখের দিকে। পার্থর কেমন অস্বস্তি বোধ হলো। মেয়েটাকে আজ হুট করে বড় লাগছে, ম্যাচিউর লাগছে! তুশি আবারও বলল,
-“আমার জন্য বাড়ি থেকে ছেলে দেখেছে। ছেলে না কি খুব ভালো চাকরি করে। আপনি কি আমায় পছন্দ করেন পার্থ?”
পার্থর কি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত? পার্থ বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর চোখে তাকিয়ে থাকে তুশির দিকে। তুশি নির্বিকার। চোখ মুখ ফুলে উঠেছে। মেয়েটা সারা রাত কেঁদেছে এটুকু পার্থ খুব ভালো করেই বুঝে ফেলেছে।
-“প্রেমিকা হবে?”
পার্থর দুই শব্দে উচ্চারণ করা প্রশ্ন! তুশির হৃৎস্পন্দনের গতি বৃদ্ধি করেছে। পার্থর চোখ মুখ তখনও গম্ভীর। তুশির চাহুনি এলোমেলো। আধ ভাঙা গলায় বললো,
-“মজা করছেন?”
-“না। আজ থেকে তুমি আমার প্রেমিকা তুশি। এখন স্বাভাবিক হও। বিয়ে পরে করবো। তোমাকে এখন আমি নামিয়ে দিয়ে আসবো কলেজ থেকে কিছুটা দূরে। সেখান থেকে সোজা বাড়িতে যাবে। যদি বিয়ের জন্য বেশি প্রেশার দেয় আমায় জানাবে। তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসবো।”
-“আপনি আমায় ভালোবাসেন?”
-“তুমি বড্ড বেশি প্রশ্ন করো। তোমাকে যা বলেছি করো। নাম্বার দিচ্ছি নিয়ে যাও”
তুশি এটুকু বুঝলো বেপরোয়া বখাটে লোকটার তার প্রতি কিছুটা হলেও দুর্বলতা আছে। তুশি পার্থর চোখে নিজের জন্য অস্থিরতা, আকুলতা দেখেছে। তুশির বিষাদে পরিপূর্ণ মনটা সহজেই ফুরফুরে হয়ে গেলো। বখাটে লোকটা আজ থেকে তার প্রেমিক? ভাবা যায়! পার্থ তুশিকে সাবধানে নামিয়ে আসলো। আসার আগে বলে এসেছে সমস্যা হলেই যেনো তাকে জানায় তুশি। তুশিও সম্মতি জানিয়েছে।
–
পার্থ আর তুশির প্রেমটা হুট করে হলেও তাদের কাছাকাছি আসতে, জানতে সময় লাগছিলো। তুশির বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে। ছেলের বিয়ে ছিলো আগে। কলেজ লাইফে পালিয়ে বিয়ে করেছিলো। এখবর জানতেই তাহেরা খাতুন বেশ চিল্লাপাল্লা করেছিলো। তুশির ছোট চাচিকে কথা শুনিয়েছে। তখন তুশি আর পার্থর ফোনে প্রেমালাপ চলছে বেশ ভালোই। যদিও তাদের কথা খুব একটা হতো না। কিন্তু ফোন কানে থাকতো। পার্থ স্বভাবতই কথা কম বলে আর তুশি? সে তো লজ্জায় দু’টো কথাও ঠিক মতো বলতে পারে না। তুশির সপ্তাহ খানেক পর পরীক্ষা শুরু। পার্থকে আজ দেখা করতে বলেছে তুশি। কলেজ থেকে দশ মিনিট হেঁটে সামনে এগিয়ে আসতেই তুশি বখাটে লোকটার দেখা পায়। তুশিকে বাইকে উঠিয়ে নিয়ে আসে দূরে।
-“ কিছু কথা বলবো রাগ না করলে?”
-“যেকোনো কিছু বলতে পারো”
তুশি তবুও ইতস্তত করে বলল, “আপনি তো পড়াশোনা জানা শিক্ষিত ছেলে। বলছি কি এবার এসব ছেড়ে কি চাকরি বা কিছুতে ঢোকা যায়?”
পার্থ মুখ খানা গম্ভীর হলো। তুশি ভয় পেলো। এবার বোধ হয় পার্থ তাকে বকাঝকা করবে। তাদের প্রেমের বয়স মাত্র পনেরো দিন। তুশির উচিত হয়নি এতো তাড়াতাড়ি এসব বলা। তুশিকে অবাক করে দিয়ে পার্থ বলল,“আমি চেষ্টা করবো।”
পার্থ পড়াশোনা নিয়ে খুবই সিরিয়াস। তুশিকে ঠিক টাইমে পড়তে বসানো যেনো তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। তুশিকে সেদিন পার্থ কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে দিয়ে আসে। বাড়িতে ফিরে তুশি সেই খুশি। পার্থ এরপর থেকে ভালো হয়ে চলবে। ভাবতেই তুশির কি যে আনন্দ হচ্ছে।
চলবে
