#প্রেমচিত্র-[৩]
লেখনীতে:ইশা আহমেদ
সাতদিন পর তুশি কলেজ এসেছে। জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চোখ মুখ শুকিয়েছে মেয়েটার। বৃষ্টিতে তুশি ভেজে না ব্যাপারটা এমন না, প্রায়শই ভিজে থাকে। তবে সেদিন একটু বেশিই ভেজা হয়েছিল। সেজন্যই জ্বর, কাশি সব এক সাথে বাঁধিয়ে বসেছিলো। সাত দিন পর কলেজে এসে শুকনো মুখে কলেজ করলো তুশি। রিক্তা অবশ্য মাঝে একদিন দেখে এসেছে বাড়িতে গিয়ে। আজ অবশ্য রিক্তা আসেনি। তুশি চারটা ক্লাস করে দুপুর বারোটায় বের হলো কলেজ থেকে। টানা কদিন বৃষ্টির পর আজ সূর্য তার তেজ সম্পূর্ণ রূপে ঢালছে! তুশি ঘেমে জুবুথুবু। হিজাব কিছু অংশ ভিজেছে। কলেজে চত্তর পার হওয়ার আগেই তুশি নিজের নাম শুনতে পেলো পুরুষালী কন্ঠে। তুশি পিছু ফিরে চাইলো।
ভিড়ের মাঝে খুঁজল নামে ধরে ডাকা ব্যক্তিকে। চোখ বাঁধলো ক্লাসমেট সায়নকে। সায়ন ছুটে তুশির কাছে আসলো। সায়ন ক্লাসের টপার বয়। দেখতে শুনতে খারাপ না। ছেলেটা তুশির সাথে বন্ধুত্ব করার অনেক চেষ্টা করেছে তবে তুশি পাত্তা দেয়নি। আর না কখনো দিবে। তুশিকে বিষ্মিত করে দিয়ে সায়ন একটা লাল গোলাপ বের করে, সামনে ধরলো তুশির। তুশি হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো। তুশি মনে মনে ভেবে বসলো ছেলেটা তাকে প্রপোজ করবে। তুশিকে অবাক করে দিয়ে সায়ন ফুল এগিয়ে দিয়ে বলল,
-“তুশি বন্ধু হবে আমার?”
তুশি বিরক্ত হলো। ফুল দিয়ে কেউ বন্ধু হতে বলে? আজব ব্যাপার। বলল,“তোমাকে আমি আগেই আমার উত্তর জানিয়েছি। এখন পাবলিক প্লেসে সিনক্রিয়েট করছো কেনো?”
সায়নের বোধ হয় মন খারাপ হলো। তুশি বিরক্ত হয়ে পা বাড়ালো বাড়ির উদ্দেশ্যে। তুশির বিরক্তি ভাব কাটলো বাড়ির মোড়ের চার দোকানে বসে থাকা পার্থকে দেখে। হাতে বরাবরের ন্যায় সিগারেট। তুশি আড়চোখে দেখে গেলো। তুশি পার্থর সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। পার্থ এ পাড়াতেই মুনসি কাজীর বাড়িতে ভাড়া থাকে। ছেলেটার ব্যাপারে কেউ কিছু জানে না। তুশি যতটুকু শুনেছে পার্থ কোনো প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। পার্থ যাই হোক না কেনো তা নিয়ে তুশির অভিযোগ নেই। পার্থকে পেলেই হবে তার। ওই বখাটে, অসভ্য ছেলেটাকে সভ্য করে তুলতে চায় তুশি।
–
দিন পনেরো পরের কথা। চাঁদনী আপার জন্য অয়ন ভাই প্রস্তাব পাঠালেন। চাঁদনী আপার সে কি লজ্জা! তুশি হাসতে হাসতে শেষ। শামসুল মির্জা এক কথায় রাজি হলেন। ছেলের সরকারি চাকরি, কেই বা রাজি না হয়ে পারে? চাঁদনী আপাকে দেখতে আসলো যেদিন অয়ন ভাই, সেদিন আপা নীল রঙের জামদানি পরেছিলো। আপাকে যেনো চাঁদের টুকরো লাগছিলো। আলোচনা সাপেক্ষে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হলো সামনের মাসের দুই তারিখে। বিয়ের মাত্র আছে দশ দিন। এর মাঝেই সব ম্যানেজ করতে হবে। অয়ন ভাইয়ের ছুটি বেশি দিন নেই তাই এই সিদ্ধান্ত। চাঁদনী আপার বিয়ের কেনাকাটা হচ্ছে ধুমধাম করে। তুশির মোটেও আজ কলেজে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো না। সামনে ইয়ার ফাইনাল আজ যেতেই হবে। তুশি কলেজে আজ ক্লাস করবে দুটো। রিক্তার বাড়ির সামনে থেকে রিক্তাকে নিয়ে কলেজে গিয়ে ক্লাস করলো দুইটা।
তুশিদের কলেজে রাজনীতি হয়, যেনো তেনো রাজনীতি নয় কিন্তু। যদিও তুশির এসবে কোনো আগ্রহ নেই। আজ কি একটা সম্মেলন থাকায় ক্লাস হবে না। দুটো ক্লাস শেষেই ছুটি। তুশি আর রিক্তা ক্লাস করলো। ক্যান্টিন থেকে চা খেয়ে মাঠে আসতেই দেখা মিললো বখাটে ছেলেটার। ওহ! বলা হয়নি পার্থ রাজনীতি করে। বেশ ভালোই নাম ডাক। তুশি আড় চোখে দেখলো। রিক্তাকে অনুরোধ করলো কিছুক্ষণ থাকতে। রিক্তা রাজি হচ্ছিলো না তবুও বান্ধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়েছে। তুশি দাঁড়িয়ে দেখছিলো সবটা। এর মাঝেই তুশির দু ক্লাস সিনিয়র মিরাজ তুশিকে ডেকে সাইডে ডাকে। তুশি বিরক্ত হলেও চুপচাপ থাকে।
-“তুশি আই লাভ ইউ”
-“দুঃখিত আমি আগ্রহি নই”
-“তোহ কি হয়েছে, আমার প্রেমিকা হয়ে যাও তুশি”
-“আমি না বললাম তো”
তুশি চলেই যাচ্ছিলো, মিরাজের কথায় থমকে দাঁড়ালো। মিরাজ রেগে অশ্লীল কিছু কথা বলে তুশিকে। তুশি লজ্জায়, অপমানে নিচু চোখে আশপাশ দেখে কাঁদতে কাঁদতে কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করে।
পার্থ দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখছিলো। তুশি কলেজ ছাড়তেই সে হনহন পায়ে এসে মিরাজের সামনে দাঁড়িয়ে কষিয়ে থাপ্পড় মারে। মিরাজ থাপ্পড় খেয়ে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পরে। উপস্থিত সবাই বিষ্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। পার্থ তখন ভীষণ রেগে! কই আগে তো পার্থ কোনো মেয়ের জন্য এমন করেনি। তবে কি কিছু চলছে পার্থ আর তুশি নামক কিশোরীর মাঝে? পার্থ আশেপাশে ভীড় জমতে দেখে ধমক দিয়ে বলে,
“যার যার কাজে যাও”
জায়গা সুরসুর করে ফাঁকা হলো মিনিট দুয়েকের মাঝে। পার্থ নিচু হয়ে মিরাজের নাক বরাবর ঘুষি দিলো। কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“ওর থেকে একশো হাত দূরে থাকবি।”
পার্থকে দলের ছেলে-পেলেরা কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলো না। পাবেই বা কীভাবে? পার্থর সামনে এই নিয়ে টু-শব্দ করলে শক্ত হাতের সপাটে থাপ্পড় খাওয়া লাগবে। কেইবা চাইবে ওই লম্বাচওড়া, শক্ত পোক্ত মানুষের হাতের থাপ্পড় খেতে? পার্থ সেদিন স্বাভাবিক ভাবে সম্মেলনে যোগ দিলো।
–
তুশির কানে এই খবর আসলো চাঁদনী আপার বিয়ের তিন দিন আগে। বাড়ি ভর্তি মেহমান। রিক্তার ও দাওয়াত। রিক্তাই জানিয়েছে পুরোটা। তুশি সেদিনের পর কলেজের রাস্তাও মাড়ায়নি। কি অশ্লীল বাক্য; ছিহ্! তুশির মনে পরলে এখনো গা গুলিয়ে উঠে। তবে এটুকু শুনে বেশ ভালো লেগেছে তুশির, পার্থ তার জন্য ওই জঘন্য লোকটাকে মেরেছে এটুকুই অনেক। রিক্তা বিয়ের তিন দিন থাকবে। আজ মেহেদী। বোনেরা মিলে ছোটখাটো মেহেদীর আয়োজন করেছে। রিক্তা আবার খুব ভালো মেহেদী দিতে পারে। চাঁদনী আপাকে দিবে মেহেদী আর্টিস্ট। আর বাকিগুলোকে রিক্তা যতটুকু পারে দিয়ে দিবে।
তুশি আজ গাঢ় সবুজের উপর ডিজাইন করা শাড়ি পরেছে, সাথে চুলগুলো বিনুনি করে ফুল গাঁথা! মুখে হালকা মেকাপের আস্তরণ। দেখতে বেশ মিষ্টি লাগছে। তুশি কখনোই হিজাব খুলে না কোনো পুরুষের সামনে। আজ বাইরের কোনো ছেলে আসবে না। এমনকি জাওয়াদ ভাইও না। এজন্যই চুলগুলো বিনুনি করেছে তুশি। চাঁদনী আপা আজ একা একাই সেজেছে। চাঁদনী আপার সাজার হাত খুব ভালো। বোনেরা মিলে তুশির রুমের এক পাশের দেওয়াল সাজিয়েছে। তুশিদের ভালো ক্যামেরা আছে। তুশি জাওয়াদ ভাইয়ের থেকে ছবি তোলা শিখেছিলো। আজ খুব ভালো কাজে দিবে। তুশি রিক্তাকে সাজতে বলে চাঁদনী আপার রুমে এসে নক করলো।
“দরজা খোলা আছে ভেতরে আয়!”
তুশি ভেতরে ঢুকে চাঁদনী আপাকে দেখে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইলো। তুশিদের দুই বোনের মধ্যে সব থেকে ফর্সা হচ্ছে চাঁদনী আপা, এরপর তুশি। তুশিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে দেখে চাঁদনী আপা হেসেই ফেললো। বলল,
“কি রে তুশি এমন হা করে তাকিয়ে আছিস কেনো? আমায় কি আগে দেখিস নি?”
-“আপা তোমাকে আজ চাঁদের টুকরো না পুরো চাঁদ লাগছে। চাঁদের ও কলঙ্ক আছে তবে আমার আপার কোনো কলঙ্ক নেই“
চাঁদনী শব্দ করে হাসলো। হাসতে হাসতে ফিসফিস করে বলল,“তুশি রে আমারও কলঙ্ক আছে। তোর অয়ন ভাই আমার কলঙ্ক। অয়ন নামক কলঙ্ক আমি সারা জীবন বয়ে বেরাতে প্রস্তুত তুশি”
-“আপা তোমাকে এই শাড়িটায় একদম রানী লাগছে সত্যি বলছি”
চাঁদনী কানের দুলটা পরতে পরতে বলল,“তোকেও আজ খুব সুন্দর লাগছে তুশি”
তুশি লজ্জা পেলো। চাঁদনী আপা থেমে আবার বলে,“তুশি অয়ন পাগলামি করছে সামনা সামনি দেখার। বলছে মিনিট পাঁচেক পর পেছনে এসে অপেক্ষা করছে। কি করবো বল তো?”
তুশি উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলল,“চলো আপা। তুমি দেখা করে এসো আমি পাহারা দিবো কেমন?”
চাঁদনী তুশির কান মলে দিয়ে বলল,
“ইদানিং বড্ড পেকেছিস রে তুশি। কি করা যায় তোকে বল তো?”
-“আপা ছাড়ো এসব। ওই দেখো অয়ন ভাই কল করেছে। চলো লুকিয়ে যাই আমরা”
চলবে…..
